বনের ডায়েরি-ভালু-স্বপ্না লাহিড়ী

bonerdiarybhalu01 (Small)পাহাড়ের কোলে জঙ্গলের গা ঘেঁসে জানমতির কুঁড়েঘরটি দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে এখন সে একাই থাকে। মাটির দেয়াল আর টিনের চাল,চালের ওপর জানমতি নিজেই শুকনো পাতা ডালপালা দিয়ে ঘরটিকে গ্রীষ্মের দাবদাহ ,বর্ষার জল আর ঠাণ্ডা থেকে বাঁচায়। দরজার সামনে ছোট্ট দাওয়াটি তার রান্নাঘর। মাটির ঘর আর উঠোনটিকে সে গোবর মাটি দিয়ে নিকিয়ে সেখানে পরম যত্নে তুলি ছুঁইয়ে মাটির ওপর লাল কালো মাটির রঙ দিয়ে ফুল,লতাপাতা,মানুষ, পাখি, জন্তুজানোয়ার আঁকে। উঠোন ঘিরে তার ছোট্ট বাগানে গাঁদা করবী জবা বেল টগর ফুটে থাকে,আর থাকে শিম বেগুন লঙ্কা কুমড়ো লাউ যা তার যৎসামান্য প্রয়োজনীয় সবজির জোগান দেয়। জঙ্গলের মধ্যে একটি তুররা (ঝর্না)। তার জল কলকল করে বয়ে যায় গোটা বছর। সক্কালবেলা জানমতি তুররার জলে স্নানাদি সেরে ঘড়ায় করে জল নিয়ে এসে আগে বাগানের পরিচর্যা করে,তারপর খড়কুটো জ্বালিয়ে দুটো ভাত ফুটিয়ে নেয়। যেদিন তার কিচ্ছুটি করতে ভালো লাগে না,সেদিন সে দাওয়ায় বসে ভাবে পুরনো দিনের কথা ।

জানমতির মনে হয় সে কতকাল আগের কথা,যখন এ জায়গাটা লোকজনে গমগম করত। জঙ্গল কেটে সাফ করে কয়লা খাদানের শ্রমিকরা এখানে বসতি, যাকে এরা দফাই বলে, শুরু করেছিল। সেই দলে জানমতি, তার ছেলে সমরু,ছেলের বউ আর দুটি ছোট ছোট নাতিনাতনিও ছিল। সামান্যই মাইনে পেত তারা,কিন্তু যা পেত তাতেই তাদের দু”বেলার ভাত আর পরনের কাপড়ের জোগাড় হয়ে যেতো। বড়ো আনন্দে ছিল তারা। দিন গেলে সন্ধেবেলা দেয়ালের খুঁটি থেকে মাদল নামিয়ে তার ছেলে সমরু যখন বাজাতে বসত,আশপাশের পুরুষ মেয়েরা দল বেঁধে এসে জুটত তার উঠোনে। শুরু হত তাদের নাচ আর গান,কখনো করমা, কখনো বা সুয়া,সইলা। মাদলের থাপ আর নাচে গানে ঝমঝম করে উঠত রাতের আকাশ চাঁদ নক্ষত্র। রাত বাড়লে মহুয়ার রসে টইটুম্বুর হয়ে ঢলে পড়তো নিদ্রাদেবীর কোলে।

মাঝে মাঝেই কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছিল,খাদান বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বাস করতে মন চাইছিল না কারো। একটা থমথমে ভাব চারদিকে। তারপর,একদিন এলো সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ। খাদান সত্যিসত্যিই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই কারো চাকরি যাবে,কেউবা বদলি হয়ে যাবে অন্য খাদানে।

এক এক করে সবাই চলে গেল। সমরু বদলি হয়ে চলে গেল অনেক দূরে সেই চার্চায়। থেকে গেল একা জানমতি। সমরুর শত অনুনয় বিনয়েও সে তার নিজের হাতে গড়া ঘরটি ছেড়ে যেতে চাইল না।

মাঝে মাঝে সমরু এসে তাকে দেখে যায়,টাকাপয়সা, চালডাল,সংসারের দরকারি জিনিসপত্র দিয়ে যায়। প্রথম দিকে বউবাচ্চা নিয়ে আসত,এখন বাচ্চারা বড়ো হয়ে গেছে। স্কুলে পড়ে,তাই আর আসতে পারে না,সমরু একাই আসে। বাচ্চাদুটোর জন্যে মন কেমন করে জানমতির,কিন্তু কী আর করা যায়,পড়াশোনা তো আগে!

যে অরণ্য কেটে সাফ করে জনমানুষের বসতি বসেছিল,তারা চলে যেতে অরণ্য সেখানে নিজের জনপদ বিস্তার করতে থাকলো ফের। এখন জানমতির কুঁড়েঘরের চারদিকে শাল মহুয়া শিমুল পলাশ বাসা বেঁধেছে। সকাল সন্ধে কতরকম পাখি ঝাঁক বেঁধে আসে সেখানে,সারাদিন অবিশ্রাম কিচিরমিচির ডাক আর হুটোপুটি চলে। জঙ্গল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বাসিন্দাদেরও আনাগোনা বেড়েছে। তাই অন্ধকার নামলেই জানমতি ঘরে ঢুকে দোর দেয়,আর হায়নার হাসি,শেয়ালদের ঐকতান,নিশাচর পাখির আওয়াজ শুনতে শুনতে সে কখন ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরের পাখিরা গান গেয়ে তার ঘুম ভাঙায়। মাঝে মাঝে সে টের পায় তেন্দুয়া,ভালুকের চলাফেরা,কিন্তু বন্ধ দোরের পেছনে কোনও ভয় নেই তার।  

এমনি করেই দিন কেটে যাচ্ছিলো জানমতির। কিন্তু সেদিন একটা ব্যাপার হল। সকালে তুররা যাবে,ঘড়া নিয়ে দাওয়া থেকে নামতেই চোখে পড়ল বেড়ার পাশের শাল গাছটার নীচে একটা ছোট্টো ভালুকছানা অঘোরে ঘুমুচ্ছে। থমকে দাঁড়াল সে,ভালো করে দেখে নিল চারধারটা। বাচ্চা যখন আছে,তার মা-ও নিশ্চয় আছে ধারেপাশে কোথাও! ভালুকরা খুব হিংস্র হয় এই সময়। সাবধানে থাকাই ভালো। অথচ তাকে যেতে তো হবেই তুররাতে! হাতে একটা ডাণ্ডা নিয়ে বেরিয়ে গেলো সে জঙ্গলের পথে। ফেরার পথে পা টিপে টিপে এসে দেখে ভালুক বাচ্চাটা তেমনই ঘুমুচ্ছে তখনও,মা ভালুকের পাত্তা নেই।

বাগানের গাছগুলিতে জল দিয়ে দাওয়ার উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে একটু কালো চা বানিয়ে ভাতের জল চাপিয়েছে এমন সময়ে একটা আওয়াজ হতে ত্রস্তে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে বাচ্চাটা কখন উঠোন পেরিয়ে দাওয়ার নীচে এসে বসেছে। জানমতি ভাবল,আহা রে, খিদে পেয়েছে বোধ হয়,মা’টা যে কোথায় গেল! 

উঠে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে কয়েকটা শুকনো মহুয়া,পেয়ারা আর চার এনে দিলো । ভালুক বাচ্চাটা একটু শুঁকে চুপ করে বসে থাকল,খেল না। ভারি রাগ হল জানমতির ভালুক মায়ের ওপর। এতটুকু বাচ্চা ছেড়ে কোনও মা যায়! সস্নেহে বাচ্চাটাকে সে বলল, “ভালু তোর খিদে পেয়েছে? দাঁড়া ভাত নামিয়ে তোকে ভাত দিচ্ছি।”

খানিক বাদে একটা শালপাতায় করে ভাত মেখে ভালুর সামনে ধরল সে। বাচ্চাটা একটু শুঁকে একটু একটু করে খেয়ে নিল ভাতটা,তারপর আবার সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল। খানিক বাদে ঘুম থেকে উঠে একটু এদিকওদিক ঘুরে আবার এসে বসল দাওয়ার নীচটিতে।

এদিকে বেলা গড়িয়ে এলো। ভালুর মায়ের পাত্তা নেই। চিন্তা হোল জানমতির,এতটুকু বাচ্চা বাইরে থাকলে শেয়াল,হায়নারা তাকে ছিঁড়ে খাবে যে! শেষে অনেক ভেবেচিন্তে ভালুকে কোলে করে ঘরে নিয়ে এলো জানমতি। নিজের বিছানার পাশে কাঁথা পেতে তাকে শুইয়ে দিল। ভালুও পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

বেশ ক’দিন চলে গেল,ভালুর মা আর আসে না। কেউ হয়ত মেরে ফেলেছে তাকে,নইলে এতটুকু বাচ্চা ছেড়ে কোন মা থাকে? 

bonerdiarybhalu (Small)জানমতি তার সমস্ত স্নেহ দিয়ে ভালুকে বড়ো করতে থাকল। ভালু একটু একটু করে বড়ো হয়। কিন্তু জানমতির সঙ্গ ছাড়ে না। তুররাতে জল নিতে, জঙ্গলে কাঠকুটো কুড়োতে, ফলফুল তুলতে,সব জায়গায় সে চলে জানমতির পিছুপিছু। নদীর জলে দুজন মিলে খেলে বেড়ায়। জানমতি ভালুকে মাছ ধরতে শেখায়, জঙ্গলে গাছ চড়তে শেখায়,শেখায় তার ফল খেতে। সারাদিন তার কাটে ভালুর সঙ্গে। বড় আনন্দে আছে জানমতি। ভালুকে পেয়ে সে যেন তার শৈশব ফিরে পেয়েছে।

ভালু একটু একটু করে বড় হচ্ছে।এখন সে আর আগের মতো ঘরের ভেতর শুতে চায় না। শোয় দাওয়ার একপাশে বা শালগাছটার গোড়ায়,যেখানে সে সেই ছোট্টবেলায় এসে ঘুমিয়েছিল। মাঝে মাঝে সারাটা দিন জঙ্গলে গায়েব হয়ে যায়। ফিরে আসে সন্ধের মুখে। প্রথম প্রথম ভয় পেত জানমতি। চিন্তা করত,তারপর ভাবত ভালুরও তো বন্ধু চাই, সঙ্গী চাই। প্রথম যখন সমরু এসে ছোট্ট ভালুকে দেখেছিল,মাকে বলেছিল, “একটু বড়ো হলে ভালুকটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দিও। তুমি একা থাকো, ওর মা যদি এসে যায়,তোমাকে আস্ত রাখবে না। জানমতি সস্নেহে ভালুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল, “আমিই তো ওর মা রে,তুই চিন্তা করিস না।”

দেখতে দেখতে মাথায় জানমতিকে ছাড়িয়ে গেল ভালু,কিন্তু মাকে না হলে তার চলে না, ফিরে ফিরে আসে ঘরে। এরই মধ্যে একদিন সমরু এসে চিন্তিত মুখে মাকে জানাল, তার বদলি হয়ে গেছে আরও দূরে সিংরৌলিতে। এখন আর সে আগের মত ঘন ঘন আসতে পারবে না,তাই মা চলুক তার সঙ্গে। জানমতি বলল, ভালুকে ছেড়ে কোথায় যাবে সে? ও এখানেই থাকবে তার সঙ্গে। সমরু যেন চিন্তা না করে। সমরু তার মাকে জানত,তাই আর জেদ না করে পাশের গ্রামে তার মামাকে বলে গেল ওর মায়ের দেখাশোনা করবার জন্যে।

*******

এই ভাবে কেটে যায় মাসের পর মাস,বছরের পর বছর। জানমতির বয়েস হয়েছে এখন। গায়ে শক্তি কমে গেছে। আগের মতো জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আর কাঠকুটো কুড়িয়ে আনতে পারেনা, তুররা থেকে জল বয়ে আনতে কষ্ট হয় তার। হাঁপিয়ে যায় সে। অযত্নে গাছপালাগুলো মরে যাচ্ছে। কতদিন হয়ে গেছে উঠোন ঘর নিকিয়ে ফুল লতা পাতা আঁকতে পারে নি সে। চোখের জলে বুক ভেসে যায় তার। চুপচাপ দাওয়ায় বসে থাকে,পাশে তার গা ঘেঁসে বসে থাকে তার ভালু। ভালুও বোধহয় জানমতির কষ্ট বোঝে,তাই বেশিক্ষণ আর সে জঙ্গলে থাকে না,ফিরে আসে।

দিন যায়,শীত আসে। এবার ঠাণ্ডাটা খুব জাঁকিয়ে পড়েছে। অনেকদিন ছেলে সমরু আসেনি। ঘরে চাল ডাল বাড়ন্ত। শরীরটাও বেশ খারাপ চলছে কিছুদিন ধরে। জঙ্গলে যাবার ক্ষমতা নেই। ঠাণ্ডায়, অনাহারে, অর্ধাহারে জানমতি শেষে একদিন বিছানা নিল। ভালু চুপ করে বসে থাকে তার মাথার কাছে,কখনও কিছু ফল এনে রাখে হাতের পাশে,নিজের ভাষায় কিছু বলে। মিনতি করে হয়তো, খেয়ে নাও মা! নিঝুম হয়ে আসছিল জানমতি।

    কিছুদিন পরে,এক সকালে সমরু এসে থমকে দাঁড়ায় তার মায়ের খোলা দরজার কিছুটা দূরে। অবাক বিস্ময়ে দেখে তার মায়ের মাথার কাছে চুপ করে বসে আছে ভালু মাথা নীচু করে। সমরুর পায়ের আওয়াজে ভালু আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। জানমতির শেষ সময়ে তার ভালু তার শিয়রে বসেছিল। আর একবার মাতৃহারা হল সে। ভালুকে আর দেখা যায় নি কোনোদিন।   

2 thoughts on “বনের ডায়েরি-ভালু-স্বপ্না লাহিড়ী

Leave a Reply