পুজো স্পেশাল ডারবানের ডায়েরি দীপকগোস্বামী শরৎ ২০১৭

জয়ঢাক পুজো স্পেশাল ২০১৭ সব লেখা একত্রে            আগের ইস্যুতেঃ ডারবানের ডায়েরি-রেলরঙ্গ

১।  ডারবান থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে একটা ছোট শহর আছে।  ছোট হলেও সেটাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশের অন্যতম রাজধানী।  তাছাড়া অনেক স্কুল, নানা ধরণের কলেজ এবং একটা ইউনিভার্সিটি নিয়ে পিটারমারিটজবার্গ এখন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রও।

২।  ১৮৯৩ সালে মহাত্মা গান্ধীর মাধ্যমে এই শহরের সঙ্গেই আকস্মিকভাবে ভারতের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের যোগসূত্র তৈরি হল।

৩। আইন ব্যবসার সূত্রে ১৮৯৩ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে পৌঁছন।  ঐ বছর ৭ জুন আইন সম্পর্কিত একটা কাজে তাঁকে ডারবান থেকে ট্রেনে প্রিটোরিয়া যেতে হয়।  ট্রেন ছাড়ার কিছু পরে এক ইউরোপীয় সাহেব গান্ধীকে ফার্স্ট-ক্লাস কম্পার্টমেন্টে দেখে দারুন চটে যান এবং নেমে যেতে বলেন।  গান্ধীর কাছে ফার্স্ট-ক্লাসের টিকিট ছিল।  তিনি নামতে অস্বীকার করলে টিকিট-চেকার এসে জানান যে ফার্স্ট-ক্লাস কোনও কুলি বা কালা আদমিদের জন্য নয়।

৪। ততক্ষনে ট্রেন পিটারমারিটজবার্গে পৌঁছে গেছে।  চেকার তাঁকে স্টেশনের ফাঁকা প্লাটফর্মে মালপত্র সমেত জোর করে ঠেলে ফেলে দিলেন। (হায়রে, তিনি কি একবারও বুঝতে পেরেছিলেন এই একটি ধাক্কাই ভারতের মত একটা বিশাল দেশের স্বাধীনতা লাভের জন্য কতটা কার্যকরী হবে) ! সেই শীতের রাত্রে (দক্ষিণ গোলার্দ্ধে জুন মাসে শীতকালই) অন্ধকার ওয়েটিং রুমে বসে গান্ধী ভাবতে লাগলেন, এই রকম অপমানের পর তিনি কি সব কাজকর্ম ফেলে ভারতে ফিরে যাবেন, না কী ভারতীয় হিসাবে এই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন!  দ্বিতীয় ভাবনাটাই জয়ী হল। পরবর্তী কুড়ি বছরেরও বেশি সময় তিনি কোয়াজুলু নাটালে কাটিয়েছেন।  যে সত্যাগ্রহ গান্ধীজির সারা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, স্থানীয় লোকেরা মনে করে তার সূত্রপাত এই পিটারমারিটজবার্গ স্টেশনেই।

 ৫। এই বছর (২০১৭) ফেব্রুয়ারির এক সকালে ডারবান থেকে পিটারমারিটজবার্গ স্টেশনে যাওয়া গেল।  শহরের কয়েকটা পুরোনো অভিজাত এলাকা ঘুরে কিছুটা নির্জন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে  ঝকঝকে এবং রংচঙে স্টেশন।  এ লাইনে এখন রোজ ট্রেন চলে না।  সপ্তাহে গোটা দুয়েক ট্রেন যাতায়াত করে।

৬। আজ কোনও ট্রেন আসার দিন নয়।  তাই শুনশান প্লাটফর্ম দুপুর বারোটাতেও আড়মোড়া ভেঙে ঘুমোচ্ছে।

 ৭। শুধু সেই ঘটনার সাক্ষী ঘড়িটা কিন্তু এখনও জেগে আছে।

৮। আর দাঁড়িয়ে আছে, মহাত্মা গান্ধীকে জবরদস্তি নামিয়ে দেওয়ার জায়গায় ইতিহাস হয়ে যাওয়া একটি শিলালিপি।  পরবর্তীকালে এই ঘটনা অন্য তাৎপর্য পেয়েছে।  ১৯৯৭ সালের ২৫ এপ্রিল এই শিলালিপি প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠান হয়। স্বাধীনতার পর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা পিটারমারিটজবার্গের স্বাধীনতার কৃতিত্ব মহাত্মা গান্ধীকে নিবেদন করেন।  দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনকার ভারতীয় রাষ্ট্রদূত গোপালকৃষ্ণ গান্ধী (যিনি সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধীর পৌত্রও) সেই নিবেদন গ্রহণ করেন।  তিনিও পিটারমারিটজবার্গ স্টেশনের সেই ঘটনাকে মহাত্মার দ্বিতীয় জন্ম বলেও উল্লেখ করেছেন।

 ৯। রোজই এই স্টেশন দেখতে আসেন আমাদের মতো ভারতবর্ষ বা অন্য দেশ থেকে বেড়াতে আসা মুষ্টিমেয় কিছু পর্যটক। 

 ১০। যাঁরা ঘটনাটির সম্পর্কে আর একটু বিস্তারিত জানতে চান, তাঁদের জন্য স্টেশনের মধ্যেই খোলা থাকে ‘সত্যাগ্রহের জন্মস্থান’ নামে একটি প্রদর্শশালা।

১১। সেখানে আছে মহাত্মা গান্ধীর বিভিন্ন বয়সের ছবি।

 ১২। মহাত্মার দক্ষিণ আফ্রিকাবাসের সময়-সারণি। 

১৩। আর আছে মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে বিভিন্ন বিখ্যাত লোকের মন্তব্য। নেলসন ম্যান্ডেলা, বা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো আরও অনেকের।  তারমধ্যে জেনারেল স্মাটের মন্তব্যের অংশটা অপেক্ষাকৃত মজার। 

১৪। এইসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে ছোট্ট প্রদর্শশালাতেই বিশ্রামের জায়গা আছে।

১৫। দেখা শেষ হলে পিটারমারিটজবার্গ স্টেশনকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসা।  তবু এই সূত্রে তখনও বাকি থেকে যায় আর একটা দ্রষ্টব্য–

১৬। সেটা চার্চ স্ট্রীটে মহাত্মার পূর্ণাবয়ব ব্রোঞ্জ মূর্তি।  ১৮৯৩-এ যে অবিচার দিয়ে এই গল্প শুরু হয়েছিল, সেই ঘটনার একশ’ বছর পূর্তিতে ১৯৯৩-এ বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর হাতে এই মূর্তির উন্মোচনে।

জয়ঢাকের সমস্ত ভ্রমণএইখানে

2 thoughts on “পুজো স্পেশাল ডারবানের ডায়েরি দীপকগোস্বামী শরৎ ২০১৭

  1. খুব ভালো ছবি, বেশ কিছু অজানা তথ্য। ভারতীয় হিসেবে গর্বিত যেমন, তেমন বিষণ্ণও হলাম। এমন একটি মানুষকে আমাদেরই কেউ হত্যা করেছিল।

Leave a Reply