বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বিচিত্র জীবজগত–বাঞ্ছারামের বাগান জাতবেদা মিশ্র শরৎ ২০১৮

বিচিত্র জীবজগত  সব পর্ব একত্রে

জাতবেদা মিশ্র

এই পৃথিবী বড় আজব জায়গা। প্রকৃতি বড়ো অদ্ভুত। সে চমক দেখাতে ভালোবাসে। কখনও তথাস্তু বলে অমরত্ব দেয় আর কখনও কারো প্রাণ বিনা নোটিশে এক্কেরে ঘচাং..

মানুষের তৈরী কিছু চরিত্র যেমন লালকমল- নীলকমল, ক্যাপ্টেন স্পার্ক, সুপারম্যান, হাল্ক, হ্যারি পটার সব কলমের এক খোঁচায় অমর হয়ে আছে।

বাঞ্ছারামের বাগান সিনেমাটিতে যেমন হাজার মৃত্যু কামনাতেও বাঞ্ছা আর কিছুতেই মরে না আর জমিদারবাবু বেচারা চিন্তায় ভাবনায় নিজেই পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। 

উপরে যে সব মনুষ্য সৃষ্ট চরিত্রগুলির নাম বললাম, তাদের স্রষ্টারা কিন্তু কাজে অমর হয়েছেন।  

মানুষ সেটুকুই পারে। আর প্রকৃতি এমনি এমনিই কিছু প্রাণীকে অমরত্ব দিয়েছে। 

আজ তেমনই কয়েকটি প্রাণীর কথা বলব।

প্রথম:-

হযবরল গল্পের উদো বুধোকে মনে আছে? যাদের ৪০ বছরের পর ৩৯, ৩৮, ৩৭  এইভাবে বয়েস পিছন দিকে যেত? তারপর আবার বেড়ে ৪০ হয়ে আবার পিছনে হাঁটা। ফলে বয়েস বাড়তে বাড়তে মরার ভয় নেই। 

এরাও সুকুমার রায় না পড়েই সে সব আয়ত্ব করে ফেলেছে। এদের নাম Turritopsis Doohmii .. এক ধরনের জেলিফিশ । এরা অসুস্থ হলে অথবা আঘাত পেলে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ছোট্টবেলার Polyp Stage  এ ফিরে যায়। তারপর নিজের সমস্ত কোষগুলিকে নতুন করে সাজিয়ে , পালিশ টালিশ করে আবার একদম ঝাঁ চকচকে হয়ে তিনদিনের মধ্যে বর্তমান অবস্থায় ফিরে আসে।  ফলে বয়েস বাড়েও না মরেও না। মৃত্যুকে কাঁচকলা দেখিয়ে মুকুটে “Immortal Jellyfish” এর পালক গুঁজে কলার উঁচিয়ে দিব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

দ্বিতীয়:-

গ্রিক পুরাণ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা হাইড্রা নামটির সঙ্গে পরিচিত। এটি একটা নয় মাথাওলা সাপ। যার একটি মাথা কাটলে সেখানে আরো দুটি গজাত। শেষমেশ হারকিউলিস অনেক বুদ্ধি করে তাকে মেরে ফেলে। 

অথবা ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনীর রক্তবীজ। যার প্রতি ফোঁটা রক্ত থেকে নতুন দৈত্য জন্ম নিত।

Flatworm রাও ঠিক তেমন। এটি এক ধরনের কৃমি জাতীয় প্রাণী। এদের আধাআধি বা লম্বালম্বি যেমন ভাবেই কাটুন টুকরো দুটি আলাদা আলাদা দুটি Flatworm এ রূপান্তরিত হয়ে যাবে। তারপর নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত  কোষগুলিকে নতুনের মতো করে  সারিয়ে ফেলে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াবে। 

মানুষ এত পড়েও কিছু শিখল না। আর এদের দেখুন, গ্রিক মাইথলজি বা ভারতের পৌরাণিক গল্প না পড়েই দিব্য  আত্মস্থ করেছে। কে জানে হয়তো পড়তেও পারে বা!!!! 

তৃতীয়:-

এদের কথা মনে হলেই মিশরের দেবদেবীদের কথা মনে হয়। কারো মাথা ঈগলের মতো, কারো শেয়ালের। বিশেষ করে সোবেক, যার মাথা কুমিরের মতো। তিনি শক্তির দেবতা।

এই প্রাণীটিকে পুরোপোরি অমরত্বের তকমা দেওয়া না গেলেও এরা ভাগীদার তো বটেই। এনারা হলেন Bowhead Whale (ধনুকমুখো তিমি) । এরা পৃথিবীর সব থেকে পুরনো স্তন্যপায়ী প্রাণী। তিমির নানা প্রজাতিকে মোটামুটি ৭০ বছর অব্দি বাঁচতে দেখা যায়। 

ধনুকের মতো মাথা হলেও এরা নিজেরা ধনুর্বিদ্যা জানে কিনা সেটা জানা না গেলেও ১৯৯০ সালে কিছু বিজ্ঞানী একটি Bowhead Whale  এর গায়ে অষ্টাদশ শতাব্দির কিছু অস্ত্রশস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পেয়েছিলেন। এই প্রজাতির সব থেকে বেশি বয়স্ক যে তিমিটিকে বিজ্ঞানীরা দেখে ছিলেন তার বয়স তখন ছিল২১১। সেটি জেলেদের একটি জালে ধরা পড়েছিল। বিজ্ঞানীরা তাকে বাঁচিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সময় সে কী ভাষায় ধন্যবাদ না গালি দিয়েছিল জানা যায়না অবশ্য। কে জানে এদের নিয়ে মিশরের কোথাও কোনো দেবদেবীর গল্প আছে কিনা।

চতুর্থ-

“ন জয়তে মৃয়তে বা কদাচিন
নয়ম ভুতবা ভবিতা বা ন ভূয়া
অজো নিত্যা শাশ্বত ইয়ম পুরানো
ন হণ্যতে হণ্যমানে শরীরে”

ভাবছেন হল কী? হঠাৎ গীতা আওড়াচ্ছি কেন? হঠাৎ আত্মা নিয়ে আবেগ এল কেন!! আরে এখন যার কথা বলব তার কথা বলতে গেলে এটাই মনে পড়ে সবার আগে। 
ইনি একজন ব্যাকটেরিয়া । নাম হল Deinococcus Radiodurans.. শ্লোকটিতে যে আত্মার কথা বলা হয়েছে তার সাথে এদের ফারাক হল , এদের শুধু জন্মটুকু আছে বাকি আর সব এক। এদের DNA এমনভাবে তৈরী যে এরা মরে গিয়েও আবার নতুন করে জীবিত হয়ে ফিরে আসে। এরা যে কোন  রকম ঠান্ডা, জলহীনতা, গহ্বর, অ্যাসিড সব কিছুতে সব সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে। এরা দেড় লক্ষ র‍্যাড পরিমাণের গামা রশ্মি বিকিরণ সহ্য করেও বেঁচে থাকে। এই মাপের তিনহাজার ভাগের এক ভাগ বিকিরণেই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যু হয়।  এদের বিকীরণ-প্রতিরোধী জীবাণু বলে। 

বিজ্ঞানীরা এদের মুকুটে “দুনিয়ার সেরা শক্তিমান” এর পালক গুঁজে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্পে যেমন “কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই,” এরা ঠিক উল্টো। ইহারা মরিয়াও প্রমাণ রাখেন যে বাঁচিয়া আছেন।

পঞ্চম-

এবার যার কথা বলব, তাকে “চিপকু” সম্মানে ভুষিত করাই যায়। টার্ডিগ্রেড-এর এর মত ঠ্যাঁটা ও নাছোড় প্রাণ বিরল। 
এরা শ্যাওলাভরা গাছেই বেশি থাকে। এই মাইক্রোস্কোপিক প্রাণীটি ৩০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৩০ বছর না খেয়েও বেঁচে থাকতে পারে। এরা এদের ব্বিপাক প্রক্রিয়া নিজেদের ইচ্ছেয় বন্ধ রাখতে পারে। আটটি পা যুক্ত এই মাইক্রোস্কোপিক প্রাণীটি যে কোনো পরিবেশে যেমন- গভীর সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল, মহাকাশ এমনকি সুপারনোভাতেও বাঁচার ক্ষমতা রাখে। 
স্টার ট্রেক-এর নতুন ডিসকভারি সিরিজে এদের কথা বলা হয়েছে। ছবির চরিত্রটি এই প্রাণীটি থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এর কিছু জিনিস আলাদা দেখানো হয়েছে। যেমন, ছবির প্রাণীটি ইন্টারডাইমেনশনাল ট্র্যাভেল করতে পারে।  
আসল টার্ডিগ্রেডদের “ওয়াটার বেয়ার ” অথবা “মস পিগলেট” নামেও ডাকা হয়। আসল রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে এবং মহাকাশে সর্বত্র এরা বিরাজমান। এই রণে, বনে ইত্যাদি শুনে আর কারো কথা মনে পড়লো কি? তবে তিনি কিন্তু মহাকাশচারী হতে পারেননি। 

শেষমেশ বাঞ্ছারাম মরেছিল কিনা জানা যায় না অবশ্য। তবে মানুষ যখন, মরবেই। তবে, মানুষের মতো এদের মরে গিয়ে প্রমাণ দিতে হয় না যে এরা বেঁচে ছিল। এরা বেঁচে থাকবে পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত অথবা তার পরেও….

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-সব লেখা একত্রে

Leave a Reply