টাইম মেশিন-যে তৃষা জাগিল-রোজি সিং-শরৎ ’২৬

এই লেখকের আগের লেখা- যারা হারায় রূপকথায়, এক অন্য জালিয়ানওয়ালাবাগের গল্প, ফরাসডাঙার যিশু

উত্তরের হিমেল হাওয়ায় শীত শীত ভাব। চারদিকে পাতলা কুয়াশা ঘিরে আছে। কার্তিক মাসের আকাশ রাতের শেষ প্রহরের তারা নিয়ে স্থির। মাঝে মাঝে পেঁচা বা রাতজাগা কোন পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও শেয়াল বা বন্য কোনও প্রাণীর ডাক রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করছে। দাঁড় বেয়ে দ্রুতগতিতে চলেছে একটি নৌকো। জিনিসপত্র বোঝাই নৌকোটির ভেতর আছে এক জ্বরের রুগী। সে অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত বোধ করায় পানীয় জলের সন্ধানে নদীর তীরে এসে নৌকো ভিড়ল। চারদিকে হোগলা বন। অদূরে শ্মশান, জ্বলন্ত কাঠ, আধপোড়া শব—এসব পেরিয়ে নৌকোর লোকজন এল ছোট্ট একটা কুটিরের সামনে। সেখানে সাধনায় মগ্ন এক সাধক।

একদল মানুষের পায়ের আওয়াজে চোখ মেললেন দয়াল ঠাকুর। সামনে বিশালদেহী, শক্তিশালী, ভয়ংকর চেহারার কিছু মানুষ দেখে তিনি অনুমান করে নিলেন, এরা আসলে ডাকাতদল। কোনও জায়গা থেকে ডাকাতি করে ফিরছে। দয়াল ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবাজিদের কোথা হতে আগমন?”

“আজ্ঞে, আসছি দামোদর বর্ধমান থেকে। যেতে হবে বহুদূর, সেই দক্ষিণে রামকেষ্টপুর (বর্তমান কাকদ্বীপের রামকৃষ্ণনগর)।”

তারা আরও জানাল, তাদের দলপতি কেষ্ট মহাপাত্র গুরুতর আহত ও অসুস্থ। তার পানীয় জলের প্রয়োজন।

জল দিতে গিয়ে দয়াল ঠাকুর দেখলেন, ডাকাতেরা তাদের লুঠের জিনিসপত্র ভাগ-বাটোয়ারা করছে। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল একটি এক হাত, কষ্টিপাথরের তৈরি বিগ্রহের দিকে। তিনি ডাকাতদের কিছু বুঝতে না দিয়ে বললেন, “বাবাজিরা, এত দূর থেকে আসা হচ্ছে, সঙ্গে রাজরাজেশ্বরী মা ব্রহ্মময়ীর এই বিগ্রহ। এঁকে কি একটু জল-বাতাসা দেওয়া হয়েছে? নইলে যে বড়ো অকল্যাণ হবে।”

দয়াল ঠাকুরের কথা শুনে চমকে উঠল ডাকাত সর্দার। বলল, “ক্ষমা করো ঠাকুর, আমরা মহাপাতক, তস্করের দল। না বুঝে এই বিগ্রহের অমর্যাদা করেছি। আমাদের তুমি অমঙ্গল থেকে রক্ষা করো।”

দয়াল ঠাকুর বললেন, “বেশ, এই বিগ্রহ আমাকে দাও। আমি এর অন্নজল, আরতির ব্যবস্থা করি।”

সর্দার অন্য ডাকাতদের উদ্দেশ করে বলল, “ওরে শোন, মাকে আর টানাহ্যাঁচড়া করিসনি। সবকিছু গুছিয়ে নে। শুধু এই বিগ্রহখান ঠাকুর মশাইয়ের কাছে রেখে যা। এ-ই হয়তো মায়ের ইচ্ছে। তিনি এখানেই থাকতে চান।”

ভোরের আলো ফোটার আগে ডাকাতদল বিদায় নিল। পরের অমাবস্যা তিথিতে শ্মশানের পাশে একটি পুরোনো বটগাছের নীচে পঞ্চমুণ্ডির আসন পাতলেন দয়াল ঠাকুর। তাঁর গুরুদেব স্বামী পূর্ণানন্দকে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করালেন সেই বিগ্রহ। গোল পাতার ছাউনি দিয়ে ঘেরা পর্ণ কুটিরে শুরু হল মা ব্রহ্মময়ীর পুজো। সময়টা ১৮৯২/৯৩ সাল নাগাদ।

এইসব ঘটনাকে জনশ্রুতি বলা হলেও গবেষকদের ধারণা, এই বিগ্রহ আসলে শাক্ত কবি, গায়ক ও কালীসাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের। বর্ধমানের চাঁপা গ্রামখানি ছিল কমলাকান্তের জন্মস্থান। শৈশবে পিতৃহীন কমলাকান্ত অতি কৈশোরেই আধ্যাত্মিকতার মধ্যে নিজেকে নিমগ্ন করেন এবং বিশালাক্ষী মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির মন্দির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। ক্রমে তাঁর সাধনা, সংগীতানুরাগ, সাহিত্য বা গীত রচনা ইত্যাদির খ্যাতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়লে বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজ তৈজশচন্দ্র বা তেজ চাঁদের কর্ণগোচর হলে তিনি রাজবাড়ির কাছে বোরহাটে কমলাকান্তকে একটি মন্দির নির্মাণ করে দেন। সেই সঙ্গে একটি অখণ্ড কালো পাথর কেটে তৈরি করিয়ে দেন এক বিগ্রহ, যার কোথাও কোনও জোড়া নেই। এমনকি গলার মুণ্ডমালাটিও ওই পাথর কেটে তৈরি। এই বিগ্রহর পায়ের নীচে শিব শায়িত নেই। কথিত আছে, কমলাকান্ত নিজের বুকের ওপর এই বিগ্রহ রেখে পুজো করতেন। ১৮২১ সালে ঠিক পঞ্চাশ বছর বয়সে কমলাকান্ত সাধনোচিত ধামে গমন করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে ওই মন্দিরে, মায়ের মূর্তির নীচে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এর বেশ কিছু বছর পর বিগ্রহটি উধাও হয়ে যায়।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে একই সঙ্গে কর্মরত হবার সুবাদে দয়াল ঠাকুর ও অযোধ্যা নিবাসী বলভদ্র পাণ্ডে বিশেষ বন্ধু ছিলেন। প্রথম দিকে দয়াল ঠাকুর নিজে মায়ের পুজো করতেন। এরপর তিনি ডেকে পাঠালেন বলভদ্রকে, যিনি ততদিনে সাধনা করে ফুল্লরা পীঠের পুরোহিত নিযুক্ত হয়েছে রামজি সাধু নামে। রামজি বজবজে এসে মায়ের পূজার্চনার দায়িত্ব নিলেন। এক হাত দৈর্ঘ্যের মাকে তিনি ডাকতেন ‘খোকি মাঈ’। সেই থেকে রামজি সাধুর খোকি মাঈ নদীতীরে সবুজ কোমল এই জনপদটির ‘খুকি মা’ হয়ে উঠলেন।

একদিন এক পাতাঝরা নিঝুম দুপুরকে অসাধারণ করে তুলেছিল একটি অনন্য রচনা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসটি। সেখানে পেয়েছিলাম গোঁসাইবাবার পরিচয়। তারপর তাঁর লেখা চিঠিগুচ্ছের একটি চিঠি থেকে জানতে পারি ‘ধাত্রীদেবতা’ আসলে তারাশঙ্করের আত্মজীবনী। আর ‘গোঁসাইবাবা’ অন্য কেউ নন রামজি সাধু ছাড়া। তিনি বলেছেন, তাঁর জীবনে যাঁরা অক্ষয় স্থানের অধিকারী, গোঁসাইবাবা বা রামজি সাধু তাঁদের মধ্যে অন্যতম। পারিবারিক গভীর পরিচয়ে জন্মকাল, কৈশোর এবং যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত গোঁসাইবাবা তাঁর জীবনে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন লেখকের কল্যাণ কামনায় গোঁসাইবাবা যজ্ঞ করেন। বীরভূমের লাভপুর থেকে কলকাতায় আসার পর তিনি মাঝে-মধ্যে বজবজে খুকি-মার মন্দিরে এসে সময় কাটাতেন।

কালস্রোতে বয়ে গেছে অনেকগুলি মাস, বছর। ঋতুচক্র আবর্তিত হয়েছে। পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সভ্যতার বিকাশ ও বদল ঘটেছে প্রতিনিয়ত। মায়ের অপার কৃপা বর্ষিত হয়েছে ভক্তবৃন্দের প্রতি। এখন এখানে মোজাইক করা সুন্দর মন্দির, নাটমন্দির, পাথরের দোল বেদি, শিবমন্দির ও অন্যান্য দেবালয় যেখানে বিরাজিত আছেন নানান দেবদেবী। এছাড়া রাস মঞ্চ, গণেশ মন্দির ও আছে একটি সেগুন কাঠের রথ। প্রতিবছর রথযাত্রায় এই রথের রশিতে টান পড়ে। আছে তিনটি শঙ্কু আকৃতির উঁচু বেদি। যেগুলির ফলকে লেখা নাম তিনজন মহাত্মার স্মৃতি বহন করে। এঁরা হলেন দয়াল ঠাকুর, রামজি মহারাজ এবং স্বামী পূর্ণানন্দ। কালীবাড়ির পিছনে আজও আছে সেই শ্মশান। বর্তমানে এটিকে আরও উন্নত করা হয়েছে।

নিত্য পূজা ছাড়াও বছরের প্রতিটি পালাপার্বণে গঙ্গাতীরের এই প্রান্তরে জমা হয় অগণিত মানুষ। ‘মেলা’ বসে কোন উৎসবে। আজ নাগরিক জীবন ক্লান্ত ও প্রযুক্তি পরিবেষ্টিত। তবু দু-দণ্ড শান্তি ও মুক্তির আশ্বাস এখানে মেলে। ওই চিঠিতেই তারাশঙ্কর লিখেছিলেন, ‘আজও পর্যন্ত যান্ত্রিক সভ্যতার জড়বাদের মধ্যে আধ্যাত্মবাদের মতো প্রাণকেন্দ্রে জাগ্রত রয়েছেন। ভারত সভ্যতার বিবর্তনের রূপটিকে অবিকৃত রেখেছেন।’

প্রতি সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠে অসংখ্য আলোকমালা। ধূপ-দীপ, সন্ধ্যারতি ও শঙ্খধ্বনিতে সূচনা হয় শুভাশুভ। বাঁধানো ঘাটে আছড়ে পড়ে নদীর ঢেউ। লঞ্চ যাত্রীরা জেটিতে দাঁড়িয়ে যান কয়েক মুহূর্ত, মন্দিরের দিকে তাকিয়ে ‘মা’-কে প্রণাম করেন। গঙ্গার জলে ভেসে বেড়ায় আলোর প্রতিবিম্ব, যা দেখে মনে হয় এ যেন এক দিগ্‌ নগর যা বোরহাট ও বজবজের মিলন সেতু। মূর্তি উধাও হওয়ার পরও বোরহাট মন্দিরের পূজার্চনা অব্যাহত ছিল। মাটির ঠাকুর গড়ে পুজো, উৎসব ইত্যাদি সমাদরে পালিত হত। ২০১৫ সাল নাগাদ বর্ধমান রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছে পাথরের কালীমূর্তি যার উচ্চতা প্রায় ছ’ফুট।

সান্ধ্যভ্রমণ সেরে, সন্ধ্যারতি দেখে বাড়ি ফেরার পথ ধরেন প্রবীণরা। তাঁদের মধ্যে কেউ গেয়ে ওঠেন, ‘আনন্দময়ী মাগো, আপনাতে আপনি থেকো।’ মা থাকেন নিশিদিন অতন্দ্র প্রহরায়।

Leave a Reply