প্রতিবেশী গাছ সব পর্ব একত্রে

বর্ধমান শহরের দক্ষিণে যে রাস্তাটি আরামবাগ চলে গেছে এই রাস্তা ধরে আট কিলোমিটার দূরে বাঁকুড়া মোড়। এখান থেকে একটি রাস্তা সোজা পশ্চিমদিকে চলে গেছে বাঁকুড়া। বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর। কেশবপুরের পাশেই শাঁকারি। শাঁকারি গ্রামে রয়েছে কয়েকটি পুরানো মন্দির। এক দিন সকালে শাঁকারির মন্দিরগুলি দেখবো বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। কেশবপুর আসতেই মনে পড়লো পুরানো দিনের কথা।
বেশ কয়েক দশক আগে স্কুল জীবন সবে শেষ হয়েছে, সেই সময় আমাদের বাড়ীতে ভাড়া ছিলেন ডাঃ সব্বির আমেদ। এই পরিবারের সঙ্গে আমাদের যেন আত্মীয়তা হয়ে গেছিল। ডাঃ আমেদ আমার ছোটো জামাইবাবুর বন্ধু। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কয়েক বছর আমাদের বাড়ীতে থাকার পর বহরমপুর চলে যান। সম্ভবত চাকরিতে বদলির কারণে। শুনেছিলাম ওনাদের বাড়ী কেশবপুর। আমার পরিবারের অন্যান্যরা কেশবপুর এসেছিলেন, আমার যাওয়া হয় নি। কেশবপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে রাস্তার ধারে একটি গাছে উজ্জ্বল লাল থোকা থোকা ফুল দেখে মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গী এই অসাধারণ সুন্দর ফুলটির নাম জানালেন মন্দার।
অভিধানে লিখেছে, মন্দার স্বর্গের বৃক্ষ বা পুষ্প। সত্যই স্বর্গের পুষ্পই বটে। এই ফুলকে না ভালবেসে থাকা যায় না। সংস্কৃত নাম পারিজাত। তবে স্বর্গের পারিজাত আর আমাদের দেখা এই পারিজাত এক কিনা, তা আমার জানা নেই। ইংরেজিতে এই গাছটিকে বলে The Coral tree বা Tiger’s Claw । ফুলগুলি দেখে বাঘনখের কথাই মনে আসে। সঠিক নামকরণ বটে।
মন্দার বা মাদার ফুল উজ্জ্বল টকটকে লাল ফুল। ডালে থোকা থোকা ধরে থাকে। গ্রাম বাংলায় এই গাছ প্রচুর দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে প্রায় আর দেখা যায় না। গাছের কাণ্ড আর সরু সরু লম্বা ডালে অসংখ্য ছোটো ছোটো কাঁটা থাকে। গ্রামের লোকেরা এই গাছের ডাল কেটে বাগানে বেড়ার খুঁটি হিসাবে ব্যবহার করতো। আজ আর তা দেখা যায় না। বেড়ার সরু সরু ডালগুলি কিছুকাল পরে গাছ হিসাবে পুনর্জন্ম নিত। গাছে পাতা আসত, আর শীতের শেষে গাছ ভরে যেত অতি উজ্জ্বল টকটকে লাল ফুলের থোকায়। এই সুন্দর থোকা থোকা ফুলের দিকে আমাদের মতো মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি – কতক্ষণ তা জানি না। অথচ গ্রামের মানুষ প্রায় ভুলে গেছে এর ব্যবহার। তাদের আকর্ষণ করে না এই ফুল, কেন তা জানিনা।
তবে এই ফুলের গন্ধ বা সুবাস নেই বললেই চলে। ফুলের বাহারেই মন ভরে ওঠে, তাই সুবাসের কথা মনে আসে না। গাছের ডাল শক্ত নয়। সরু সরু লম্বা ডাল সারা গাছকে পূর্ণ করে রাখে। যখন গাছে ফুল ধরে, লম্বা সরু ডালে পাতা আর থাকে না। বাহারি ফুলের আকর্ষণে পাখি আর মৌমাছি এসে ভীড় করে।
ভারত মহাদেশ ছাড়া পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তর অংশে এই গাছ দেখা যায়। এই গাছ অনেক লম্বা হয়। পাতাগুলি প্রায় ছয় ইঞ্চি লম্বা-চওড়া, হৃদয় আকৃতির। ফলগুলি বিন জাতীয়। দক্ষিণ ভারতে কফি গাছের আচ্ছাদক গাছ হিসাবে ব্যবহার হয়। পাতা এবং ডালে এল্কালয়েড রয়েছে। এই গাছের ভেষজ ব্যবহার রয়েছে।
পাতার রস কাটাছেঁড়া, ফোলা, ত্বকের রোগ বা কানের ব্যথায় ব্যবহার করা হয়। পাতার নির্যাস খিঁচুনি, বমি, অনিদ্রা, জ্বর, প্রস্রাবের কষ্ট ইত্যাদি রোগে ব্যবহৃত হয়। গাছটির বিজ্ঞান সম্মত নাম Erythrina variegate (= Erythrina indica) । গাছটি Fabaceae বা মটরগাছ পরিবারভুক্ত।
ছবিঃ লেখক
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব পর্ব একত্রে
ছবিঃ লেখক