পরদিন সকালে ঘোড়ায় চড়ে কালী গন্ডকির বিশাল পাথুরে গিরিখাত পেরিয়ে রওনা দিলাম। শেরপারা আমাদের লারজুং হয়ে নিয়ে গেল। বোঝাই গেল যাবার পথে ওরা লারজুং-এর জপযন্ত্রগুলো একবার করে ঘুরিয়ে যেতে চায়, তাই এই ব্যবস্থা। জায়গাটা অবশ্য অসাধারণ সুন্দর। দুপাশের বাড়ি থেকে এগিয়ে আসা ছাদে সরু সরু গলিগুলো ঢাকা, দেখে মনে হয় শীতকালে এখানে প্রচুর তুষারপাত হয়। আরও আধ্মাইল মত এগিয়ে ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিলাম। সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ পাহাড়ের ঢালে দলে দলে ইয়াক আর গরু চরে বেড়াচ্ছে, আমাদের ঘোড়াগুলিও ব্যস্ত হয়ে তাদের সঙ্গে ঘাস খাওয়ায় যোগ দিল। আমরা যে দিকে যাব সে রাস্তার দুপাশে সারি দিয়ে গাছ, তাতে লাল আর গোলাপী প্রচুর ফুল ফুটে আছে, মিষ্টি গন্ধ আসছে। এরকম স্বর্গীয় পরিবেশে ঘড়ি ধরে চলা খুব শক্ত। আজ কুলিরা যতবারই বিশ্রাম চাইল, আপত্তি করলাম না আমরা। শেরপারা একটু অবাক হল। ভাবতে খুবই অদ্ভুত লাগে, এই পুষ্পিত বৃক্ষরাজি আর সবুজ ঘাসে ছাওয়া পাহাড়ি ঢালের গভীর প্রশান্তি থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে একটা সমীহ-উদ্রেককারী, ভয়ানক ও বিস্তীর্ণ হিমবাহে পৌঁছে যাওয়া যায়।
আমরা বড় গাছপালার সীমানা বা ট্রি-লাইন পেছনে ফেলে এগিয়ে চললাম। এই উচ্চতায় জায়গায় জায়গায় কিছু ছোট ঝোপ ছাড়া আর কোনও সবুজ নেই। মাঝে মাঝে কয়েক ফালি তুষার জমে আছে। কুলিরা মাল নিয়ে বেশ মসৃণভাবেই উঠে এল। সন্ধেবেলা, হিমবাহের আগে শেষ পাথুরে জমিতে আমাদের বেস ক্যাম্প স্থাপন করা হল।
আমাদের সঙ্গে যে রেডিও সেটটি আছে তার মাধ্যমে ছ’মাইল ব্যাসার্ধের ভেতর যোগাযোগ করা যায়। সেটটা চালু করে তুকুচায় কথা বললাম, “হ্যালো, আইজ্যাক। আমরা ঠিকমত পৌঁছে গেছি। এদিকে আবহাওয়া একটু মেঘলা, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তোমাদের খবর কী?”
“নোয়েল কাল রওনা দিয়ে তোমাদের সঙ্গে যোগ দেবে। এদিকে কোজি আর শ্যাজ ফিরে এসেছে।”
“ও, তাই! অন্নপূর্ণার কী খবর?”
“ওরা মিরিস্তি খোলা বরাবর তিনদিন ধরে হেঁটে গেছে, শেষমেশ মিরিস্তি খোলার গিরিখাতের শেষে যে গিরিপথ মত আছে সেখানে পৌঁছতে পেরেছে।”
“বাঃ, দারুণ! তারপর?”
“গিরিপথটা পেরিয়ে ওরা অন্নপূর্ণার মূল গিরিশিরাগুলির একটা থেকে নেমে আসা একটা উপ-গিরিশিরার তলায় পৌঁছেছিল।”
“যেটা অডটের সঙ্গে ওরা ২৭শে এপ্রিল দেখেছিল?”
“ঠিক তাই। এই উপ-গিরিশিরাটা নাকি একটা বিশাল ব্যাপার। ওপরে গিয়ে সম্ভবত ওটা মূল গিরিশিরায় মিশেছে, কিন্তু নিচ থেকে সংযোগস্থলটা দেখা যায় না।”
“আর এগোয় নি ওরা?”
“না। ওরা বলছে ওখান থেকে সেই উপ-গিরিশিরাটা ঘুরে অন্নপূর্ণার উত্তরগাত্রের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।”
“ও, তাহলে তিলিচো পাসের কোনও খোঁজ ওরা পায় নি!”
“কোনও পাসের কোনও চিহ্নই নেই। তিলিচো পাস যদি সত্যিই কোথাও থাকে, সে অন্য কোথাও আছে।”
“হুমমম। তিনিগাঁওয়ের সেই শিকারি তাহলে ঠিকই বলেছিল।”
পরদিন ভোরে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বেরিয়ে পড়লাম; খুব দ্রুত হিমবাহের হিমানী-প্রপাতের (ice-fall) দিকে এগিয়ে চললাম। সামনে থেকে আধো-আলো আধো-অন্ধকারে হিমানী-প্রপাতটিকে বেশ ভয়ঙ্কর লাগছিল। আমাদের দল ছ’জনের – আমি, ল্যাচেনাল ও রেবুফত, আর শেরপাদের মধ্যে আং থারকে, ফু থারকে এবং সরকি। অভিযানে এই প্রথম শেরপারা এমন একটা পরিস্থিতির সামনে পড়ল যেখানে পর্বতারোহণের বেশ কঠিন কলাকৌশল জানা দরকার।
হিমবাহটা বরফের ফাটল বা ক্রিভাসে ভর্তি। ফাটলের ওপর প্রাকৃতিক বরফের সেতু বা স্নো ব্রিজ খুঁজে খুঁজে আমাদের এগোতে হচ্ছিল। পাশের খাড়া পর্বতপ্রাচীরের গায়ে বড় বড় বরফের চাঙড় বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে, যেন যে কোনও সময় ভেঙে পড়বে। কখনও কখনও বাধ্য হয়ে সেগুলোর তলা দিয়ে যেতে হল, অন্য কোনও রাস্তা নেই। পায়ে ক্র্যাম্পন বেঁধে কঠিন বরফে চড়াই উঠতে উঠতে মাঝে মাঝেই চোখ চলে যাচ্ছিল সেই দৈত্যাকৃতি চাঙড়গুলোর দিকে।
ধীরে ধীরে ঢালটা আরও খাড়াই হল, আইস-অ্যাক্স দিয়ে কঠিন বরফে সিঁড়ির মত ধাপ কেটে কেটে আমাদের এগোতে হচ্ছিল। পিঠে চল্লিশ পাউন্ডেরও বেশি ওজনের একেকটা রুকস্যাক নিয়ে শেরপাদের খুবই কষ্ট হচ্ছিল উঠতে। বেলা ১১টা থেকেই মেঘ জমতে শুরু করেছিল, হঠাৎ আবহাওয়া খুবই খারাপ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি একটা মোটামুটি সমতল জায়গা খুঁজে তাঁবু ফেলতে হল যেখানে তুষারধ্বসের সম্ভাবনা কম। তখন সবে ২টো বাজে, হিমবাহের দৈর্ঘ্য বরাবর মাত্র অর্ধেকটা আমরা পার হয়েছি, তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। বিকেলটা নষ্ট হল। তারপর খুব অস্থির একটা রাত কাটল, সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না।
ধৌলাগিরি ও তার পূর্ব হিমবাহ, বাঁদিকে ধৌলাগিরির দক্ষিণপূর্ব গিরিশিরা; ছবিঃ আন্তর্জাল
পরদিন অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়লাম। প্রতিদিনই দেখছি দুপুর ২টোর পর যে কোনও সময় আবহাওয়া খারাপ হয়ে যেতে পারে; তারপর সন্ধ্যে অবধি শুধু গুরুগুরু মেঘের গর্জন আর চারপাশের পর্বতগাত্রে তার প্রতিধ্বনি। ক্যাম্পের ওপরের প্রথম চড়াইটা যখন পেরিয়ে গেলাম তখন ভোরের আলো সবে ফুটছে। আমাদের রুকস্যাকে বোঝাই আইস-পিটন, হাতুড়ি, ক্যারাবিনার ইত্যাদি পর্বতারোহণের জরুরী জিনিসপত্র – তাদের ঠোকাঠুকির সুমধুর আওয়াজ পিঠের পেছন থেকে কানে আসছিল। সমস্তরকম কঠিন পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত হয়ে বেরিয়েছিলাম। ভোরবেলার এই ঠাণ্ডায় বরফ একদম পাথরের মত শক্ত। শেরপারা তাদের ক্র্যাম্পন ঠিকঠাকই ব্যবহার করছিল, কিন্তু আমাদের তুলনায় ওদের গতি মন্থর। আর তুকুচার দক্ষিণের সেই পাহাড়ের ওপর থেকে যেমনটি দেখেছিলাম, হিমবাহের ডানতীর (True Right Bank) ধরে এগোনোটাই দেখলাম সবচেয়ে ভালো (এবং হয়তো একমাত্র) রাস্তা।
প্রায় ১৬০০০ ফিট উচ্চতায় উঠে বেশ হাঁপ ধরতে লাগল। বিশ্রামের জন্য দাঁড়ালে শেরপারা তাদের আইস-অ্যাক্সের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে একরকম তীক্ষ্ণ শিসের মত বিচিত্র আওয়াজ করে ফুসফুসটা পুরো খালি করে দেয়। এর আগে নিচের দিকে ট্রেকিং-এর সময় কিছু কুলিকেও এরকম করতে দেখেছি, তাই ব্যাপারটা বেশ পরিচিত হয়ে গেছিল। আমার মনে হচ্ছিল, ল্যাচেনাল আর রেবুফতের থেকে অক্সিজেনের অভাবটা আমি কম অনুভব করছিলাম; একটু কম হাঁপ ধরছিল। এটা মনে হয় দিনকয়েক আগে ১৬০০০ ফিটের বেশি উচ্চতায় দু’তিন রাত কাটানোর সুফল। এই অভিজ্ঞতার পরই ঠিক করলাম চূড়ান্ত অভিযানের আগে আমাদের দলের প্রত্যেককে ১৬০০০ থেকে ২০০০০ ফিট উচ্চতার মাঝে কিছু রাত কাটিয়ে অতি-উচ্চতার সাথে সড়গড় হয়ে নিতে হবে।
দুপুর হয়ে গেল। হিমানী প্রপাতের ওপরের ছোট্ট সমতল জায়গাটা তখনও ৩০০ গজ দূরে। হিমবাহের চলন অনেকটা নদীরই মত। সমতল পেলে শান্তভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দেয়, আবার তার পরই খাড়াই ঢাল বরাবর দুর্দমনীয় জলপ্রপাতের মত ঝাঁপ দেয়। আমাদের এই হিমবাহটির ৩০০ গজের এই শেষ প্রতিরোধ কী করে সামলাব মাথায় তখন সেই চিন্তা। ল্যাচেনাল বলল, “ব্যাপার মোটেই সুবিধের ঠেকছে না।”
“হুমম, খাড়াই ঢালটা বেয়ে কত বরফের চাঙ্গড় গড়িয়ে পড়েছে দেখ,” বলল রেবুফত।
বললাম, “পুরো খাড়াইটাই কঠিন বরফ। আর খাড়াই বলে খাড়াই! এ একটা ভদ্রলোকের মত রাস্তা হল? তার চেয়ে হিমবাহটা পেরিয়ে বাঁ তীর (True Left Bank) দিয়ে চেষ্টা করি চলো।”
“হুম, তবে ওদিকে যাবার আগে এদিকটা একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়,” রেবুফত বলল।
“বেশ, দেখো। তুমি আর ল্যাচেনাল দুজনেই যাও। শেরপাদের সঙ্গে অপেক্ষা করছি আমি।”
মুহূর্তের মধ্যে সেই কঠিন সবুজ বরফের ঢাল বেয়ে বেশ খানিকটা উঠে গেল দুজন। “দারুণ, চালিয়ে যাও,” চেঁচিয়ে উৎসাহ না দিয়ে পারলাম না আমি। ওদের কেরামতি দেখে মন ভালো হয়ে গেল, আর শেরপারা তো অবাক!
কিছুক্ষণ পর ল্যাচেনালের গলা পাওয়া গেল, “মরিস, হিমবাহ পেরোনোর দরকার নেই। তুমি উঠে আসতে পারবে। আরেকটু এগোলেই সমতল জায়গাটা পেয়ে যাবার কথা।”
“ঠিক আছে, সাবধানে এগোও।”
আকাশটা ঘোলাটে হয়ে গেছে। প্রতিদিনের মত আজও ঝড় আসছে মনে হয়। ল্যাচেনাল আর রেবুফত খুবই বিপজ্জনক জায়গায় আছে। যে কোনও সময় ঢাল বেয়ে তুষারধ্বস নামতে পারে।
শেরপাদের বললাম, “চলো, আমরাও এগোই।” ওরা খুব খুশি হল বলে মনে হল না। ওদের জন্য বরফের ঢালে আমায় বড় বড় করে ধাপ কাটতে হল, হাতে ধরার জন্যও খুপরির মত হোল্ড কাটতে হল, নইলে পিঠের বোঝার ভারে ওরা খাদের দিকে উল্টে যেতে পারে। ঢালটা এতটাই খাড়াই যে সোজা হয়ে দাঁড়ালে একজন অনায়াসে বরফের দেওয়ালটা একটু চেটে দেখতে পারে।
“যাচ্চলে, এবারে কী হবে?”, ওপর থেকে একটা গলা পেলাম।
“যাঃ, এতো দেখছি পুরো হিমবাহটার প্রস্থ বরাবর বিশাল এক ফাটল!”, অন্যজন বলল। দুজনেই খুব শাপশাপান্ত করছে শুনলাম।
“ডিঙনো যাবে না?”, চিৎকার করে বললাম আমি, “তাহলে হিমবাহটা সেই পেরোতেই হবে আর কি! ওই পারে হয়তো রাস্তা পাওয়া যাবে।”
হালকা তুষারপাত শুরু হয়ে গেছে। মেঘটা খুব নিচে নেমে এসেছে, আর অনবরত গুড়গুড় করে ডেকে আমাদের স্নায়ুর পরীক্ষা নিচ্ছে। আমাদের ছ’জনের অবস্থানই তখন খুব ভয়ানক জায়গায়, চারদিকের খাড়া পাহাড়ের গায়ে বিরাট বিরাট বরফের চাঁই বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে। হিমবাহটির অভাবনীয় প্রতিরোধের সামনে আমরা প্রায় দিশাহারা; তার জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরার আওয়াজ আসছে; আর তাতে আমাদের পায়ের তলার বরফ কেঁপে কেঁপে উঠছে। আলো খুবই কমে এসেছে।
ল্যাচেনাল আর রেবুফতও যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে। তাও হিমবাহ পেরিয়ে কোনও রাস্তা পাওয়া যায় কিনা দেখার জন্য ওরা একটা মরিয়া চেষ্টা করল। আমরা প্রায় শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করলাম। হিমবাহ মাঝে মাঝেই ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠছিল। বিমর্ষভাবে ফিরে ওরা বলল, “নাঃ, ওদিকেও কোনও রাস্তা নেই।”
সন্দেহের সুরে বললাম, “হুম, ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না। যাক গে… কিছুই যখন করার নেই…”
রেবুফত বলল, “মরিস, আমাদের মনে হয় নিচে নেমে যাওয়াই উচিত। এ জায়গাটা খুব একটা নিরাপদ নয়।”
ওর কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, চড়-চড়-চড়াৎ করে একটা তীব্র দীর্ঘ ফাটল ধরার আওয়াজ হল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে দুহাত দিয়ে মাথা ঢেকে বরফের ওপর উবু হয়ে মুখ গুঁজে বসে পড়লাম। কিন্তু নাঃ, আমাদের পালা তখনও আসে নি!
“নিচে চলো, ধ্বস নামবে,” ল্যাচেনাল চীৎকার করে উঠল, “এক্ষুনি নিচে নামো সব।”
“চলো ফিরে যাই এখান থেকে,” রেবুফত বলল। অনবরত বজ্রপাতের শব্দ আমাদের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলল। একে ঠিক ফিরে যাওয়া বলা যায় কি? একে বলে পালিয়ে যাওয়া! ছোবল মারতে উদ্যত রণসাজে সজ্জিত পর্বত থেকে ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়া!
“ভাগ্য খুব ভালো থাকলেই বেঁচে ফিরব আজ,” ওর শেরপার সাথে পড়িমরি নামতে নামতে কোনওমতে বলল ল্যাচেনাল।
“জলদি চলো ভাইয়া, জলদি জলদি,” আমি আমার রোপ-এ বাঁধা শেরপার উদ্দেশে চীৎকার করে বললাম। মনে হচ্ছিল আমার সঙ্গীই সবচেয়ে মন্থর। একে একে সেই খাড়া বরফের দেওয়াল বেয়ে নেমে এলাম আমরা। ঠিক তখনই শুরু হল প্রচণ্ড তুষারঝড়। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হল আমাদের। তাড়াহুড়ো করে নামাটা এখন বিপজ্জনক, প্রতিটা পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলা উচিত।
“শেরপাদের দিকে খেয়াল রেখো, কারও সাথে যেন ছাড়াছাড়ি না হয়,” সেই হাওয়ার মধ্যে গলা চড়িয়ে ল্যাচেনালকে বললাম। ল্যাচেনাল খুব দ্রুত নামছিল, ওর সাথে পাল্লা দেওয়া শেরপাদের পক্ষে কঠিন। “আরে এখনও অনেক রাস্তা নামতে হবে। জলদি না করলে হবে?”, বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে জবাব দিল ল্যাচেনাল।
খানিক নিচে নামার পর হাওয়ার জোর কিছু কমল। বিপজ্জনক ঢালটা থেকে নেমে আমরা তখন মোটামুটি নিরাপদ জায়গায়।
“ইসস্, আর একটু হলেই হিমবাহটা পেরিয়ে যেতাম আজ…!”
“এরকম পরিস্থিতি ও আবহাওয়ায় গাজোয়ারি করে এগোনোটা মোটেই ঠিক নয়।”
মনে মনে ভাবলাম, হিমবাহটা যদি পেরোতেও পারতাম আমরা, এই রুট ধরে অভিযানের পুরো দলকে ওপরে নিয়ে যাওয়া একটা উন্মাদের মত সিদ্ধান্ত হবে। জেনেশুনে এরকম মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় সঙ্গীদের উঠতে বাধ্য করা কখনওই উচিত নয় আমার। গোঁয়ারের মত এ পথে এগিয়ে যদি একটিও প্রাণহানি হয়, শৃঙ্গজয় হলেও তার ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। জীবন সবার আগে।
তুষারঝড় থেমে গিয়ে তখন তুষারপাত শুরু হয়েছে। চারদিক ঘন কুয়াশায় সাদা হয়ে গেছে; পাঁচ গজ দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্য দিয়ে ভূতের মতন আমরা ছ’জন নিচে নেমে চলেছি। দূরে পেছনে অনবরত তুষারধ্বস নেমে চলেছে, তার ভয়ঙ্কর আওয়াজ কানে ভেসে আসছে। সেই প্রলয় থেকে আমরা অক্ষত বেরিয়ে এলাম বটে, কিন্তু দিনটা সারাজীবন একটা দুঃস্বপ্নের মতোই আমাদের মনে থেকে যাবে।
বিকেল পাঁচটা নাগাদ বেসক্যাম্পে পৌঁছলাম। নোয়েল দূর থেকে আমাদের দেখতে পেয়েই চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছিল।
“নোয়েল, তুমি এখানে কবে এলে? গতকাল?”
“হ্যাঁ, রাস্তা চিনতে কোনও অসুবিধে হয় নি আমার। এখানে পৌঁছেই আংদাওয়া ছোকরাকে তুকুচা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। বেকার দুজনে মিলে এখানে বসে বসে অন্নধ্বংস করার কোনও মানে হয় না। তাছাড়া আংদাওয়াকে টেরের দরকার।”
“আজ তাহলে কত তারিখ? আমাদের দিনক্ষণের হিসেব সব গোলমাল হয়ে গেছে।”
“আজ তিন তারিখ।”
“অ্যাঁ, বলো কী? মে মাসের তিন তারিখ হয়ে গেল আজ? বর্ষা নামার আগে আর মোটে একমাস বাকি? বোঝো! আর এদিকে ধৌলাগিরির গায়ে একটা আঁচড়ও কাটতে পারলাম না আমরা! কী করে যে কী হবে! এখান থেকে শেষ চেষ্টা হিসেবে সামনের ওই দক্ষিণ-পূর্ব গিরিশিরাটা ধরে একবার এগিয়ে দেখলে হয়।”
“হুম, আমি আর রেবুফত দেখতে পারি,” বলল ল্যাচেনাল।
“বেশ। তোমাদের স্কি চলে এলেই গিরিশিরা ধরে এগিয়ে ওই বরফের উঁচু ঢিপির মত জায়গাটা অবধি যেতে পারো। ওখান থেকে ধৌলাগিরি দক্ষিণগাত্রের ভালো ছবি পাওয়া যাবে।”
নোয়েল তুকুচার সঙ্গে রেডিওয় যোগাযোগ করার প্রস্তাব দিল।
বলল, “ঘন্টাদুই আগে আইজ্যাকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এরিয়াল থেকে এমন গোঁ গোঁ আওয়াজ হচ্ছে যে কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। বন্ধ করে দিলাম।”
“বেশ করেছ! এরিয়ালে বাজ পড়ে যদি রেডিওটা নষ্ট হয়ে যেত? আমাদের কিছু হোক না হোক, রেডিও গেলে সর্বনাশ!” ল্যাচেনাল ফোড়ন কাটল।
কিছুক্ষণ পর তুকুচাকে ধরা গেল রেডিওয়।
“হারজগ বলছি। তুকুচার খবর কী?”
“হ্যাঁ, আইজ্যাক বলছি। সব ঠিকঠাক এখানে। তেমন কোনও খবর নেই। টেরে আর অডট আজ সকালে রওনা দিয়েছে ধৌলাগিরির উত্তরদিকে অনুসন্ধান চালাতে। তোমাদের কী খবর?”
“আমাদের? আমাদের খবর হল… ধৌলাগিরির পূর্ব হিমবাহটা পেরিয়ে ওপরে উঠতে পারি নি আমরা… তবে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি।”
“বাঃ, তার মানে ওই রাস্তায় চূড়োয় ওঠা সম্ভব তাহলে?”
“পাগল? এই রাস্তায় কোনও অভিযানের পক্ষেই ওঠা সম্ভব নয়। এ পাহাড়গুলো সব অসভ্য রকমের দুর্গম, এতে চড়া মানুষের কাজ না।”
“তাহলে? কী করবে এখন?”
“আমি কাল নেমে আসছি। ল্যাচেনাল আর রেবুফত দক্ষিণ-পূর্ব গিরিশিরা ধরে এগিয়ে মোটামুটি ১৮০০০ ফিট উচ্চতায় একটা ঢিপি অবধি যাবে। ওখান থেকে ধৌলাগিরির দক্ষিণগাত্রটা পুরো দেখতে পাবে ওরা।”
“ওদের জন্য কিছু পাঠাতে হবে?”
“হ্যাঁ, আরও খাবারদাবার পাঠাও। আর তিনজোড়া স্কি লাগবে ওদের।”
“বেশ। কাল সকাল সকাল ফিরে এলে তোমায় লাঞ্চে থরের মাংস খাওয়াব।”
“থর?”
“হ্যাঁ, থর। হিমালয়ের এক প্রজাতির বুনো লোমশ ছাগল, বেশ বড় বড় হয় (Thar বা Himalayan
tahr)। জিবি আর এখানকার সেই সুবা আমাদের রাইফেল দিয়ে শিকার করছিল, তিনটে মেরেছে। আমাদের ভাগে একটা পড়েছে।”
“ওঃ, তাহলে তো কাল নেমে আসতেই হচ্ছে! আর টেরে? সে থরের মাংস ফেলে বেরিয়ে গেল যে বড়?”
“চিন্তা নেই, টেরে বেশ বড় সাইজের একটা খণ্ড সঙ্গে নিয়েই গেছে।”
“তাই বলো! ঠিক আছে। কাল দেখা হচ্ছে। ওভার।”
পরদিন খুব ভোরবেলা বরফের ঢালে ওঠার কলাকৌশল নিয়ে শেরপাদের একটা ছোট ক্লাস নিলাম, তারপর একা একা রওনা দিলাম তুকুচার দিকে। নামার রাস্তাটা সত্যিই দারুণ উপভোগ্য। গাছে গাছে লাল ফুলে বসন্তের সমারোহ, সবুজ মখমলের মতো ঘাসের ঢালে এখানে সেখানে রঙবেরঙের ছোট ছোট ফুল ফুটে আছে। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। খুব বেশি সময় নষ্ট করতে চাইছিলাম না, অথচ পথের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য একটু পরপরই থামতে বাধ্য হচ্ছিলাম, আবার খানিক পরে গুনগুন করে আপনমনে গান গাইতে গাইতে নামছিলাম। নামতে নামতে দুটো ফার গাছের ফাঁক দিয়ে দেখি, গাছপালায় ঢাকা পাহাড়ের কোলে প্রায় লুকোনো অসাধারণ সুন্দর সবুজ এক হ্রদ; তার স্থির জলে তুষারশুভ্র নীলগিরির ছায়া পড়েছে; তার চারধার ছোট ছোট ঝোপ আর নরম সবুজ শ্যাওলায় ঢাকা। স্বর্গীয় এক দৃশ্য!
কালী গন্ডকির পাথুরে গিরিখাতে নেমে দেখি, ওপরে গত ক’দিনের তুষারপাতের ফলে নদীর জল অনেক বেড়ে গেছে; পা ভেজাতে হবে। জুতোটা ভেজাতে চাইছিলাম না, কেননা ভেজা জুতো পড়ে হাঁটলে পায়ে ফোস্কা পড়বে। এদিকে খালি পায়ে হাঁটারও অভ্যেস নেই। জুতো খুলব কিনা ভাবছি, সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সেই সময় একটি তিব্বতী লোক সেখানে এসে উপস্থিত হল। এক ঝলক দেখেই সে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিল, আর তারপর আরামসে আমায় পিঠে তুলে নিয়ে খালি পায়ে অনায়াসে সেই খরস্রোতা নদী পেরিয়ে ওপারের শুকনো ডাঙায় নামিয়ে দিল। কৃতজ্ঞতাবশত তাকে একটি রৌপ্যমুদ্রা দিলাম। অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে বার বার মাথা নিচু করে অভিবাদন করে সে আমায় ধন্যবাদ জানাতে লাগল। বেচারা! মহানুভবতা দেখাবার এরকম সুবর্ণ সুযোগ এসব অঞ্চলে তো বিশেষ পাওয়া যায় না, তাই আরেকটি রৌপ্যমুদ্রা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম, “এই নাও আরেকটা।” সে যেন নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না! আরেকবার অভিবাদন করে এগিয়ে এসে সটান আমার পায়ের পাতায় একটা চুমু খেয়ে ফেলল। আমি কী করব কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম। মুখে হাসি এনে দেবতার মত একটা বরাভয় ভঙ্গি করার চেষ্টা করলাম। তারপর নিজের ব্যবহারে অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে তুকুচার দিকে রওনা দিলাম।
বেলা একটা নাগাদ তুকুচা পৌঁছলাম। কোজি আর আইজ্যাক হাসিমুখে আমায় অভ্যর্থনা জানাল। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। যে পরিমাণ খেলাম, মনে হয় টেরের সাথে পাল্লা দিতে পারতাম। খেতে খেতে গল্প চলল, “আহা! কতদিন পর টাটকা মাংস খাচ্ছি। থরের জন্য জিবিকে ধন্যবাদ।”
“ধৌলাগিরির পূর্ব হিমবাহটা কি এতটাই দুর্গম?”
“পর্বতারোহণের কলাকৌশলের দিক দিয়ে দেখলে ওটা আল্পসের সবচেয়ে কঠিন কোনও রুটেরই মত, তবে নিঃসন্দেহে তারচেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। ল্যাচেনালও তাই মনে করে। আমাদের খুব খারাপ একটা সময় কেটেছে ওর ওপর। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি! শেরপারা বেশ কয়েকবার পাহাড়ের ঢাল থেকে পড়ে গেছে।”
“হুম, খুব চিন্তার কথা,” কোজি বলল, “যাক, ভাগ্য ভালো যে কোনও ক্ষতি হয়নি…”
“ক্ষতি হয়েছে বৈকি! সময়? হু হু করে সময় চলে যাচ্ছে যে! যা দেখছি… ধৌলাগিরির রক্ষণ বেশ মজবুত।”
“হুম! বেশি চিন্তা কোরো না! আগামীকালই হয়ত একটা রুট খুঁজে পেয়ে যাব আমরা!”
আইজ্যাক কোজির দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “আগামীকাল! পেলে খুবই অবাক হব আমি। রুট একটা খুঁজে বার করতেই হবে আমাদের, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার যেটা চিন্তা হচ্ছে, তা হল, আমাদের মধ্যে কেউই এখনও অবধি আশার ক্ষীণতম আলোটুকুও দেখতে পাইনি। অনুসন্ধান পর্ব শেষ করতেই এখনও বহু দেরি আমাদের!”
বললাম, “তা কেন? দক্ষিণ-পূর্ব গিরিশিরা ধরে চূড়ায় ওঠার রাস্তা পাওয়া যেতে পারে, ল্যাচেনাল আর রেবুফত ওই রুটেই যাচ্ছে। দক্ষিণগাত্র ধরে কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা তাও ওরা দেখতে পাবে। আর পূর্ব হিমবাহ এবার আমরা পেরোতে পারি নি ঠিকই, তবে ওর বাঁ তীর (True left) ধরে একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়।”
“দেখো মরিস, আমায় ক্ষমা করো, আমি অতোটা আশাবাদী হতে পারছি না।”
“হ্যাঁ, মানছি। আমার মনেও অনেক সংশয় দানা বেঁধেছে,” স্বীকার করতেই হল আমায়।
“পূর্ব হিমবাহের পথে আমি আর শ্যাজ একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি”, কোজি বলল।
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তোমাদের বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে?”
“উমমম, কী আর বলি! হ্যাঁ বলাই উচিত!”
“ঠিক আছে। তোমরা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে। অতি উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতেও পারবে, আর পূর্ব হিমবাহ ধরে একবার শেষ চেষ্টাও হয়ে যাবে।”
“বেশ, কালই বেরিয়ে যাব আমরা। দক্ষিণগাত্র, উত্তরগাত্র, এই গিরিশিরা, ওই গিরিশিরা – সব চষে ফেলব একে একে, একটাও ছাড়ব না। দেখি ধৌলাগিরি কীভাবে ঠেকায় আমাদের!”, কোজি তেতে উঠেছে।
সন্ধেবেলা একটু বিশ্রাম নেবার ইচ্ছে ছিল। পরিস্থিতির জট ছাড়াতে ঠাণ্ডা মাথায় একটু চিন্তা করা দরকার। এমন সময় তাঁবুতে এল জিবি। বললাম, “থরের জন্য ধন্যবাদ, জিবি।” সে নিজেকে খুব ভালো শিকারি বলে মনে করে। দেখলাম আজ ও আড্ডার মুডে আছে। অগত্যা ওর সঙ্গে বকবক করতে হল। নেপাল, গুর্খা সম্প্রদায়, এ দেশের সর্বেসর্বা নেপালের রাজপরিবার… নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলল। পকেট থেকে বার করে রাজার লেখা নিয়োগপত্রটা দেখাল জিবি, আগেও বারকয়েক দেখিয়েছে অবশ্য! বাঁশ থেকে হাতে তৈরি কাগজে সংস্কৃতে লেখা, তাতে নানারকম শিলমোহর।
পরদিন, ৫ই মে, সকাল ৮টা নাগাদ কোজি আর শ্যাজ বেরিয়ে গেল। পূর্ব হিমবাহে এবারে ওদের রগড়ানির পালা। ওরা বেরিয়ে যেতেই হঠাৎ সব কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। তুকুচার বেস ক্যাম্পে রইলাম শুধু আমি আর আইজ্যাক।
“একজন সৈনিক নিচের দিকে তানসিং অবধি যাচ্ছে। কোনও চিঠিপত্র পাঠাতে হবে?”
অবশ্যই! পোস্ট করার জন্য চিঠির পাহাড় জমে আছে যে! কিন্তু পাঁচ সপ্তাহের ওপর হয়ে গেল, ফ্রান্স থেকে কোনও চিঠি পেলাম না তো আমরা? জিবির সাহায্য নিয়ে গুরখালি ভাষায় তানসিং-এর পোস্টমাস্টারকে একটা চিঠি পাঠানো হল, তিনি যাতে ব্যাপারটা একটু দেখেন।
তারপর একটা ক্যামেরার ট্রাইপডে 25X-এর একটা টেলিস্কোপ লাগিয়ে আমি আর আইজ্যাক বসলাম। মোটামুটি ১৬০০০ ফিট উচ্চতায় সেই সাদা বরফের ঢিপির মতো চুড়োটার গায়ে ল্যাচেনাল আর রেবুফতকে আবিষ্কার করলাম। ওরা তখন ফ্রেঞ্চ পদ্ধতিতে স্কি করে নেমে আসছে। ল্যাচেনালকে সহজেই চিনলাম ওর অনবদ্য স্টাইল দেখে। শেরপাদের অবাক করে দিয়ে ও দুর্দান্ত কিছু বাঁক নিল।
ফিরে এলে আইজ্যাক রেবুফতকে ধরল, “কী, কেমন দেখলে ধৌলাগিরির দক্ষিণগাত্র?”
“বাগলুং থেকে দেখে তো দারুণ লেগেছিল,” আমিও যোগ করলাম।
“হুঁ, দারুণই বটে! কাছ থেকে দেখলে বুঝতে! সে এক রাক্ষুসে বরফের ঢাল, মাইলের পর মাইল খাড়া উঠে গেছে, মাঝে কোথাও দাঁড়াবারও জায়গা নেই। আল্পসের সাথে তুলনা করলে অনেকটা ম্যাটারহর্নের উত্তরগাত্রের মত, শুধু ওর থেকে তিন গুণ বড়। ওটাকে স্রেফ খরচের খাতায় ফেলে দেওয়াই ভালো।”
আমরা নীরবে একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম।
“হুম, বোঝা গেল! আর দক্ষিণপূর্ব গিরিশিরা? সেদিন পূর্ব হিমবাহের ক্যাম্পে বসে যখন কথা হচ্ছিল তখন তোমরাই তো ওই রুটের ব্যাপারে সবচেয়ে আশাবাদী ছিলে! তোমরাই বললে…”
“ভুল বলেছিলাম। প্রথম কথা, রাস্তাটা অসম্ভব দীর্ঘ। দ্বিতীয়ত, পুরো রাস্তাটাই খুব উঁচু দিয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই রুট টেকনিক্যালি প্রচণ্ড কঠিন – পুরো রাস্তাটাতেই পর্বতারোহণের খুব উঁচু মানের কলাকৌশলের প্রয়োজন। অসংখ্য তুষারপ্রাচীর, আইস টাওয়ার, ভাঙাচোরা রাস্তা; কিছু জায়গা আবার পাথুরে, ছোট ছোট পাথুরে শৃঙ্গ দাঁতের মত উঁচিয়ে আছে – বাধার কোনও শেষ নেই।”
“তাঁবু ফেলার জায়গা নেই?”
“একটাও না।”
“হুম, ব্যাপার তো খুব সুবিধের ঠেকছে না।”
“ওই রাস্তায় যাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।”
আইজ্যাক বলল, “দ্যাখো, আমার মনে হয় না দক্ষিণপূর্ব গিরিশিরা নিয়ে আমাদের কারও মনে কোনও উচ্চাশা ছিল। দক্ষিণগাত্রের ব্যাপারেও তাই।”
“তাহলে মোদ্দা কথাটা কী দাঁড়াল?”
“খুব সহজ! ধৌলাগিরির দক্ষিণগাত্র আর দক্ষিণপূর্ব গিরিশিরা – এই দুই রুটেই একটা করে বড় বড় ঢ্যাঁড়া এঁকে দাও! দুঃখের হলেও এটাই বাস্তব।”
বিমর্ষবদনে আমরা সবাই রাতের ডিনার সারতে মেস টেন্টের দিকে চললাম।
পরদিন আমাদের ক্যাম্পে এক বৌদ্ধ লামার পায়ের ধুলো পড়ল। এঁর সাথে বাগলুং-এই দেখা হয়েছিল। লামার পরনের মেরুন রঙের জোব্বাটি খুব পরিষ্কার বলে মনে হল না, কিন্তু লোকটি খুব ভালোমানুষ – হাসিখুশি, মজাদার। আইজ্যাক এই সহজসরল বন্ধুত্বপূর্ণ লামাদের খুব পছন্দ করে। সে প্রচুর খাওয়াল লামাকে। উনি প্রবল উৎসাহের সঙ্গে মুক্তিনাথের মহিমা সম্বন্ধে আমাদের অনেক কিছু বললেন। আং থারকেকে দোভাষী করে আমাদের বাক্যালাপ চলল।
“আপনি তাহলে এখন মুক্তিনাথ যাচ্ছেন?”, জিগ্যেস করলাম আমরা।
“হ্যাঁ, আগামীকাল পৌঁছব সেখানে।”
“কিন্তু সে তো এখান থেকে বেশ দূর!” যদিও লামাদের অনেক অলৌকিক ক্ষমতা থাকে বলে শুনেছি, তাও একদিনে কী করে ইনি মুক্তিনাথ পৌঁছবেন সেটা আমার মাথায় ঢুকল না।
“আপনারাও অবশ্যই আসুন একবার মুক্তিনাথে। প্রতিদিন ওখানে নানারকম অলৌকিক কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে… পাতাল থেকে অগ্নিশিখা বেরিয়ে আসছে… পুরোহিতরা প্রতিদিন অসাধারণ সব ভবিষ্যৎবাণী করে চলেছেন…”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই যাব। এই কিছুদিনের মধ্যেই যাব…”
আইজ্যাকের মাথায় হঠাৎ দারুণ এক বুদ্ধি খেলে গেল। সে জিগ্যেস করে বসল, “লামাসাহেব, আমরা কি ধৌলাগিরির শৃঙ্গে উঠতে সক্ষম হব?”
এইবার! এতক্ষণে লামার সামনে নিজের আসল ক্ষমতা প্রদর্শনের সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হল! প্রথমেই গভীর ধ্যানে তলিয়ে গেলেন তিনি। তারপর হাতে একটা জপের মালা নিয়ে গুনতে গুনতে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে চললেন, একবার আকাশের দিকে তাকান, তারপরই ফের নিজের হাতের দিকে। এরকম চলল প্রায় মিনিট পাঁচেকেরও বেশি। আমরা চুপ করে নট নড়নচড়ন হয়ে বসে আছি। এতদিনে কি তবে চোখের সামনে কোনও অলৌকিক ঘটনা দেখতে চলেছি? আমরা কি আর জানিনা যে এই লামারা হলেন একেকজন অতীন্দ্রিয় ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি?
ধীরে, খুব ধীরে ধীরে, মনে হল লামা লৌকিক জগতে ফিরে এলেন। তারপর মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলেন, “ধৌলাগিরি আপনাদের পক্ষে শুভ নয়…”; মিনিটখানেক চুপ করে থেকে যোগ করলেন, “ওকে ছেড়ে দেওয়াই মঙ্গল, মনকে অন্যদিকে চালিত করুন।”
“কোনদিকে?” আইজ্যাক জিগ্যেস করল। আমাদের কাছে দিকটা গুরুত্বপূর্ণ!
“মুক্তিনাথের দিকে,” লামা এমনভাবে বললেন যেন এ আর জিগ্যেস করার কী আছে?
কিন্তু, উনি কি অন্নপূর্ণা বোঝাতে চাইলেন? জানি না। ভবিষ্যৎই একমাত্র বলতে পারবে।
ল্যাচেনাল ফিরল, রোদে পুড়ে একদম তামাটে হয়ে গেছে। পূর্ব হিমবাহের ক্যাম্পে এখন কোজি আর শ্যাজ। রেডিওটা কাজ করছে না, তাই কিছুদিন ওদের কোনও খবর পাব না। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ অডট আর টেরে ক্যাম্পে ‘অবতরণ’ করল। বাড়িয়ে বলছি না, আক্ষরিক অর্থেই ‘অবতরণ’, কারণ ওরা ক্যাম্পের পাশের খাড়া পাথুরে দেওয়ালটার ওপর থেকে র্যাপেল করে নামল। টেরে যথারীতি প্রচণ্ড উত্তেজিত, দাড়িগোঁফ বেড়ে গিয়ে তাকে বেশ ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।
“শোনো ভাইসব, ধৌলাগিরির ব্যাপারে তোমরা নতুন করে ভাবতে পারো,” উত্তেজনায় আর বাছাবাছা শব্দ প্রয়োগে টেরে প্রায় ফেটে পড়ল, “দ্যাখো মরিস, পৃথিবীর কোনও বীরপুঙ্গবের সাধ্য নেই তোমার ওই সাধের ধৌলাগিরিতে চড়ে। ওতে ওঠা যায় না। ও একটা শয়তানের পাহাড়।”
“আরে এসো, বোসো আগে, চা-কফি খাও, বিশ্রাম করো, ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গেছ যে!” টেরেকে একটু ঠাণ্ডা করার জন্য বললাম।
“চা-কফি? খাবারদাবার কিছু নেই নাকি?” টেরের জিজ্ঞাসা।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওরা নিয়ে আসছে তোমার জন্য। তারপর বলো, কী দেখলে তোমরা?”
“প্রথম থেকে বলি,” অডট শান্তভাবে শুরু করল, “তেসরা মে মোটামুটি ১৪৭০০ ফিট উচ্চতায় তাঁবু ফেললাম আমরা, তোমাদের দুটো ক্যাম্পের মাঝামাঝি জায়গায়। পরদিন রাত্রে ক্যাম্প করলাম তোমাদের আবিষ্কৃত ‘গুপ্ত উপত্যকায়’। ওই উপত্যকায় পৌঁছনোর পাস অবধি গিয়ে কুলিরা একটু ঝামেলা করেছিল, আর এগোতে চাইছিল না। ওর পরে আর যায় নি ওরা কখনও, তাই ভয় পাচ্ছিল। কাল সকালে, খুব ভোরে রওনা দিয়ে, গুপ্ত উপত্যকা ধরে এগিয়ে গিয়ে আমি আর টেরে আরেকটা পাসে পৌঁছলাম, যেটা তোমরা দূর থেকে দেখেছিলে। সেই পাসটাই হল ধৌলাগিরির উত্তরদিকের উপত্যকায় পৌঁছনোর গিরিপথ (এটি এখন ‘ফ্রেঞ্চ পাস’ নামে পরিচিত)। আর সেখান থেকে যা দেখলাম…”
“ওফ, ভাবলে আমার এখনও হাত-পা কাঁপছে,” টেরের পক্ষে চুপ করে থাকা আর সম্ভব হল না, “সেখান থেকে দেখলাম এই পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম গিরিখাত!”
“আমাদের মুখোমুখি তখন ধৌলাগিরির দানবীয় উত্তরগাত্র,” অডট বলে চলল, “আর পায়ের নিচে এক বিশাল বিস্তীর্ণ হিমবাহ, ফাটলে ফাটলে ভর্তি…”
“পৃথিবীর বীভৎসতম হিমবাহ,” টেরের অলঙ্করণ চলতে থাকে।
“… হিমবাহটা এক সুগভীর গিরিখাত ধরে পশ্চিমদিকে বয়ে চলেছে। গিরিখাতের দুপাশের পাথুরে দেওয়াল একেবারে খাড়া, হাজার হাজার ফিট উঁচু!”
“দেখেছ? ঠিক ধরেছিলাম আমি,” আইজ্যাক প্রায় বিজয়ীর উল্লাসে লাফিয়ে ওঠে, “তাহলে প্রমাণ হল ধৌলাগিরির উত্তরগাত্র ধোয়া জল মায়ান্দি খোলা দিয়েই নামছে, দাম্বুশ খোলা দিয়ে নয়।” (তৃতীয় পর্বের পৃষ্ঠা ৩ :ধৌলাগিরির ভৌগোলিক বিন্যাস দ্রষ্টব্য)
টেরের কথা তখনও শেষ হয়নি, “জায়গাটায় সবকিছুই দানবীয় মাপের, অভাবনীয় আকৃতির, এ যেন এক অন্য পৃথিবী! যদি উত্তর গিরিশিরার কথা ধরো, যেটা ওই হিমবাহ থেকে পূর্ব হিমবাহকে আলাদা করে রেখেছে, সেটা আধা পাথুরে আর আধা কঠিন বরফ, পুরোটাই খুব খাড়াই। আর উত্তর-পশ্চিম গিরিশিরা, যেটা আমরা আগে দেখিনি, সেটা ওই ভয়ঙ্কর গিরিখাতের মধ্যে নেমে গেছে।”
খুবই হতাশাজনক ব্যাপার সন্দেহ নেই।
“তার মানে বলছ ওই রাস্তায় যাওয়া যাবে না?”, বললাম আমি।
আইজ্যাক বলল, “লামা তো বলেই গেলেন ‘ধৌলাগিরি তোমাদের পক্ষে শুভ নয়, মুক্তিনাথ চলো।’ ভুলে গেলে?”
“ঠিক, মুক্তিনাথেই যেতে হবে আমাদের,” দৃঢ়স্বরে বললাম আমি, “কাল সকালেই রওনা হব!”
“তার মানে? তিলিচো পাসের দিকে?” রেবুফত জিগ্যেস করল।
“আমি মোটামুটি নিশ্চিত তিনিগাঁও-এর সেই শিকারি ঠিকই বলেছিল। তিলিচো নীলগিরির উত্তরে, দক্ষিণে নয়। দক্ষিণে হলে কোজি, শ্যাজ আর অডট তিলিচোর খোঁজ পেত। তিলিচো পেরিয়ে আমরা উত্তরদিক থেকে অন্নপূর্ণার দিকে এগোব।”
“মিরিস্তি খোলার দিক দিয়ে নয় কেন? ওদিক দিয়ে এগিয়ে কোজি আর শ্যাজ তো অন্নপূর্ণা দেখতে পেয়েছিল!”
“দেখেছিল, তবে সে অনেক দূর থেকে। আর ওরা উত্তরগাত্রটা দেখতে পায় নি। ওই রুট দিয়ে অন্নপূর্ণার উত্তরগাত্রে পৌঁছনো সহজ হবে না। যে গিরিশিরাটা ওরা দেখেছিল ওটার কথা ভেবেও লাভ নেই। ওদেরও তাই মত…”
“মরিস, ম্যাপটা দেখ,” আইজ্যাক বলে উঠল, “নীলগিরির উত্তরে দেখানো সেই তারাচিহ্নটাই যদি তিলিচো পাস হয়, তাহলে কিন্তু আমাদের অনেক দিনের হাঁটা বেঁচে যাবে।”
“ঠিক। আমরা একেবারে সরাসরি অন্নপূর্ণার উত্তরগাত্রের গোড়ায় উপস্থিত হব। আর সাধারণত হিমালয়ের শৃঙ্গগুলির উত্তরগাত্র অপেক্ষাকৃত সুগম হয়। অন্নপূর্ণার খোঁজে ওই রাস্তায় আমরা যতদূর যেতে হয় যাব। যদি সেই মানাংভোট অবধি যেতে হয় তাও সই!”
“বাহ! পরিস্থিতি তাহলে শেষে এরকম দাঁড়াল? কোথায় আমাদের অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে ওঠার কথা, আর আমরা এখন ভাবছি কিনা অন্নপূর্ণার খোঁজে যাব!”
ফোড়ন কাটল বটে আইজ্যাক, তবে ওর কথার সুরে হতাশাটা গোপন রইল না।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)

