ধারাবাহিক উপন্যাস অন্তিম অভিযান পিটার বিশ্বাস বর্ষা ২০১৮

আগের পর্বগুলো

“আর চারদিন, তাই না এলেনা?”

ইনসটিটিউটের এই দিকটা ভারী নির্জন। সাধারণত এখান থেকে রাতের এই সময়টায় ক্যাম্পাসের কিছুদূর দিয়ে বয়ে যাওয়া নয়াদিল্লি-ভোপাল এয়ার-ওয়েতে ব্যস্ততার সীমা থাকে না। এখন তা একেবারে নির্জন। একটা উড়ন্ত ইঞ্জিনের শব্দও তার নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে না।

এলেনা জবাব দিল না কোন। আকাশের দিকে চোখদুটো তুলে ধরে পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে বসে ছিল সে। সেখানে মধ্যরাতের অন্ধকারে জ্বলন্ত একটা চোখের মত স্থির হয়ে আছে  আলোর একটা টুকরো। এলেনা জানে এই মুহূর্তে তা আসলে স্থির নয়। বিদ্যুৎগতিতে মহাশূন্য সাঁতরে ষোলো মাইল ব্যাসার্ধের ওই মৃত্যুদূত এখন ছুটে আসছে তার লক্ষ্যের দিকে।

ডি-১২২ এর আক্রমণ বস্তুটার গতিমুখকে বদলে দিয়েছিল বইকি। তবে যেটুকু বদল তা আনতে পেরেছিল তাতে তার আঘাতবিন্দু পৃথিবীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে গিয়ে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের দিকে ঘুরে গিয়েছে।

কেঁদে ফেলেছিল এলেনা। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিল পাশে দাঁড়ানো ক্রিস্টোফারের কাঁধে মুখটা রেখে।

আগস্টের এক তারিখে উৎক্ষেপণের পর, মঙ্গলের কাছাকাছি গভীর মহাকাশে পৃথিবীর শেষ আশা, ডি-১২২ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সুইফট টাটলের সংঘর্ষের ছবি দেখে পৃথিবী জুড়ে নতুন আশার ঢেউ জেগেছিল। কিন্তু তার তিনদিন পরে, এই ঘরে দাঁড়িয়েই ঐ সর্বনাশা ধূমকেতুর বদলে যাওয়া গতিপথের যাবতীয় টেলিমেট্রির বিশ্লেষণ শেষ হতে পর্দায় যখন তার ফলাফল ভেসে ওঠে তখন নিজেকে আর সামলাতে পারেনি সে।

ক্রিস্টোফার একটা কথাও বলেনি। কোনো সান্ত্বনা দেয়নি সে তাকে। শুধু হাতে ধরা কমিউনিকেটোরের পর্দায় একটা নির্দিষ্ট ছবির গায়ে মৃদু চাপ দিয়েছিল শুধু। কোড-এক্স। প্রজেক্ট এক্সোডাসের সূচনা সঙ্কেত।

পৃথিবীর জনসংখ্যা গত এক শতাব্দিতে অনেকটাই কমে এসেছে। তবু প্রায় পাঁচশো কোটি মানুষের মধ্যে মাত্রই কয়েক মিলিয়নকে এ গ্রহের বুক থেকে সরিয়ে বিভিন্ন মহাকাশ আশ্রয় আর চাঁদ ও মঙ্গলের উপনিবেশে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে গত এক বছরে।

সরকারি বেসরকারি সমস্ত মহাকাশে যাবার যোগ্য যানকেই অধিগ্রহণ করা হয়েছে এর জন্য। হয়ত সে-কাজে বাদ যায়নি কা-পোনের মালবাহী যানও। তবে সে-খবর ক্রিস্টোফার সঠিক জানে না। বছরখানেক আগে মঙ্গল উপনিবেশের সৈন্যদের হাতে তার ধরা পড়ে ছাড়া পাবার পর থেকে কোনো অজ্ঞাত কারণে তার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।

প্রজেক্ট এক্সোডাসের উদ্দেশ্য অন্য ছিল। ক্রিস্টোফারের কমিউনিকেটরের সংকেত ভেসে গিয়ে বুদ্ধ-এর একটা নির্দিষ্ট প্রোগ্রামকে চালু করে দিয়েছে এবারে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তা সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে গিয়ে পরবর্তী ব্যাচের সমস্ত সাধারণ যাত্রীর মহাকাশযাত্রার অনুমতি বাতিল করে দিয়েছে। তার বদলে খবর পৌঁছে গেছে আগে থেকে তৈরি করে রাখা একটা বিশেষ তালিকার মানুষের কাছে। এ-গ্রহের সমস্ত সেরা শিল্পী, বৈজ্ঞানিক, দেশনেতা এবং সেনাবাহিনীর বাছাই যোদ্ধাদের তৈরি হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্তটা আগে থেকেই নেয়া হয়েছিল। ডি-১২২ ব্যর্থ হলে, শেষ আঘাতের আগে দশ দিনের মধ্যে এ-গ্রহের শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে যে-কোনো মূল্যে। বন্যার মুখে দাঁড়িয়ে ক্ষেতের ফসলের বদলে সঞ্চয়ের সেরা বীজগুলোকে রক্ষা করবার মত। সেখানে করুণা বা দয়ার কোনো স্থান নেই।

প্রজেক্ট এক্সোডাস চালু হবার পর সেই নিয়ন্ত্রণকক্ষে দাঁড়িয়ে তার হাজারো পর্দায় এরপর থেকে তারা দেখেছে, পৃথিবীর প্রত্যেকটা উৎক্ষেপণকেন্দ্রের সামনে অসহায় সাধারণ মানুষের আকুতি। দেখেছে কোথাও কোথাও বিদ্রোহী মানুষজনের আক্রমণকে সামাল দিতে সেনাবাহিনীর ছোঁড়া ঘুমপাড়ানি গ্যাসের আক্রমণে জ্ঞান হারানো লক্ষ লক্ষ মানুষের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবার দৃশ্যকে। দেখেছে, পৃথিবীর প্রত্যেকটা ভুখণ্ডে মাটির তলায় ছড়িয়ে থাকা পাতালযোগাযোগের সুরঙ্গের জালের ভেতর অসংখ্য অসহায় মানুষের ইঁদুরের মত আত্মগোপণ করে বাঁচবার শেষ চেষ্টাকে।  

হঠাৎ চোখের জল মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়াল এলেনা। তারপর ক্রিস্টোফারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “চলো। সময় হয়েছে।”

“হ্যাঁ। চলো।”

উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ র‍্যাম্প বেয়ে তারা নেমে আসছিল ইনস্টিটিউটের নিজস্ব উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের দিকে। সেখান দাঁড়িয়ে থাকা ভোঁতা চেহারার যানটা এবার ইনস্টিটিউটের বাকি সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘ একটা যাত্রার শেষে পৌঁছে যাবে মঙ্গল উপনিবেশের নিরাপদ আশ্রয়ে।

মহাকাশযানের খোলা সিঁড়ির মুখে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে এলেনাকে তুলে আনতে গিয়ে হঠাৎ একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল ক্রিস্টোফার। তার পকেটের মধ্যে রাখা কমিউনিকেটরটা হঠাৎ মৃদু কেঁপে উঠেছে একবার। এই সময়ে, কে…

তাড়াতাড়ি থমকে দাঁড়িয়ে কমিউনিকেটরটা বের করে আনল ক্রিস্টোফার। হাতে টান পড়তে এলেনাও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার কৌতুহলী চোখ ক্রিস্টোফারের কমিউনিকেটরের দিকে ধরে। সেখানে তখন একটা শূন্য আর এক-এর একটা দীর্ঘ সারি ভেসে উঠেছে।

এলেনার দৃষ্টিতে সে সংখ্যার সারির কোনো অর্থ ছিল না। কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ক্রিস্টোফারের শরীরটা শক্ত হয়ে উঠল। সিঁড়ি তুলে আনা হয়েছে ততক্ষণে। এসে আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছিল যানের দরজা। অটোপাইলট জেগে উঠেছে যানের। পৃথিবীর আকর্ষণকে কাটিয়ে নিরাপদে যানকে কক্ষে পৌঁছে দেয়া একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সে-কাজে এখন মানুষ আর নিজের দক্ষতায় বিশ্বাস রাখে না।

কমপিউটারের যান্ত্রিক গলার গণনা তখন আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছিল শূন্যের দিকে। হঠাৎ একটা ঝটকা দিয়ে এলেনার হাত ছাড়িয়ে বন্ধ হয়ে আসতে থাকা দরজাটার এগিয়ে গেল ক্রিস্টোফার।

যেন তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়েই আগামী ঘটনাটার একটা আভাস পেয়েছিল এলেনা। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে সে চেপে ধরেছে ক্রিস্টোফারকে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠেছে, “ক্রিস না… কেউ সাহায্য করুন…”

ভেতরের করিডোর থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল দুজন অস্ত্রধারী প্রহরী। একমুহূর্তের জন্য সেদিকে ঘুরে তাকাল ক্রিস্টোফার। এলেনার বজ্র আলিঙ্গন ছাড়িয়ে নেবার সময় নেই আর। যা করবার এখনই করতে হবে। হঠাৎ এলেনাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে গড়িয়ে গিয়ে দরজার ফাঁকটুকু দিয়ে ছিটকে গেল সে অনেকটা নীচে উৎক্ষেপণক্ষেত্রের জমির দিকে।

তীব্র হাওয়ার একটা ধাক্কা প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তাদের জমি থেকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিল অনেকটা দূরত্বে। উৎক্ষেপণের আগে যান থেকে ছড়িয়ে দেয়া ঘনীভূত বাতাসের এই ঝড় প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চালু আছে। একটা নিরাপত্তামূলক বন্দোবস্ত। উদ্দেশ্য, ইঞ্জিন চালু হবার সময় তার আশপাশের শ-দুয়েক মিটার ব্যাসার্ধের একটা এলাকাকে একেবারে ফাঁকা করে নেয়া। প্রযুক্তিটা আসবার আগে, প্লাজমার তীব্র বিচ্ছুরণ ফেলে যাওয়া কোন বস্তু বা অসতর্ক গ্রাউন্ড স্টাফকে মুহূর্তে জ্বালিয়ে দিয়ে বহুবারই মর্মান্তিক কিছু দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বিভিন্ন

মাটিতে আছড়ে পড়ে দূর থেকে তারা দেখেছিল যানের পেছন থেকে হঠাৎ ছিটকে আসা উত্তপ্ত প্লাজমার ধারা। তার ধাক্কায় ধীরে ধীরে মাটি ছেড়ে আকাশের দিকে মুখ বাড়াল সুবিশাল আন্তর্গ্রহ যান। তারপর গতি বাড়িয়ে ধেয়ে গেল বায়ুমণ্ডলের বাধা পেরিয়ে।

এলেনার হাত ধরে পাশের জনশূন্য হ্যাঙারটার দিকে ছুটতেছুটতেই তীব্র উত্তপ্ত প্লাজমার ঝড়ে তাদের চোখমুখ ঝলসে যাচ্ছিল। হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে রেখে এলেনা হঠাৎ বলল, “তুমি উন্মাদ। এভাবে নিজের জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া…”

“ভুল এলেনা। আমি পাগল নই।” মাথা নাড়ল ক্রিস্টোফার, “হঠাৎ একটা আশা…”

“তার মানে?”

হাতের কমিউনিকেটরটা তার দিকে তুলে ধরল ক্রিস এবারে, “এর অর্থ জানো?”

ছুটতেছুটতেই সেদিকে তাকিয়ে দেখল একবার এলেনা। তারপর মাথা নাড়ল।

“স্বাভাবিক। চোরাচালানকারীদের নিজস্ব কোড ল্যাঙ্গুয়েজ তোমার জানবার কথা নয়। একটা বিশেষ শ্রেণীর অক্টাডেসিমেল কোডিং।”

“তুমি…”

সুদীর্ঘ সংখ্যার সারিটাকে দ্রুত পড়তেপড়তেই মাথা নাড়ল ক্রিস, “আমি নই। আমার বাবা, কা পোন চি। এই প্রথম সারিটা বাবার নামের তিনটে শুরুর অক্ষরকে বোঝাচ্ছে। তার সঙ্গে কয়েকটা শব্দ, লাফাও। লুকোও। দ্রুত।”

“তোমার বাবা…চোরাচালানকারীদের ভাষা…”

হ্যাঙারের অন্ধকার গহ্বরটার ভেতরে ততক্ষণে পৌঁছে গেছে তারা। তার দেয়ালের সুইচবোর্ডে দরজাটা বন্ধ করবার বোতামটায় চাপ দিতেদিতেই ক্রিস বলল, “সে অনেক লম্বা কাহিনী এলেনা। শুধু একটা কথা জেনে রেখো, কা পোন চি বিনা কারণে কোনো নির্দেশ দেন না।”

“কিন্তু এরকম একটা আদেশ…”

হ্যাঙারের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। সঙ্গেসঙ্গেই একটা মৃদু, মরাটে আলো জ্বলে উঠেছে তার ভেতরে। সেই আলোয় তাদের লম্বা লম্বা ছায়াগুলো অশরীরির মত ছাদের গা থেকে ঝুঁকে থাকে। সেইদিকে চোখ ধরে রেখে ক্রিস বলল, “কারণটা আমি জানি না। তবে নির্দেশ পাঠাবার সময় নির্বাচনটা বলছে, তিনি কোথাও থেকে নজর রেখেছেন আমাদের গতিবিধির ওপর। আর, কাউকে তিনি বোঝাতে চান, আমরা ওই যানে করে রওনা হয়ে গেছি ইনস্টিটিউটের সমস্ত বিজ্ঞানীর সঙ্গে।”

“বুঝিয়ে বলো ক্রিস। তোমার কথার পেছনে কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না আমি।”

“বলছি। ইনস্টিটিউটের সমস্ত বিজ্ঞানী যানে ওঠবার পর তার অটোপাইলট চালু হয়েছে। সে-খবর যানের কমপিউটার আন্তর্জাতিক আইন মেনে সম্প্রচার করে দিয়েছে সমস্ত কম্পাঙ্কে। অর্থাৎ এর ওপর কোনো নজরদারী চালু থাকলে নজরদার নিশ্চিত হবে যে আমরা সকলেই যানে উঠেছি।

“এরপর একেবারে শেষমুহূর্তে লাফ দেবার পরেই যানের প্লাজমার জ্বালানির ঝড় মহাকাশ থেকে যেকোনো ইলেকট্রনিক নজরদার যন্ত্রের চোখে একটা অস্বচ্ছ আবরণ গড়ে দেবে কয়েকমিনিটের জন্য। সেই সময়টুকুর সুযোগ নিয়ে বাবা আমাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে যাবার নির্দেশ পাঠিয়েছেন একেবারে শেষমুহূর্তে।

“কিন্তু কেন?”

“বোধ হয় এখন তা অনুমান করতে কোনো সমস্যা হবে না এলেনা। আকাশের দিকে দেখ,” বলতেবলতেই হঠাৎ কাঁপা কাঁপা আঙুলে হ্যাঙারের পোর্টহোল দিয়ে উঁকি মারা আকাশের দিকে দেখাল ক্রিস। সেখানে, স্থির হয়ে ভাসতে থাকা সুইফট টাটলের আগুনের গোলার আলোয় কোনো তারা চোখে পড়ে না আর। কিন্তু সেই উজ্জ্বল আলোর বুকেও হঠাৎ করেই তখন জেগে উঠেছে একটা উজ্জ্বলতর আলোর ঝরণা। এক মুহূর্তের জন্য চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যে জ্বলে উঠে তার আগুনের ফুলকিগুলো ফের ধেয়ে আসছিল পৃথিবীর দিকে।

“সবাই শেষ হয়ে গেছে এলেনা। কক্ষপথে পৌঁছোবার আগেই কোন চোরা আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছে যানটা। এর যাত্রীদের মধ্যে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই…”

এর কিছুক্ষণ বাদে, নয় আলোকমিনিট দূরত্বে অন্ধকার শূন্যে ভাসমান দুটো কার্বণ গ্রহাণুর বুকে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার যানদুটোর একটাতে একটা উত্তেজিত শব্দ জেগে উঠল। টেবিলে হাতের আঘাত করে উঠে দাঁড়িয়েছেন অ্যাডমিরাল লালপিওতে। সেখানে তখন ভেসে উঠেছে কমাণ্ডার জালালের মুখ। তার পাশে, ছুটন্ত যানের জানালা দিয়ে ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছিল পৃথিবীর আবহমণ্ডল ছেড়ে উঠে আসতে থাকা ভোঁতা চেহারার একটা অতিকায় যান। সরাসরি তার দিকে নিজের আত্মঘাতী যানের মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটে চলেছেন তিনি। ইশারায় সেদিকে দেখিয়ে জালাল বলে উঠলেন, “মিশন…”

তাঁর কথাটা শেষ হবার আগেই হঠাৎ তীব্র আগুনের একটা ঝলক পর্দা জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েই অন্ধকার হয়ে গেল পর্দাটা।  হাতটা নিজের অজান্তেই একবার কপালে উঠল লালপিওতের। মঙ্গল উপনিবেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে আত্মঘাতী সৈনিক জালাল আর তার দলের সম্মানার্থেই সম্ভবত। ক্রিস্টোফার সহ ইনস্টিটিউটের সমস্ত বিজ্ঞানীকে নিয়ে মঙ্গলযানের রওনা হবার পরিকল্পনার খবর তাঁর কাছে আসবার পর থেকে এই মুহূর্তটার জন্যই চাঁদের পেছনে কয়েকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল জালালের আত্মঘাতী যান।

ঐ ক্রিস্টোফার যদি লালপিওতের কাছে অজানা কোন রহস্যকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে পাড়ি দেবার চেষ্টা করেও থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে তার ছাই ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর কক্ষপথ জুড়ে। কিছু নিরীহ মানুষও মারা গেল সঙ্গে এই যা। তবে সে-নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই লালপিওতের। এটা যুদ্ধ। এখানে ন্যায়নীতির কোন ভূমিকা নেই।

“আরো একবার!”

হঠাৎ পাশে বসা জেমস আরিয়ানার গলাটা পেয়ে তাঁর দিকে ঘুরে দেখলেন লালপিওতে। জেমসের চোখদুটো দ্বিতীয় একটা পর্দার দিকে স্থির হয়ে রয়েছে তখন। সমস্ত পার্থিব বেতার সম্প্রচারের ওপর নজরদারি করবার পর্দাটায় অজস্র তথ্য ভেসে চলেছে তখন। অলসভাবে সেদিকে একবার ঘুরে তাকালেন লালপিওতে। ও তথ্যে আর কোন আগ্রহ বেঁচে নেই তাঁর এখন। মিশন সাফল্যের গড়ায় এসে পৌঁছেছে এবার। আর কোন বাধা নেই সামনে। শেষ একটা বাধার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, প্রফেসর ওসের ওই শয়তান ছেলেটাকে শেষ করবার পর সেটুকুও সরে গেছে।   

পর্দার দিকে চোখ ধরে রেখে আরিয়ানার ভ্রূদুটো কুঁচকে রয়েছে তখন। লালপিওতে সেদিকে ঘুরে তাকাতে আঙুলের ইশারায় অন্য তথ্যগুলোকে মুছে দিয়ে দুটো সংখ্যার সারিকে সামনে টেনে এনেছেন তিনি সেখানে।

“একটা ছোট্ট ধাঁধা অ্যাডমিরাল। যানটা উৎক্ষেপণের ঠিক আগের মুহূর্তে পৃথিবীর আয়নমণ্ডল থেকে একটা বেতারসঙ্কেত তার দিকে ভেসে গিয়েছিল। তার কয়েকমিনিট বাদে ফের এই দ্বিতীয় সঙ্কেতটা।”

সংখ্যাগুলোর দিকে একনজর তাকিয়ে দেখলেন লালপিওতে। একেবারেই এলোমেলো। পরিচিত কোন কোডের সঙ্গে তার মিল নেই কোনো।

“গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হচ্ছে না জেমস। সম্ভবত আয়নমণ্ডলে কোনো বৈদ্যুতিক ক্ষরণ বেতার তরঙ্গটার জন্ম দিয়েছে। যন্ত্রগণ তাকে সংখ্যার চেহারা দিতে তাই অর্থহীন সংখ্যাগুলোর জন্ম হয়েছে। তবে গ্রোভারকে পাঠাও। বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেলে যেন আমাকে জানায়।”

বলতেবলতেই নিজের পর্দায় সুইফট টাটলের টেলিমেট্রির দিকে নজর ঘোরালেন লালপিওতে। একপাশে চালু একটা কাউন্ট ডাউন ঘড়ি দেখাচ্ছিল, আর ছিয়ানব্বই ঘন্টা…

*****

সেখান থেকে অনেক দূরে পৃথিবীর বুকে একটা অন্ধকার হ্যাঙারের ভেতরেও পৌঁছেছিল দ্বিতীয় সংকেতটা। আকে অনুবাদ করে নিয়ে এলেনার মুখের দিকে একটু বিস্ময়ের চোখে তাকিয়েছিল ক্রিস্টোফার, “তাবিজে স্মৃতি পান করো…”

“এর মানে কী? তাবিজ…আমি কিছু…”

“ক্রিস!” হঠাৎ এলেনার উত্তেজিত গলাটা তাকে থামিয়ে দিল। তার একটা হাত তখন ক্রিস্টোফারের গলার কাছে উঠে এসে টান দিয়ে খুলে এনেছে সেখানে ঝোলানো ধাতুর তাবিজটা। সেটাকে হাতে ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল সে।

তার হাত থেকে তাবিজটা নিজের হাতে নিল ক্রিস। দীর্ঘদিন ধরে গলায় পরে থাকতে থাকতে একটা অভ্যাসের মতই দাঁড়িয়ে গেছে তার জিনিসটাতে। হঠাৎ করে তার আলাদা অস্তিত্ত্বের কথা তার মাথায় আসে না।

“এটা… এটা কোথা থেকে পেয়েছিলে তুমি?”

“জানি না এলেনা। তোমাকে তো আমি আমার পরিচয় সমস্তই খুলে বলেছি। যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে জঙ্গলের ভেতরে তখন থেকেই দেখেছি এটা আমার গলায় পরানো।খুলে ফেলতে গিয়েছিলাম। কা-পোন মানা করেছিলেন। বলেছিলেন, হয়ত ওই আমার আসল জীবনের একমাত্র স্মৃতি। ব্যাপারটা সেন্টিমেন্টারল, কিন্তু তবু কখনো প্রাণে ধরে ওটাকে খুলে ফেলতে পারিনি আমি। কিন্তু কা-পোনের এই মেসেজটা…”

হঠাৎ নিজের ব্যাকপ্যাকটা থেকে বের করে আনা ধাতব দণ্ডোটার গায়ের একটা বোতামে চাপ দিল এলেনা। তার মাথায় একটা সরু লেজার কাটারের আলো জ্বলে উঠেছে।

“মাটিতে রাখো ওটাকে। সুক্ষ্ম কাজ। সাবধানে করতে হবে। তোমার কাজ নয় এ। আমাকে করতে দাও।”

প্রায় মিনিটকয়েকের চেষ্টায় শিল্পীর দক্ষতায় একটু একটু করে তাবিজটার মাথাটাকে কেটে ফেলে ছুরির আলোটা বন্ধ করল এলেনা। তারপর সেটাকে উল্ট কতে হাতের তেলোয় সামান্য ঠুকে তার ভেতর থেকে স্ফটিকের চ্যাপ্টা, ছোট্ট শিশিটা বের করে এনে ক্রিস্টোফারের হাতে তুলে দিল সে।

শিশিটার মধ্যে জমে থাকা ঘন গোলাপি তরলটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ক্রিস্টোফার।

“স্মৃতি পান করো…তাহলে কী…”

“না ক্রিস। একটা অজানা রাসায়নিক। এখানে কেউ আমাদের সাহায্য করবার নেই। তোমার কোনো বিপদ হলে…”

তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ম্লান হাসল ক্রিস্টোফার, “কা-পোনকে আমি বিশ্বাস করি। তাছাড়া ডুবন্ত মানুষ, খড়কুটো ধরেও তো বাঁচতে চায় এলেনা! আজ প্রা বাঁচলেও আর ছিয়ানব্বই ঘন্টা বাদে কে বাঁচাবে আমাদের। তার চাইতে এই চেষ্টাটুকু করে…”

বলতেবলতেই শিশির তরলটুকু নিজের মুখে ঢেলে দিয়েছে ক্রিস্টোফার। আর তারপর মাথায় তীব্র একটা যন্ত্রণার বিস্ফোরণ নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল তার সামনে।

ক্রমশ

গ্রাফিক্‌স্‌- ইন্দ্রশেখর

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply