
মূষিকরতন মাত্র তিন ইঞ্চি লম্বা হলে কী হবে, তার মাথায় এক বাক্স বু্দ্ধি। এক দিন সে গভীর বনের মধ্যে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একটা ল্যাজমোটা খ্যাঁকশিয়াল মূষিককে দেখতে পেয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে এগিয়ে এল। মূষিকের কাছে এসে হাসি হাসি মুখে বলল, ‘ছোট্ট মূষিক, ছোট্ট মূষিক, গুটি গুটি পা ফেলে কোথায় যাচ্ছ? ঐ বড় গাছের তলায় আমার গর্তে এস। একসঙ্গে দুপুরবেলা ভূরিভোজন করব। আমার কাছে ভাল ভাল খাবার আছে। ধান, চাল, ডাল, গম, চিনে বাদাম, কাজু বাদাম, আম, কাঁঠাল, খেজুর….তুমি খেয়ে শেষ করতে পারবে না।’
মূষিকরতন বলল, ‘শিয়ালমশাই, তোমার মতো দয়া কারও নেই। কিন্তু আমি তো আজ খেতে পারব না। আমি আজ দুপুরবেলা খোক্কসের সঙ্গে খাব।’ শিয়াল তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘খোক্কস? খোক্কস আবার কে? আগে তো তার নাম শুনিনি!’
মূষিক বলল, ‘খোক্কস। তুমি কি তাকে চেন না? রাক্ষসের ভাই খোক্কস।’
শিয়াল বলল, ‘আমি খোক্কস টোক্কস চিনি না। আমি খালি খরগোসকে চিনি।’
শুনে মূষিক বলল, ‘খরগোসকে তো তুমি চিনবেই। তবে খোক্কসকে একবার দেখলে ভুলবে না।’ ‘তার মূলোর মতো দাঁত, কূলোর মতো কান, জালার মতো পেট।’
শিয়াল জানতে চাইল, ‘কোথায় খোক্কসের সঙ্গে দেখা করবে? তোমাকে কি খাওয়াবে?’ মূষিক বলল, ‘কাছেই। ঐ ঝোপের ধারে দেখা হবে। খোক্কস যা সবচেয়ে ভালবাসে তাই খাওয়াবে।’ শিয়াল জানত চাইল, ‘খোক্কস কী খেতে সবচেয়ে ভালবাসে?’
মূষিক বলল, ‘আগুনে ঝলসানো শিয়ালের মাংস খেতে ভীষণ ভালবাসে।’ একথা শুনে শিয়ালমশাই ‘ওরে বাব্বা’ বলে ল্যাজ গুটিয়ে এক দৌড়।
মূষিকরতন আপন মনে বলল, ‘বোকা বুদ্ধু শিয়াল। কিছুই জানে না। খোক্কস বলে কোন কিছু নেই।’
মূষিকরতন ঘন বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। একটা গোলগাল হুতুমপ্যাঁচা মূষিককে দেখতে পেয়ে ভাবল বেশ মোটাসোটা ছোট্ট ইঁদুর। গায়ে মাংস আছে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘ছোট্ট মূষিক, ছোট্ট মূষিক, গুটি গুটি পা ফেলে কোথায় যাচ্ছ? গাছের মগডালে আমার বাসায় একটু কেক বিস্কুট খেয়ে যাও। মিষ্টি কিসমিস আর চালকুমড়োর মোরব্বা দেওয়া কেক। কেকওয়ালার বাক্স থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে এসেছি।’
মূষিকরতন বলল, ‘প্যাঁচাদিদি, প্যাঁচাদিদি, তোমার মতো ভাল কেউ হয় না। কিন্তু আমি তো আজ খেতে পারব না। আমি তো এখন খোক্কসের সঙ্গে চা খেতে যাচ্ছি।’ প্যাঁচা তার ডানা দুটো ঝেড়ে বলল, ‘খোক্কস? খোক্কস আবার কে? আগে তো তার নাম শুনিনি!’
মূষিক বলল, ‘খোক্কস। তুমি কি তাকে চেন না? রাক্ষসের ভাই খোক্কস। তার গদার মতো পা আর ছাতার মতো হাত। নরুণের মতো ধারালো লম্বা নখ।’
পেঁচা জানতে চাইল, ‘কোথায় খোক্কসের সঙ্গে দেখা করবে? কী খাওয়াবে?’
মূষিক বলল, ‘কাছেই। ঐ নদীর ধারে দেখা হবে। খোক্কস যা সবচেয়ে ভালবাসে তাই খাওয়াবে।’
প্যাঁচা জিজ্ঞেস করল, ‘কি সবচেয়ে ভালবাসে?’ মূষিক উত্তর দিল, ‘মুচমুচে প্যাঁচার বড়া।’
একথা শুনে হুতুমপ্যাঁচা ‘ওরে বাব্বা’ বলে ডানা ঝাপটে ধর্ ফর্ করে উড়ে গেল। মোটাসোটা মূষিকরতন আপন মনে বলল, ‘বোকা বুদ্ধু প্যাঁচা। কিছুই জানে না। খোক্কস বলে কোন কিছু নেই।’
মূষিকরতন আবার বনের মধ্যে দিয়ে চলতে শুরু করল। এবার একটা গায়ে ছোপ ছোপ দাগকাটা গোখরো সাপ মূষিককে দেখতে পেল। সাপ মূষিককে দেখে ভাবল কি তেল চুকচুকে বাদামী রঙের ইঁদুর। মূষিকের কাছে গিয়ে বলল, ‘ছোট্ট মূষিক, ছোট্ট মূষিক, গুটি গুটি পা ফেলে কোথায় যাচ্ছ? কাঠগাদায় আমার বাড়িতে আজ মহা ভোজ হচ্ছে। আমার কাছে খেয়ে যাও।’
মূষিকরতন বলল, ‘গোখরোদাদা, গোখরোদাদা। তোমার মতো চমৎকার মন কারও নেই। কিন্তু আমি তো আজ খেতে পারব না। আমি তো এখন খোক্কসের সঙ্গে ভোজ খেতে যাচ্ছি।’ গোখরো তার ফনা তুলে বলল, ‘খোক্কস? খোক্কস আবার কে? আগে তো তার নাম শুনিনি!’
মূষিক বলল, ‘খোক্কস। তুমি কি তাকে চেন না? রাক্ষসের ভাই খোক্কস। তার ভাঁটার মতো লাল চোখ আর সাপের চেয়েও বড় লকলকে জিভ। সারা গায়ে ফণীমনসার কাঁটা।’
গোখরো জানতে চাইল, ‘কোথায় খোক্কসের সঙ্গে দেখা করবে? কী খাওয়াবে?’ মূষিক বলল, ‘কাঠগাদার কাছে পুকুরের ধারে দেখা হবে। খোক্কস যা সবচেয়ে ভালবাসে তাই খাওয়াবে।’ গোখরো জিজ্ঞেস করল, ‘কী খেতে সবচেয়ে ভালবাসে?’ মূষিক উত্তর দিল, ‘চাকা চাকা করে কাটা সাপের ঝোল।’
একথা শুনে গোখরো সাপ ‘ওরে বাব্বা’ বলে সরসর করে শুকনো পাতার মধ্যে মিলিয়ে গেল। তেল চুকচুকে মূষিকরতন আপন মনে বলল, ‘বোকা বুদ্ধু । গোখরো কিছুই জানে না। খোক্কস বলে কোন কিছু নেই।’
মূষিকরতন আবার এগিয়ে চলল। হঠাৎ সে দেখতে পেল বনের ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে আসছে। ‘ওরে বাব্বা’ বলে মূষিক দাঁড়িয়ে পড়ল।
ও কে আসছে? মূলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো কান, জালার মতো পেট। গদার মতো পা আর ছাতার মতো হাত। নরুণের মতো ধারালো লম্বা নখ। আবার তার ভাঁটার মতো লাল চোখ আর সাপের চেয়েও বড় লকলকে জিভ। সারা গায়ে ফণীমনসার কাঁটা।
মূষিকরতন ভয়ে সিঁটকে গেল, ‘এ যে দেখছি খোক্কস!’
মূষিকরতনকে দেখে খোক্কস মহা খুশি। এক গাল হেসে মূষিককে বলল, ‘আমার কী খেতে ইচ্ছে করছে তুমি শুনবে? দুটো পাঁউরুটির মধ্যে তোমাকে পুরে একটা ইয়া মোটা স্যান্ডউইচ খেতে খুব ইচ্ছে করছে। দারুণ ভাল লাগবে।’
মূষিকরতন বলল, ‘আমাকে খেতে ভাল লাগবে বল না। আমি একটুও ভাল খেতে না। আমি এই বনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জন্তু। আমার পেছন পেছন এস। একটু পরেই দেখবে আমাকে দেখে সবাই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।’
মূষিকের কথা শুনে খোক্কস হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি এগিয়ে চল। আমি তোমার পেছনে হাঁটছি।’
মূষিক আর খোক্কস হাঁটতে শুরু করল। ওরা হাঁটছে তো হাঁটছেই। খোক্কস বলল, ‘আমি শুকনো পাতার মধ্যে হিস হিস শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’
মূষিক বলল, ‘ওতো গোখরো সাপ হিস হিস করছে। হ্যালো, গোখরোদাদা, তোমার কী হয়েছে?’ গোখরো একবার খোক্কসকে মাথা থেকে পা অবধি দেখল আর বলল, ‘আমি চললাম ছোট্ট মূষিক।’ গোখরো সাপ সর সর করে কাঠগাদায় মিলিয়ে গেল।
মূষিকরতন খোক্কসকে বলল, ‘দেখলে তো আমি কী বলেছিলাম।?’
খোক্কস বলল, ‘অতি আশ্চর্য!’
ওরা আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর খোক্কস বলল, ‘আমি সামনের ঐ বড় গাছে হুতুম হুতুম শুনতে পাচ্ছি।’ মূষিক বলল, ‘ওতো হুতুম প্যাঁচা ডাকছে। হ্যালো প্যাঁচাদিদি, তোমার কী হয়েছে?’
হুতুম প্যাঁচা একবার খোক্কসকে মাথা থেকে পা অবধি দেখল আর বলল, ‘আমি চললাম ছোট্ট মূষিক।’ তারপর প্যাঁচা ডানা ঝটপট করে উড়ে গাছের মগডালে মিলিয়ে গেল।
মূষিকরতন খোক্কসকে বলল, ‘দেখলে তো আমি কী বলেছিলাম?’
খোক্কস বলল, ‘আমার মুখ দিয়ে কথা সরছে না!’
মূষিকরতন আর খোক্কস বনের মধ্যে আরো খানিকটা এগিয়ে গেল। খোক্কস এবার বলল, ‘সামনের পথ থেকে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’
মূষিক বলল, ‘ও তো খেঁকশিয়াল হাঁটছে। হ্যালো শেয়াল মশাই, তোমার কী হয়েছে?’
শিয়াল একবার খোক্কসকে মাথা থেকে পা অবধি দেখল আর বলল, ‘আমি চললাম ছোট্ট মূষিক।’ তারপর এক দৌড়ে তার গর্তে মিলিয়ে গেল। মূষিকরতন খোক্কসকে বলল, ‘দেখলে তো আমি কী বলেছিলাম।? সবাই আমাকে ভয় পায়। আমি হচ্ছি এই বনের রাজা।’ ‘অনেক বেলা হল। খিদেয় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে। আমি এখন কী খাব?’
তখন খোক্কস বলল, ‘তোমাকে আমি কী খেতে দেব? আমি তো তোমাকে নেমন্তন্ন করিনি!’
তারপর মূষিক গান ধরল,
‘তিন ইঞ্চি মূষিকরতন গভীর বনের রাজা,
আজ বিকেলে, গরম তেলে খাবে খোক্কস ভাজা।’
গান শুনে খোক্কস বাবাগো মাগো বলে দুমদাম করে তার গদার মতো পা ফেলে পালিয়ে গেল। মূষিকরতন তখন খাবারের খোঁজে হাঁটতে লাগল। যেতে যেতে কাঁঠালগাছের তলায় একটা শুকনো বিচি কুড়িয়ে পেল। মনের আনন্দে মূষিক বিচিটা চিবতে লাগল। গভীর বনে আর কোন শব্দ নেই। চারদিক চুপচাপ।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: গল্পটি ইংরেজ শিশু সাহিত্যিক জুলিয়া ডোনাল্ডসন লিখিত ‘দ্য গ্রাফলো’ অনুসরণ করে লেখা
অলঙ্করণঃ রাহুল মজুমদার
খুবই সুন্দর গল্পঃ , খুব ভালো লাগলো, ছোটবেলার কথা মনে পরে গেলো।