বিশ্ব্বের জানালা নদীর গল্প মীম নোশিন নওয়াল খান শীত ২০১৬

biswerjanalapadmaহিমালয় পর্বতমালা। অনেকগুলো পর্বত মিলে একসঙ্গে থাকে। তাদের সারা শরীর বরফে ঢাকা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। হিমালয় খুব একা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হওয়ায় তার কাছে কেউ আসে না। বিশাল বড় জায়গা জুড়ে তার বিস্তৃতি, পুরোটাই নিশ্চুপ, নিঝুম।

হিমালয়ের ইচ্ছে তার অনেক বন্ধু থাকুক। কথা বলার কেউ থাকুক। তাই সে প্রার্থনা করল, তার গা থেকে যেন বরফ গলে অনেকগুলো নদী তৈরি হয়। তাহলে সে কথা বলার বন্ধু পাবে। তার গা থেকে কুলকুল করে ঝর্ণা বইবে, নদী বইবে। ইশ! কী সুন্দরই না দেখাবে তাকে!

সৃষ্টিকর্তা হিমালয়ের প্রার্থনা শুনলেন। তার গা থেকে বরফ গলে তৈরি হল অনেক নদী। সেই নদীগুলোর মধ্যেই দুটো হচ্ছে অলকানন্দা আর ভাগীরথী। হিমালয়ের বুকে ৩,৯০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এক হিমবাহ থেকে বরফ গলে পানি হয়ে তাদের জন্ম হল।

অলকানন্দা আর ভাগীরথী ভাবল, একা একা থাকা খুব কষ্ট। দুজনে বন্ধু হলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। তারা দুজন একসঙ্গে হয়ে গেল। দু’জন একসঙ্গে হয়ে এক বিরাট নদী তৈরি করে ফেলল। ভারতবর্ষের লোক তার নাম দিল- গঙ্গা।

গঙ্গা নদী হিমালয় থেকে বেরিয়ে ভাবল, পৃথিবীটা দেখবে সে। পুরো পৃথিবীটা কীভাবে দেখা যায়? তাই সে একটা বুদ্ধি করল। নিজেকে খণ্ড খণ্ড করে এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করল। তার একটা অংশ ছুটতে ছুটতে ভারত পার হয়ে ঢুকে পড়ল বাংলাদেশে। এ দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দিয়ে ঢুকে পড়ার পর এ দেশের মানুষ তার নাম রেখে দিল “পদ্মা।”

ব্যস! গঙ্গা নদী হয়ে গেল পদ্মা নদী। নতুন নাম পেয়ে দারুণ খুশি হল পদ্মা। কিন্তু খুশি হয়ে থমকে গেলে তো চলবে না। তাকে তো পৃথিবীটা দেখতে হবে।

মনের আনন্দে কুলকুল করে বইতে লাগল পদ্মা নদী। তৈরি করল দুটো উপনদী- মহানন্দা আর পুনর্ভবা। মহানন্দা বাংলাদেশেই রয়ে গেল। তবে পুনর্ভবা বইল বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ- দুটোর উপর দিয়েই।

চলতে চলতে গোয়ালন্দে এসে পদ্মার সঙ্গে দেখা হল যমুনার। যমুনার সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল পদ্মা। যমুনাকে নিয়ে নিল তার সঙ্গে, পৃথিবী দেখতে।

আবার চলতে লাগল সে। এবার চলতে চলতে চাঁদপুর জেলায় গিয়ে সে পেল মেঘনা নদীর দেখা। খুব ব্যস্ত হয়ে মেঘনা বয়ে যাচ্ছে। পদ্মা জিজ্ঞেস করল, তুমি কে বোন? কোথায় যাচ্ছ?

মেঘনা গম্ভীর গলায় বলল, আমি মেঘনা। আমি সমুদ্র দেখতে যাচ্ছি।

          পদ্মা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, সমুদ্র! সেটা আবার কী? কী আছে সেখানে?

          মেঘনা হেসে ফেলল। বলল, সমুদ্র হচ্ছে সেই জায়গা- যেখানে সব নদীদের দেখা হয়। সবাই একসঙ্গে গিয়ে সেখানে মেশে। তারপর সবার পানি একসঙ্গে হয়ে একসঙ্গে চলে। সেই হচ্ছে সমুদ্র। সে বিরাট বড়। অনেক জল তার গায়ে। অনেক নদী তার গায়ে।

পদ্মা অবাক হয়ে বলল, তাই! কখনও শুনিনি তো! মেঘনা, তুমি আমাকে তোমার সাথে সমুদ্রে নিয়ে যাবে?

মেঘনা হাসল। বলল, বেশ তো। চলো।

ব্যস। পদ্মা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে মেঘনার সাথে চলতে শুরু করল। তারা দুজন যখন একসঙ্গে হল, তখন পদ্মার নামটা লোকে ভুলেই গেল। লোকে তাকে মেঘনা নামেই চিনল।

পদ্মার অবশ্য তাতে একটুও দুঃখ নেই। সে সমুদ্রে যাচ্ছে- এটাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের কথা। পদ্মা মেঘনার সাথে চলতে লাগল। চলার পথে সে অনেক শাখা-প্রশাখা তৈরি করল। সেগুলোকে মানুষ খুব সুন্দর সুন্দর নাম দিল। গড়াই, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব- এরকম মজার মজার নাম দিল মানুষ তার শাখাগুলোকে। প্রশাখাগুলোরও নাম রাখল- মধুমতী, পশুর, কপোতাক্ষ- আরো কতকিছু!

এই নদীগুলো যে কত জায়গায় ঘুরল, কতকিছু দেখল! তারা কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর- কত কত জেলায় যে ঘুরে বেড়াল!

শুধু কি তাই! মানুষ যে তাদের কত প্রশংসা করল! পদ্মার পাড়ে মানুষ বসতি গড়ল, তার গায়ে মাঝি নৌকো ভাসালো। তার থৈ থৈ পানিতে নীল আকাশের নিচে ভাটিয়ালি গান গেয়ে বৈঠা বায় মাঝি, তার নৌকার রঙিন পাল আকাশে ওড়ে। পদ্মার পানিতে অনেক মাছ ঘর বানাল। রূপোর মতো চকচকে ইলিশ ঘুরে বেড়ায় তার বুকে। পদ্মার যে কী আনন্দ! তার মাথার উপরে আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খচিল। জেলেরা তার বুকে জাল ফেলে মাছ ধরে। পদ্মা হয়ে গেল খুব চঞ্চল, ব্যস্ত একটা নদী।

সেই সাথে সে হয়ে উঠল অপূর্ব সুন্দরী। তাকে দেখে বাংলার কবি-সাহিত্যিকেরা বললেন, এমন সুন্দর নদী তাঁরা দেখেননি আর। প্রায় সবাই পদ্মাকে নিয়ে গান লিখলেন, কবিতা লিখলেন, গল্প-উপন্যাস লিখলেন। মানিক বন্দোপাধ্যায় পদ্মার পাড়ের মানুষদেরকে নিয়ে যে উপন্যাসটা লিখলেন, তার নাম দিলেন “পদ্মা নদীর মাঝি।” সেই উপন্যাস সবাই খুব পছন্দ করল।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে গান লিখলেন-

পদ্মার ঢেউ রে-

ও মোর শূন্য হৃদয়, পদ্ম নিয়ে যা যা রে…

পদ্মার খুব আনন্দ। কত বড় বড় মানুষেরা তাকে নিয়ে লেখে, তার ছবি আঁকে। সে চঞ্চল মেয়ে হয়ে ফুরফুরে মনে কুলকুল করে বয়ে চলল।

চলতে চলতে পদ্মা আর মেঘনা সত্যিই একদিন সমুদ্রের কাছে পৌঁছে গেল। নদীটা আনন্দে চিৎকার দিয়ে বলল, এত্ত সুন্দর সমুদ্র! এত্ত সুন্দর!

হাসিখুশি সমুদ্র তাকে দেখে হেসে বলল, এসো। আমার কাছে এসো। আমার বুকে অনেক আনন্দ, অনেক খুশি।

আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পদ্মা-মেঘনা ঝাঁপিয়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে। সেই সমুদ্রের নাম বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগর পরম মমতায় নদীটাকে বুকে টেনে নিল।

যখন পদ্মা মেঘনার সাথে বঙ্গোপসাগরে এসে পৌঁছুল, তখন সে ইতোমধ্যে অনেক লম্বা হয়ে গেছে। সে হয়ে গেছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। তার দৈর্ঘ্য তখন ৩৬৬ কিলোমিটার।

অন্য নদীরা বলল, পদ্মা! তুই তো এই দেশের মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গেছিস! তোকে ছাড়া এ দেশের মানুষেরা কিছু ভাবতেই পারে না!

পদ্মা লজ্জা পেয়ে হাসল। তারপর সে মিশে গেল সমুদ্রের বুকে। সমুদ্রের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়েই সে পৃথিবী দেখবে, সমুদ্রের পরম মমতায় নিজেকে আগলে রেখে।

biswerjanalapadma02

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

Leave a Reply