লজেন্স- দোয়েল বন্দ্যোপাধ্যায়

সে অনেককাল আগেকার কথা। মেখলিগঞ্জকে তখন ঠিক শহরের পর্যায় ফেলা যায় না। তবে সেখানে বাজার দোকান, ইশকুল সবই ছিল। আর ছিল মেখলিগঞ্জের চা-বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হলুদবন নদী। ওমা, নদীর নাম হলুদবন কেন?

পাড়ার বুড়ো মানুষরা বলতেন, “কে জানে বাপু কেন। তবে ছোটোবেলায় শুনেছি নদী আর চা-বাগানের মধ্যে সত্যি একখানা হলুদবন ছিল। সেখানে নানা রঙের ফুল ফুটত। তারপর গঞ্জের বহর বাড়ল। বাড়িঘর তৈরি হল। বন গেল, তবে নামটি রয়ে গেল।”

বুড়োমানুষদের ছোটবেলা যখন তখন তো আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। মেখলিগঞ্জে বেড়াবার মত কিছু নেই। তবে ওই দূর পাহাড়ের পথে যাওয়ার সময় দুচারজন পর্যটক এসে বলেন, “নদীর নাম হলুদবন কেন?” তখন সকলেই ঠোঁট উল্টে বুড়োমানুষদের মতই বলে, “কে জানে বাপু!”

সেই নদীর ধারেই কাকডাকা ভোরে পাওয়া গেলো তাকে। চোখে জল টলটল, মুখে কথা নেই। চা বাগানে কাজে যাচ্ছিল দুখিয়া। সেই প্রথম দেখতে পায় তাকে। দুখিয়ার কোঁচড়ে ছিল ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য কেনা লজেন্স। একখানা তার দিকে এগিয়ে দিতেই কাঁপা-কাঁপা কচি হাতে সেটা নিয়ে টপ করে মুখে পুরে দিল সে। দুখিয়া তখন তাকে কোলে করে হাটে নিয়ে গেল। দুখিয়ার কোলে তাকে দেখে সক্কলে দৌড়ে এল, “ওমা এটা কে গো? কেমন চাঁদপানা মুখ। কথা বলে না কেন? ও খোকা তোমার নাম কী? বাড়ি কোথায়?”

সে কিছু বলল না। শুধু এ গাল থেকে ও গালে লজেন্স চালান করল। মালোপাড়ার শশীঠাকরুন বললেন, “ও দুখিয়া পেলে কোথায় একে?”

দুখিয়া বলল, “ওই তো নদীর ধারে। বাপ-মাকেও খুঁজলুম, পেলুম না।”

“বাঘে নেয় নি তো?”

“ধুত,” বলল দুখিয়া, “ওখানে আর বাঘ কোথায়। কে জানে কে রেখে গেছে দুধের শিশুকে!”

গঞ্জের মুরুব্বিরা বললেন, “তা বললে তো হয়না। এ ছেলের বাপ-মার খোঁজ করতেই হবে।”

তারপর সারা গঞ্জ জুড়ে খোঁজ-খোঁজ। নদী-নালা, পাহাড় পর্বত, বন জঙ্গল, সব তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাদের পাওয়া গেল না।

দেখতে-দেখতে বছর ঘুরে গেল। সে তখন আধো-আধো কথা কয়। দুখিয়াই তার দায়িত্ব নিল। সবাই আবার তাকে বলল, “ও খোকা তোমার বাড়ি কোথায়?”

সে ওই নীল পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলে, “ওই যে ওখানে।” 

“ওখানে কোথায়?”

ব্যস, সে আর কিছুই বলে না। খালি লজেন্সটা এগাল থেকে ও গাল করে। সক্কলে আবার তার নাম জিজ্ঞেস করল। সে আধো –আধো স্বরে বলল, “ ল-জে-ন্স”। সক্কলে হো-হো করে হাসল। দুখিয়া লজ্জা-লজ্জা মুখ করে বলল, “আমি রোজ একখানা করে দিই কিনা। তাই ওই শব্দটাই…!”

মেখলিগঞ্জের মানুষজন তো আর খারাপ নয়। তারা দুখিয়াকে বলল, “ এমন নাম তো চলবে না। দুদিন পরে একে তো ইশকুলে দিতে হবে। তখন তো নাম-ধাম-সাকিন-ঠিকানা যা হোক একটা কিছু তো দিতে হবে নাকি?”

দুখিয়া মাথা হেলিয়ে খুব ভাবল। প্রত্যেকেই খুব ভাবল। শেষে ওই যে হাটের ঠিক পাশের ঘোষবাবুদের পুকুর আর তার ঠিক পাশেই মস্ত গির্জা, তার বুড়ো ফাদার জন, লাঠি ঠুক-ঠুক করে এসে বললেন, “এ শিশুকে তো স্বয়ং ঈশ্বর পাঠিয়েছেন ও-ও-ওই নীল আকাশের দেশ থেকে। তাই আমি ওর নাম দিলুম নীলাভ।”

সেই সুন্দর মিষ্টি নাম সকলেরই খুব পছন্দ হল। কিন্ত তা হলে কী হবে? খাতায় কলমে নীলাভ হলেও মেখলিগঞ্জের ছেলে বুড়ো সবাই তাকে ডাকতে লাগল ‘লজেন্স’ বলে।

।২।

দেখতে-দেখতে আরও বছর গড়িয়ে গেল। নীলাভ এখন স্পষ্ট কথা কইতে পারে। কিন্ত তাতে কী? সে কথা বলে খুবই কম। দুখিয়া চা-বাগানে কাজ করে আর সে এদিকসেদিক ঘুরে বেড়ায়। তবে বছরের একটা সময় তাকে দারুণ খুশি দেখায়। সে হল মেখলিগঞ্জের ঘুড়ি উৎবের দিন। সেই যে বুড়ো ফাদার জন, তারও আগে যিনি ফাদার ছিলেন, তাঁর নাম ছিল ফ্রান্সিস। তাঁর বাড়ি ছিল সেই ইউরোপের কোনও এক সুন্দরমত দেশে। তা সেখান থেকে সব ছেড়েছুড়ে  মেখলিগঞ্জের গির্জেতে চলে এসে তিনি সন্ন্যেসী হলেন ঠিকই, কিন্ত তাঁর একটা নেশা তিনি ছাড়তে পারলেন না। সেটা হল ঘুড়ি ওড়ানোর বাতিক। বসন্তকাল এলেই ফাদার ফ্রান্সিস হইহই করে ঘুড়ি ওড়াতেন। শুধু নিজেই নয় গাঁশুদ্ধু সক্কলকে সেখানে শামিল করতেন। আহা! সে ঘুড়ির যেমন রং তেমনি বাহার।

ফ্রান্সিস মারা যাওয়ার পরও মেখলিগঞ্জে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব থেকেই গেল। তবে কি,ফাদার ফ্রান্সিসের সময়কার ঘুড়ির বাহার আর রইলনা। লজেন্স হাঁ করে ঘুড়ি দেখত আর আপন মনেই হাসত।

এ’বছরেও দেখতে-দেখতে বসন্ত এসে গেল। সবাই ঘুড়ি তৈরিতে মন দিল। গেলবার মেখলিগঞ্জে বদলি হয়ে এসেছেন নতুন দারোগা প্রদীপ সমাদ্দার। হাসিখুশি আমুদে মানুষ। পেশায় দারোগা হলে কী হবে, লোকটা মোটেও দারোগার মত নয়। দেশ বিদেশ ঘুরেছেন, ভারী মজার-মজার গপ্পো বলতে পারেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এবার যার ঘুড়ি সবচেয়ে ভাল হবে তার হাতে তিনি নিজে পুরস্কার তুলে দেবেন। ব্যাস, যেই না বলা ওমনি গঞ্জে এক্কেবারে ঘুড়ি তৈরির হিড়িক পড়ে গেল। পুরস্কার পেতে কার না ভাল লাগে!

প্রতিযোগিতার দিন মেখলিগঞ্জের আকাশ নানা রঙের ঘুড়িতে ছেয়ে গেল। সমাদ্দার মশাই নিজে হাতে খাতা-কলম নিয়ে নম্বর দিতে থাকলেন। এমন সময় দেখা গেল, সমস্ত ঘুড়িকে ছাপিয়ে ওই দূরে চা-বাগানের ঠিক ওপর দিয়ে উড়ছে মস্ত এক পাখি! আবার সবাই চোখ কচলে দেখল। না-না পাখি নয়তো এযে মস্ত একটা ঘুড়ি! যেমন তার বাহার, তেমনি তার রং। বসন্তের সোনা রোদ্দুর সে পাখির সোনালি ডানায় পড়ে ঝলমল করছে। ছোটরা জিজ্ঞেস করল, “এ ঘুড়ি কার?”

বড়রা বলল, “এ ঘুড়ি কার?”

দারোগাও বললেন, “সত্যি তো? কে ওড়ায় এ ঘুড়ি?”

খোঁজ-খোঁজ। শেষে নুটুবাবুর নাতি চিৎকার করে বলল, “আরে এত লজেন্সের ঘুড়ি! এত আমি দেখেছি। সে তো দিনরাত্তির ওই নদীর ধারে বসে এটা তৈরি করত।”

দারোগা বললেন, “লজেন্স কে?” সকলে তখন তাকে লজেন্সের গপ্পো বলল। তিনি শশব্যস্ত হয়ে বললেন, “ডাক-ডাক তাকে, শিগগির নিয়ে এস আমার সামনে!”

ছোটরা হইহই করতে-করতে দৌড়ে গিয়ে লজেন্সকে ডেকে নিয়ে এল। সে বেচারা অতশত না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল দারোগার দিকে। দারোগা বললেন, “এত চমৎকার ঘুড়ি তুমি নিজে তৈরি করেছ?” লজেন্স মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

দারোগা সমাদ্দার আবার বললেন, “কিন্ত এ পাখি তো এদেশের নয়, এই পাখি তুমি কোথায় দেখলে?”

লজেন্স সেই নীল পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল,“ওই যে ওখানে?”

কিন্ত তারপর আর কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু মুখের লজেন্সখানা এগাল থেকে ওগাল করল। দারোগা দিব্যি খুশি হয়ে তার হাতেই এ বছরের সেরা ঘুড়ির পুরস্কার তুলে দিলেন। পুরস্কারের মোড়ক খোলার পর দেখা গেল সেটা একটা বই। তাতে নানা রঙের ঘুড়ির ছবি। বইয়ের নাম ‘ফ্রাঙ্কলিনের ঘুড়ি’।

দারোগা বললেন, “এ এক ছোটো ছেলের গল্প, পরে সে মস্ত মানুষ হয়ে জগত্‍জোড়া নাম করেছিল ঠিকই, কিন্ত ছেলেবেলায় সে কেমন ঘুড়ি ওড়াতে ভালবাসত সেই নিয়েই গপ্পো।”

লজেন্স বড়-বড় চোখে ছবিগুলো দেখতে লাগল। কিন্ত সকলে মিলে দারোগাকে বলল, “ওকে বই দিয়ে কী লাভ দারোগাবাবু? ও তো পড়তেই পারে না!”

“সেকী? পড়তে পারে না কেন?”

“ওমা, ও যে ইশকুলে যায় না।”

“কী জ্বালা!ইশকুলেই বা যায় না কেন?”

“আহা রে বেচারা, ওর তো বাপ নেই, মা নেই, থাকে তো দুখিয়ার কাছে। ওকে আর কে ইশকুলে দেবে।”

“উহুঁ উহুঁ” বলে মাথা দুলিয়ে দারোগা বললেন, “তা বললে কী আর হয়? শেষে লেখাপড়া না শিখে গুণ্ডা বদমায়েশ হলে পরে তো আমাকেই দৌড়ঝাঁপ করে ওকে ধরতে হবে। এই বয়সে এত হাঙ্গামা পোষায় নাকি?”

সকলে বলল, “সেতো ঠিকই, সেতো ঠিকই।”

“তবে এখন উপায়?”

“উপায় একটাই। আমি ওকে আজকেই ফাদার জনের ইশকুলে ভর্তি করে দেব। ওখানকার ছাত্রাবাসেই ও থাকবে। আর ওর লেখাপড়ার সব খরচ আমার।”

সবাই শুনে ধন্য-ধন্য করল। কিন্ত দুখিয়া আছারি-পিছারি কেঁদে বলল, “সেই এত্তটুকু বয়স থেকে ছেলে আমার কাছে আছে। আমি ওকে ছেড়ে থাকবো কেমন করে?”

ফাদার জন বললেন, “তুমি মোটে চিন্তা কোরো না। শনি-রোববার ও তোমার কাছেই থাকবে।”

তখন দুখিয়ার মুখে হাসি ফুটল।

ইশকুলে তো ভর্তি হল লজেন্স। তবে দেখা গেল লেখাপড়ায় তার সেরকম মন নেই। ফাঁক পেলেই সে ঘুড়ি বানায়। আর রাতে হস্টেলের সকলের চোখ এড়িয়ে সেই দারোগাবাবুর দেওয়া বইখানা অল্প-অল্প পড়ে আর ছবির পাতা উল্টোয়। পড়ে আর ভাবে, ভাবে আর অবাক হয়। সারা বিশ্বে এত জায়গায় এত মাতামাতি হয় ঘুড়ি নিয়ে! তারপর ভাবতেভাবতেই মুখের লজেন্সখানা এগাল ওগাল করতে –করতে ঘুমিয়ে পড়ে!

।৩।

প্রতি বছরই ঘুড়ির উৎসবে লজেন্সের ঘুড়ি সেরার শিরোপা পায়। শুধু তাই নয়, কেউ আব্দার করলেও তাকেও ঘুড়ি বানিয়ে দেয় লজেন্স। দেখতে-দেখতে শীতকাল এসে গেল। দারোগাবাবুর মেয়ে ঝিমলির বিয়ে ঠিক হল। আনন্দের কথা। সারা মেখলিগঞ্জের লোক পাত পেড়ে নেমন্তন্ন খেল। কিন্ত দারোগাবাবু ভেউভেউ করে কেঁদে বললেন, “মেয়েটা অনেক দূর চলে যাবে গো।”

“অনেক দূর মানে কত দূর?”

“অ-নে-এ-এ-ক দূরের দেশ। সে যাচ্ছে জাপানে। জামাই ওখানেই চাকরি করে কিনা।”

শশীঠাকরুন একগাল হেসে টপ করে মস্ত এক রাজভোগ মুখে পুরে বললেন, “সহজ কথায় বললেই তো হয় বাপু, যে মেয়ে তোমার বিলেত যাচ্ছে!”

সে যাই হোক। ঘরের মেয়ে বিলেত যাচ্ছে বলে সারা গঞ্জের লোক প্রচুর কান্নাকাটি করল। আর ঝিমলি নতুন বউটি হয়ে হুশ করে উড়োজাহাজে চেপে জাপানে চলে গেল। বছর পাঁচেক পর সে যখন মেখলিগঞ্জে এল, তার সঙ্গে বছরতিনেকের ডলপুতুলের মত একটা মেয়ে। সে সারা মেখলিগঞ্জে দৌড়ে বেড়ায়, খেলে বেড়ায়। সবার কোলে চড়ে ভারী আমোদ করে। দারোগাবাবুও বেশ খুশি নাতনি পেয়ে। লজেন্স এসে ঝিমলির সঙ্গে দেখা করে। ঝিমলি তাকে জাপান দেশের গল্প শোনায়। সেখানে রাজা আছেন, রানি আছেন আর আছে তাদের মস্ত প্রাসাদ। জাপান দেশটা ছবির মত সুন্দর, সেখানে নানা রঙের ফুল ফোটে, কত পাখি আর প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। এমন সব গপ্পো শুনে লজেন্সের মন ভাল হয়ে যায়।

ঝিমলিদের ফেরত যাওয়ার সময় এগিয়ে এল। সকলেরই মন খারাপ। লজেন্স এসে ঝিমলিকে মস্ত একটা ঘুড়ি তার মেয়ের জন্য উপহার দিল। চোখ জুড়িয়ে যায় সে ঘুড়ি দেখলে। ঝিমলি তার গাল টিপে বলল, “একদিন তোকে ঠিক নিয়ে যাব ওই দেশে।”

লজেন্স কিছু না বলে শুধু হাসে আর লজেন্সখানা এগাল ওগাল করে!

।৪।

সেই যে জাপান দেশের মস্ত রাজপ্রাসাদ, সেখানে থাকেন সম্রাট আকিহিতো আর থাকেন তার সম্রাজ্ঞি আকিকো। কিন্ত এত বৈভবের মধ্যে থেকেও সম্রাটের মন ভাল নেই। হবেই বা কী করে? সম্রাজ্ঞি আকিকোর মুখে যে হাসি নেই। কেন নেই? না তাঁর সাধের কুকুর ইনু, কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। কুকুরের শোকে সাম্রাজ্ঞি শয্যা নিয়েছেন। কথা বলেন না, খাবার খান না। ডাক্তার বদ্যি সবাই জবাব দিয়ে দিয়েছে। রানিমা বোধহয় আর বেশিদিন…

সেদিন সাম্রাজ্ঞির সখী তার চুল বেঁধে দিচ্ছে, এমন সময় রানিমা বলে উঠলেন, “ওইতো, ওইতো আমার ইনু!” সখী তো অবাক। রানি যে অনেকদিন পর কথা বলেছেন!

সে বলে, “কই রানিমা, কোথায় আপনার ইনু?”

“ওই যে, ওই আকাশে।”

সখী অবাক হয়ে দেখে সত্যি তো তাই। ইনুর মত দেখতে একখানা কুকুরছানা ওই আকাশে ভাসছে! সে দৌড়ে যায় সম্রাটের কাছে। সম্রাট তখন গোমরা মুখে ছাদে পায়চারি করছিলেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। সখীর মুখে ইনুর কথা শুনে সম্রাট তো অবাক।

“রানির আবার মাথাখানা বিগড়ে গেল নাকি?” ভাবলেন মনে-মনে। তখন সেই সখী আবার বলল, “ওই যে ওই দেখুন মহামান্য সম্রাট।” বলেই সে আকাশের দিকে দেখাল।

 সম্রাট অবাক হয়ে দেখলেন সত্যি তো। ইনুর মত দেখতে একটা কুকুর…না! এ তো একটা ঘুড়ি…দারুণ একটা ঘুড়ি!

দেখতে-দেখতে সেই ঘুড়ি আচমকা সুতো কেটে ভোঁ-কাট্টা হয়ে সম্রাটের বাগানে এসে পড়ল। সম্রাট তাঁর মন্ত্রী, সেনাপতি সক্কলকে বললেন, “এক্ষুনি যাও, খুঁজে বের করো, কে ওড়ায় এমন চমৎর ঘুড়ি?”

কিন্ত তাকে খুঁজতে হল না। ঘুড়িখানা ফেরত নিতে মায়ের হাতটি ধরে সে নিজেই গুটিগুটি পায়ে হাজির হল সম্রাটের প্রাসাদের বিরাট দরজার সামনে। সে তো আর সম্রাটের ভাষা বুঝবে না। তাই তার হয়ে তার মা সম্রাটকে বলল, “মহামান্য সম্রাট এ ঘুড়ি বানিয়েছে আমার দেশের একটি ছেলে।”

সম্রাটের পিছু-পিছু সাম্রাজ্ঞিও এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি মৃদু কন্ঠে বললেন, “কোথায় তোমার দেশ?”

সকলে অবাক। রানির যে বেদম অসুখ। তিনি তো কথা কন না, খাবার খান না! সম্রাট বললেন, “তোমার দেশ থেকে সেই ছেলেটিকে আনতে পারবে? তার যাওয়া আসার সব খরচ দেবে রাজ পরিবার!”

ঝিমলি মুচকি হেসে বলল, “অবশ্যই মহামান্য সম্রাট!”

।৫।

ঝিমলি অসময়ে মেখলিগঞ্জে আসায় চিন্তায় পড়ে গেল সব্বাই। তারপর এই খুশির খবর শুনে সকলের সে কী আনন্দ। দুখিয়া বলল, “ও ঝিমলি দিদি তোমার মত লজেন্সও বিলেত চলে যাবে?  বিলেতের রাজা আমাদের লজেন্সকে গারদে পুরে দেবে না তো?”

ঝিমলি হেসে বলে, “বিলেত নয়গো, এ অন্য দেশ। বালাই ষাট। গারদে কেন পুরবে? তুমি কিচ্ছুটি চিন্তা কোরো না। আমি ওকে ভালোই রাখব।”

লজেন্সের পাসপোর্ট হল, ভিসা হল, উড়োজাহাজের টিকিট হল। দেখতে-দেখতে তার যাওয়ার দিন এসে গেল। সারা মেখলিগঞ্জের লোক তাকে বিমানবন্দরে ছাড়তে এল। বাকি যাত্রীরা ভাবল “কোনও কেউকেটা নাকি?”

দেখা গেল, সে বড়ো-বড়ো চোখওয়ালা চাঁদপানা এক ছেলে।

জাপানে পৌছে তো লজেন্স অবাক। এত বড় প্রাসাদ, এ যে তাদের মেখলিগঞ্জের সমান। সম্রাট আর সাম্রাজ্ঞি নিজেদের ভাষায় খুব আহ্লাদ প্রকাশ করে লজেন্সকে কোলে তুলে নিলেন। সে তো ছাই কোনও কথাই বুঝছে না। শেষে দোভাষীর ডাক পড়ল।

সম্রাট বললেন, “এ কুকুর তুমি কোথায় দেখলে?” লজেন্স বলল, “ওই যে ওখানে।”

দোভাষী সম্রাটের কানে-কানে কী যেন বলল। তারপর সম্রাট সাম্রাজ্ঞির কানে-কানে কী যেন বললেন। তারপর রাজসভার সকলেই সকলের কানে-কানে কী যেন বলল।

সম্রাট বললেন, “তুমি জান ওইদিকে কী আছে?”

লজেন্স বলল সে জানে না।

“ওইদিকে আছেন পাহাড়ের দেবতা ফুজি। তুমি কি তাঁকে দেখেছ?”

লজেন্স বলল, না সে দেবতা ফুজিকে দেখেনি, কিন্ত মেখলিগঞ্জের নীল পাহাড় দেখেছে।

সকলে তাকে বলল, মেখলিগঞ্জের নীল পাহাড়ের চেয়েও সুন্দর হল এই ফুজি। সম্রাট বললেন একদিন তিনি লজেন্সকে নিয়ে ফুজি পাহাড় দেখতে যাবেন। লজেন্স কিছু না বলে শুধু হাসল। সে সম্রাটের মস্ত প্রাসাদের অতিথি হল। সারাদিন সে প্রাসাদে ঘোরে, খায়দায় আর ঘুড়ি বানায়। সেইসব সুন্দর ঘুড়ি দেখে সাম্রাজ্ঞি একদম সুস্থ হয়ে গেলেন। তাতে সম্রাটেরও আহ্লাদ আর ধরে না। তিনি লজেন্সকে বললেন, “তুমি বাছা এখানেই থেকে যাও। আর মাস ছয় পরেই জাপানে ঘুড়ির উৎসব হবে। তুমি সেখানে সুন্দর সব ঘুড়ি ওড়াতে পারবে।”

লজেন্স কিন্ত রাজি হল না। সে জানাল, সে ফিরে যেতে চায় মেখলিগঞ্জে। যেখানে আছে হলুদবন নদী, যেখানে আছে তার নীল পাহাড়, আছে দুখিয়া, ফাদার জন, শশীঠাকরুন আর দারোগাবাবু। সম্রাটের হাজার অনুরোধ, সাম্রাজ্ঞির চোখের জল, কিছুতেই আটকে রাখা গেল না তাকে। সম্রাট বেজার মুখে বললেন, “তুমি চলে গেলে ঘুড়ি উৎসবের কী হবে?” লজেন্স বলল, সে দেশে ফিরেই উৎসবের জন্য ঘুড়ি তৈরি করে সম্রাটকে উপহার দেবে।

“কিন্ত ফুজি পাহাড়, দেবতা ফুজি? তাকেও তো দেখলে না তুমি?”

লজেন্স কিছু না বলে শুধু হাসল আর মুখের লজেন্স এগাল ওগাল করল।

মেখলিগঞ্জে ফিরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল লজেন্স। এখানে সে আবার মুক্ত স্বাধীন হয়ে ঘুরতে থাকল। জাপানের ঘুড়ি উৎসবের কথা যদিও ভোলেনি সে। সম্রাটকে কথা দিয়েছে যে। উৎসবের আগেই ফাদার জনের সাহায্যে মস্ত ঘুড়ি উপহার পাঠাল জাপানের সম্রাটকে।

কিছুদিনের মধ্যেই সম্রাটের চিঠি এল ফাদার জনের কাছে। চিঠি পড়ে তো ফাদার অবাক। তিনি লজেন্সকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “নীলাভ তুমি তো একটা পাহাড় তৈরি করে পাঠিয়েছ সম্রাটকে তাই না?”

লজেন্স বলল “হ্যাঁ ফাদার।”

“তুমি কোথায় দেখলে সে পাহাড়?”

“ওই যে ওখানে।” বলে সেই নীল পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলল লজেন্স আর তারপর মুখের লজেন্সটা…

ঠিক তখনই সারা জাপান দেশকে মুগ্ধ করে সম্রাটের রাজপ্রাসাদের ছাদ থেকে আকাশে ভাসতে থাকলেন দেবতা ফুজি!

ছবিঃ শিবশংকর ভট্টাচার্য

দোয়েল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরের গল্প-সলিউশান এক্স

Leave a Reply