বিশ্বের জানালা পাহাড়ের কান্না-মেঘনা নদী মীম নোশিন নাওয়াল খান বর্ষা ২০১৭

আগের নদীর গল্প–পদ্মা

 

ভারতে অনেক পার্বত্য অঞ্চল আছে। সেসব জায়গায় অনেক পাহাড়। হিমালয় পর্বতমালার নাম তো নিশ্চয়ই জানো? হিমালয় অনেকগুলো নদীর মা।

কিন্তু সব নদী হিমালয়ের মেয়ে নয়। যেমন ধরো মেঘনা নদী। মেঘনা নদীর জন্ম কীভাবে জানো?

ভারতের আসামে রয়েছে লুসাই পাহাড়। খুব সুন্দর সেই পাহাড়। অনেক অনেকদিন আগের কথা। একদিন লুসাই পাহাড়ের সাথে আকাশের খুব ঝগড়া হল। আকাশ বলল, সে পাহাড়ের চেয়ে বড়। তার গায়ে অনেক মেঘ ভেসে বেড়ায়, পাখি উড়ে যায়, সূর্য ওঠে, চাঁদ-তারাদের খেলা হয়। তাই সে-ই বেশি সুন্দর।

আর পাহাড় বলল, মোটেই না। আমিই বেশি সুন্দর। আমি কত উঁচু, কী বিশাল, আমার সৌন্দর্য উছলে পড়ে।

এই নিয়ে আকাশ আর পাহাড়ের ঝগড়া লেগেছিল। লুসাই ছিল খুব অভিমানী মেয়ে। ঝগড়া করতে করতে সে কেঁদে ফেলল।

সে তো বিরাট পাহাড়। তাহলে তার চোখের পানি কতখানি হবে ভাবো? তার চোখের পানি গড়িয়ে তার গাল বেয়ে সমতল ভূমিতে নেমে এল। এভাবে তার কান্নায় তৈরি হল একটা নদী। সেই নদীর নাম “বরাক।”

লুসাই পাহাড় কান্না থামাল না। কাঁদতেই থাকল। তার চোখের পানিও গড়িয়ে আরো দূরে যেতে থাকল। তাই বরাক নদী ছুটতে ছুটতে চলে এল আসামের শেরপুরে। এখানে এসে আবার নদী চলার পথে বাধা পেল। তাই দুই ভাগ হয়ে আবার চলতে লাগল। এই দুটো ভাগ হচ্ছে সুরমা আর কুশিয়ারা।

সুরমা আর কুশিয়ারা কুলকুল করে বইতে বইতে ভারত থেকে বাংলাদেশে চলে এল। সিলেট দিয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল। তারপর সুনামগঞ্জ এবং হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তে এসে তারা আবার একসঙ্গে হয়ে গেল।

সুরমা

তখন বাংলাদেশের মানুষ দ্বিধায় পড়ে গেল। একসাথে হয়ে যাওয়া নদীটাকে তারা কী নামে ডাকবে? সুরমা না কুশিয়ারা? তাই তারা ঠিক করল, নদীটার একটা নতুন নাম দেবে। নদীটার নতুন নাম দেয়া হল “কালনি।”

লুসাই পাহাড় তো কেঁদেই চলেছে। তাই কালনি নদী, মানে পাহাড়ের চোখের পানি গড়াতেই লাগল। বইতে বইতে সে এল ভৈরব বাজারের কাছে। এখানে এসে কালনির সঙ্গে দেখা হল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের। তারা দুজন একসঙ্গে হয়ে একটা নদী তৈরি করল।

ব্যস! বাংলাদেশের মানুষগুলো আবার দ্বিধায় পড়ল। এই নদীটাকে কী নামে ডাকা যায়? তখন তারা নদীটার নাম দিল “মেঘনা।”

মেঘনা নদী এঁকেবেঁকে চলতে লাগল। দক্ষিণ দিকে যেতে যেতে সে চাঁদপুরের কাছে পদ্মা নদীতে গিয়ে মিশল। এই যে দুটো নদী মিশে গেল, এই জায়গাটা আবার ইলিশ মাছের খুব পছন্দ হল। প্রতিবছর সমুদ্র থেকে ইলিশ মাছ মেঘনা নদীতে আসে ডিম পাড়তে। কেন জানো? কারণ মেঘনা খুব লক্ষ্মী নদী। সে কাউকে বকা দেয় না। তাই ইলিশ মাছ এখানেই নিরাপদ আশ্রই খুঁজে নিল। সেজন্যই মেঘনার ইলিশ সবার খুব প্রিয়।

কিন্তু মেঘনা তো থেমে থাকতে পারল না। লুসাই পাহাড় যে কেঁদেই যাচ্ছে। সে আরো দক্ষিণে চলতে লাগল। নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা দ্বীপের মধ্যে দিয়ে সে চলতে লাগল। এরপর সে চার ভাগে ভাগ হয়ে চারটা পথে চলতে লাগল। তেঁতুলিয়া, শাহবাজপুর, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া- এই চারটা জায়গার মোহনা দিয়ে মেঘনা সোজা আছড়ে পড়ল সাগরের বুকে।

যতক্ষণে সে সাগরে গিয়ে মিশেছে, ততক্ষণে সে অনেক লম্বা হয়ে গিয়েছে। তার দৈর্ঘ্য ১৫৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৪০০ মিটার। লুসাই পাহাড়ের চোখের পানি মেঘনা হয়ে উঠল বাংলাদেশের গভীর এবং প্রশস্ততম নদী। সুরমাসহ তার দৈর্ঘ্য হয়ে গেল ৬৫০ মাইল!

মেঘনা নদী সবার খুব প্রিয় হয়ে উঠল। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মেঘনা নদীর উপর মেঘনা-গোমতী সেতু তৈরি করা হল। মেঘনা হয়ে উঠল এ দেশের অন্যতম প্রধান নদী। জেলেরা তার বুকে নৌকা ভাসাল, কবি-সাহিত্যিকরা তাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করলেন। মেঘনা হয়ে উঠল সবার আদরের মেয়ে।

কিন্তু মজার কথা কী জানো? সেই যে অনেক অনেকদিন আগে লুসাই পাহাড় কাঁদতে শুরু করেছিল, সে কিন্তু এখনও কান্না থামায়নি। সে এখনও কেঁদেই যাচ্ছে। আর তার চোখের পানি এই বরাক নদী হয়ে মেঘনা নদীর মধ্যে দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। মেঘনা নদীর বুকে যে পানি টলমল করে, সেটাই লুসাই পাহাড়ের কান্না। পাহাড়ের কান্না সবার প্রিয় নদী মেঘনা হয়ে বয়ে চলেছে নিরন্তর। লুসাই পাহাড়ের কান্না কবে থামবে, কেউ জানে না। কিন্তু সবাই চায়, পাহাড়টা কাঁদতেই থাকুক। কেন জানো? কারণ মেঘনা নদীকে সবাই খুব ভালোবাসে যে!

বিশ্বের জানালা সব লেখা একত্রে

2 thoughts on “বিশ্বের জানালা পাহাড়ের কান্না-মেঘনা নদী মীম নোশিন নাওয়াল খান বর্ষা ২০১৭

Leave a Reply