এভারেস্ট এরিক শিপটন (সব পর্ব একত্র)

অন্যদিকে আমরা পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলাম। কিন্তু তীব্র বাতাস এবং খারাপ আবহাওয়ায় তৃতীয় শিবিরের অবস্থা বিপজ্জনক ছিল। আমাদের পৌঁছনোর পনেরোদিনের মধ্যেই তার আরও অবনতি হতে থাকে।
সেই একই শেরপা ও সহ অভিযাত্রীদল মনে করিয়ে দিল এবারের সাথে ১৯২৪-এর সেই এভারেস্ট অভিযানের আবহাওয়ার আশ্চর্য সাদৃশ্যের কথা। কিন্তু এবছর আধুনিক এবং পর্যাপ্ত আরোহণের সাজ সরঞ্জাম সাথে থাকায় তীব্র বায়ুপ্রবাহ থেকে অভিযাত্রীরা নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হলেন।
উত্তর মেরুতে অভিযাত্রী ওয়াটকিনসের ব্যবহৃত ডোম আকৃতির যে দ্বিস্তর তাঁবু অভিযাত্রীরা সঙ্গে নিয়েছিলেন সেটির নীচের অংশটা ১৫ ফুট ব্যসবিশিষ্ট। বাঁশের কাঠামো দিয়ে তৈরি এই তাঁবুর বাইরের ও ভিতরের আস্তরণের ভেতর ফাঁক রাখা হয় যাতে গরম বায়ুর একটি স্তর সেখানে জমা হয়। এই বৃহৎ তাঁবু খাড়া করা খুব কঠিন, কিন্তু নিখুঁত ভাবে এটি স্থাপন করতে পারলে ঐ উচ্চতায় দুর্গম পরিবেশে শিবির হয় সবচেয়ে আরামদায়ক।
বাতাসের তীব্রতার সাময়িক বিরতিতে যত দ্রুত সম্ভব আমরা পাহাড়ের ঢালে ফের কাজ আরম্ভ করলাম। ঢাল বরাবর ধাপ কেটে কেটে আগে যে পথ তৈরি করে গিয়েছিলাম, আবহাওয়া শান্ত হতে আমরা সে পথের কোন চিহ্ন খুঁজে পেলাম না।
দীর্ঘক্ষণের সুন্দর আবহাওয়ার সুযোগে আমরা ৩-এ শিবির স্থাপন করলাম। কিন্তু তীব্র বায়ুর প্রকোপে অরক্ষিত উত্তর চূড়ার খাড়া পাহাড়ের সন্নিকটে অবস্থিত এই শিবির ৩য় শিবিরের তুলয়ায় সাচ্ছন্দহীন এবং হিমশীতল। কঠিন বরফে ঢাকা জায়গাটাতে তাঁবু খাটানো অভিযাত্রীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল। এক রাতে শুরু হল প্রবল তুষার ঝড়। তীব্র হাওয়ায় তাঁবুর একটি প্রান্তের পেরেক ভেঙে গেল।
প্রাথমিক উত্তেজনা সামলে আমরা ফের সামনে এগোতে থাকলাম। ধীর গতিতে দিনের পর দিন অগ্রসর হতে হতে অবশেষে পর্বতসমষ্টির উঁচু দুই শিখরের মধ্যবর্তী নীচু স্থানে পৌঁছে গেলাম। কঠিন বরফাচ্ছন্ন খাড়াই দেওয়াল বেয়ে অর্ধেক পথই আরোহণে আমাদের নেতৃত্ব দিলেন অভিযাত্রী স্মাইথ। অনায়াসে দড়ির মই স্থাপন করে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে থাকলাম।

অবশেষে ১৫ মে পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে দড়ি স্থাপন করে (fix rope) পথ তৈরি হল। গিরিসংকটের চূড়ার থেকে ২০০ ফুট নীচে ২০ ফুট চওড়া একটি স্থানে চতুর্থ শিবির স্থাপন করলাম। পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা এই সংকীর্ণ পাথরটি বিশাল হিমদরীর (crevasse) নীচের ওষ্ঠের একটি অংশ। উপরের ঝুলে থাকা ওষ্ঠাংশটি ৪০ ফুট উঁচু। শিবির ভালোভাবেই স্থাপিত হল বটে, আরামদায়কও হল, কিন্তু তা সত্ত্বেও উপরের ঝুলন্ত বরফের প্রশস্ত অংশটি থেকে তুষারধ্বসের বিপজ্জ্বনক সম্ভাবনা থেকেই গেল।
পরবর্তী চারদিন প্রবল তুষার ঝড়ে আমরা অগ্রসর হতে পারলাম না। স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে কর্মহীন দিন কাটতে লাগল। নীচের শিবিরে থাকা সহঅভিযাত্রীদের সাথে আমাদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ১৯ তারিখ বায়ুর প্রকোপ কমতেই আমি এবং স্মাইথ নর্থ কলের ২০০ ফুটের ভয়াবহ খাড়াই দেওয়াল বেয়ে আরোহণ শুরু করলাম। গিরিসংকটের সংকীর্ণ চূড়ায় যখন পৌঁছোলাম, আমরা মুখোমুখি হলাম পশ্চিমের এক ভয়ঙ্কর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের। তুষারঝড়ে অবসন্ন ধূসর মেঘে আচ্ছন্ন দৈত্যের মত সারি সারি অসংখ্য শৃঙ্গ। ঝড়ের পর সন্ধ্যা নামতেই নীলাভ কুয়াশাচ্ছন্ন শৃঙ্গগুলি থেকে উজ্জ্বল লাল আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকল।
আমরা আবহাওয়ার সতর্কতা পেলাম –বর্ষার আর বেশি দেরি নেই। শীঘ্র বৃষ্টি শুরু হতে চলেছে অন্যান্য ভারতের সমতল ভূমিতে। এই জরুরি বার্তা আসার সাথে সাথে আমরা বুঝতে পারলাম দ্রুত অভিযান শেষ করতে না পারলে এবারও আমাদের পরাজয় আসন্ন।
১৯ মে’র আবহাওয়া পঞ্চম শিবির স্থাপনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পক্ষে অনুকূল ছিল। কিন্তু তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার দংশন আমাদের অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়াল। ২২ শে মে বন্ধ হল হিমশীতল হাওয়ার দাপট। এই ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করেই বারনি, বাউস্টেড, ওয়েগার এবং ওয়েন হ্যারিস সহ আটজন শেরপা পঞ্চম শিবির স্থাপন করলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল সম্ভব হলে যত উচ্চতাই হোক পরবর্তী দিন ষষ্ঠ শিবির স্থাপন করা হবে। ঠিক হল ষষ্ঠ শিবির থেকে প্রথম পদক্ষেপ নেবেন অভিযাত্রী ওয়েগা এবং ওয়েন হ্যারিস। ওঁদের অনুসরণ করে অগ্রসর হতে থাকব স্মাইথ এবং আমি।
২৩ তারিখ পরিকল্পনানুযায়ী আমরা চতুর্থ শিবির গুটিয়ে অগ্রসর হতে থাকলাম। নর্থ কলে পৌঁছেই বাতাসের ভয়ংকরতা আমাদের আরোহণ স্তব্ধ করে দিল। বিকেল ৪টের সময় অবশেষে পঞ্চম শিবিরে পৌঁছে দেখলাম পুরো দলই ঐ শিবিরে উপস্থিত। বায়ুর দাপট কমে যাওয়া সত্ত্বেও ভয়ংকরতার চিহ্ন থেকে গেছিল পঞ্চম শিবিরে। ফলে উচ্চতর শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। পঞ্চম শিবিরে আমাদের দুজনের থাকার মত পরিসর না থাকায় ফের আমাদের নীচের শিবিরে ফিরে যেতে প্রস্তাব দেওয়া হল। সিদ্ধান্ত হল ওয়েন এবং হ্যারিসের পরিবর্তে অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাব আমি এবং স্মাইথ ।
ছবিঃ মূল গ্রন্থ থেকে