ধারাবাহিকের আগের এপিসোডগুলো

“তোমার পি এইচ ডির নির্দেশক হবার জন্য তিনজন বৈজ্ঞানিক দাবি জানিয়েছেন,” ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রধান জেমস উইলিয়াম হাতের ট্যাবলেটটার দিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়লেন, “আন্তর্গ্রহ প্লাজমা ড্রাইভ ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামের ধীরেন্দ্র বাজপেয়ী, ভুগর্ভ ফুঁড়ে চলা শব্দোত্তর আন্তর্মহাদেশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামের যশজিত হেনা এবং হ্যাঁ, পরীক্ষামূলক অতি আলোকগতি মডিউল প্রোগ্রামের ওয়াং হেন্স। এখন পছন্দটা তোমার ইয়ংম্যান। তোমার সৌভাগ্যকে আমি ঈর্ষা করি।”
“অতি আলোকগতি মডিউল?” সামনে বসা তরুণটির চোখে ঝলসে ওঠা আলোটা নজর এড়াল না জেমসের। ঠিক এইটেই তিনি আশা করছিলেন।
“কিন্তু এটা তো ডিফেন্স মিসাইল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের গবেষণাপ্রকল্প নয়?”
“ইয়ংম্যান, যশপাল শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণার কাজ করে না। এখানে আরো কিছু গবেষণাকেন্দ্র আছে। তার বিজ্ঞানীরাও কেউ কেউ তোমার কাজে উৎসাহী। যদিও তোমার আবেদনপত্র ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণাকেন্দ্রের জন্য পেয়েছি আমরা, তবু তুমি হেনস-এর কাছে কাজ করতে চাইলে আমি তা বিবেচনা করব।”
জেমসের হাতে ধরা ট্যাবলেটের পর্দাটার দিকে একনজর দেখে মাথা নাড়াল ক্রিস্টোফার। তারপর মাথা নীচু করেই বলল, “আমার নিজের পছন্দটা আমি জানাতে পারি কি?”
“আরে সেইটাই তো বলছি। এই তিনটে প্রোগ্রামের যেকোনটাতে সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কোনটা তুমি বেছে নেবে তা একেবারেই তোমার ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি আমরা। তবে যদি আমাদের উপদেশ চাও তাহলে বলব, অতি আলোকগতি মডিউল প্রোগ্রামে যাও তুমি। ওই পথেই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তোমার মত প্রতিভাকে আমরা চাইব—”
“আমারও তাই ইচ্ছা স্যার। কিন্তু—”
তার মুখের দিকে স্থির চোখে তাকালেন উইলিয়াম। ওয়াং তাঁর প্রিয় ছাত্র। ক্রিস্টোফারের মাস্টার্সের বিষয় ছিল বস্তু-প্রতিবস্তু জ্বালানির উন্নতিসাধন। এই বয়সেই সে এলাকায় সে আশ্চর্য প্রতিভার সাক্ষর রেখেছে। অতিমহাকাশ গবেষণায় এই জ্বালানির প্রয়োগেই একমাত্র সাফল্য পাওয়া যে সম্ভব সে কথা ওয়াং তাঁকে বহু আলোচনাতেই বলেছেন। সেটা জানতেন বলেই কিছুদিন আগে এ বিষয়ে ক্রিস্টোফারের স্টুডেন্ট রিসার্চ প্রোগ্রামের কাজগুলো দেখে উইলিয়াম তাকে এখানে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন।
একজন ভালো ছাত্রকে নজের গবেষণা প্রোগ্রামে নেবার জন্য কাড়াকাড়ি থাকেই। সেখানে ওয়াং এর প্রতি পক্ষপাতিত্ব সামনাসামনি দেখানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবু তাঁর বিশ্বাস ছিল ইনটারভিউ বোর্ডে ক্রিস্টোফার ওয়াং এর অফারটাই নেবে। তার কাজের সরাসরি প্রয়োগ সেখানেই সম্ভব। এখন এই ছোটো কিন্তুটা হঠাৎ তাঁর ভ্রূতে কুঞ্চন জাগিয়ে তুলেছে।
“কিন্তু—কী?”
দ্রুত চিন্তা করছিল ক্রিস্টোফার। টাইকোর কাল রাত্রের কথাগুলো তার কানে বাজছে এখনো। বাবা কোথায় কী শুনেছেন তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে তার সন্দেহ আছে যথেষ্ট। কিন্তু তাঁর ইচ্ছেটাকে মর্যাদা না দিলে তিনি দুঃখ পাবেন। সেটা তার কাছে সবার ওপরে। জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা স্মৃতিভোলা অনাথ ছেলেকে এতদূরে তুলে এনেছেন তিনি। বারংবার বলেন, “আমার পেশায় সারাটা জীবন চোরপুলিশ খেলে গেলাম। আমার ছেলে তা করবে না। সে সবার সেরা বিজ্ঞানী হবে।” তাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন।
একটু বাদে সে মুখ তুলল সে। মনস্থির করে নিয়েছে ক্রিস্টোফার। একবার শুধু বাবা আর টাইকোর ইচ্ছেটাকে পূরণ করে দেয়া। তারপর সে তার নিজের স্বপ্নের কাজে যাবে। কেন বাবা বুদ্ধর বিশ্লেষণ অনুযায়ী সুইফট টাটলের গতিপথ আর উপগ্রহ নজরদারির মূল তথ্যকে মিলিয়ে দেখতে চাইছে সে জানে না। টাইকোরও বক্তব্য সেখানে আশ্চর্য কিছু পাওয়া যাবে। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী আর একটা যন্ত্রমস্তিষ্কের এহেন শখের কথা শুনলে তা এই বিজ্ঞানিদের হাসির খোরাক হবে। নিজের পালকপিতা এবং প্রথম শিক্ষককে সবার সামনে হাস্যাস্পদ হতে দিতে সে চায় না। আসল কথাটা বলা যাবে না এখানে।
“আমাকে একটা ছোট প্রজেক্টের কাজ শেষ করে নেবার অনুমতি দেবেন স্যার?”
“খুলে বল।”
“বস্তু-প্রতিবিস্তু জ্বালানি নিয়ে আমার মূল গবেষণা। ড ওয়াং এর কাছে সেইটাই আমার প্রধান কাজ হবে। কিন্তু এর সঙ্গে প্লাজমা জ্বালানির মিশ্র এঞ্জিন অনেক বেশি কার্যকর হবে বলে আমার ধারণা। মূল কাজে যাবার আগে আমি তাই প্লাজমা জ্বালানির বিষয়ে ড ধীরেন্দ্র বাজপেয়ীর কাছে কিছু কাজ করতে চাই।”
“ইমপসিবল। এই দুই জ্বালানি সম্পূর্ণ দু রকম। এদের কোন মিশ্রিত ব্যবহার-”
“সেইটা খুঁজে দেখবার জন্যই আমার গবেষণা হবে স্যার। প্লাজমা জ্বালানীর বিষয়ে ডক্টর বাজপেয়ী পৃথিবীতে এক নম্বর। তাই-”
“অর্থাৎ তুমি বাজপেয়ীর আন্তর্গ্রহ ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামে যোগ দিতে চাইছ।”
“হ্যাঁ স্যার। এ প্রজেক্টটা করে নেবার পর ডক্টর ওয়াং এর প্রজেক্টে যোগ দিলে কাজটা আমি আরো ভালোভাবে করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।”
খানিকক্ষণ চুপ করে অবাধ্য ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন উইলিয়াম। দুঃসাহস বটে। প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ইচ্ছেকে এত অবলীলায় উড়িয়ে দিল। রাগ হচ্ছিল তাঁর। আবার মজাও লাগছিল । দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, অনুগত ভালো ছাত্রেরা চিরকাল মাঝারি মাপের কাজেই আটকে থাকে। সীমা ভাঙা দুঃসাহসী কাজ করতে পারে একমাত্র এই দুঃসাহসী তরুণরাই।
নিজের মনের ভাবটা চেপে রেখে মাথা নাড়লেন তিনি, “বেশ। আমার এতে সম্মতি আছে। বেস্ট অব লাক ইয়ংম্যান। যশপালে স্বাগত।”
********
“হাই ক্রিস।”
এলেনার হাসিমুখটা কমিউনিকেটরের পর্দায় ফুটে উঠেছে। উক্রেইনের মেয়ে। সতের বছর বয়সে পিএইচডি করেছিল ডিপ স্পেস ন্যাভিগেশনে।
সামনে ‘বুদ্ধ’র টার্মিনালে ভেসে চলা সংখ্যার স্রোতগুলোর থেকে চোখ ঘোরাল ক্রিস্টোফার। গত এক বছর ধরে তিলতিল করে জোগাড় করা সমস্ত তথ্যকে একত্র করে এইবার শেষ গণনার প্রোগ্রামটা চালু হয়েছে। অমিত শক্তিশালী কমপিউটার তার নির্দেশ মেনে হাজারো টেরাবাইট তথ্যকে একে অন্যের সঙ্গে মিলিয়ে গড়ে তুলছে একটা সুদৃশ্য নকশা। যন্ত্রের কাজ শেষ হবার আগে তার বিশেষ কিছু করবার নেই। কমিউনিকেটরের দিকে চোখ ঘুরিয়ে সে বলল, “বল।”
“ঘড়ির দিকে দেখ।”
“দেখবার দরকার নেই। আমি জানি। সন্ধে নটা।”
“আজ কমিউনিটি হল-এ সাপ্তাহিক খাওয়াদাওয়া আছে। মনে আছে তো?”
ক্রিস্টোফার কিবোর্ড থেকে পর্দার দিকে মুখ তুলে হাসল, “মনে আছে। কিন্তু আজ আমি আমি যে যেতে পারছি না এলেনা!”
“ওসব বললে শুনছি না। আজ তোমাকে আসতেই হবে। একটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য।”
“সারপ্রাইজ? মানে?”
“আজকের তারিখটা দেখ একবার। ২২ আগস্ট ২১২৫। কিছু মনে পড়ছে? হ্যাপি বার্থ ডে ক্রিস।”
মৃদু হাসল ক্রিস্টোফার। এলেনা তার গল্পটা জানে না। এ প্রতিষ্ঠানের কেউই তা জানে না। কা পোনের তৈরি করে দেয়া জন্মদিনটাই এখন—”
“ক্রিস! ওঠ বলছি!”
পর্দার বুকে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠা নকশাটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল ক্রিস্টোফার। লাল রঙের একটা রেখা গড়ে উঠছে সেখানে ধীরে ধীরে। গভীর মহাকাশ থেকে উঠে এসে তা সরাসরি এগিয়ে চলেছে পৃথিবীর দিকে। এখনো তা ঠিক কোনখানে গিয়ে শেষ হবে বোঝা যায় না। যন্ত্রের গণনা শেষ হয়নি। কী মনে হতে হঠাৎ সে আরো কিছু কম্যান্ড দিল কিবোর্ডের বুকে। একই উৎস থেকে উঠে আসা একটা নীল রঙের রেখা এইবার দ্রুত এগিয়ে এল লাল রেখাটার পাশাপাশি। তারপর মঙ্গল পেরিয়ে আস্তে আস্তে তা লাল রেখার পথ ছেড়ে সরে গিয়ে, পৃথিবীর কিছু দূর দিয়ে উধাও হল মহাকাশের গভীরে।
“এবার কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি ক্রিস,” কমিউনিকেটরে এলেনার অধৈর্য গলা ভেসে এল ফের।
“এই যাই,” হাসিমুখে বলে উঠল ক্রিস। কা পোনের সন্দেহটা আরো বাস্তব ঠেকছে এখন। কিন্তু একজন বৈজ্ঞানিক অনুমানের ভিত্তিতে কোন কাজ করতে পারেন না। গণনার কাজটা আগে শেষ করতে দিতে হবে বুদ্ধকে। অর্থাৎ আরো ঘন্টাদুয়েকের ধাক্কা। সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে—
“তবে ঠিক দুঘন্টার বেশি থাকব না বলে রাখছি আগে থেকেই। ততক্ষণে ডেটা প্রসেসিং শেষ করে রাখবে বুদ্ধ। ফিরে এসে রেজাল্টগুলো—”
“জানি জানি। এখন এস তো।”
ডেটা সেন্টারের বাইরের স্কাইওয়াকের ঠিক সামনেটায় এলেনা দাঁড়িয়েছিল। ক্রিস্টোফারকে বেরিয়ে আসতে দেখে একগাল হাসল, “চল। সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।”
এ স্কাইওয়াকটা নতুন। গবেষণাকেন্দ্রের উঁচু বাড়িগুলোর মাথা ছাড়িয়ে সটান উঠে গেছে ওপরের দিকে। একপাশ দিয়ে চলমান এসকালেটারটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল ক্রিস্টোফার। তারপর এলেনার হাতটা ধরে বলল, “উঁহু। হেঁটে যাব। ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাঁটতে ভালো লাগছে বেশ।”
“সে চল। কিন্তু একটা প্রশ্ন করব?”
“হুম।”
ডক্টর বাজপেয়ী পরশুদিন আমার রিভিউয়ের সময় কথায় কথায় তোমার কথা বলছিলেন। তুমি নিজের প্রজেক্টের রিসার্চ টাইমে অন্য কোন পার্সোনাল প্রজেক্ট নিয়ে বেশি ব্যস্ত বলে বিরক্তি দেখাচ্ছিলেন। কথাটা কি সত্যি?”
চুপ করে হাঁটছিল ক্রিস্টোফার। কথাটা সত্যি। কিন্তু সে কথা একে বলে লাভ নেই কিছু। বিশ্বাস করবে না। কেউই বিশ্বাস করবে না তার কথা এখনও। সে নিজেও পুরোপুরি বিশ্বাস করে না নিজেকে। যখন শুরু করেছিল তখন কাজটা যে এত লম্বা হয়ে উঠবে তা তার আন্দাজ ছিল না। বুনো হাঁসের খোঁজে সময়টা নষ্ট করল না তো সে? কিন্তু প্রাথমিক গণনাগুলো যে হদিশ দিতে শুরু করেছে তাতে–
“তোমার নিজের প্রজেক্ট রিভিউ তো পরশুদিন। তার জন্য তৈরি হয়েছ কি?”
স্কাইওয়াকের মুখটা এইবারে নীচু হয়ে এগিয়ে গিয়েছে কমিউনিটি হলের আলোজ্বলা দরজার দিকে। সেখান থেকে লোকজনের মৃদু গুণগুণ ভেসে আসছিল। সেইদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ক্রিস্টোফার। প্লাজমা ড্রাইভের সঙ্গে প্রতিবস্তু ইঞ্জিনের হাইব্রিড তৈরির প্রস্তাব! সেটা যে সম্ভব নয় তা সে গোড়া থেকেই জানে। আগামী পরশুর রিভিউতে সে নিজের প্রজেক্ট নিয়ে কী বলবে তা সে এখনো জানে না। গত একটা বছর ধরে সে কাজের বিশেষ কিছুই এগোয়নি তার। দিনরাত এক করে সে কা পোনের সন্দেহের বিষয়ে তথ্য একত্র করে গিয়েছে। আজকের রাতটা গুরুত্বপূর্ণ। কী রায় দেবে বুদ্ধ তার সব তথ্যকে বিশ্লেষণ করে?
ক্রমশ