সব লেখা একত্রে–উমা ভট্টাচার্য

উমা ভট্টাচার্য
হেডি লামর্ নামটি আমার মত অনেকের কাছেই বোধ হয় খুব একটা পরিচিত নাম নয়। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী। কিন্তু তাঁর জীবনের আর একটি দিক, আর একটি পরিচয় আজও অনেকের কাছে প্রায় অজ্ঞাত।
চলচ্চিত্রামোদী কিছু মানুষজন নিশ্চয়ই অভিনেত্রী হেডিকে জানেন কিন্তু বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর নামটি অনেকেই জানি না। জয়ঢাকের এবারের ‘সেই মেয়েরা’ পর্বে থাকছে তাঁর জীবনের আর বৈজ্ঞানিক অবদানের কথা।
বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় যোগাযোগের প্রধান হাতিয়ার যে-সব ওয়্যারলেস মাধ্যম, যথা ফ্যাক্স, ওয়াই-ফাই, ব্লু-টুথ এসব নামগুলির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। শেষ দুটি ছাড়া আজ প্রায় সব মানুষেরই দৈনন্দিন জীবন একপ্রকার অচল।
অথচ বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সাধারণ নাগরিক জীবনে এগুলির অস্তিত্বই ছিল না। সেই সময়ে নিজের অজান্তেই হেডি লামর্ শব্দসংকেত পাঠাবার যে ওয়্যারলেস পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিলেন সেই পদ্ধতিটিই আজকের ডিজিটাল যোগাযোগের দুনিয়ায় হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। এক্ষেত্রে তিনিই পথিকৃৎ।
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর দূরদর্শী বিজ্ঞানী নিকোলা টেস্লা অবশ্য বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই আগামীদিনের পৃথিবীতে ইন্টারনেটের আবশ্যিকতার কথা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। একাধারে ইলেকট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, পদার্থবিদ ও উদ্ভাবক, নিকোলা টেস্লা আগামীদিনে আন্তর্জালে যুক্ত এক পৃথিবীর কথা ঘোষণা করেছিলেন।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ‘সেঞ্চুরি ম্যাগাজিনে’ লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে এক ‘ওয়ার্লড সিস্টেম’(বিশ্বজনীন যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে) আসবে যখন সারা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে রেডিওসংকেত, টেলিফোনের মেসেজ, খবরাখবর, গান, ছবি সবই পৌঁছে যাবে মুহূর্তে, আর তা সম্ভব হবে এক ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে’।
নিকোলা টেস্লার সেই ‘ওয়ার্লড সিস্টেম’-এর ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছিল অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান অভিনেত্রী হেডি লামর্-এর হাত ধরে। অসাধারণ কার্যকরী আবিষ্কারটি নিজের অজান্তেই তিনি করেছিলেন অন্তরের তাগিদে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে অ্যালায়েড শক্তির নৌযুদ্ধের সুবিধার্থে যে পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, সেই আবিষ্কারেই নিহিত ছিল আজকের দিনের ওয়্যারলেস সিস্টেমের, সেল ফোনের কার্যকারিতার প্রধান হাতিয়ার ব্লু-টুথ আর ওয়াই-ফাই সিস্টেমের ভ্রূণ, যা সেল ফোনের মেরুদণ্ড।
এই কাজে তিনি সাথী করেছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও কম্পোজার জর্জ আনথিয়েলকে। নিজের ব্যক্তিগত পরীক্ষাগারে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ‘ফ্রিকয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম’-যা সংক্ষেপে ‘এফ এইচ এস এস’ সিস্টেম নামে পরিচিত বিজ্ঞানীদের কাছে।
এ-পদ্ধতিতে অতি অনিয়মিতভাবে(ইরেগুলার)দ্রুত পরিবর্তনশীল কম্পাঙ্কে বেতারে (ওয়্যারলেস)শব্দতরঙ্গকে পাঠানো যায় সংবাহকের কাছে। সেই সংবাহক মাধ্যম রেডিও সিগনালকে সম্প্রচার করে শব্দসংকেত পাঠাতে পারে গ্রাহকের কাছে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি চলে একটি ‘রেডিও গাইডেড সিস্টেমে’।
এই প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি তৈরি করেছিলেন ‘সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম’ যার মাধ্যমে সাংকেতিক ভাষায় সংবাদ পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। প্রতিপক্ষ সে সংবাদ ‘ডি-কোড’ করতে পারবে না এমনই ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁরা, এককথায় ‘আনব্রেকেবল্ কোড’এ সংকেত পৌঁছুত গ্রাহকের কাছে যা একমাত্র গ্রাহকই বুঝতে পারত।
তাঁরা এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিত্রশক্তির পক্ষে নাৎসীদের যুদ্ধাস্ত্রের মোকাবিলা করতে। তাঁর আবিষ্কৃত ‘ফ্রিকোয়েন্সি হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম প্রযুক্তি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জর্জ অ্যানথিয়েলের ‘প্রোগ্রামড পিয়ানো’ সিস্টেম। সিগনাল প্রেরণ আর গ্রহনের মধ্যবর্তী সময়ে রেডিও সিগনালকে অসম(ইরেগুলার) ফ্রিকোয়েন্সিতে ছড়িয়ে দিয়ে গ্রাহকের কাছে সঙ্কেত প্রেরণ করতেন।
প্রতিপক্ষের কাছে এই প্রযুক্তি ছিল অজানা। নৌযুদ্ধে হিটলারসমর্থক অক্ষশক্তির ব্যবহৃত অস্ত্র যেন মিত্রশক্তির নিক্ষিপ্ত টর্পেডোকে জ্যাম না করতে পারে সেজন্য তাঁরা এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করে গোপনে সংকেত পাঠাতে শুরু করেছিলেন ও সফল হয়েছিলেন।
অসামান্য এই প্রযুক্তি আবিষ্কারের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছিলেন যে হেডি লামর্, তাঁর কিন্তু কোন প্রথাগত বিজ্ঞান শিক্ষাই ছিল না। তিনি ছিলেন আদ্যন্ত স্ব-শিক্ষিত। বিজ্ঞান তো দূরের কথা সাধারণ প্রথাগত শিক্ষারও সুযোগ পাননি সেভাবে।
জন্মসূত্রে ইহুদি পিতামাতার সন্তান হেডি জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে, ভিয়েনাতে। বাবা গার্ট্রুড কিয়েসলারের আদি বাড়ি বর্তমান ইউক্রেনের লেমবার্গে হলেও ভিয়েনাতে তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যাঙ্ক ডিরেকটর। মা এমিল কিয়েসলার ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত ইহুদিকন্যা। ভালো পিয়ানোবাদিকা, অত্যন্ত অভিজাত স্বভাবের মহিলা। এই স্বভাবটি তাঁর কন্যার মধ্যেও বাহিত হয়েছিল।
সুদূর অতীত থেকেই পৃথিবীর নানা দেশে বিশেষত ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি নানাভাবে আক্রমণ চালু ছিল। এমিল কিয়েসলার ঝঞ্ঝাট এড়াতে নিজে জুডাইজম ত্যাগ করে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। অসামান্য সুন্দরী কন্যা হেডিকেও ক্যাথলিক নাগরিক হিসাবে বড়ো করে তুলেছিলেন। অস্ট্রিয়াতে বাস করার সময় নাৎসী দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে হেডি মাকে নিয়ে চলে যান আমেরিকাতে। সেখানেই তাঁর রূপালী পর্দার জগতে সফল পদার্পণ।
১৯২০ সালের মধ্যেই অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর অসামান্য অভিনয় প্রতিভা দেখে একজন প্রযোজক তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন বার্লিনে। সেখানে থিয়েটারের ট্রেনিং শেষ হবার পর অভিনয় জগতে প্রবেশের জন্য হেডি ফিরে আসেন ভিয়েনাতে। ১৯৩৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন নামকরা অভিনেত্রী। অভিনেত্রী হিসাবে নাম করার পর তাঁর স্তাবকের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এই সময় ভিয়েনায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিখ্যাত অস্ত্রব্যবসায়ী ফ্রিৎজ্ ম্যান্ডল্-এর নজরে পড়ে গেলেন হেডি। একরকম বাধ্য হয়ে তাঁর ঘরনিও হলেন।
বিয়ের পর থেকেই হেডির খোলামেলা অভিনেত্রী জীবন আর পছন্দ ছিল না গোঁড়া স্বভাবের ম্যান্ডল্-এর। তাঁর চাপে হেডিকে অভিনয় পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছিল। নিরুপায় হেডি পালাবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
বিপুল অর্থের অধিকারী, প্রভাবশালী এবং রূঢ় প্রকৃতির ম্যান্ডল্-এর ওঠাবসা ছিল হিটলার, মুসোলিনীর মত বড় মাপের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। হেডির লেখা থেকে জানা যায় যে, ম্যান্ডল্-এর বাড়িতে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে ও পার্টিতে এঁদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তিন বছরের বিবাহিত জীবনে অতিষ্টপ্রায় হেডিকে একপ্রকার বন্দিনীর মত জীবন কাটাতে হচ্ছিল।
তবে এই সময়ে ফ্রিৎজ্ ম্যান্ডল্ নিজের অজান্তেই হেডির একটি বিশেষ উপকার করেছিলেন। তিনি তাঁর বাড়িতে আয়োজিত বিভিন্ন পার্টিতে সমবেত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সুন্দরী স্ত্রী হেডির পরিচয় করিয়ে দিতেন। আর সেইসূত্রে নিজের অজান্তেই হেডিকে ফলিত বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে আহরিত ফলিত বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি জ্ঞান হেডির পরবর্তী জীবনে একজন বিখ্যাত আবিষ্কর্ত্রী হয়ে ওঠার পথের পাথেয় হয়েছিল।
ইউরোপে যুদ্ধের বাজারে অস্ত্রব্যবসায়ীদেরই ছিল রমরমা। শুধু অস্ত্রের বেচাকেনাই নয় ফ্রিৎজ্ ম্যান্ডল্ অস্ত্র বিশেষত অ্যামুনিশন অর্থাৎ গোলা উৎপাদনও করতেন। তাঁর বিরাট দুর্গের মত প্রাচীর ঘেরা বাড়িটিতেই ছিল কারখানা। হেডি সেখানে হাতে-কলমে কাজ করতে দেখতেন কারিগরদের।
শ্রুতিধর, বুদ্ধিমতী কমবয়সী হেডি সে-সময় যে-জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তাঁর উর্বর মস্তিষ্কে সে-সব বিষয় গেঁথে গিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে হেডি অযাচিতভাবে প্রাপ্ত সেই জ্ঞানের সযত্নে লালন করতেন। তাঁর নানা শখের মধ্যে বিজ্ঞানের নানা প্রযুক্তি নিয়ে চর্চা করাটা ছিল অন্যতম। পরবর্তীকালে অভিনেত্রী জীবনের অবসরে, নির্জনে তিনি সময় কাটাতেন সেই আরব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগের অনুশীলন করে।
ভিয়েনাতে বসবাসের শেষের দিকে স্বামী ফ্রিৎজ ম্যান্ডল্ হেডিকে ঘরে তালাবন্ধ করে আটকেও রাখতেন। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য উদগ্রীব হেডি একদিন ম্যান্ডল্-এর অসতর্কতার সুযোগে পরিচারিকার বেশ ধরে সেই আশ্রয় ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। আঠারো বছর বয়সের মধ্যেই যে মেয়েটি অভিনয়ের জন্য বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন, রোম কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছিলেন, আর এরপর সারা ইউরোপ তাঁর অভিনীত সিনেমাটিকে শ্রেষ্ট শিল্পকীর্তি আখ্যা দিয়েছিল, তিনি কীভাবে অভিনয় ছেড়ে থাকতে পারেন! অতএব পালাতেই হল তাঁকে।
ম্যান্ডল্-এর আশ্রয় ছেড়ে চলে গেলেন প্যারিসে। প্যারিসে গিয়ে অবিলম্বে দেখা করলেন বিখ্যাত এক চিত্রপরিচালকের সঙ্গে। সময়টা ১৯৩৭ সাল। চিত্রপরিচালক লুইস বি মেয়ার নতুন অভিনয় প্রতিভার সন্ধানে তখন ঘুরছিলেন ইউরোপের নানা দেশে। তিনি হেডিকে প্রথমেই নিজের নামটি পালটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিলেন।
তাঁর নির্দেশ অনুসারে নাম পালটিয়ে ‘হেডউইগ এভা মারিয়া কিয়েসলার’ হয়ে গেলেন ‘হেডি লামর্’। নির্বাক চলচিত্রের দিনের একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ছিলেন ‘বারবারা লা মার’(Barbara La Marr)। হেডি নিজের পূর্বনাম ‘হেডউইগ এভা’র সংক্ষিপ্ত রূপ ‘হেডি’টুকু রেখে সাথে জুড়ে নিলেন প্রিয় অভিনেত্রীর নামের শেষের ‘লা মার’ অংশটুকু, পরিচিত হলেন ‘হেডি লামর্’ নামে।
শুরু হল অভিনয় জগতে তাঁর জীবনের সুবর্ণ অধ্যায়। তিনি এরপর চলে গেলেন আমেরিকায়। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যেই অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান অভিনেত্রী বলে পরিচিত হেডির ১৮টি বিখ্যাত ফিল্ম চিত্রায়িত হল। শিক্ষার ক্ষুধা তাঁর অবশ্যই ছিল, আর তাই অবসর কাটাতেন নিজের হবি নিয়ে। বিবিধ বিষয় নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা, আর কিছু না কিছু আবিষ্কারের নেশা ছিল প্রবল।
আমেরিকায় নিজের বাড়িতে অবসর যাপনের জন্য নিরালায় একটি ল্যাবরেটরিই স্থাপন করেছিলেন বলা যায়, যে ঘরে ছিল নিজের একটি ‘এক্সপেরিমেন্টাল টেবিল’। সেখানেই তিনি বিজ্ঞানের নানা টুকিটাকি পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন। সেখানে কারোর প্রবেশ নিষেধ ছিল। সেই অমূল্য সময় ছিল নিজের জন্য বরাদ্দ। সেখানে বসে কাজ করতেই উদ্ভাবন করেছিলেন ‘ইমপ্রুভড ট্রাফিক স্পটলাইট’। এছাড়া একটি ট্যাবলেটও উদ্ভাবন করেছিলেন যেটি জলে ডোবালে পাওয়া যেতে পারে একটি কার্বোনেটেড ড্রিংক, যদিও এই উদ্ভাবন সাফল্য পায়নি।
হেডি তাঁর যে বিখ্যাত আবিষ্কারটি করলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং সেটির সফল প্রয়োগও করলেন অ্যালায়েড পাওয়ার এর নৌবাহিনীকে প্রতিপক্ষের টর্পেডোহানা থেকে বাঁচানোর সংকেত পাঠাতে একথা প্রথমেই বলেছি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৌযুদ্ধে সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমেরিকান নেভি উপকৃত হলেও নিজেদের নিয়মে অ-মার্কিন কোন আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে তাদের আপত্তি ছিল। গত শতাব্দির ষাটের দশকের আগে পর্যন্ত হেডির আবিষ্কৃত ‘সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম’কে তাঁরা ব্যবহার না করলেও হেডি ও তাঁর সহ-উদ্ভাবক জর্জ অ্যানথিয়েল কিন্তু ১৯৪২ সালেই ‘রেডিও গাইডেড সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম’ উদ্ভাবনের জন্য পেটেন্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য মহিলা বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের মত হেডিও মহিলা বলে চিরাচরিত নিয়মে যথোপযুক্ত সম্মান পাননি।
সকলের অজান্তেই তাঁর আবিষ্কার হয়ে উঠেছিল এক নতুন সিস্টেমের মেরুদন্ড। ফ্যাক্স, সেল-ফোন, ব্লু-টুথ, ওয়াই-ফাই প্রভৃতি ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন সিস্টেমের জয়যাত্রা শুরু তাঁর আবিষ্কারের হাত ধরে। কয়েক দশকের মধ্যেই ডিজিটাল দুনিয়ার বিপ্লব ঘটে গেল।সেল ফোনের দুনিয়ায় এল যুগান্তর।
তাঁর বিজ্ঞানপ্রতিভা ধীরে ধীরে এত উন্নত হচ্ছিল যে বিখ্যাত অ্যাভিয়েশন টাইকুন হাওয়ার্ড হিউগস্ একসময় নিজের বিমানের ডিজাইনের উন্নতি ঘটানোর জন্য ও নির্মিত বিমানের গতিবেগ বাড়ানোর উপায় আবিষ্কারের জন্য হেডির সাহায্য চাইলেন। হেডির অসামান্য বিজ্ঞান প্রতিভা আর একাগ্রতার কথা জানতেন তিনি। বন্ধু হিউগস্-এর আবেদনে সারা দিয়ে হেডি শুরু করলেন অ্যারোডায়নামিক্স নিয়ে পড়াশোনা। অবসর সময়ের বেশীর ভাগটাই মনোযোগী পরীক্ষার্থিনীর মত পড়তে লাগলেন পাখিদের উড়ানপদ্ধতি, মাছেদের জলের মধ্যে চলনপদ্ধতির নানা খুঁটিনাটি বিষয়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি হিউগস্কে নতুন আইডিয়ার যোগান দিলেন, নতুন ধরনের বিমানের স্কেচ এঁকে কিছু নির্দেশসহ হিউগস্-এর হাতে তুলে দিলেন। এমনই ছিল তাঁর বিজ্ঞানপ্রতিভা আর ভিস্যুয়ালাইজেশন ক্ষমতা।
যুদ্ধের বাজারে তিনি কিছু দিনের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহ অভিযানেও অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর সহ-আবিষ্কারক জর্জ অ্যানাথিয়েল ‘ইলেকট্রনিক ফ্রণ্টিয়ার ফাউন্ডেশন পাইওনিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ আর ‘বুলবি গ্নাস স্পিরিট অফ অ্যাচিভমেন্ট ব্রোঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। শুধুমাত্র বিজ্ঞান, ব্যাবসা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মৌলিক জনহিতকর কাজের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হত।
বিখ্যাত অভিনেত্রী আর অসামান্য বিজ্ঞান প্রতিভার অধিকারী হেডির শেষ জীবনটি কিন্তু খুব সুখে কাটেনি। ২০০০ সালের ১৯শে জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে তাঁর ইহজীবন শেষ হয়ে যায়। তাঁর কাজের মধ্যেই তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন এই প্রার্থনা করে শেষ করি হেডি লেমর্ এর জীবনকথা। এক বিস্মৃত উদ্ভাবকের উদ্দেশ্যে এভাবেই জানাই শ্রদ্ধা।