স্মরণীয় যাঁরা ইন্দ্রলাল রায় পুষ্পেন মণ্ডল বসন্ত ২০১৮

স্মরণীয় যাঁরা

 ১৯৩২ সনে জে আর ডি টাটা নন, তাঁর অনেক আগেই বিমানের জয়স্টিক ধরেছিলেন এক ভারতীয়। দেশ থেকে বহুদূরে, জার্মান যুদ্ধবিমানের সঙ্গেমুখোমুখি সংগ্রামে। মৃত্যুর শতবর্ষে জয়ঢাকের স্মরণ।

পুষ্পেন মণ্ডল। 

প্রথম এবং একমাত্র ভারতীয়, যিনি বোমারু বিমান নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আকাশপথে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাঁধিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন এক বাঙালি। নাম ইন্দ্রলাল রায়। মাত্র উনিশ বছর বয়েসে ইউরোপীয় রণাঙ্গনে বাঘা বাঘা যুদ্ধবাজদের ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন মাঝ আকাশে। মাত্র ১৭০ ঘণ্টার উড়ানে দশটি উল্লেখযোগ্য বিজয় পেয়েছিলেন তিনি। সেই সাহসী ছেলেটির কথা আজকে আমি বলব তোমাদের।

পেয়ারেলাল রায় আর ললিতা রায়ের দ্বিতীয় সন্তান ইন্দ্রলাল রায় জন্মেছিলেন ২রা ডিসেম্বর, ১৮৯৮, কলকাতায়। আদরের ডাক নাম ছিল ‘লাড্ডি’। তৎকালীন ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে এক অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্ম হয়েছিল তাঁর। বাবা পেয়ারেলাল রায় ছিলেন এক নামকরা ব্যারিস্টার এবং ‘জেনারেল অফ পাবলিক প্রসিকিউশন’। বড় দাদা পরেশলাল রায় (১৮৯৩-১৯৭৯) যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় আর্টিলারি বিভাগের প্রথম ব্যাটেলিয়ানে। তিনি ছিলেন বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। পরবর্তী কালে যাঁকে ‘ভারতীয় বক্সিংএর পিতা’ বলা হত। ইন্দ্রলালের মামার বাড়ির দাদু ডঃ সূর্যকুমার চক্রবর্তী ছিলেন ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রথম পাশ্চাত্য ওষুধের ডাক্তার। তাঁর ভাগ্নে সুব্রত মুখার্জি (১৯১১-১৯৬০) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জঙ্গি বিমানের পাইলট ছিলেন ও ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বায়ুসেনায় যোগ দিয়ে হয়েছিলেন ‘চিফ অফ এয়ার স্টাফ’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হল ইন্দ্রলাল তখন লন্ডনের ‘সেন্ট পল’স’ স্কুলের ছাত্র। যোগ দিলেন ‘রয়্যাল ফ্লাইং ক্রপস’এ। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি সমস্যা আছে এই অজুহাতে প্রথমেই বাদ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। পরে লন্ডনের এক বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পুণরায় সুযোগ পান তিনি। পাঁচ মাসের ট্রেনিং-এর পর ৪ঠা এপ্রিল, ১৯১৭ সালে, আঠারো বছর বয়েসে পাকাপাকি ভাবে কাজ শুরু করেন ব্রিটিশ বায়ুসেনায়। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদাধিকারী রূপে ৫৬ স্কোয়ার্ডন-এ যোগ দিলেন ৩০শে অক্টোবর।

কিন্তু দু’মাসের মধ্যে যুদ্ধবিমানের ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করে শয্যাশায়ী হন। কয়েক মাস পর সুস্থ হয়ে আবার যোগ দিলেন ‘ইকুইপমেন্ট অফিসার’ হিসাবে। কিন্তু মাটিতে পড়ে থাকার পাত্র তিনি ছিলেন না। যুদ্ধের আকাশটাই যেন ছিল তাঁর স্বপ্নের গতিপথ। দু’সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় পাস করে ক্যাপ্টেন জর্জ ম্যাকএলরসের অধীনে ৪০ নং স্কোয়ার্ডনে যোগ দিলেন। সেটা ছিল ১৯১৮ সালের জুন মাস।

যুদ্ধ বিমানের সিটে বসার তের দিনের মধ্যে দশখানা উল্লেখযোগ্য বিজয়ের ধ্বজা উড়িয়ে ছিলেন তিনি। প্রথম জার্মান বিমান ধ্বংস করেন ৬ই জুলাই, ১৯১৮। তারপর ৮ই জুলাই তিনটি, ১৩ই জুলাই দুটি, ১৫ই জুলাই আবার দুটি, ১৮ ও ১৯শে জুলাই একটি করে বিপক্ষ শিবিরের যুদ্ধ বিমান গুঁড়িয়ে দেন। এই দশটির মধ্যে অবশ্য দুটি বিমান যৌথভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল।    

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একদিকে ছিল ‘ইউনাইটেড কিংডম অফ ব্রিটেন’, ফ্রান্স, ও রাশিয়ার জোট। যাকে বলা হত ‘এলায়েড পাওয়ার’। আর অন্য দিকে জার্মান, ‘অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি’ আর ইটালির জোট বা ‘সেন্ট্রাল পাওয়ার’। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৮শে জুলাই ১৯১৪। শেষ হয়েছিল প্রায় তার চার বছর পর ১১ই নভেম্বর ১৯১৮। অন্তত সাত কোটি সামরিক বাহিনী ও ছ’কোটি সাধারণ ইউরোপিয়ান এই যুদ্ধে সরাসরি ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। যার মধ্যে আনুমানিক নব্বই লক্ষ সৈন্য ও সত্তর লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাসে তখন অবধি সব থেকে বড় বিধ্বংসী যুদ্ধ ছিল এটি।

যুদ্ধের প্রায় শেষ লগ্নে ২২শে জুলাই, ১৯১৮ সালে ফ্রান্সের উত্তর সীমান্তে ‘কারভিন’ শহরের আকাশে জার্মান যুদ্ধ বিমান ‘ফকার ডি. সেভেন’ এর সাথে দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই করাকালীন ‘ডগ ফাইটে’ মারা যান ইন্দ্রলাল রায়। তাঁর ঐ তের দিনের অসাধারণ লড়াই ও দশটি স্মরণীয় বিজয়ের জন্য মরণোত্তর ‘ডিসটিঙ্গুইসড ফ্লাইং ক্রস’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একজন সাহসী ভারতীয় ও বাঙালি তরুণ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে ইন্দ্রলাল রায়ের নাম লেখা আছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে।

১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত সরকার তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ডাকটিকিট তৈরি করেছিলেন। ২০১৮ সাল সেই বীর যুবকের মৃত্যু শতবার্ষিকী।

                 স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

Leave a Reply