বিশ্বের জানালা- নেইল দ্বীপ-উমা ভট্টাচার্য

bhugol02 (Medium)

নেইল বা নীল দ্বীপ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেরই অন্তর্গত আর একটি ছোট্ট  দ্বীপমালা (ইংরেজীতে যাকে আমরা বলি আর্কিপেলেগো) ‘রিটছি’তে অবস্থিত। অত্যাচারী কুখ্যাত ব্রিটিশ সৈনিক জেমস্‌ জর্জ স্মিথ নেইলের নামে দ্বীপটির নাম হলেও দ্বীপটি অপূর্ব সুন্দর,এখানকার মানুষগুলিও খুব ভালো। চারদিকে নীল সমুদ্র আর সাদা বালুকাবেলায় ঘেরা, পান্নাসবুজ দ্বীপটিতে গেলেই মন আনন্দে ভরে যায়।

গ্রেট আন্দামানের  মূল ভুভাগের পূর্বদিকে ২৫থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘রিটছি’তে আছে ৪টে বড় দ্বীপ ,আর ৭টি ছোটো দ্বীপ। ছোটোগুলির কয়েকটি আবার ছোটো ছোটো আইলেট,দ্বীপ বলা চলেনা সেগুলিকে। এদের মধ্যে দিয়ে ছোটো ছোটো জলধারা বয়ে গিয়ে এদের আলাদা করেছে,ঠিক ভেনিসের দ্বীপগুলির মত।

নেইল আয়তনে ১৯.৯ বর্গ কিলোমিটার,দেখতে অনেকটা সফট্‌ টয়ের বসানো হাঁসের মত। আন্দামানের সদর শহর পোর্টব্লেয়ার থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত নেইল। সারা দ্বীপটিই কোথাও উঁচু, কোথাও নীচু, কোথাও সমতল। সমুদ্রও এখানে বাসভূমির সমতলে অবস্থিত।   

‘রিটছি’র একেবারে দক্ষিণে অবস্থিত নেইল দ্বীপের  সাগরপারে চারদিকেই,সাদা  মিহি বালির বেলাভূমি আর সাদা প্রবালের ছড়াছড়ি। বিস্তীর্ণ বেলাভূমির ধার ঘেঁষে চলে গেছে ঘন বনরাজি,বিশাল বিশাল মহুয়া গাছ, স্থানীয়রা যাকে বলে মোয়া গাছ। তবে এই মহুয়া সাঁওতাল পরগণার মহুয়া নয়।

বুনো জামগাছ আছে,আছে কেয়া গাছের মত দেখতে অগুণতি ‘পণ্ডানাস’ নামে একরকম ফলের গাছ। এ গাছের ফল দেখতে আনারসের মত,পাতার গায়ে কাঁটা। এইসব গাছের গায়ে কাঠের ফলকে কোথাও লেখা আছে কেওড়া,কোথাও লেখা আছে পণ্ডানাস। এছাড়া আরও নানা বড়োবড়ো গাছ,ঝোপঝাড়,স্রু বাঁশের ঝাড়। নারকেল আর সুপুরিগাছের বাগানে ভর্তি। কলাগাছ,বাংলাদেশের নানা ফল, ফুলের গাছ,দোফলা আমগাছের বাগান দেখে মনে হবে যেন বাংলাতেই আছি।

এই মিনি বাংলাদেশে আছে পাঁচটি গ্রাম,সীতাপুর,ভরতপুর,নেইল কেন্দ্র, লক্ষ্মণপুর,রামনগর। সব মিলিয়ে এখানে বর্তমান লোকসংখ্যা পাঁচহাজারের মত,এখানে ৯৯টি সেটলার পরিবার প্রথম গিয়ে জঙ্গল কেটে বসতি করেছিল। এঁরা সবাই বাংলাদেশের উদ্বাস্তু পরিবার,কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রত্যেকে পেয়েছিল ৩০ বিঘা করে জমি,২২০০০ টাকা,লাঙল দেবার জন্য দুটি বলদ,একটি দুধেল গাই,ঘর করার টিন বাঁশ,সবকিছু। আর সেই  বাস্তুহারা মানুষগুলি তেপান্তরের পারে কালাপানির দেশে গিয়ে,জঙ্গল হাসিল করে জমিতে সোনা ফলিয়েছে। এখন তো ‘নেইল’কে আন্দামানের ফিডিং বোল অর্থাৎ ‘খাদ্যপাত্র’বা শস্যাধার বলা হয়। সারা আন্দামানেই এখানকার উৎপাদিত ফসল চালান হয়। এখানে প্রাথমিক,মাধ্যমিক, উচ্চমাধমিক মিলিয়ে তিনটি স্কুল আছে। পড়াশোনা, স্কুলের পোশাক সব বিনামূল্যে। প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্র আছে একটি। খোলামেলা  পরিবেশ, গাছপালা আর সমুদ্রিক হাওয়ার কারণে রোগবালাই নেই বললেই চলে। অধিবাসীরা সব মিলিয়ে ভীষণ খুশি,আনন্দিত,তৃপ্ত। সবুজে ভরা এই দেশ দেখলে মনে হবে এখানেই বোধ হয় স্বর্গ নেমে এসেছে। গেলে আর আসতে ইচ্ছে করবে না।

শিক্ষায় এখানকার ছেলেমেয়েরা পিছিয়ে নেই। শিক্ষার যেটুকু সুযোগ এখানে আছে তার যোগ্য সদ্‌ব্যবহার করছে এই দ্বীপের ছেলেমেয়েরা। এখানকার এক পরিবারের বড় ছেলে দিল্লীর এইমসে্‌র বড় সার্জন,তার স্ত্রীও দিল্লীর এক হাসপাতালের সার্জন। এক ছেলে রাজস্থানে ইঞ্জিনিয়ার। তাঁরা কিন্তু নিজেদের জন্মভূমি ‘নেইলে’ প্রতি বছরে আসেন,খোঁজখবর নেন একটি  গ্রামের মত দ্বীপটির বাসিন্দাদের। এটি একটি দৃষ্টান্ত। এরকম পরিবার অনেক আছে।

এই পরিবারটির বাস নেইলের সমুদ্রতীরে এক উঁচু জায়গা আর সমতল মিলিয়ে। এঁদের বাড়ির এলাকার মধ্যেই উঁচু মাটির ঢিপিটির  শুকনো কাদামাটির উপর দিয়ে চলতে চলতে পথ হয়ে আসে এবড়ো –খেবড়ো আর সঙ্কীর্ণ। তারপরে দুধারে পণ্ডানাসের গাছের মাঝখান দিয়ে পাথুরে পথে খানিকটা নেমে গেলেই সামনে দেখা যাবে এক আশ্চর্য জগৎ।

bhugol01 (Medium)

নীচে পৌঁছুলে প্রথমে দেখা যাবে এক বিস্তীর্ণ মেটে ও আরও নানারঙের, নানা আকারের মৃত প্রবালের এক চাদর বিছানো। যতদূর সমুদ্র দেখা যায় ততদুরই এই প্রবালের চাদর বিছানো।  যতদূর চোখ যায় দেখা যায় সমস্ত সমুদ্রতীর ধরে বালির বদলে নানা প্রবালের  ছড়াছড়ি। এই প্রবালের বেলাভুমির পুবদিক ধরে আছে প্রাচীন,দীর্ঘকায় মোটা  মোটা গাছের সারি,ফলন্ত কেওড়া গাছের ঘন সবুজ বন। পশ্চিম দিকে সমুদ্র,ভাঁটার সময় জল দূরে গেলে ভেসে ওঠে প্রবালের বেলাভূমি। প্রবালের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় নানা ছোটো ছোটো সামুদ্রিক প্রাণী,ক্যাটফিশের দল প্রবালের ফাঁক থেকে শুঁড়গুলি বের করে দুলিয়ে দুলিয়ে খাবার খুঁজছে। দক্ষিণদিক জুড়ে বিরাট উঁচু উঁচু পাথরের চাই পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়েছে। সেগুলির অনেকগুলি আবার প্রবালের  চাঙর। প্রবালের চাদরের ওপর দিয়ে হেঁটে সমুদ্রের দিকে খানিকটা এগুলেই সামনে দেখা দেবে প্রকৃতিদেবীর আপন খেয়ালে বানানো এক বিশাল উঁচু ‘পাথরের প্রাকৃতিক ব্রিজ’। মাঝখানটা ফাঁকা। কী আশ্চর্যভাবে ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে আছে নিরালায়,নির্জনে, সকলের চোখের আড়ালে! অনেকেই এর খোঁজ জানে না।সমুদ্রের জল কলোচ্ছাসে সেই ‘ন্যাচারাল ব্রিজ’-এর পাদদেশ ধুয়ে দিচ্ছে।

bhugol03 (Medium)সেখান থেকে বেরিয়ে চলে যাওয়া যায় লক্ষ্মণপুর বিচের ধারে,ধবধবে সাদা বালুকাবেলায়। গ্রামের পথের দুধারে বাড়ি ঘর গাছপালার মাঝে মাঝে রিসর্ট আর একটি হেলিপ্যাড পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে এসে দেখা যাবে এখানেও বড়ো বড়ো গাছে ভর্তি এক মাঠ। যেখানে পর্যটক নিয়ে আসা গাড়িগুলি অপেক্ষা করে। সমুদ্রের ধার ধরে বিরাট বিরাট গাছ,সবুজ পাতার মাথায় মাথায় সূর্যের আলো মেখে দাঁড়িয়ে আছে,সূর্যাস্ত দেখবে বলে। এখানে বিচটি দক্ষিণ দিকে সরু হয়ে গেছে। পশ্চিমদিকের বিচের দিকে যেতে হবে সূর্যাস্ত দেখতে হলে। পুবদিকের সমুদ্রের পার ছেড়ে খানিকটা পথ,পাতলা অরণ্যের সারি সারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকলে পৌঁছে যাওয়া যাবে পুবদিকের বেলাভূমিতে। প্রায় ৪০ ফুট চওড়া বেলাভুমিতে অজস্র দুধসাদা ছোটো বড় নানা আয়তনের,আর নানা জ্যামিতিক নকশা আঁকা প্রবালের ছড়াছড়ি। দেখলেই সংগ্রহে রাখার জন্য কুড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু সে উপায় নেই,কারণ সরকারী নিষেধাজ্ঞা। সমুদ্রের রঙ বর্ণনা করার মত ভাষা নেই। সমুদ্রের তীরের কাছের জল হাল্কা পান্না সবুজ,খানিকটা কচি কলাপাতার মত,তারপরেই ময়ূরকন্ঠী সবুজ,আরও দূরে গাঢ় ময়ূরকণ্ঠী নীল। এই দূরের জল দেখতে প্রায় কাল্‌চে লাগে,তাই একে কালাপানিও বলে। মেঘমুক্ত আকাশের গভীর নীলিমা প্রতিফলিত হচ্ছে সমুদ্রে। যেন নীল আর সবুজের খেলা চলছে আন্দামান সাগরের স্বচ্ছ জলতরঙ্গে। মাঝে মাঝে লাফ দিয়ে উঠছে ডল্‌ফিন আর ডুগং। সাঁতারে ব্যস্ত বিদেশীরা। সুর্যাস্ত নেমে আসবে ৫টায়। চাঁদনি রাতে এই দুধসাদা বেলাভূমি আর আলোআঁধারিতে তীর ধরে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভূতুড়ে গাছের সারি এক গা ছমছমে ভাললাগার সৃষ্টি করবে।

bhugol04 (Medium)এছাড়া দেখার আছে কাছেই ভরতপুরের বিচ। এখানে  গ্লাসবটম বোটে চড়ে দেখা যেতে পারে সমুদ্রের নীচের নানা আকারের,নানা রঙের, কোরাল আর রঙিন সামুদ্রিক মাছের আনাগোনা। করা যাবে স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং। সকাল ৮টা থেকেই শুরু হয় ভাঁটার টান,সমুদ্রের নীল জল  ক্রমশঃ দূরে সরে যায়, ভেসে ওঠে  নানা আকার আর নানা রংয়ের প্রবালের চাঙর। দেখতে লাগে জলের নীচে ভাসমান ঝোপের মত। দলে দলে ভাসতে থাকে। কোথাও ভেসে ওঠে সাদা বালির চাদর। পর্যটকেরা সেসব পেড়িয়ে চলে যান জলকে ছুঁতে,বা স্নান করতে। বালিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে অজস্র নানা আকারের নানা প্রজাতির শামুক,কাঁকড়া,ঝিনুক। হাতে নিলেই চুপ,একটু বাদেই বেরিয়ে আসবে খোলার ভিতরে লুকিয়ে ফেলা পা-গুলি,লাফিয়ে পড়বে হাত থেকে,চলতে শুরু করবে দ্রুতপায়। এগুলি কুড়িয়ে বেড়ানোও এক মজার খেলা। সারা এলাকাটি বড়ো বড়ো গাছের ছায়ার ঢাকা। সারি সারি মনোহারী জিনিস,শঙ্খ, প্রবালের তৈরি নানা স্যুভেনিরের দোকান। অর্ধেক করে চেরা মোটা মোটা বাঁশের তৈরি বসার জায়গা,মাথায় তালপাতার মত একরকম পাতার ছাউনি। বসতে পয়সা লাগেনা,জিনিসপত্র রেখে নিশ্চিন্তে স্নান করতে বা ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে। চুরি ছিনতাই নেই কোথাও। শুধু তাই নয়,প্লাস্টিক বর্জিত সারা দ্বীপ; সকলেই পরিবেশ সচেতন। রাস্তায় থুতু ফেলা, নেশা করা নিষেধ। সবাই তা মেনে চলে।

এখানে মাছ ধরার নৌকাও যাবে। চা,ডিম,পাউরুটি,নুডলসের দোকানও আছে। দোকানীদের সবাই ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আসা,সহজ আর সৎপথে রোজগার করার জন্য আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগের জন্য। কেউ বা শিলিগুড়ির,কেউ আগরতলার,কেউ মালদহের বাসিন্দা। সবাই এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে পেরে খুব খুশি তা এঁদের কাছ থেকেই জানা যাবে। কিছু দূরেই দেখা যায় ‘নেইল’দ্বীপে ঢোকার আর বেরোবার জেটি। জাহাজের টিকিট চেক করিয়ে, আই কার্ড দেখিয়ে  লাইন দিয়ে ঢুকতে হবে জেটিতে। জেটির কাছেই মনোরম গাছের ছায়ায় বসার জায়গা আছে,আছে যাত্রীদের খাবারের রেস্তোঁরা। অজস্র ডাবের দোকান। আর জেটির পথ ধরে এগোলেই দেখা যাবে পাতলা জলের নীচে আধডোবা হয়ে ভেসে আছে প্রবালের দল,আর সাদা চিকচিকে বালি। দুরে ইতস্তত শেকড়ের নীচ থেকে মাটি ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া ছাড়া ম্যানগ্রোভের  ঝাড়,অদূরেই নিবিড় অরণ্য,বা অন্য কোন দ্বীপ দেখা যাবে নীলসবুজ সাগরের মাঝে। এছাড়া আছে সীতাপুরের বিখ্যাত বিচ যা অনুপম সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার জন্য বিখ্যাত।

ছবিঃ লেখক, ও সংগৃহীত

বিশ্বের জানালা-র সমস্ত গল্প এই লিংকে একসাথে