এই উপন্যাসের আগের পর্বগুলো

নবম অধ্যায়
রাতুল তার রুমে গেল। অনেক খোঁজাখোঁজি করেও বিনয়কে পাওয়া গেল না। হেডমাস্টার স্যার সব ছাত্রদের নির্দেশ দিলেন নিজেদের রুমে চলে যেতে। সাধারণত হোস্টেল এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকে না। স্টাফেরা এগারোটার মধ্যে সব রুমের বাতি বন্ধ করে দিয়ে যান। কিন্তু আজ দেরি হল বিনয়ের হারিয়ে যাওয়ার কারণে।
রাতুল তার খাটে বসে সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিল। সে একটু আগে যা দেখে এল তা কি সত্যি? বিশ্বাসই হচ্ছে না। হাতে বিনয় বা জাদু রাজ্যের সম্রাট নিকোলাই পুত্র হারিরির দেয়া ছোট জাদুর বই। রাতুল কাঁপা কাঁপা হাতে বইটা খুলল। তাতে শুধু সাদা পাতা। কিছুই লেখা নেই।
পাশের খাটে শুয়ে আকাশ বই পড়ছিল। সে বেশিরভাগ সময়ই বই পড়ে। পাঠ্যপুস্তক না হলে গল্পের বই। সুতরাং, অনেক বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে তার জ্ঞান আছে। এছাড়া এ চকলেটের বীজের ব্যাপারে কিংবা কবি শান্ত শফিকুরের কবিতাগুলোর নষ্ট না করতে বলে সে বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। সুতরাং, রাতুল এখন তাকে আর বোকা মনে করে না।
আকাশ বই থেকে মুখ তোলে চশমাটা ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথায় ছিলে?”
রাতুল বলল, “এই তো…বারান্দায় ছিলাম।”
আকাশ আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমার হাতে ওটা কি বই?”
রাতুল উঠে গিয়ে বইটা ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বলল, “ওটা কিছু না।”
তারপর কথা অন্যদিকে নেয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল, “তুই এই ঝামেলার মধ্যে বই পড়ছিস নাকি?”
আকাশ উৎসাহ পেয়ে উঠে বসে বলল, “হ্যাঁ। এই একটু আগে পড়তে বসেছি। ভূতের বই। সাত রকমের ভূতের কথা আছে এখানে। সবচেয়ে ভয়ংকর হল গরিলা ভূত। অন্য ভূতের হাত থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু গরিলা ভূতে ধরলে আর রক্ষা নেই।”
রাতুল জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ‘গরিলা ভূতটা আবার কী?” কিন্তু সেই সময়ে দরজায় টোকা দিয়ে হেডমাস্টার বললেন, “কী খবর তোমাদের?”
রাতুল তার টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে ড্রয়ার খুলে বইটা রাখতে গিয়েছিল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আকাশ খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। হেডমাস্টার স্যার হাসিমুখে ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে ছোট একটা লাঠি এবং গায়ে সাদা পাঞ্জাবী। তিনি কালো পাজামা পড়েছিলেন। এবং তার হাতের লাঠিটিও কালো।
হেডমাস্টার স্যার ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে রাতুলের খাটে এসে বসলেন। তারপর বললেন, “তোমরা বসো। কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?”
রাতুল বলল, “জি না, স্যার।”
হেডমাস্টার স্যার আকাশের দিকে তাকালেন।
আকাশও বলল, “জি না স্যার।”
রাতুলের ইচ্ছে হচ্ছিল হারিরি যেসব কথা বলে গেছে সে সম্পর্কে স্যারকে কিছু জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু তার ভয় হচ্ছিল। তাই কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না।
স্যার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “রাতুল, তোমার সাথে কি যে ছেলেটা হারিয়ে গেছে তার দেখা হয়েছিল?”
রাতুল উত্তর দিল, “জি স্যার।”
“আজ হয়েছে?”
“জি।”
“কতক্ষণ আগে?”
“এই একটু আগে স্যার।”
“কোথায়?”
“বারান্দার কোণে সে অন্ধকারে বসেছিল।”
“তোমাকে কিছু বলেছে?”
“বলেছে সে নাকি জাদু রাজ্যের সম্রাট নিকোলাই এর ছেলে।”
“কিছু দিয়ে গেছে?”
“একটা জাদুর বই।”
“কোথায় সেটা?”
রাতুল তার ড্রয়ার থেকে বইটা বের করে স্যারের হাতে দিল। স্যার কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে বইটা দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যে জাদুকর এসেছিলেন তিনি তোমাকে কিছু দিয়ে গেছেন?”
রাতুল বলল, “একটি জাদুর চকলেট। তিনি বলেছেন এই চকলেটের বীজ থেকে জাদুর চকলেটের গাছ হবে।”
স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “বীজটা কোথায়?”
রাতুল তার ড্রয়ার থেকে কাগজে মোড়া বীজটা বের করে স্যারের হাতে দিল। স্যার বীজটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। এর গন্ধ শুঁকলেন। এরপর তিনি জাদুর বইয়েরও গন্ধ শুঁকলেন।
তারপর বললেন, “সব কিছু ঠিক আছে।”
প্রচন্ড কৌতুহলী হয়ে উঠেছিল রাতুল বীজটি নিয়ে। তাই সে প্রশ্ন করে বসল, “স্যার, এটা থেকে কি সত্যি সত্যি গাছ হবে?”
স্যার রাতুলের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বললেন, “তা আমি বলতে পারব না। এটা সাধারণ কোন বস্তু নয়। আমাদের পৃথিবী যেমন এক জগত তেমনি অন্য এক জগত আছে। সে জগতে সব কিছু অন্যরকম। সে জগতে প্রবেশ করতে হলে বিশেষ বস্তুর দরকার হয়। এ বীজ সেরকমই এক বিশেষ বস্তু। মাঝে মাঝে পৃথিবীর কোন কোন মানুষ এ’রকম বস্তু পেয়ে যায়। আর সেই বিস্ময়কর জগতে প্রবেশের অধিকার লাভ করে। আমিও পেয়েছিলাম খুব ছোটবেলায়।”
স্যার তার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে খুব ছোট গোলাকৃতির একটি রাবারের বল বের করে বললেন, “আমার ক্ষেত্রে সে বস্তুটি ছিল এই রাবারের বল। এটাই আমাকে দেয়া হয়েছিল। তোমাকে দেয়া হয়েছে অন্যরকম কিছু। এটা দিয়ে কী করতে হবে তা নিশ্চয়ই জাদুকর তোমাকে বলে গেছেন?”
রাতুল বলল, “হ্যাঁ, তিনি বলেছেন চাঁদের আলোতে এটা মাটিতে রোপন করতে।”
স্যার বললেন, “তাহলে তো হয়েই গেল। মাটিতে রোপন করলেই হয়ত তুমি এর বিশেষত্ব দেখতে পাবে।”
তারপর তিনি জাদুর বইটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই বইটা হল জাদু রাজ্যের কিছু তথ্যের বই। এই বইটি জাদু রাজ্যের বাইরে কাজ করে না। তাই এখানে কিছু দেখা যাচ্ছে না।”
রাতুলের তখন মনে হল হারিরির কথা। সে নিশ্চয়ই বিপদে আছে। রাতুল জিজ্ঞেস করল, “স্যার, ছেলেটা কি এখনো লুকিয়ে আছে?”
স্যার একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “একটু আগে তাকে হোস্টেলের ছাদ থেকে কোবিলাইয়ের লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে। কোবিলাই হল কালো জাদুকর। অন্যায়ভাবে সে জাদু রাজ্যের সম্রাট হতে চায়। সে সম্রাট হলে পৃথিবীতেও অন্যায় প্রভাব খাটাবে। তাই মানুষ এবং জাদু রাজ্যের মঙ্গলের জন্য তাকে ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু সে বড় শক্তিশালী।”
রাতুলের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল এই কথা শুনে। বার বার তার চোখে ভাসছিল বিনয় তথা হারিরির মুখ। সে মুখ বিমর্ষ, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কিন্তু নিরাশ নয়। স্যারও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর রাতুলের দিকে তার হাতের কালো লাঠিটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, “যখন বীজ রোপন করতে যাও তখন এই লাঠি হাতে রাখবে। এটি সাধারণ কোন লাঠি নয়। জাদু রাজ্যে এ তার ক্ষমতা দেখাবে। আর কখনো বিশ্বাস হারাবে না। মনে রাখবে তুমি যদি বিশ্বাস করো পারবে, তাহলেই তোমার পক্ষে পারা সম্ভব। বিশ্বাস না থাকলে তুমি আগেই হেরে বসে থাকবে।”
রাতুল লাঠিটি হাতে নিল। স্যার খাট থেকে উঠে দরজা খুলে আবার রাতুলের দিকে ফিরে বললেন, “দুশ্চিন্তা করো না।” তারপর তিনি বেরিয়ে গেলেন।
রাতুল কিছুক্ষণ লাঠিটির দিকে চেয়ে বসে রইল। স্যার বিছানায় বীজ এবং বইটি রেখে গেছেন। রাতুল সে দুটি হাতে নিল। পাশের খাটের কাছে দাঁড়িয়ে আকাশ রাতুল এবং হেডমাস্টার স্যারের কথা শুনছিল। সে কথাবার্তার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারেনি। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছে খুব বিশেষ কিছু ঘটতে চলেছে।
সে রাতুলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “স্যার কী বলে গেলেন? আর এসব কি জাদুরাজ্যের জিনিস?”
রাতুল আকাশের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে এখন নানা চিন্তা। এই জাদুর বীজ রোপন করলে আসলে কী হবে? জাদুরাজ্য দেখতে কেমন? সেখানে কী হচ্ছে? সত্যি সত্যি কি এমন কিছু হচ্ছে? নাকী সব কোন স্বপ্ন বা কল্পনা?
আকাশ আরো কয়েকবার জিজ্ঞেস করল। কিন্তু রাতুল প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে বলল, “আমি পিছনের শালবনে যাব।”
আকাশ অবাক কন্ঠে বলল, “এখন?”
রাতুল বলল, “হ্যাঁ। এখন।”
আকাশ বলল, “কিন্তু গেটে তো দারোয়ান। বাইরে যেতে দেবে না।”
রাতুল বলল, “ছাদে গিয়ে জানালার কার্নিশ দিয়ে নামব।”
আকাশ ভয় পেয়ে বলল, “পড়ে যাবে না? এভাবে নামা বিপদজনক।”
রাতুল বলল, “আমি এর আগে অনেকবার নেমেছি।”
কথাটা সত্যি। জানালার কার্নিশ দিয়ে এবং পাইপ বেয়ে রাতুল অনেকবার নিচে নেমেছে। হোস্টেলের আরো অনেকে নেমেছে। এটা একরকম খেলার মত হয়ে গিয়েছিল একসময়। এই বিল্ডিংটায় পাইপ এবং জানালার কার্নিশ এমনভাবে দেয়া আছে যে নামাটা খুব কঠিন কিছু না। যখন ছাত্ররা খেলা হিসেবে এভাবে নামতে শুরু করল তখন একদিন এক স্যারের নজরে পড়ে যায়। তারপর কড়াভাবে নিষেধ করা হয়। এভাবে আর কাউকে নামতে দেখলে হোস্টেল ও স্কুল থেকে বের করে দেয়া হবে।
কিন্তু আজ নামতে হবে। রাতুলের আত্মবিশ্বাস আছে সে ঝামেলা ছাড়াই নামতে পারবে। যদিও রাতে সে কোনদিন নামেনি। আজ রাত হলেও পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণ চাঁদের আলোর কারণে চারদিক রূপালি আলোতে আলোকিত।
আকাশ বলল, “কিন্তু আমি তো নামতে পারব না। আমার ভয় লাগবে।”
রাতুল বলল, “তোকে নিচ্ছে কে? তুই ঘরে বসে বই পড়।”
আকাশ বলল, “না। আমাকে তোমার সাথে নাও। প্লিজ।”
রাতুল বলল, “সে হবে না। এটা অনেক রিস্ক। তাছাড়া তোর গিয়ে কাজ নেই।”
কিন্তু আকাশ নাছোড়বান্দা। সে যাবেই। রাতুল শেষপর্যায়ে তার অনুরোধে বিরক্ত হয়ে তাকে সাথে নিতে রাজি হল। তাতে বিপদের ঝুঁকি অবশ্য বাড়ল কিছুটা। কারণ মোটাসোটা আকাশকে নিয়ে কার্নিশ আর পাইপের সাহায্যে নিচে নামা সহজ কথা না।
রাতুল ব্যাগে জাদুর বই, বীজ ভরল। আকাশের একটা চামড়ার ছোট ব্যাগ ছিল। এতে স্ক্রু ড্রাইভার থেকে শুরু করে হাবিজাবি অনেক জিনিসে ভর্তি। এটাকে আকাশ বলে বৈজ্ঞানিক বক্স। তার সেই বৈজ্ঞানিক বক্সটাও ব্যাগে ভরা হল। অতঃপর তারা দুজন খুব সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে পৌঁছল।
ছাদে গিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলোতে চারপাশটা দেখে নিল রাতুল। এরকম চাঁদের আলো একরকম ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করে। মনে হয় কিছু দূরে যেন ছায়া ছায়া কী একটা দাঁড়িয়ে। মানুষের মত খানিকটা, খানিকটা ভূতের মত। রাতুল তাড়াতাড়ি একপাশে গিয়ে রেলিং ধরে নিচে তাকাল। উপর থেকে এভাবে নিচে তাকালে ভয় ভয় করে। কিন্তু রাতুল আজ লক্ষ্যস্থির করে এসেছে। শুধু শুধু ভয় পেলে চলবে না। সে স্যারের দেয়া কালো ছোট লাঠিটাকে পিঠে বেঁধে নিল। এরপর রেলিং টপকে জানালার কার্নিশে চলে গেল। তারপর ফিসফিস করে আকাশকে বলল, “এভাবে নামবি। একটা কার্নিশে নামার পর পাইপ বেয়ে একটু নেমে আরেকটাতে লাফিয়ে পড়বি।”
আকাশ বলল, “কিন্তু যদি পা কার্নিশে না পড়ে?”
রাতুল বলল, “পা কার্নিশে না পড়লে সোজা গিয়ে পড়বি নিচে। তাই খুব সাবধানে পা ফেলবি। আর আস্তে কথা বল। জানালার পাশেই কিন্তু রুম।”
রাতুল পাইপ বেয়ে নেমে আরেকটা কার্নিশে লাফিয়ে পড়ল।
আকাশ তখন কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রথম কার্নিশে নেমেছে। এই প্রথমবারের মত তার ইচ্ছে হচ্ছে ফিরে চলে যেতে। কিন্তু রাতুলের সাথে যেতেও ইচ্ছে করছে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ভয়ে সে কার্নিশে দাঁড়িয়ে শীতের সকালে পুকুরের ঠান্ডা জল থেকে উঠে আসা মানুষের মত কাঁপতে লাগল। নিচে চোখ যেতেই যেন আত্মা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য হুটোপুটি শুরু করে দেয়।
রাতুল দুটি কার্নিশ অতিক্রম করার পর পিছনে চেয়ে দেখল আকাশ এখনো প্রথম কার্নিশেই দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রাতুল এত দূর চলে এসেছে যে এখান থেকে কিছু বলতে গেলে জানালার পাশের রুমের ছাত্ররা শুনে ফেলতে পারে। রাতুল ফিসফিস করে আকাশকে ডাক দিয়ে হাত দিয়ে নামতে ইশারা করল। কিন্তু আকাশের অবস্থা দেখে মনে হল না সে নামতে পারবে।
আকাশের অবস্থা দেখে রাতুলের রাগে ইচ্ছে হচ্ছিল নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে। রেগে গেলে তার চোখমুখ অন্যরকম হয়ে যায়। সে রাগে প্রায় গজগজ করতে করতে আবার উপরে উঠতে শুরু করল। একটি কার্নিশ ওঠার পর আকাশের খেয়াল হল উত্তেজিত রাতুল উঠে আসছে। রাতুল উঠে এলে নিশ্চিত তাকে রুমে ফেরত পাঠাবে। কিল থাপ্পড়ও কিছু পড়তে পারে। মূলত সে ভয়েই সে দেয়াল থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে পাইপ ধরে নামার চেষ্টা করল। এটা খুব কঠিন কিছু ছিল না, তাই পেরে গেল। পরের কার্নিশে পা ফেলে সে নিচে তাকাল। আকাশ নামছে দেখে রাতুল ওঠা বন্ধ করে দেখছে। আকাশ ভালোভাবে কার্নিশে পা ফেলতে পারল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল রাতুল। সেও নামা শুরু করল। নামতে আর কোন ঝামেলা হচ্ছিল না। আকাশও মোটামোটি বুঝতে পেরেছিল কীভাবে নামতে হয়। সুতরাং তারা নেমে যেত আধঘন্টার মধ্যেই। কিন্তু মাঝপথে এসে রাতুল থমকে দাঁড়াল।
রাতুল তখন উপর থেকে তিন নাম্বার জানালার কার্নিশে। আর মাত্র একটা কার্নিশ বাকি আছে। তারপর পাইপ বেয়ে নামলেই নিচে পৌছানো যাবে। কিন্তু নিচে শোনা গেল মানুষের হাটার শব্দ। টর্চ লাইট দিয়ে দারোয়ান হোস্টেলের চারপাশটা দেখে নিচ্ছে।
রাতুলের বুক ঢিবঢিব করতে লাগল। সে মূর্তির মত দেয়ালের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আকাশও নিচে নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে স্থির হয়ে বসে আছে। এরকম কাটল দশ মিনিটের মত। দারোয়ান চারিদিকে কয়েকবার টর্চ মেরে চলে গেল। ভাগ্য ভালো সে উপরে তাকায়নি। রাতুল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু তবুও পুরোপুরি নির্ভার হতে পারল না সে। কারণ বলা যায় না, দারোয়ান যদি নিচে কোন কাজে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে নামা মাত্র তাদের দেখে ফেলবে। তাই সাবধানে কোন শব্দ না করে রাতুল নামল। আকাশও নেমে এল সন্তর্পনে।
তারা দুজন নেমে চারিদিকে তাকিয়ে খুব দ্রুতবেগে স্কুলের সীমানা দেয়ালের কাছে গেল। এখানে একটি ছোট গর্ত আছে। যে গর্ত দিয়ে যাওয়া যায় অন্যপাশে। সেখানে একটি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার ওপর পাশেই শালবন।
রাতুল এবং আকাশ দেয়ালের গর্ত দিয়ে বাইরে বের হয়ে রাস্তা ক্রস করে শালবনে প্রবেশ করল। পূর্ণচাঁদের আলো শালবনে অপূর্ব সৌন্দর্য বিস্তার করেছে। এই সৌন্দর্য না দেখলে বোঝা যাবে না। রাতুল শালবনের কিছুটা গভীরে গেল। তার কাঁধের ব্যাগ থেকে বের করল সেই জাদুর চকলেটের বীজ। এটা রোপন করতে হবে। কিন্তু দেখা গেল মাটি খোঁড়ার মত কিছু নেই। আর মাটি এত শক্ত যে হাত দিয়েও খোঁড়া সম্ভব না। এই সমস্যারও সমাধান করল আকাশ। সে ব্যাগে তার বৈজ্ঞানিক বক্স নিয়ে এসেছিল। বৈজ্ঞানিক বক্সে অদ্ভুত সব জিনিসের মধ্যে একটি ছিল স্টিলের চাকু। এই চাকু দিয়েই মাটি খুঁড়ে গর্ত করল রাতুল। তারপর সেই গর্তে চকলেটের বীজটাকে রেখে দিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দিল। কিছুক্ষণ তারা দুজন সে জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কিছুই হল না।
রাতুল বলল, “চল। এবার হোস্টেলে ফিরতে হবে। কাল এসে দেখব গাছ হল কি না।”
আকাশ জিজ্ঞেস করল, “পানি দিতে হবে না? গাছের তো পানির দরকার হয়।”
রাতুল বলল, “এখন পানি পাবো কোথায়। আপাতত এরকমই থাক। কাল পানি দেব এসে।”
রাতুল পিঠে বাঁধা লাঠিটা হাতে নিল এবং ফিরে যেতে শুরু করেছিল। আকাশও যাচ্ছিল তার পিছু পিছু। তারা মাত্র কয়েক পা গেছে এমন সময় পিছন থেকে এল খচখচ শব্দ। তারা দুজন প্রায় একসাথে ঘুরে ফিরে তাকাল। যা দেখল তাতে তাদের চক্ষুস্থির! কালো কুচকুচে একটি গাছ গঁজিয়ে মাথা সমান উঁচু হয়ে গেছে।
দুজন সামনে এগিয়ে গেল গাছের নিচে। রাতুলের হাতে হেডস্যারের দেয়া লাঠি দিয়ে রাতুল একটি খোঁচা দিল চকলেট বৃক্ষে। নরম নরম ঠেকল গাছের গা। তারপর তারা কিছু বুঝে উঠার আগে হঠাৎ এক তীব্র আলোর ঝলকানি শুরু হল। উজ্জ্বল একরাশ আলো গাছের আশপাশ এবং তাদের ঘিরে ঘুরতে লাগল চক্রাকারে। এই ঘূর্ননের গতি বৃদ্ধি পেতে লাগল। একসময় আলোর তীব্রতা এত বেশি হল যে তারা দুজন চোখ বন্ধ করতে বাধ্য হল।
রিকশার টুং টাং শব্দ শুনতে পেল তারা। আলোর তীব্রতা একটু কমলে রাতুল চোখ খোলে দেখল একটা আলো ঝলমল রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। এর চালকের আসনে একজন অদ্ভুত রিকশাওয়ালা। মাথায় কালো হ্যাট, মুখে অদ্ভুত মুখোশ। পড়নে কালো আলখেল্লা।
রিকশাওয়ালা খসখসে গলায় বলল, “তোমরা রিকশাতে উঠে পড়ো। অনেক দূর যেতে হবে। খুব বেশি সময় নেই।”

রাতুল এবং আকাশ দুজনই দেখল তাদের চারপাশে চক্রাকারে ঘুরছে তীব্র আলো। সুতরাং রিকশায় ওঠা ছাড়া উপায় নেই। তারা দুজন ভয়ে ভয়ে রিকশাতে চড়ে বসল।
রিকশাওয়ালা আবার বলল, “সিটবেল্ট বেঁধে নাও। খুব জোরে ছুটতে হবে।”
রাতুল সিটবেল্ট বেঁধে নিল। আকাশ বাঁধতে পারছিল না ভয়ে বা অন্য কোন কারণে। রাতুল তাকে বাঁধতে সাহায্য করল। সিটবেল্ট বাঁধা শেষ হলে রিকশাওয়ালা টুং টাং করে বেল বাজাল। তারপর ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল রিকশা বাতাসে ভর করে। রিকশার গতি বৃদ্ধি পেতে লাগল। একসময় এতই বৃদ্ধি পেল যে আলোর ঝলকানি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। রাতুল এবং আকাশ দুজনই আবার চোখ বন্ধ করতে বাধ্য হল।
চোখ খোলার পর তারা দেখল অন্য দৃশ্য। আশপাশের পরিবেশ বদলে গেছে। রিকশা এবং রিকশাওয়ালা নেই। তারা চলে এসেছে এক সবুজ পৃথিবীতে। সেখানে আকাশের রঙ সবুজ। কয়েকটি রঙ বেরঙের ডানাওয়ালা মাছ উড়ছে বাতাসে প্রজাপতির মত। কয়েকটা সবুজ ও হলুদ খরগোশ লাফিয়ে পড়ছে পাশের স্বচ্ছ জলের ডোবায়। রাতুলদের সামনে দিয়েই উড়ে গেল একটা আস্ত বাঘ।
রাতুল বুঝতে পারল এ দেশ জাদুর দেশ। এই সেই জাদু রাজ্য। আকাশ তখন বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে। এমন জগত যা কল্পনাকেও হার মানায়! রাতুল ও আকাশ চারপাশটা দেখছিল তার একেকটা জিনিস দেখে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তখন তারা শুনতে পেল কাঁপা কাঁপা গলায় কে যেন বলছে, “কে বাছা তোমরা? এখানে কী করছ?”
প্রথমে রাতুল এবং আকাশ কেউই ধরতে পারল না শব্দটা আসছে কোথা থেকে। তারপর রাতুলের চোখ পড়ল তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক পাশে একটি ঝাঁকড়া গাছের দিকে। সে গাছ লাল নীল নানা ফলে ভর্তি। ফলগুলো এতই পাকা যে মনে হচ্ছে রঙ ফেটে বেরোচ্ছে। সে ফল এবং সবুজ পাতার ফাঁকে গাছের একটি ডালে সাদা কাপড় পড়া এক থুত্থুড়ে বুড়ি বসে আছে। সে-ই প্রশ্ন করছে রাতুলদের।
রাতুল বুড়িকে দেখতে পেয়ে বলল, “আমরা জানি না এখানে কীভাবে এলাম। আপনি কে?”
বুড়ি বলল, “হে হে হে। আমি কে? এটা কোন কথা হল বাছা? আমি এই গাছের মালিক। তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত। নাও আমার গাছের ফল খাও। এর রসে তোমাদের প্রাণ জুড়াবে।”
বুড়ি একটা ডাল ধরে হালকা ঝাঁকি দিল। তাতে দুটো টসটসে ফল শূন্যে ভাসতে ভাসতে রাতুল এবং আকাশের মুখের সামনে এসে স্থির হয়ে রইল। রাতুলের কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল। তাই সে ফল হাতে নিলেও মুখে দিল না। কিন্তু আকাশ লোভ সামলাতে পারল না। রাতুল কিছু বলার আগেই সে খপ করে ফলটা ধরে গপ করে এক কামড় বসিয়ে দিল। তারপর প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যে পুরোটা সাবার করে দিয়ে হাতের রস চাটতে লাগল।
রাতুলের তখন মনে পড়ল জাদুর বইয়ের কথা। সে ব্যাগ থেকে বইটা বের করল। বইয়ের রঙ তখন বদলে গেছে। সবুজ মোহনীয় এক রঙের আবহ তৈরি হয়েছে বইয়ের মলাটে।
রাতুল প্রথম পাতা খুলল। তাতে স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিনের মত লেখা উঠল,
জাদু সম্রাট নিকোলাই পুত্র হারিরির পক্ষ থেকে জাদু রাজ্যে তোমাদের স্বাগতম। এই লেখা যদি তোমরা দেখতে পাও তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি তোমরা জাদু রাজ্যে চলে এসেছ।জাদু রাজ্য ভয়ংকর সব সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। সামান্য ভুলেই এখানে প্রাণনাশ হতে পারে। তাই সাবধান। এখানের প্রথম নিয়মটা মানুষদের এক প্রচলিত নিয়মের মতোই- ‘অপরিচিত কেউ কিছু দিলে খাবে না।’ এখানে ডাইনিরা গাছে গাছে থাকে। নতুন কেউ এলে তাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে বিষফল খাইয়ে দেয়।
এটা পড়েই রাতুল আঁতকে উঠল। তার মানে আকাশ বিষফল খেয়েছে। রাতুল তার হাতের ফলটি ছুঁড়ে ফেলে দিল। গাছ থেকে বুড়ি বলতে লাগল, “ফেলে দিলি কেন বাছা? আরেকটা ফল দেব? আরেক রঙের খাবি? এই রঙ কি তোর পছন্দ না?”
রাতুলের সেসব শোনার মত অবস্থা নেই আর। আকাশ বিষফল খেয়েছে সুতরাং তার জীবন এখন সংকটাপন্ন। আকাশকে বাঁচাতে হবে। রাতুল জাদুর বইয়ের বিষফল অংশে আঙুল রাখতেই বিষফল বিষয়ক আরো কিছু তথ্য সামনে এল। রাতুল খুঁজে বের করল কেউ বিষফল খেয়ে ফেললে তাকে কীভাবে বাঁচানো যায় সে অংশ। তাতে লেখা আছেঃ
কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ডাইনি বুড়ির প্ররোচনায় বিষফল খেয়ে ফেললে যত শীঘ্র সম্ভব তাকে পীযূষ স্রোতস্বিনীর জল পান করাতে হবে। তবে সাবধান পীযূষ নদে ভয়ানক মেছো কুমিরের বসবাস।
রাতুল বই বন্ধ করে বোকার মত গাছের বুড়িকে জিজ্ঞেস করে বসল, “পীযূষ নদ কোথায়?”
ডাইনি বুড়ি তখন বুঝতে পারল তার ছলচাতুরি এরা বুঝে গেছে। এবার সে নিজ রূপে ফিরে এল। অগ্নিমূর্তি ধারণ করল বুড়ি। তার চোখ দুটি লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছিল। সে চিৎকার বলতে লাগল, “দূর হয়ে যা! দূর হয়ে যা মানুষের দল! হা হা হা!”
রাতুল আকাশকে নিয়ে গাছের কাছ থেকে সরে এল। তবুও বুড়ির চিৎকার থামল না। রাতুল ভেবে পাচ্ছিল না এখন কী করবে বা কার কাছে জিজ্ঞেস করবে। জাদুর বইয়ে হয়ত তথ্য আছে কিংবা জিজ্ঞেস করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেটা কীভাবে রাতুল বুঝতে পারছিল না।
ঠিক তখন তাদের পেছন থেকে ভালো মানুষের মত একটা কন্ঠ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এই ডাইনি বুড়ি এত চেঁচাচ্ছে কেন আজ? আমার ঘুমটা ভেঙে দিল বজ্জাত বুড়ি।”
রাতুল তাকিয়ে দেখল হাই তুলতে তুলতে কথাটা বলেছে একটি বিরাটাকার সিংহ। সিংহটার শরীর দেখলে মনে ভয়ে ধরে যায়। সকালের জলখাবার হিসেবে কয়েকজন মানুষকে পুরো গিলে খেতে পারবে এমন শরীর। কিন্তু তার মুখটা অনেক নিরীহ। মায়া মায়া ভাব তার চোখ মুখে। রাতুল তাই ভয় না পেয়ে বলল, “আমার বন্ধুকে বুড়ি বিষফল খাইয়ে দিয়েছে। আমি পীযূষ নদে যেতে চাই। তুমি কি আমাকে বলতে পারবে এটি কোন দিকে?”
সিংহ হাই তুলতে তুলতে বলল, “তুমি চাইলে আমি তোমাদের সেখানে পৌঁছে দিতে পারি। তবে সেখানে আমি থাকতে পারবো না। মেছো কুমির খুব ভয়ানক। একবার আমার লেজ কামড়ে ধরেছিল।”
রাতুল বলল, “আমাদের পৌঁছে দিলে খুব উপকার হয়।”
আকাশ ততক্ষণে অনেক নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। বিষফলের ক্রিয়ায় সে চারদিক ঘোলাটে দেখতে শুরু করেছে।
সিংহ বলল, “তোমার বন্ধুকে নিয়ে আমার পিঠে চড়ে বসো।”
বলেই সিংহ তার পিঠের সাথে লাগানো ডানা দুটি ঝাপটাল কয়েকবার। রাতুল সিংহের ডানা দেখে চমকে গেল আবার। ডানার রঙ এবং চামড়ার রঙ একই হওয়ায় আগে তার চোখে পড়েনি।
ক্রমশ