আগের পর্ব- ব্যাঙ ও লাওস, নেপালি বাদুর, ইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব, থমকে চমকে থাইল্যান্ড, কঙ্গোয় কয় দিন, সিয়েরা লিওনের পাতাখোর, আম আদমির মালাওয়ি, পাহাড়ি আহার, হাবিজাবি খাবার দাবার
আমাদের ছোটোবেলায় স্লাইস ব্রেড ছিল না। মফস্সলে থাকতাম, পাঁউরুটি বলতে বুঝতাম একটা চৌকো সলিড জিনিস, তাকে দু-ভাগ করে টোস্ট করে খেতে হত। একটু বড়ো শহর দুর্গাপুর, ছুটিতে সেখানে গেলে অবশ্য বাবা বাজার থেকে স্লাইস রুটি আনতেন, কয়লার উনুনে তারের জালির ওপরে সেঁকে তাতে বাড়িতে করা পেয়ারার জ্যাম লাগিয়ে খাওয়া হত। সেটা একটা ভীষণরকম বিলাসিতা ছিল। সেঁকার পর একটু কালো কালো হত, হালকা পোড়া গন্ধ। আমার এখনও টোস্টের থেকে সেঁকা পাঁউরুটি ভালো লাগে।
তবে বাড়িতে পাঁউরুটি আসত কালেভদ্রে। শান্তিনিকেতন থেকে ছুটিতে দুর্গাপুরে গেলে বাবা কুমিরের মতো দেখতে মিষ্টি রুটি আনতেন। ভিতরে লাল চেরি দেওয়া। একটা গোলমতো বান রুটি পাওয়া যেত। তার ওপরে একটা হাফ চেরি দেওয়া থাকত। ছোটোবেলায়, মানে দশ বছর বয়স অবধি পাঁউরুটির ধারণা বলতে এই। তখনও হাতে পয়সা দেওয়া হত না। ফলে বাড়ির খাবার আর ইস্কুলের টিফিন। বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে গেলে রুটি, তরকারি, পরোটা, গুড় এইসব। বাড়ির টিফিন খাওয়ার সময় ছিল না, টিফিনের সময় খেলতে হত। ফেরার সময় রাস্তায় ভুতো, কালু ইত্যাদি চারপেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকত, কারণ আমার টিফিন খাওয়ার ব্যাপারে তাদের একটা অধিকার বোধ জন্মে গিয়েছিল।
ইস্কুলে টিফিন দিতে আসতেন খুদুদা। একদিন মুড়ি-বাদাম, একদিন লুচি-আলুরদম। বেকারির প্রোডাক্ট বলতে একদিন আসত রাশিয়ান বিস্কুট। আর একদিন লম্বু। লম্বু একটা গোল শক্ত জিনিস, কেন তার নাম লম্বু হয়েছিল জানি না। ভিতরে একটা চটচটে নারকেলের পুর দেওয়া। রাশিয়ান বিস্কুট সাদা ফসফসে। ওপরে শুকনো নারকেলের গুঁড়ো ছড়ানো। ফর্সা বলে হয়তো তার নাম ছিল রাশিয়ান। আর কখনও আসত বাপুজির কেক। সে-কেক আজও পাওয়া যায়, দাম এখন বেড়ে আট টাকা। একটু মান পড়েছে, তবে এখনও কাগজের মোড়কে লাল সবুজ চিনিতে ডোবানো অজানা ফলের টুকরো—গরিবের ফ্রুট কেক। তাড়াহুড়োর মুখে রাস্তায় খিদে পেলে এখনও বাপুজিই ভরসা।
একটা বেকারি ছিল শান্তিনিকেতনে, একচেটিয়া। তারাই সব পাড়ায়, দোকানে পাঁউরুটি দিত। এক নাম ভুলে যাওয়া কাকু একটা ওলটানো গাড়িতে চড়ে পাঁ-উ-রু-টিইই বিক্রি করতে আসত পাড়ায়। রিকশায় চালক বসে থাকে সামনে, কিন্তু এই রুটির গাড়ির চালক বসে পিছনে আর মস্ত বাক্সটা তার সামনে—আমার কেবলই কেমন সোজা উলটো গুলিয়ে যেত।

কলেজে উঠে একটু টাকাপয়সা আসে হাতে—হাতখরচ। তখন বুঝতে পারলাম, বারো হাজার বছরে ঘটনাচক্রে আবিষ্কার করা রুটি আর তিন-চার হাজার বছর আগে ইজিপ্টে তাতে ইস্ট দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা পাঁউরুটি মানব সভ্যতায় কী অপরূপ অবদান রেখেছে।
ওই কোয়ার্টার পাউন্ড পাঁউরুটির পেট কেটে তাতে কী না মাখিয়েছি আমরা! ক্যান্টিনে একটা দুরন্ত ব্যাপার ছিল মাঝখানে ভেজিটেবল চপ চেপ্টে স্যান্ডউইচ করে তিন ফুট চা সহযোগে সুড়ুত সুড়ুত করে খাওয়া। বিকেলের দিকে মামার ক্যান্টিনে গরম রসগোল্লা নামত। একটা নরম তুলতুলে রসগোল্লা নিলে অনেকখানি রস পাওয়া যেত। উনুনে সেঁকা একটু পোড়া গন্ধের কড়কড়ে রুটি রসে ডোবালেই অমৃত হয়ে যেত। বেশি ডোবানো যাবে না, তাহলেই ব্যাপারটা অতি আদুরে হয়ে পড়বে; রসে ডুবিয়েই পাঁউরুটির ভিতর অবধি রস যাওয়ার আগেই তাকে মুখে চালান করতে হবে পাঞ্জাবিতে রস না পড়তে দিয়ে। চপ স্যান্ডউইচে ভেজিটেবল চপ ছাড়াও আলুর চপ, বিপদে আপদে ফুলুরি চেপ্টেও খেয়েছি।
আর একটা ঘরানা হচ্ছে টোস্ট। দু-ফাঁক করে সেঁকে তাতে নানাবিধ জিনিস মাখানো। ডিম-টোস্ট ব্যাপারটা আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি। তবে বাটার টোস্টে চিনি ছড়িয়ে খেতে বেশ লাগে। কেউ কেউ একটু গোলমরিচ ছড়িয়ে খান। তবে এসব ক্ষেত্রে কোঁত করে গিলে নেওয়ার জন্য আমার একটি কলা লাগে; এক কামড় টোস্ট, চিনি দাঁতে কড়মড় করে উঠছে আর তাকে প্রশমিত করার জন্য কলা। কলকাতায় এসে সর টোস্ট খেলুম—আহা। তা গিলতে অবশ্য অনুঘটক লাগে না। টোস্ট ব্যাপারটা যেই স্লাইসে নামিয়ে আনবেন, অমনি সেটা সাহেবি হয়ে যাবে। সাহেবি দুধ-পাঁউরুটি খেতে অবশ্য মাঝে মাঝে ভালোই লাগে।
ভারতে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের হাত ধরে পাঁউরুটির প্রবেশ ঘটে। তবে মাঝখানে যা হোক কিছু একটা দিয়ে স্যান্ডউইচের সৃজনশীলতা ভারতবর্ষের মতো আমি কোথাও দেখিনি। মৃত মুরগির টুকরো তো বটেই, কিন্তু যেখানে যেরকম খাবারের চল, সেখানে তাকেই বেচারা পাঁউরুটির সঙ্গে লেপ্টে থাকতে হয়েছে। এমনকি অ্যাভোকাডোর মতো এক বিস্বাদ ফল গুঁজেও স্যান্ডউইচ হয়— ভাবি আমাদের লাউ কী দোষ করল! মধ্য এশিয়ায় পাঁউরুটিতে টক দই লাগিয়েও খেতে হয়েছে যস্মিন দেশ যদাচার-এর দোহাই দিয়ে। পনির, আলু টিকিয়া, ভুট্টা, পালংশাক, আইসক্রিম—কীসের না স্যান্ডউইচ বানিয়েছে মানুষ। সেটা নানা এয়ারপোর্টে ঘুরলে বোঝা যায়। কেবল উচ্ছে ভাজাটাই যা বাকি! লিখতে লিখতে মনে হল, ডায়াবেটিকদের জন্য উচ্ছে ভাজা-স্যান্ডউইচের একটা পেটেন্ট নিয়ে রাখা ভালো, দিনকাল যা পড়েছে! বাড়িতে থাকা এক জেন জি-র কল্যাণে শুয়োরের মাংসের জ্যাম লাগিয়ে পাঁউরুটি খাওয়ারও সৌভাগ্য হল।
বিদেশ থেকে আমদানিকৃত স্লাইস রুটিতে শসা, টমেটো, লেটুস, মাংস ও নানাবিধ সস দেওয়া স্যান্ডউইচ অবশ্য আজকাল সব জায়গায় পাওয়া যায়। বেশ ফ্যাশনেবল, তাই পঁয়ত্রিশ টাকা খরচের জিনিস দেড়শো টাকায় পাওয়া যায় মাঠে-ঘাটে। বিমানবন্দরে তো সাড়ে তিনশোর নীচে কিছুই নেই প্রায়! তবে কিনা যেটা মাথায় নিয়ে লিখতে আসা, ব্যাপারটা রান্না করা কী সহজ ভাবুন। কেউ কিছু জানুক না জানুক, স্যান্ডউইচ করে নিতে জানবেই। হোটেলে ব্রেকফাস্টে তো আজকাল নিজের হাতেই বানিয়ে নিতে হয় সবাইকে। পাঁউরুটি সেঁকা না হলে আমার কেমন কাঁচা কাঁচা মনে হয়। আমার এক বন্ধু আমাকে যদিও অনেকবার বুঝিয়েছেন, পাঁউরুটি রান্নাই করা হয়, সুতরাং তাকে না সেঁকলেও কাঁচা বলা যাবে না। আমি শুনলেও ব্যাপারটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করিনি।
তবে টোস্টার ব্যাপারটি অতি ভয়ানক বস্তু। আপনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখবেন পাঁউরুটি ব্যাটারা কোনও মতেই সেঁকা হচ্ছে না, যেই আপনি দূরে যাবেন, অমনি সে ঝাঁ করে পোড়া কয়লা হয়ে যাবে। কোনো-কোনো টোস্টার কনভেয়ার বেল্টের মতো—এদিকে ঢোকালেন, অনেকক্ষণ পরে স্লো মোশনে নীচ দিয়ে খটখটে পাঁউরুটি বেরিয়ে আসবে। অবশ্য সে রুটির টুকরো আপনিই ঢুকিয়েছেন কি না তার গ্যারান্টি নেই। লোকে অনেক সময় কটমট করে তাকায়, ভাবখানা এই যে, ওই রুটির টুকরোয় তারই নাম লেখা। তাগড়াই চেহারার লোক থাকলে আমি আর সেদিন পাঁউরুটিই খাই না। কে জানে বাবা পাঁউরুটির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা না লেগে যায়! এমনিতেই পাঁউরুটি খেতে আমি খুব ভালোবাসি না, পাঁউরুটি খাই তার সঙ্গে যা আছে সেইটা খাওয়ার জন্য। যেমন আধখানাতে জ্যাম আর আধখানায় বাটার দিয়ে দুটো একসঙ্গে খেতে দারুণ লাগে। ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে কলেজে কোয়ার্টার পাউন্ড রুটি সেঁকার সঙ্গে পেঁপে-মুরগি-গাজর-আলু দিয়ে একটা স্টু করা হত—তার লোভে খেতাম। নানকিদার দোকানে ঘুগনি, কাঁচা পেঁয়াজ আর ওপর থেকে ছড়িয়ে দেয়া ভাজা মশলার জন্য পাঁউরুটি খেতাম। রক্তদান করলে অনেক সময় ডিমসেদ্ধ, কলা আর পাঁউরুটি দিত, আর কলাটিও অধিকাংশ সময় কাঁচা থাকত। আমার ভয় হত, পাঁউরুটি-সেদ্ধ ডিম বিনা কলায় গলায় আটকে না একটা বিপদ হয়। রক্ত দিয়ে আপনার কিছু হল না, কিন্তু গলায় পাঁউরুটি আটকে মারা গেলেন, এটা খুব বীরোচিত হবে না। কেবল সুকুমার রায়ের সঙ্গে দেখা হলে আমি নিশ্চয় জিজ্ঞেস করতুম তিনি সত্যি পাঁউরুটি আর ঝোলাগুড় খেয়েছেন কি না, কারণ আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।
পাঁউরুটির দেশি ফিউশন পাঁওভাজি। ছাগল, মুরগি, সবজি, ডাল এমনকি চানাচুর—সবার সঙ্গেই তার সখ্য। তবে সর্বশ্রেষ্ঠ ফিউশন যে শাহি টুকরা, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। এর আবিষ্কার সম্পর্কে কোনও তথ্য আমার কাছে নেই। এই মুঘলাই মিষ্টিটি পাঁউরুটি আসার পরে তার মানে আবিষ্কৃত হয়েছে। ঘিয়ে পাঁউরুটিকে কড়কড়ে করে ভেজে তাকে চিনির রসে ও ঘন করা দুধে এলাচ-সহ, নানাবিধ মশলা-সহ ডুবিয়ে রেখে এই অনবদ্য মিষ্টিটি তৈরি হয়। একটা মাত্র খেয়ে এর আশ মেটে না।
ইউরোপের পাঁউরুটির বিন্যাস অবশ্য দেখার মতো। ওখানে শুধু পাঁউরুটির দোকানই দেখেছি অনেক, নানা আকারের, নানা মাপের পাঁউরুটি। কারও ওপরে তিল, কারও চিজ, কারও টমেটো, কারও ভিনিগারে ভেজানো জুকিনি। কারও ভেতরে এরাই নানা আকারে লুকিয়ে থাকে। ব্রেকফাস্টের টেবিলে তারা আসে, তাদের কাটার জন্যও নানা মাপের ছুরি। কারও দাঁত, কেউ ধারালো। কেউ ঘসঘস করে কাটে, কেউ কাটতে গেলে ছিঁড়ে যায়। ইউরোপে থাকলে ডাক্তারি ছুরি চালানোও সহজে শেখা যাবে বলে মনে হয়।

পাঁউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে কড়াইয়ে মাখন দিয়ে বাদাম কারিপাতা জিরে ইত্যাদি দিয়ে ভেজে পাঁউরুটির উপমা জাতীয় একটা চটজলদি জলখাবার অনেকবার ছেলের ইস্কুলের টিফিনের সমাধান করে দিয়েছে। পাঁউরুটি জলে ডুবিয়ে তাকে অনেক সময় মিষ্টিতে ভেজাল দেওয়ার কাজে লাগানো হয়। আর এক সহজ খাবার হচ্ছে ফ্রেঞ্চ টোস্ট। ডিমের গোলায় ডুবিয়ে ভেজে নেওয়া। মাঝখানে আলুর পুর দিয়ে রোল করে বেসনে ডুবিয়ে ভেজে নেওয়া ব্রেড রোল অম্বুলে বাঙালির এক মারাত্মক আত্ম-অত্যাচার। রেলওয়ে স্টেশনের দোকানের শো-কেসের সে এক অত্যাবশ্যকীয় হাতছানি।
ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে—পাঁউরুটি না থাকলে কুঁড়েরা করত কী?

লম্বু এখনও পাওয়া যায়। ভিন জেলায় বসবাস কালে কত রাতে পাউরুটি পিত্ত রক্ষা করেছে!
পাউরুটি পাঁচালি স্বাদু লাগল।