স্মরণীয় যাঁরা করুণ কৃষ্ণ মাজুমদার পুষ্পেন মণ্ডল শরৎ ২০১৮

করুণ কৃষ্ণ মজুমদার

পুষ্পেন মণ্ডল

সালটা ১৯৪৪। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সেই সময়ের বিখ্যাত অ্যামেরিকান ম্যাগাজিন ‘লাইফ’এর ১৫ই মে সংখ্যাতে প্রকাশ পেল বারোজন বিশ্বখ্যাত ফ্লাইং অফিসারের নাম। তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন “জাম্বো” বা কেকে মজুমদার নামে এক ভারতীয় যুদ্ধবিমান চালক। বিগত কয়েক বছরে যুদ্ধাকাশে অসামান্য দক্ষতা ও সাহসিকতা দেখিয়ে চমকে দিয়েছিলেন তামাম বিশ্ববাসীকে। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি বেঁচে থাকাকালীন দু’দুবার “ডিসটিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস” পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। রয়্যাল একাডেমির পক্ষ থেকে ব্রিটেনের স্বনামধন্য পোট্রেট আঁকিয়ে ‘উইলিয়াম ড্রিং’ ছবি আঁকলেন “জাম্বো”র।

কে এই বিখ্যাত বাঙালি হিরো ‘জাম্বো’ ওরফে কেকে মজুমদার? তাঁর কথাই আজকে বলব তোমাদের।

পুরো নাম করুণ কৃষ্ণ মজুমদার। ১৯১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর জন্মেছিলেন কলকাতায়। তাঁর দাদু (মায়ের বাবা) ছিলেন আর এক বিখ্যাত মানুষ। ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি ভারতীয় ন্যাশেনাল কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

করুণ কৃষ্ণ মজুমদারের স্কুল জীবন কেটেছিল দার্জিলিঙের “সেন্ট পলস স্কুলে”। স্কুল শেষ করে ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডের কর্নওয়েলে “রয়্যাল এয়ারফোর্স ফ্লাইং কলেজ”এ ভর্তি হন। কলেজ থেকে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে ভারতে ফিরে এলেন। তারপর যোগ দেন সদ্য স্থাপিত ভারতীয় এয়ারফোর্সের ১নং স্কোয়াড্রনে। তাঁর ঝকঝকে স্মার্ট ও বলিষ্ঠ চেহারা, ছ’ফিট উচ্চতা, তেমনি অসাধারণ সাহস, উচ্ছ্বাস ও ব্যক্তিত্বের জন্য তাঁর ডাক নাম হয়েছিল “জাম্বো”।

১৯৪১ সালে জাম্বোকে স্কোয়ার্ডন লিডার পদে প্রোমোশন দিয়ে পাঠানো হল পাকিস্তানের ‘মিরামাসহ’ বিমান ছাউনিতে। ‘ওয়েস্টল্যান্ড ওয়াপিটি’ ও ‘হাকার হার্ট’ নামে যুদ্ধবিমানগুলি ওড়াতে জাম্বো চূড়ান্ত দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ‘ওয়েস্টল্যান্ড লায়সেন্ডার’ নামে আরও আধুনিক বিমান যোগ হল তাঁর বাহিনীতে। কিছুদিন তাঁকে এই নতুন যুদ্ধবিমানের ট্রেনিং কমান্ডার হিসাবেও কাজ করতে হয়েছে।   

টিমের যেখানেই সর্বোচ্চ সাহসিকতা, ঝুঁকি ও চূড়ান্ত কর্মদক্ষতার প্রয়োজন পড়েছে জাম্বো ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সবার আগে এবং বারংবার চোখ ধাঁধানো সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন, ঠিক একজন দুর্দান্ত হিরোর মত।

১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকার তাঁকে বার্মার ‘টুগো’ বিমানছাউনিতে পোস্টিং করে। জাপানী যুদ্ধবিমানের একটি দল ‘টুগো’ আক্রমণ করেছিল ঠিক তার পরের দিনই। লাগাতার বোমাবর্ষণে ব্রিটিশদের বেশ কিছু যুদ্ধবিমান সহ সামরিক ঘাঁটির তখন ব্যাপক ভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়। জাম্বোর উপস্থিত বুদ্ধিতে কিছু বিমান বেঁচেও যায় সেই আঘাত থেকে। পরেরদিন অর্থাৎ ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ ‘ওয়েস্টল্যান্ড লায়সেন্ডার’ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ‘মায়েহংসন’ বিমান ঘাঁটিতে। একাই তছনছ করে দিলেন জাপানিদের। দুটি আড়াইশো পাউন্ডের বোমা ফেললেন।

আকাশপথের সাথে মাটিতেও জলে-জঙ্গলে তখন যুদ্ধ চলছিল লাগাতার। মার্চ-এপ্রিল ১৯৪২, জাপান পিছু হটতে শুরু করেছে বার্মা ছেড়ে। এরকমই একদিন জাপানী ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে ফেরার সময়ে গুলি লাগল তাঁর এয়ারক্রাফটে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে ভেঙে পড়ল বিমান। কিন্তু কপালজোরে বেঁচে গেলেন জাম্বো। তারপর টানা বেশ কয়েক দিন ধরে দুর্গম পাহাড় জঙ্গলে হেঁটে ফিরে এলেন সভ্য শহরে। তাঁর রোমহর্ষক জীবন কোন হলিউডই সিনেমার থেকে কম ছিল না।

১০ই নভেম্বর ১৯৪২ সালে লন্ডনে জাম্বোকে প্রথম জীবিত ভারতীয় হিসেবে “ডিসটিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস” সম্মানে ভূষিত করা হল। এরপর তিনি ‘উইং কমান্ডার’ পদে আসীন হলেন পুনরায় প্রথম ভারতীয় হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি অসামান্য বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষের সাথে। ধ্বংস করেছেন শত্রুপক্ষের বহু বোমারু বিমান। ১৯৪৪ সালে ‘লাইফ’ পত্রিকায় বিশ্বের সেরা বারো জন সাহসী ফ্লাইং অফিসারের মধ্যে উঠে এল তাঁর নাম। আবার পুরস্কৃত করা হল তাঁকে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫, লাহোরের বিমান ছাউনিতে একটি খোলা প্রদর্শনী উড়ানে অংশ নিয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম জাম্বো। তখন তিনি কমান্ডিং ফ্লাইট অফিসার। পুরানো একটি যুদ্ধবিমান ‘হকার হ্যারিকেন’ নিয়ে আকাশে ঘুরপাক খেতে খেতে আচমকা বিস্ফোরণ! আগুনের গোলার সাথে আকাশেই ছিটিয়ে পড়ল বিমানের ধ্বংসাবশেষ। মাত্র ৩২ বছর বয়েসে আকাশেই হারিয়ে গেলেন এক বিশাল মাপের বাঙালি বীর। 

করুণ কৃষ্ণ মজুমদারের দেহাবশেষ রাখা আছে বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানে উজ্জ্বল মার্বেল পাথরের তৈরি সমাধি ফলক হয়ত এখন মলিন হয়েছে। কিন্তু লেখাটা বোঝা যায় পরিষ্কার, “Go, passers-by And do if you can as he did A Man’s part In defense of liberty.”

হ্যাঁ, বুদ্ধি, সাহসিকতা, দক্ষতা এগুলি কোন জাতির জন্মগত অধিকার নয়। অর্জন করতে হয় জীবন দিয়ে। স্যালুট জাম্বো ওরফে করুণ কৃষ্ণ মজুমদারকে, তাঁর দৃষ্টান্তমূলক জীবনাদর্শের জন্য।

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

                            

Leave a Reply