হাওয়াই এর রূপকথা (মারি কাওয়েনা পুকুই-এর করা ইংরিজি অনুবাদ (একটি হাওয়াইয়া সংবাদপত্রে প্রকাশিত) থেকে – ইন্দ্রশেখর

কেওয়ালোর ঝর্ণার পাহারাদারেরা একদিন দেখল, দুটো বাচ্চা ক্লান্ত পায়ে বনপথ ধরে হেঁটে আসছে। খানিক বাদে ছোট্ট মেয়েটা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। তার দাদা তাকে তুলে দাঁড় করালো, তারপর তাকে ঝর্ণাটা দেখিয়ে যেন বলল, “তাড়াতাড়ি চল। ”
এক পাহারাদার তাই দেখে বলল, “আহা রে, গায়ের জামাকাপড় ময়লা, দেখে মনে হয় খেতেও পায়না ভালো করে। কেউ বোধ হয় ওদের ভালোবাসে না। ”
অবশেষে তারা ঝর্ণার কাছে এসে পৌঁছোতে ছেলেটা পাহারাদারদের জিজ্ঞাসা করল, “আমরা একটু জল খাবো? রাস্তায় খুব গরম তো! আমাদের জলের পাত্রটাও ফাঁকা। ” তার ছোটবোনটা ততক্ষণে ঘাসের ওপরে শুয়ে পড়েছে। তার দাদা ঝর্ণা থেকে তাদের জলের পাত্রটা ভরে নিয়ে বোনের কাছে নিয়ে যেতে সে প্রাণভরে জল খেয়ে নিয়ে দাদার কোলের কাছে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পাহারাদারদের প্রাণে দয়ামায়া ছিল। বাচ্চাদুটোকে তারা পেট ভরে খাওয়ালো আর তারপর তাদের সঙ্গে করে নিয়ে গেল তাদের নিজেদের ঘুমোবার ঘরে। “এরা বোধ হয় খুব গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে আর এদের বাড়ির লোক নিশ্চয় খুব কুঁড়ে,” তারা বলাবলি করছিল নিজেদের মধ্যে, “আহা, এইখানে এরা একটু বিশ্রাম করে নিক। ”
পরদিন সকালে পাহারাদারেরা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বাগানে গাছেদের যত্ন করতে গেল। সূর্য উঠেছে তখন। পাহাড়ের মাথা থেকে সব কুয়াশারা সরে গেছে। আর, তাদের ঘুমের বাড়ির মাথায় ঝুলে ছিল একটা রামধনু।
“আরে, আমাদের ঘুমবাড়ির মাথায় একটা রামধনু যে! তার মানে একজন রাজা—” তারা অবাক হয়ে বলাবলি করল।
“বাচ্চাগুলো!” অবাক হয়ে বলল আরেকজন, “ওরা তাহলে কে?”
***
বেশ ক’দিন ভাইবোনেরা থেকে গেল সেখানে। দিনের বেশির ভাগ সময়টাই ঘুমুতো তারা। যতক্ষণ জেগে থাকত, সে-ও একেবারেই চুপচাপ। বোনটাকে দেখলে মনে হত সে একটু বেশি ক্লান্ত।
একদিন সন্ধেবেলা তারা দুজন ঘুমবাড়িতে ঢোকবার পর, ঝর্নার জল খেতে খেতে মাকিকি থেকে আসা এক চাষী আর সবাইকে বলল, “পথে আসতে আসতে খবর পেলাম, হা-ওর বাচ্চারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। কোথায় গেছে তার কোন খোঁজ নেই।”
“মানে জমিদারবাবুর ছেলেমেয়েরা?”
“হ্যাঁ। কিছুদিন আগে ওদের মা মারা গেছেন। বাড়িতে সৎমা এসেছে। সে ওদের একেবারে ভালোবাসে না। তাদের বাপ হা-ও বাড়িতে না থাকলে সে তাদের উপোস করিয়ে রাখে আর ভীষণ বকে। ”
“তাহলে তারা যে পালাবে তাতে আর আশ্চর্য কী?”
“হুঁ,” মাথা নাড়ল মাকিকির সেই চাষী, “হা-ওর বাচ্চারা ভারী ভালো। কিন্তু হলে কি হয়? কপালে যে দুঃখু লেখা। শুনছি নাকি সৎমা গুন্ডা পাঠাচ্ছে ওদের খুঁজে বের করবার জন্যে। এইদিকে আকাশে রামধনু দেখতে পেয়েছে নাকি। বলেছে, ও রামধনু যেখানে, তার সৎ ছেলেমেয়েও সেইখানে থাকবে। সৎ মা আরো বলেছে, যারা তাদের থাকতে দিয়েছে তাদেরও বেজায় শাস্তি পেতে হবে। ”
ঝর্ণার পাহারাদারেরা একে অন্যের দিকে চাইল। তারপর তাদের একজন দৃঢ় গলায় বলল, “এমনও তো হতে পারে যে, যারা বাচ্চাদুটোকে আশ্রয় দিয়েছে তারা ওদের এইভাবে গুন্ডাদের হাতে ছেড়ে দেবে না?”
“জমিদারগিন্নির গুন্ডাদের সামনে কোন সাধারণ লোক দাঁড়াতেই পারবে না!”
মাকিকির সেই চাষী চলে যাবার পর পাহারাদারেরা অনেকক্ষণ ধরে শলাপরামর্শ করল বসে বসে। তারপর তারা ঘুমোতে গেল।
ওদিকে ঘরের ভেতর জেগে বসে দাদাটা কিন্তু সব শুনেছিল। সব্বাই ঘুমিয়ে পড়লে দাদা আস্তে আস্তে উঠে ছোটোছোটো হাতে ঘুমন্ত বোনটিকে কোনমতে কোলে তুলে নিয়ে টলোমলো পায়ে উঠোনে চাঁদের আলোয় এসে তাকে নামিয়ে দিল। ঘুম ভেঙে কাঁদতে লাগল বোনটা। দাদা তাকে ফিসফিস করে বলল, “চুপ, চুপ, ভয় পেলে চলবে নাকি? আয় আমার সঙ্গে আয়। ”
“আমরা কোথায় যাচ্ছি দাদা? আমি যাবোনা। আমার ঘুম পায় যে!”
“ঘুমুবি, তবে একটু পরে। সৎমা আমাদের ধরবার জন্য গুন্ডা পাঠাচ্ছে। আবার সেই বকা খাওয়া আর শাস্তি পাওয়া—তুই কি তাই চাস? চল চল,আমাদের অনেক দূরে পালাতে হবে সব্বার চোখের আড়ালে। ”
“বোন মাথা নাড়ল, “ঠিক। চল তাহলে। ”
চাঁদের আলোছাওয়া পথ ধরে নু-আনু নদীর মোহানার দিকে চলে গেল তারা। ছোট্ট বোনটা মাঝেমাঝেই বলছিল, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে দাদা। ” কিন্তু তারপর আবার বুকে বল এনে হাঁটছিল সে। কিন্তু খানিক বাদে সে একেবারে পথের ওপর বসে পড়ে বলল, “আমি আর পারছি না দাদা। আমায় একটু জল এনে দে। ”
দাদা তাড়াতাড়ি জলের পাত্রটা নেড়েচেড়ে দেখল, তারপর বলল, “জল যে একফোঁটাও নেই বোন। পা চালিয়ে চল দেখি ,আরেকটা ঝর্ণা খুঁজে পাই নাকি। ”
বোন কিন্তু নড়ে না। তার খুব তেষ্টা পেয়েছে। শেষমেষ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে কান্না জুড়ল। দাদা তখন শুকনো ঘাসের একটা বিছানা বানিয়ে তাতে তাকে শুইয়ে চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। কিন্তু তার নিজের চোখে ঘুম আসে কই? শরীর ভেঙে পড়ছে ক্লান্তিতে। তেষ্টায় তারও গলা শুকিয়ে কাঠ। মাথায় ঘুরছে নানান চিন্তা। এখন তারা পালিয়ে কোথায় যাবে? বোনের জন্যে একটু জলই বা পাবে কোথায়?
এইসব ভাবতে ভাবতে একগলা তেষ্টা নিয়েই সে একসময় বোনটির পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে শোনে তার মায়ের গলা। মা ডাকছিল, “খোকা, খোকা রে। ” ঘুমের মধ্যে তার মনে হল মা যেন সেই ছোট্টোবেলাকার মত তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আর বলছে, “পায়ের কাছের ঝোপটা টেনে তোল, তাহলেই জল পাবি বাবা। ” এই বলে মায়ের ছবিটা মিলিয়ে গেল।
অমনি চোখ খুলে উঠে বসল ছেলেটা। ভাবল, “মা এসেছিল স্বপ্নে। আমাকে জলের খোঁজ দিয়ে গেল। দেখি তো—”
পায়ের কাছে তার সত্যিসত্যিই একটা কাঁটাঝোপ দাঁড়িয়েছিল। তার ডাল ধরে টানতে প্রথমে তো কাঁটা ফুটে রক্তই বেরিয়ে গেল তার। তারপর কয়েকটা পাতা দিয়ে ডালটাকে ধরে প্রাণপণে টানতে ঝোপটা উপড়ে এল তার হাতে, আর তার গর্তটার ভেতর থেকে কলকল করে উঠে এল একটা ঝর্ণা।
তাড়াতাড়ি জলের পাত্রটা ভরে নিয়ে দাদা বোনকে ডেকে তুলে প্রাণভরে জল খাওয়ালো। তারপর নিজেও জল খেল আশ মিটিয়ে। তারপর বোনকে বলল, “আর ভয় নেই বোন। মা রয়েছে সঙ্গে। এখন আয় ঘুমুই। ”
তাদের ঘুম ভাঙল যখন, তখন রোদে ঝলমল করছে চারিদিক। চোখ খুলে ভাইবোন দেখে তাদের বাবার লোকজনেরা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবার মুখে হাসি। দাদা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর তাদের রাতের সব কথা বলতে সবাই মিলে সেই ঝর্ণার জল খেল। তারপর লোকেরা বলল, “চলো চলো, তোমাদের বাবা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ”
“আর সৎমা?” বোন ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“কোনো ভয় নেই,” বলে উঠল একজন লোক, “তোমরা তো খুব ভালো, তাই ভগবান তোমাদের আসল মাকে পাঠিয়ে তোমাদের জলের খোঁজ দিয়েছেন। সৎমা তোমাদের কিচ্ছুটি করতে পারবে না দেখো। ”
বহু বহু বছর ধরে সেই ঝর্ণাটা বয়ে গেল সেখান দিয়ে। অনেকদিন পরে একবার লোকজনেরা মিলে তার ওপরে একটা চানঘর বানালো তাদের রানিমার জন্যে। এই রানিমা ছিলেন হা-ও বংশের সেই ছোট্ট বোনটির নাতনীর নাতনী। সেই ঝর্ণার নাম সবাই রেখেছিল হা-ও-এর ধারা।
এখন ঝর্ণাটা আর নেই। সেইখানে একটা বড় শহর হয়েছে। লোকজন নল দিয়ে পাহাড়ের পেট থেকে জল বের করে নেয়। যেখানে ঝর্ণাটা ছিল সেখানে একটা মন্দির আছে। তার নাম কাওয়াইয়া হা-ও, মানে হা-ওএর ধারা।
ছবিঃ মৌসুমী