আগের পর্ব- প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব,চতুর্থ পর্ব

ইন্দুমাধব মল্লিকের(৪ ডিসেম্বর, ১৮৬৯ থেকে ৮ মে, ১৯১৭) জন্ম হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। পিতার নাম রাধাগোবিন্দ মল্লিক। আদি বাড়ি বর্ধমান জেলার শ্রীখণ্ড গ্রামে। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। অটোভ্যাকসিন চিকিৎসা পদ্ধতি ভারতে প্রথম চালু করায় অগ্রণী ছিলেন ইন্দুমাধব। ১৮৯৭ থেকে ১৯০০ সাল অবধি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, দর্শন ও রসায়ন বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন।বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে তাঁর দক্ষতা ছিল। ১৯১০ সালে বিখ্যাত ইকমিক কুকারের উদ্ভাবন করেন ইন্দুমাধব। ইকনমিক ও হাইজিনিক এই দুটো শব্দ মিলিয়ে এর নামকরণ করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। বাঙালি বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত দেওঘরে বোমা পরীক্ষায় আহত হলে গোপনে তাঁর চিকিৎসা করেন।ভ্রমণবিলাসী ইন্দুমাধব বহু জায়গায় ভ্রমণ করেছেন। ১৯০৬ সালে তাঁর চীন ভ্রমণের কাহিনি এবার থেকে ধারাবাহিকভাবে জয়ঢাকের পাতায় বের হচ্ছে। এবারে চতুর্থ পর্ব
সিঙ্গাপুর-[প্রথম প্রস্তাব।]
মালয় দেশে আমি তিনটি স্থান দেখিয়াছি। প্রথমটি পিনাঙ। পিনাঙের কথা পূর্ব্বের দুই প্রবন্ধে বলা হইয়াছে। মালয়ের সর্ব্বাপেক্ষা বড় সহর সিঙ্গাপুর। পিনাঙ হইতে সিঙ্গাপুর যাইতে তিন দিন লাগে। তবে পথে পোর্ট সুইটেনহাম নামক এক বন্দরে ঘণ্টা কতকের জন্য জাহাজ থামে।
সুটেনহাম একটি ছোট বন্দর ; সবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে মাত্র। সমতল ভূমির উপর এ স্থানটি অবস্থিত বলিয়া এখান হইতে রেলযোগে মালপত্র মালয় দেশের ভিতরে বহুদূর পর্য্যন্ত লইয়া যাওয়া হয়। পিনাঙ বা সিঙ্গাপুর দুইটি স্থানই দ্বীপে অবস্থিত, এই কারণে এই সকল স্থান হইতে মালয় উপদ্বীপের মধ্যভাগে রেল যাওয়া অসম্ভব। তাই এ স্থানে একটি নূতন আড্ডা করা হইয়াছে। এ স্থানটি নিচু সমতলভূমির উপর ; অল্পদিন হইল নিবিড় জঙ্গল কাটিয়া স্থাপিত। সহরটী বড় স্যাঁৎস্যাঁতে ; মশার উৎপাত ও জ্বরের প্রদুর্ভাবও এইজন্য এখানে বেশী। প্রতিভাশালী ডাক্তার রসের আবিষ্কারানুসারে আজকাল স্থির হইয়াছে যে, এক জাতীয় দূষিত মশক দংশনই ম্যালেরিয়া ঘরের উৎপত্তির কারণ। সেই কারণে বর্ষার ঠিক শেষে ও শীতের প্রারম্ভে অর্থাৎ পূজার সময় ও পরে যখন মাটি অত্যন্ত ভিজা থাকে, সেই সময় মশাও বিস্তর জন্মে। তাহার ফলে ঐ সময় আমাদের দেশে ম্যালেরিয়া জ্বরের যত প্রাদুর্ভাব হয় অন্য সময়ে তত হয় না। কিন্তু সুইটেনহাম বন্দরে সমুদ্রোপকূলের মাটি অনবরত ভিজা থাকাতে বার মাসই এখানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব। সে ম্যালেরিয়া হইতে কাহারও,—বিশেষ ইউরোপবাসীদের রক্ষা পাওয়া দায়। তা’ছাড়া আসাম অঞ্চলে যে “কালা-আজর” নামক এক প্রকার জ্বর হয়, সে জ্বরও এখানে খুব দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল কারণে স্থানটীর স্বাস্থ্যোন্নতি ও ব্যবসার উন্নতি হইতেছে না। আমরা রেঙ্গুন হইতে আনীত বিস্তর চাল ও কতকগুলি বিলাতী কাপড়ের গাঁট নামাইয়া দিলাম মাত্র, সেখান হইতে কিছুই লইলাম না।
আজকাল মশা মারিয়া এখানকার ম্যালেরিয়া কমাইবার প্রস্তাবও হইতেছে। এ বিষয়ে কৃতকার্য্য হইলে শীঘ্রই স্থানটির উন্নতি হইবে। সেখানে যে ৫।৬ ঘণ্টা ছিলাম, তার মধ্যে আমি ভয়ে ভয়েই স্থানটী দেখিয়া বেড়াইয়াছি। ভয়ের কারণ, পাছে এই অল্প সময়ের মধ্যেই ম্যালেরিয়া ধরে! দেখিবারও তথায় বেশী কিছুই নাই। রেঙ্গুনের মত নিচু সমতল ভূমি বলিয়া এখানকার রাস্তাগুলিও চাওড়া ও সোজা। বাড়ীগুলি কাঠের।
আমাদের দেশে ম্যালেরিয়ার একটি প্রধান আড্ডা বর্দ্ধমান জেলার মত এখানেও এটেল মাটি দেখিলাম। জমি নরম ও ভিজা বলিয়া হাল্কা করিয়া বাড়ী তৈয়ার করিতে হয় এবং বায়ু যাতায়াতের জন্য তাহার তলা খুলিয়া রাখিতে হয়। এখানেও প্রায় সকল বাসীন্দাই চীনেম্যান। তারাই দোকান করে। চুল ধুইবার ও বিনাইবার দোকানের পাশেই চণ্ডুর দোকান। তার পাশেই জুয়া খেলিবার আড্ডা।
কালো মালয়বাসীরা মাটি কাটিয়া কুলির কাজ করিয়া বেড়াইতেছে। এখানকার জলবায়ুতে চির অভ্যস্ত বলিয়া তাহারা ম্যালেরিয়ায় তত ভোগে না।
এখান হইতে জাহাজ ছাড়িয়া তার পর পরদিন প্রাতে সিঙ্গাপুর পৌঁছিলাম। শুধু মালয়-উপদ্বীপ নয়, সমগ্র এসিয়ার মধ্যে সিঙ্গাপুরই সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান বন্দর। বন্দরে ঢুকিবার সময় দূর হইতেই তাহার আভাস পাওয়া যায়। অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড় জল ভেদ করিয়া উঠিয়াছে। তাহাদের উপর অতি সুন্দর সুন্দর বাঙ্গালা নির্ম্মিত, ও তাহার চারি পাশেই পিনাঙএর মত প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মাছ ধরিবার আড্ডা।
নানা রকম নূতন নূতন মাছ এখানে পাওয়া যায়। পূর্ব্বেই পিনাঙ প্রবন্ধে বলা হইয়াছে “কাটেল্ ফিস্” নামক এক প্রকার বড় বড় দাঁড়া সংযুক্ত গোল মাছ জলের নীচে মাথা নিচু করিয়া চলে। অতিশয় হিংস্র স্বভাব বলিয়া ইহাদের দৃষ্টিশক্তি অতি প্রখর। দেখিতে এক রকম বলিয়া পার্শ্বে ইহার ছবি দেওয়া গেল।

একটি কথা আছে,—এ সকল দেশের লোক যত ভাত খায়, তত মাছ খায়। অসংখ্য ছোট বড় সাম্পান কৌশলে ও দ্রুতগমনে, যে দিকে ইচ্ছা পাল তুলিয়া যাইতেছে। হাওয়া যে দিকেই হউক না কেন, এ দেশের মত সমুদ্র-পরিবেষ্টিত স্থানে মাঝিরা নৌকা চালাইতে এমন সিদ্ধহস্ত যে, যে দিকে ইচ্ছা পাল তুলিয়া তাহারা যাইতে পারে। বায়ুভরে পাল স্ফীত হইয়া যখন নীল রঙে চিত্রিত চোখ আঁকা “ড্রাগন” ঝোলান সাম্পানগুলি সমুদ্র আচ্ছন্ন করিয়া এদিক ওদিক ভাসিয়া বেড়ায়, দূর হইতে তখন সে দৃশ্য অতি সুন্দর দেখায়। ছোট বড় অর্ণব-পোতের ত সংখ্যাই নাই। নানা দেশের নানা রকম নিশান তুলিয়া বাণিজ্য-তরী সকল সমুদ্রে ভাসমান।
এস্থানে কত রকমের বিভিন্ন জাতির যুদ্ধ জাহাজ দেখিলাম। কেহ আসিতেছে, কেহ যাইতেছে, কেহ মাঝদরিয়ায় নঙ্গর করিয়া আছে, কেহ জেটিতে কয়লা বোঝাই লইতেছে। তাদের শিটির বিকট স্বর শুন্লে যেন প্রাণ কেঁপে উঠে। ভীমদর্শন গোরা ও কাফ্রী সৈন্যগুলি ঠিক যেন যমদূতের মত দেখিতে। আর তাদের ব্যবহারও পশুর মত। রুষ-জাপান যুদ্ধের জন্যই বিভিন্ন দেশের এত রণতরী এখানে জমা হইয়াছে ; আবশ্যক বুঝিলেই যুদ্ধে যোগ দিবে। “ষ্টীমলঞ্চ”গুলি তীরবেগে নিকটবর্ত্তী স্থানে যাতায়াত করিতেছে। বন্দরে ঢুকিয়া যতদূর দেখা যায়, কেবল নৌকা আর জাহাজ ; তা’ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। কলিকাতার বন্দরের সহিত তুলনায় এ বন্দর অন্ততঃ দশগুণ বড়। সহরের প্রকাণ্ড বাড়ীগুলি সব যেন তীরে সারবন্দী হইয়া দাঁড়াইয়া আছে।
জাহাজ জেটির যতই নিকটবর্ত্তী হইতে লাগিল, ছোটছোট ডিঙ্গীতে চড়িয়া মালয় দেশের কতকগুলি কালো কালো নগ্নমূৰ্ত্তি লোক আসিয়া জাহাজের চারিদিকে ঘিরিল। তাদের মধ্যে ৮।৯ বৎসরের ছেলেও অনেকগুলি ছিল। আমার ইচ্ছা হ’তে লাগল, এদের কাণ ম’লে স্কুলে দিয়ে আসি। কিন্তু তা’হলে এদের আর এমন স্বাস্থ্য থাকত না। এরা খুব জবর ডুবুরী। জাহাজের উপর হইতে সিকি দুয়ানি জলে ফেলে দিলে এরা তৎক্ষণাৎ ডুব দিয়ে তা’ তুলে আনে। এরা মাছের মত অবলীলাক্রমে সাঁতার দিতে পারে। সমস্ত দিনই এরা ছোট ডিঙ্গীতে চ’ড়ে সমুদ্রতীরে ঘুরে বেড়ায় ; আর জাহাজ আসিলেই এইরূপে সিকি দুয়ানী রোজগার করে। এইরূপে প্রতিদিন এদের আয়ও যথেষ্ট হয়। এদের অন্য কোন কাজ নাই। শ্যাম ও মালয়ের সমুদ্রতীরবর্ত্তী লোকেরা সন্তরণ-কার্য্যে অতি পটু। শুনিয়াছি এডেনেও নাকি এরূপ ডুবুরী আছে।
বন্দরে প্রবেশ করিবার সময় জাহাজের বেগ কমান হইল। চারি দিকে অজস্র “জেলি” মাছ দেখা গেল। সূৰ্য্যরশ্মিতে নানা রঙে রঞ্জিত হইয়া তাহারা জলের নীচে খেলিয়া বেড়াইতেছে ; দেখিতে ঠিক যেন শ্বেত ও লোহিত আভাযুক্ত পদ্মফুলের মত, অথচ তাদের সারাংশ অতি কম। জল হইতে তুলিলে একফুট লম্বা একটি জেলি মাছ সঙ্কুচিত হইয়া এক ইঞ্চি হয়! ডারউইনের ক্রমবিকাশ হতে, এই জেলী মাছই জীবের বিকাশের দ্বিতীয় অবস্থা। স্থূল দেহের ভিতর দেহ-নলেরও আবির্ভাব হইয়াছে।

সিঙ্গাপুরে আর একটি সুন্দর দৃশ্য দেখিলাম। কালো ফিরিঙ্গীর পোষাক-পরা কতকগুলি মাদ্রাজী জাহাজের ধারে ধারে ছোট নৌকা করিয়া অনেক রকম প্রবাল ও নানাবিধ ছোট বড় চিত্র-বিচিত্র শামুক বেচিয়া বেড়াইতেছে। সেগুলি দেখিতে এত সুন্দর যে, মনে হয় ঠিক যেন গজদন্ত নিৰ্ম্মিত সাদা সাদা ফুল। এই প্রবালগুলি ক্রমবিকাশ-পর্য্যায়ে জেলি মাছ হইতে এক স্তর উচু, শুধু দেহনল নয়, ইহাদের দেহে খাদ্যনলও সংযুক্ত আছে। দামও অতি অল্প। এক ডলার দিলে নানা রকম রঙ ও আকারের এক ঝুড়ি প্রবাল পাওয়া যায়। আমি অনেকগুলি কিনিয়া আনিয়াছি ও আমার অনেক বন্ধুবান্ধবকে উপহার দিয়াছি।
সিঙ্গাপুর দ্বীপটীর উপকূলের অর্দ্ধেক অংশ ক্রমিক জেটী দিয়ে বাঁধান। এসকল স্থানে বাহাদুরী কাঠের অভাব নাই। বড় বড় বাহাদুরী কাঠ দিয়ে জেটী প্রস্তুত। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য এত বেশী যে, জাহাজ একবারে জেটীতে লাগিয়া মালপত্র নাবাইয়া না দিলে বা বোঝাই না নিলে চলে না। যতদূর চক্ষু যায়, জেটীতে সারি সারি জাহাজ বাঁধা রহিয়াছে। অতি ক্ষিপ্রতার সহিত আমাদের জাহাজ জেটীতে ভিড়ান হইল। চীনেম্যান কুলি, কুলির সরদার, কেরাণী ইত্যাদিতে জেটী পরিব্যাপ্ত। সবই চীনেম্যান। মাংসপেশী বহুল সুগঠন অৰ্দ্ধনগ্ন দেহে তাহারা অকাতরে ১০।১২ ঘণ্টা করিয়া খাটিয়া মাল নাবান-উঠান কাজ করিতেছে। জেটীর পাশেই বিস্তৃত আয়তন ঢেউতোলা টিনের গুদাম-ঘর। তার ভিতর হইতেই ছোট ট্রেণযোগে মালপত্র সহরের ভিতর নীত হইতেছে। তার নিকটেই পাথুরে কয়লার স্তূপ! বহুদূর ধরিয়া পর্ব্বতাকারে কয়লা রক্ষিত হইয়াছে। যেন সমুদ্রের ধারে বরাবর একটি অবিচ্ছন্ন কয়লার পাহাড়ের সারি চলিয়া গিয়াছে। সিঙ্গাপুর জাহাজে কয়লা লইবার একটি প্রধান আড্ডা, জাহাজের জন্য পাথুরে কয়লা বোঝাই হইবার স্থান। এ অঞ্চলের সকল জাহাজই এখানে থামে। জাপান যাইবার জাহাজই হউক, আর চীন যাইবার বা অষ্ট্রেলিয়া যাইবার জাহাজই হউক,—সকল জাহাজই এখানে আগে আগে ও এখান হইতে কয়লা ও আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি বোঝাই লয়। সিঙ্গাপুর যে কেবল বড় ব্যবসার স্থান বা কয়লা বোঝাই হইবার আড্ডা, তাহা নয় ; এ স্থানটি অতি সুদৃঢ়রূপে রক্ষিত। এখানে একটি কেল্লা আছে, তাহা অতি সুকৌশলে গঠিত ও দুৰ্জ্জেয়।
সিঙ্গাপুরের আবহাওয়া অতি সুন্দর। বিষুবরেখার অতি সন্নিকট, সুতরাং এস্থানটি খুব গরম হইবারই কথা ; প্রকৃতপক্ষে এখানে কিন্তু বেশী গরম পড়ে না। সমুদ্রের নিকটবর্ত্তী সকল স্থানেই যেমন বেশী শীত বা বেশী গরম হয় না, এখানেও সেইরূপ। এখানে প্রায় সারা বছর ধরিয়াই একরূপ নাতিশীতোষ্ণ ঋতু বিরাজ করে। এখানে বর্ষাকাল বলিয়া কোনও কাল নাই। বৃষ্টি সারা বছরই মাঝে মাঝে হইয়া থাকে।
যেখানে এমন চিরবসন্ত বিরাজমান, সেই স্থানের সেই ছোট ছোট পাহাড়ের উপরকার ছোট ছোট বাংলাগুলির দিকে চাহিলেই আমার মনে হইত,—যে ভাগ্যবান পুরুষেরা ঐ স্থানে বাস করেন, তাঁহারা কত সুস্থ শরীরে কত মনের সুখে থাকেন। উন্মুক্ত বিমল বাতাস দিবারাত্রি বহিতেছে। কলিকাতার ঘন অবস্থিত ধূলি ও ধূমসমাকীর্ণ বাড়ীর তুলনায় এবাড়ীগুলি ত স্বর্গপুরী। অনন্ত সুনীল সমুদ্র চতুৰ্দ্দিকে বিস্তৃত। সূর্য্যোদয়ে, সূর্য্যাস্তে ও পূর্ণিমার বিমল আলোকে সমুদ্রবক্ষে নভোমণ্ডলের প্রতিবিম্ব পড়িয়া কতই না জানি শোভা হয়।

জাহাজও জেটীতে লাগিল আমিও জাহাজ হইতে নামিলাম। জেটীতে লাগে বলিয়া, এ সকল স্থানে জাহাজ হইতে নামা-উঠার কোনও গোলমাল নাই। রেঙ্গুনের মত সাম্পানের সাহায্য লইতে হয় না। নামিয়া আর দুই পা’ গেলেই অসংখ্য রিক্স (ঠেলা গাড়ী) পাওয়া যায় ; সুতরাং এ সকল স্থানে ভ্রমণ করার বিশেষ সুবিধা। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ঘণ্টায় দুই জনার ৩০ সেণ্ট মাত্র ভাড়া ;—রিক্সগাড়ী ঘোড়ার গাড়ীর মত বেগে চলে ; সুতরাং অতি অল্প সময়ে ও অতি কম খরচে সকল স্থান দেখা যায়।
প্রতি সাগর বা প্রণালীতে প্রবেশের পথেই ইংরাজ অধিকৃত একটু না একটু স্থান আছেই। সমুদ্রের উপর ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য এরূপ আবশ্যক। এক সিঙ্গাপুরই কতদিকের পথ আগুলিয়া আছে। চীন, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া যাইবার পথে সকল জাহাজকেই এখান দিয়া যাইতে হয়। শুধু এখানে নহে, ভূমধ্য সাগরের প্রবেশের পথ জিব্রালটার হইতে দেখিয়া আসিলে, সৰ্ব্বত্রই এরূপ দেখা যায়। ভূমধ্য সাগরের মধ্যপথে মাল্টা দ্বীপ ইংরাজ অধিকৃত। মিসর দেশ ইংরাজেরই ক্ষমতাধীনে ; ইহা ভূমধ্য সাগর হইতে লোহিত সমুদ্রে প্রবেশের পথে অবস্থিত। লোহিত সমুদ্র হইতে বাহির হইবার পথেই এডেন-বন্দর।
তার পর ভারতবর্ষ, লঙ্কাদ্বীপ ও ব্রহ্মদেশ ত ইংরাজেরই করতলগত। মালয়-প্রণালীর পথে পিনাঙ ও সিঙ্গাপুর এবং চীনসমুদ্রের একদিকে লাবুয়ান দ্বীপ এবং অপর দিকে হংকং দ্বীপ ইংরেজাধিকৃত।
শেষোক্ত এই অধিকারগুলির একটু বিশেষত্ব আছে। ইহা জমির খানিকটা অংশ ও তাহার নিকটবর্ত্তী কতকগুলি দ্বীপ লইয়া গঠিত। পিনাঙ একটি দ্বীপ ; কিন্তু নিকটবর্ত্তী ভূখণ্ডের অংশটুকুর নাম ওয়েলেশলী টাউন। এইরূপ সিঙ্গাপুরও একটি দ্বীপে অবস্থিত ; কিন্তু নিকটবর্ত্তী ভূখণ্ডকে মালাক্কা বলে।
যতগুলি প্রধান আড্ডা আছে, তাহা দ্বীপেই অবস্থিত। বিদেশে দ্বীপই সৰ্ব্বাপেক্ষা নিরাপদ স্থান। পিনাঙ, সিঙ্গাপুর, হংকং,—সবগুলিই দ্বীপ।
ভূখণ্ডস্থ জমি, আভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আবশ্যক। সেই স্থান হইতেই রেলযোগে ইউরোপীয় পণ্যদ্রব্যাদি দেশের ভিতর নীত হয়।
বহুপূর্ব্বে এই সকল স্থানের নিকটবর্ত্তী দ্বীপপুঞ্জে পর্ত্তুগীজদের ক্ষমতাই প্রবল ছিল। তাহাদের হাত হইতে ওলন্দাজেরা অনেক স্থান কাড়িয়া লয়েন এবং অনেক স্থান আবার ইহাঁদের হাত হইতে ইংরাজ, ফরাসী, জার্ম্মাণ ও আমেরিকা প্রভৃতির হাতে গিয়াছে। এইরূপে নিকটবর্ত্তী স্থানগুলি বিদেশীয় জাতির মধ্যে ভাগাভাগী হইয়াছে।
নামিয়াই প্রথমে জেটীতে খানিক পরিভ্রমণ করিলাম। ক’ত মাইল উহা লম্বা, তাহার আমি শেষ পর্যন্ত যাইতে পারিলাম না। চীনে-কুলির ভিড় ও নালপত্র নামানর গোলমালে তাহার উপর দিয়া যাতায়াতও সহজ নহে।
চীনে কুলি অতি সুদক্ষ, তাহারা নিঃশব্দে কাজ করে। জিনিষপত্র ফেলা বা ভাঙ্গা-চুরা কদাচ ঘটিয়া থাকে। কলিকাতার কুলি বা রেঙ্গুনের মাদ্রাজী কুলি কত রকম সুর করিয়া গান করে। ইহাদের মুখে কিন্তু কোন শব্দই নাই।
যতক্ষণ কাজ করিবে, ক্ষণেকের তরেও ইহারা একবার বিশ্রাম করে না, কেবল ঠিক আহারের সময় ফিরিওয়ালার কাছ হইতে ভাত-তরকারী কিনিয়া খাইবার জন্য স্বল্পক্ষণ ছুটী পায়। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্য্যন্ত অবিরাম পরিশ্রমের মূল্য অধিকাংশ স্থলেই ২০ বা ৩০ সেণ্ট অর্থাৎ ৫ আনা মাত্র।
বেশী লোক বলিয়া চীনদেশে মজুরী এত সস্তা। তাই চীনেম্যানরা মালয় ব্রহ্মদেশ প্রভৃতি স্থানে এত ছড়িয়ে পড়েছে ; ও ভারতবর্ষ, দক্ষিণ আফরিকা প্রভৃতি স্থানে অসংখ্য চীনেম্যান কারিকর ও কুলির কাজ করিবার জন্য যাইতেছে। র্যাণ্ড স্বর্ণখনির জন্য বহু চীনে কুলির চালান হয়। তাহারা সব ৬০ আনা রোজে যাইতেছে।
জাহাজের আফিসের লোকেদের নিকট হইতে খবর পাইলাম যে, এক একটি চীনে কুলি চারিটি ভারতবর্ষীয় কুলির কাজ করে। সুতরাং হিসাব মত কত সস্তা পড়িল। প্রকৃতই দেখিলাম, রেঙ্গুনে যে সব বস্তা দুটী তিনটী ক্ষীণদেহ মাদ্রাজী কুলিতে গান গাহিতে গাহিতে মুখভঙ্গী করিয়া তুলে ও ফেলিয়া জখম করে, এক একটি চীনে কুলি অবলীলাক্রমে তাহা বহন করিয়া থাকে।
কিরূপ দ্রুতবেগে ও কতকক্ষণ ধরিয়া ইহারা যাত্রীসহ রিক্স গাড়ী টানিয়া লইয়া বেড়ায় তাহা দেখিলে তাহাদের কত যে ক্ষমতা তাহা বুঝা যায়। বটানিকাল গার্ডেন দেখিতে যাইবার কালে ঘন ছায়াযুক্ত বড় বড় নারিকেল-নিকুঞ্জের ভিতর দিয়া সুগঠন চীনে রিক্স ওয়ালা দ্বারা যখন তীরবেগে আমাদের রিক্স গাড়ী নীত হইতেছিল, সে স্থানে—সে সময়কার আমার মনের আনন্দ ভাষায় বুঝান যায় না।
এই পরিশ্রমের সহিত তাহাদের আহারের তুলনা করিলে বিস্মিত হইতে হয়। দিনে—তিনবারে ৬ পেয়ালা মাত্র ভাত-তরকারী ও অতি সমান্য মাত্র মাংস ও কিছু নাছ খাইয়া ইহাদের দেহ কেমন করিয়া এত পুষ্ট ও বলবান থাকে, তাহা বুঝা যায় না। আমার মনে হইল, আমাদের দেশের সাধারণ লোকেরা দুই বেলায় অন্ততঃ ইহাদের একজনের দৈনিক আহারের দুই তিন গুণ আহার করে। অল্প আহার ও কায়িক পরিশ্রমে এবং মনের চিরপ্রফুল্লতাতেই ইহাদের শরীরে বলাধান করে। সু-হজমের যে সব লক্ষণ, তার সব গুলিই এদের ভিতর দেখা যায়। এরা ঘুমাবে একেবারে অকাতরে,—ঠিক যেন মৃত ব্যক্তির মত। মাদুরে শুয়ে এবং বাঁশ বা কাঠের বালিশ মাথার দিয়ে যে অবস্থায় শুইবে, সেই অবস্থায়ই উঠিবে—একবারও পাশ ফিরে না। এদের প্রতিদিন মলত্যাগের প্রথা নাই,—তিন চার দিন অন্তর, যখন আবশ্যক হইবে, তখন যাইবে। আর সে দাস্তও যত সুহজমব্যঞ্জক হইতে হয়। বায়ুর প্রাচুর্য্য বা তরলতার লেশ মাত্র তাহাতে নাই। অতি অল্পমাত্র সময়ে ইহাদের মলত্যাগ সমাধা হয়।
এদের পোষাক ঢলঢ’লে ইজের ও কোট ; তবে কেহ কেহ গা’ খুলিয়াও কাজ করে। চীনজাতি বড় নীলরঙ প্রিয়। তাদের পোষাক নীলরঙের, সাম্পান নীলরঙের, বাড়ীগুলিতে নীল রঙ মাখান ও সাইনবোর্ডগুলির হয় জমি না হয় হরফ নীল রঙের।
এদের সুহজমের কারণ কি ও এমন সুগঠন মাংশপেশীবহুল দেহে অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রমের কুফলই বা কি,—সে সব কথা বিস্তৃতরূপে পরে বলিব। তাহা হইতে আমাদের দেশের লোকের অনেক শিখিবার আছে। তবে এই টুকু মাত্র এখানে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, চীনেদের ভিতরে হৃদ্রোগের প্রাদুর্ভাব বড়ই দেখা যায়। পিনাঙ প্রবন্ধে রিক্স ওয়ালার কথায় বলিয়াছি যে, দশ বার বৎসর এরূপ গুরুতর পরিশ্রম করিয়া তাহারা হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
কুলি ও নৌকার মাঝিরও সেইরূপ। হৃদ্রোগই এরূপ মৃত্যুর কারণ।
প্রত্যহ দিনের কার্য্য শেষ হইলে চীনে কুলিরা সমুদ্রে গা’ধুইয়া থাকে ; কিন্তু মাথায় জল দেয় না,—পাছে বিনানীতে লোণা জল লাগে ও চুল ভিজিয়া যায়! মধ্যে মধ্যে আপনাদের কাপড়গুলিও কেচে দেয়। মাথা ধুইবার জন্য আলাহিদা দোকান আছে, সেখানে গরম জল ও সাবাঙ দিয়া মাথা ধুইয়া চুল বিনাইয়া দেয়। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ফিরিওয়ালারা ভাত, মাছ, মাংস, তরকারী ইত্যাদি বেচিয়া বেড়ায়। কোনও কুলিকে রেঁধে খেতে হয় না। দিনে তিন বার খাইবার খরচ ১২ সেণ্ট মাত্র। কাপড় জামা ছিঁড়িয়া গেলে চীনে ফিরিওয়ালী স্ত্রীলোক দুই এক সেণ্ট লইয়া তাহা রীপু করিয়া দেয়। শুইবার জন্য এদের একটি মাদুরি ও একটি কাঠের বা বাঁশের বালিশ মাত্র দরকার হয়। এরা কখনও আহারের সময় জলপান করে না, অথবা কখনও সরবৎ বা ঠাণ্ডা জল পান করে না। আবশ্যক মত ছোট ছোট পিয়ালায় স’বজে চা খায়;তাতে চিনি বা দুধ দেয় না। আবশ্যকীয় সকল দ্রব্যই ফিরিওয়ালারা সেই স্থানে আনিয়া যোগায়;সুতরাং তাদের কাজের ভাবনা ছাড়া আর কোনও ভাবনা ভাবিতে হয় না।
সিঙ্গাপুর প্রবন্ধে চীনেম্যান সম্বন্ধে বেশী কথা বলার আমার ইচ্ছা ছিল না ; সে কথা হংকং, এময় প্রভৃতি চীন দেশীয় স্থান সম্বন্ধে বলিলেই ভাল হইত। তবে মালয় দেশ ও তথাকার আদিমবাসী সম্বন্ধে পিনাঙ সম্বন্ধে বলিতে গিয়া অনেক কথা বলিয়াছি আর ইহাও বলিয়াছি যে, এ সকল দেশে শতকরা ৯০ জন চীনেম্যান বাস করে। যদিও দেশটী মালয়-উপদ্বীপ বটে, কিন্তু চীনে অধিবাসীই বেশী ও ব্যবসাদিসূত্রে তাহারাই প্রধান। এই কারণে চীনেম্যানের কথা আপনিই আসিয়া পড়িল। বিশেষ সিঙ্গাপুরের মত একটি প্রধান বন্দরে বিপুল জেটীর কথা বলিতে বলিতে চীনে কুলির কথা না বলিলেই নয়।
জেটীতে কত বিভিন্ন প্রকার মালপত্র দেখিলাম। রেঙ্গুন হইতে আনীত চালের বস্তা ঠাসা রহিয়াছে। আমরা আবার আরও কতকগুলি চালের বস্তা নামাইয়া দিলাম। বাহাদুরী কাঠ, লোহার কড়ি, করুগেটেড আয়ারণ, অনেক বিলাতী কাপড়ের গাঁট ও অন্যান্য নানা রকমের বিলাতী দ্রব্যাদি নামিল। জেটীতে অধিকাংশই বিদেশী পণ্যদ্রব্য। জাপানী দেশলাইয়ের অসংখ্য বড় বড় বাক্স এখান হইতে চালান হইয়া ভিন্ন ভিন্ন জাহাজে রেঙ্গুন, পিনাঙ প্রভৃতি দেশে নীত হইতেছে। আপকার কোম্পানীর জাহাজেই সৰ্ব্বাপেক্ষা ভিড়। চীনদেশে মালপত্র বা লোকজন নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা সম্বন্ধে আপকার কোম্পানীর জাহাজই প্রধান।
সহরের ভিতর ঢুকিয়া যতদূর দেখিলাম, সমস্ত সহরটী কেবল দোকানে পরিপূর্ণ। লোকে লোকারণ্য, তার অধিকাংশই চীনে। পৃথিবীর সকল দেশের লোকই এখানে ব্যবসাসূত্রে আসিয়াছে। সকল লোককে দেখিলেই মনে হয় তাহারা অস্থায়ী, কেবল ধন লুটিতে আসিয়াছে। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে আমেরিকাবাসীই বেশীর ভাগ। বিস্তর ফরাসীও আছে, তাহারা মদের দোকান বা থিয়েটার বা কেশ পারিপাট্যের দোকান করে, কেহ বা হোটেলের স্বত্বাধিকারী ও ম্যানেজার। তাহারা দোকানে অতি সুন্দর সুন্দর মোম নির্ম্মিত অৰ্দ্ধনগ্ন স্ত্রীমূৰ্ত্তি রাখিয়াছে।
এদেশের লোক সম্বন্ধে আর একটা কথা বিশেষ করিয়া বলা উচিত। ইউরোপীয় ও চীনে মিশ্রিত একরূপ সঙ্কর জাতি এ অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। তাদের নাসিকা উন্নত, কিন্তু গালের হাড় উচু ও চোক বাঁকা। তারা অনেকেই সাহেবদের মত পোষাক পরে ; আবার অনেকে ঠিক চীনেম্যানের মত ঢল ঢ’লে বেশ করিয়া থাকে। আর কতকগুলি আছে, তাহারা ইউরোপীয়ানদের মত আঁটা সোটা পোষাক পরে বটে, কিন্তু টুপির ভিতর চীনেদের মত বিনানীও লুকাইয়া রাখে। পূর্ব্বেই বলিয়াছি,—চীনেম্যান যেখানে যায় সেই খানেই বর্ণসঙ্কর জাতি উৎপন্ন করে। ইউরোপীয় জাতি ও মগজাতির সঙ্গে, এমন কি কলিকাতার চীনেপাড়া বেন্টিঙ্ক ষ্ট্রীটেও অনেক চীনেম্যানের ঔরসে এবং ফিরিঙ্গীর মেয়েদের গর্ভে অনেক দো-আসলা জাতি উৎপন্ন হইয়াছে। অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফরিকার উপনিবেশসমূহে চীনেকুলি আমদানি করিতে যে আপত্তি, তার একটা কারণ, এই রূপ দো-আসলা জাতির সৃষ্টির ভয়।
এ ছাড়া অনেক জাপানদেশীয় লোক, ইহুদি ও পার্শী এখানে বড় বড় দোকান করিয়াছে। এ অঞ্চলের সর্ব্বত্রই শিখ পাহারাওয়ালা দেখা যায়। তাদের সাহায্য ব্যতীত ইংরাজ গবর্ণমেন্টের যেন শান্তিরক্ষা চলে না। বেছে বেছে ভীমাকৃতি শিখ আমদানী করা হয়েছে। অধিকাংশই দেখিলাম ৬ ফুটের উপর ঢেঙ্গা। তাহারা রাস্তার মাঝে দাঁড়াইয়া শান্তি রক্ষা করিতেছে। খৰ্ব্বাকৃতি মালয় পুলিস তাদের চারিদিকে দাঁড়াইয়া হুকুম তামিল করিতেছে। শিখ পাহারাওয়ালাকে সেখানে সকলেই যমের মত ভয় করে। দোষীর বিচারও তাদের হাতে সঙ্গে সঙ্গেই হইয়া যায়। গালি, ঘুষি, চপেটাঘাত, যষ্টিপ্রহার ও চীনেদের বিনানী ধ’রে টানিয়া উৎপীড়ন,—ইহা প্রায়ই দেখা যায়। লঘুপাপে গুরুদণ্ড সচরাচর হইয়া থাকে। শিখ পাহারাওয়ালা একবার হাঁক দিলেই হ’ল—সকল লোকই ভয়ে কাঁপে। আমরা তাদের সঙ্গে হিন্দীতে কথা কহিলে, তাদের আর আনন্দের সীমা থাকিত না। দেশের লোক দেখিয়া তাদের যেন আত্মীয়তার স্পৃহা জাগিয়া উঠিত। চীনে রিক্সওয়ালাকে আমাদিগকে দেখাইবার স্থান সকল বুঝাইয়া দিত, এবং আমাদের যেন কোনও বিষয়ে অসুবিধা না ঘটে, সে সম্বন্ধেও শাসাইয়া দিত। এখানে মাদ্রাজীরও অসদ্ভাব নাই। তারা অনেকেই সাহেবদের চাকরী করে ; অনেকে স্বাধীনভাবে নিজে নিজে দোকান করিতেছে।
আর স্ত্রীলোকের ত সংখ্যা নাই। এত স্ত্রীলোক কোথাও কখন দেখি নাই। যত বিভিন্ন জাতীয় স্ত্রীলোক আসিয়া এখানে জুটিয়াছে, তার মধ্যে জার্ম্মাণদেশীয় ইহুদী ও জাপানী স্ত্রীলোকই বেশী। তাহারা যেখানে থাকে সে পথ দিয়া চলিলেই “আপনার সঙ্গে একটি মাত্র কথা কহিতে চাই” স্ত্রীকণ্ঠ উচ্চারিত এই কথাগুলি অহরহ শুনিতে পাওয়া যায়। সহরের অনেক স্থানে কেবল তাদেরই বসতি। সেই স্থানেই থিয়েটার, সেই স্থানেই হোটেল, সেই স্থানেই মদের দোকান। সারারাত্রি দিনের মত জনতা। ঘুরে ঘুরে বড় পিপাসা হওয়ায় চীনে রিক্সওয়ালাকে অঙ্গভঙ্গী করিয়া,—সঙ্কেতে বুঝাইয়া দিলাম যে জল খাইতে চাই। সে মদের দোকানে নিয়ে গেল। তারাই ২০ সেণ্ট বা ৫ আনার বিনিময়ে লেমনেড ও বরফ খাওয়াইল। একটি ফরাসী রমণী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“আপনি কি খানিক ক্ষণের জন্য উপরে আসিয়া একটু বিশ্রাম করিবেন না?” সে স্থলেও চীনে স্ত্রীলোকের গাম্ভীর্য্য যায় নাই, চারিদিকের সাজসজ্জা শব্দবিন্যাস ও অঙ্গ-বিভ্রমের মাঝে তাদের গাম্ভীর্য্য অক্ষুণ্ণ আছে।
বাড়ী গুলি সব তিন চারিতলা উচু। সর্ব্বোপরের ছাত ঢালু। গায়ে গায়ে গাঁথা সবগুলি এক রকম দেখিতে ও অধিকাংশই নীল রঙ মাখান। নীচে দোকান ; উপরে থাকিবার আড্ডা। দোকানের সামনে নীলরঙের সাইনবোর্ড ঝুলচে। চীনে হরফগুলি নীচে নীচে লেখা,—দেখিতে ঠিক যেন ঘর বাড়ীর মত। প্রতি বাড়ীর সম্মুখেই ঢাকা বারান্দা। সব বাড়ীর বারান্দাগুলিই সংযুক্ত ; সুতরাং তার ভিতর দিয়া যেন একটা ঢাকা ফুটপাথ হইয়াছে। বরাবর যাইলে মাথায় রৌদ্র বা বৃষ্টির ছাঁট লাগে না।
রাস্তায় রথযাত্রার মত ভিড়। দ্রুতবেগে রিক্স গাড়ী প্রভৃতি অনবরত যাতায়াত করিতেছে। এমন কি কলিকাতা হইতে গিয়াও আমাদের ভ্যাবাচেকা লাগিত। মধ্যে মধ্যে সমুদ্র হইতে এক একটা খালকাটা হইয়াছে, তাহা দিয়া কত নৌকা মালপত্র আনিয়া একবারে দোকানের কাছে পৌঁছাইয়া দিতেছে। জলের উপর দিয়া বহিয়া আনিবার খরচ জমির উপর দিয়া আনার খরচের এক তৃতীয়াংশ মাত্র। এখানে ভাল ভাল ডাক্তারখানা আছে,—কিন্তু খুব ভাল ডাক্তার নাই। বড় লাইব্রেরী নাই; যাহা আছে, তাহা নভেলে পূর্ণ। বিশ্ববিষালর নাই,—উচ্চ শ্রেণীর বিদ্যালয়ে বিদ্যাশিক্ষা দেওয়া হয়।
এখানে এত ঘন বসতি যে সমস্ত সহরটীতে, রেঙ্গুন ও পিনাঙের মত একটিও বড় উদ্যান বা মন্দির দেখিলাম না। ঘোড়দৌড়ের মাঠ আছে বটে কিন্তু তাহা ছোট ও তাহার চারিদিকে বসতি। সহরের অনেক দূরে, শিবপুরের কোম্পানীর বাগানের মত, বটানিকাল গার্ডেন আছে। সেখানকার দৃশ্য অতি মনোহর। তার নিকটে কোথাও বসতি নাই। চারিদিক নিস্তব্ধ ; যেন পৃথিবীর সহিত সকল সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন। সেখানকার স্বচ্ছ সরোবরে “ভিক্টোরিয়া রিজিয়া” (রাণী ভিক্টোরিয়া) নামক আমাদের পদ্ম জাতীয় এক প্রকার প্রকাণ্ড আকৃতিবিশিষ্ট শতদল ফুল রাশি রাশি ফুটিয়া থাকে। কোন কোনটীর ব্যাস দেড় বা দুই ফুট হইবে। ঐ পদ্মের পাতাগুলিও অতি প্রকাণ্ড। দেখিলে মনে হয়, এরূপ পদ্মের উপর বীণা বাজাইয়া নাচা কিছু অসম্ভব নহে। আর সেখানকার সোজা লম্বা নারিকেল গাছের ঘন কুঞ্জবন,—ঠিক যেন বেতসকুঞ্জের মত। বট ও অশ্বত্থ গাছ অপেক্ষাও প্রকাণ্ড ছায়া-তরুর তলায় বেলা দ্বিপ্রহরে বসিলে আর উঠিয়া আসিতে ইচ্ছা হয় না। চারিদিক নিস্তব্ধ। দূরাগত পাখীর গান ঠিক যেন দূরাগত বংশধ্বনির মত শ্রুতিসুখকর। মাথার উপরে, গাছের ঘন পাতায় লুকাইয়া একটি পাখী করুণস্বরে ডাক’ছিল। আর যেন আমারই জীবনের অতীত ইতিহাস সুস্পষ্ট ভাষায় বলছিল।
সেখান হ’তে ফিরতে আমার প্রায় সন্ধ্যা হ’ল। আসিবার সাথে সহর হইতে অনেক দূরে মালয়পল্লী দেখিলাম। ছোট ছোট পাহাড়সমাকুল একটি স্থানে ঐ পল্লী অবস্থিত। কাঠের বাড়ীর ঢালু চালাগুলি বহুদূর অবধি, ক্রমান্বয়ে চলিয়াছে।
সেই সকল গাছ-পালা সমাচ্ছন্ন পাহাড়েরই পাদমূল ধৌত করিয়া সমুদ্রের জল কুল-কুল রবে জোয়ারভাটা খেলে। কতপ্রকার শামুক ও জলজ প্রাণীর চিত্র-বিচিত্র খোলা তথায় দেখিলাম; ঢেউয়ের সহিত তীরের দিকে উঠিতেছে ও নামিতেছে। পল্লীর ছোট ছেলেগুলি সমুদ্রজল থেকে সেই সকল কুড়িয়ে গুলি ছোড়াছুড়ি করে। আর ছোট মেয়েরা ভিজে বালি দিয়ে খেলাঘর প্রস্তুত করে,—মুক্ত হাওয়ায় সুস্থ শরীরে মনের আনন্দে সময় কাটায়। তাহাদের বয়স্কা বোনেরা বনফুলের মালা গেঁথে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়। সে মালার তলা দিয়ে দিবাবসানে যে চলে, তারই মনের ভাব পরিবর্ত্তিত হয়, তাদের এইরূপ বিশ্বাস।
সন্ধ্যার অল্পক্ষণ পূর্ব্বেই আমাদের জাহাজ ছাড়িল। এইবার আমরা ভীষণ চীন-সমুদ্রে বহুদিনের জন্য ভাসমান হইলাম।
ক্রমশ
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘পর্যটকের ডায়েরি’ বইটি থেকে উদ্ধৃত
মূল বইটি নীচের লিঙ্কে পাবেন-
https://joydhakbooks.in/product/parjatakerdairy/
