গল্পঃ বাঁধাকপির তরকারি– রাজীবকুমার সাহা

galpobadhakopi_1 (Small)

তখন বয়স কত হবে? দশ-বারোর বেশি নয়। তখনও নিজেদের বাড়ি হয়নি আমাদের। বাবার চাকরির সূত্রে মামার বাড়ির খুব কাছাকাছি থাকতাম আমরা, একটা ভাড়াবাড়িতে। আমাদের বাড়ি আর মামার বাড়ির মাঝখানে একটা ছোট্ট উপত্যকামত ছিল। একটা ছোট্ট নদীর মতো এই উপত্যকাটাই মামার বাড়ির পাড়া আর আমাদের পাড়াটাকে আলাদা করে রেখেছিল। স্থানীয় ভাষার এই উপত্যকাকে ‘ডোন’ বলত সবাই। গ্রামের বাড়ি, চারদিকে পাকা বাউন্ডারি নেই। বদলে উঁইধরা নড়বড়ে ছেঁচা বাঁশের বেড়া ছিল। চারদিক তখন ঘন সবুজ গাছগাছালি আর ছোট ছোট ঝোপঝাড়ে ভর্তি ছিল। একেবারে পটে আঁকা গ্রাম। আজকালকার মতো চব্বিশ ঘণ্টা বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের পাহারা দিয়ে রাখত না। পাড়া-বেপাড়ার গোটা বিশেক ছেলেমেয়ে আর আমরা তিন ভাইবোন মিলে একটা বড়োসড়ো খেলার দল ছিল আমাদের।

আমরা প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম সবাই। সকালবেলায় স্কুল বসত। কোনও মতে স্কুল থেকে ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে ফিরে এসে চাট্টি মুখে দিয়েই একদৌড়ে ওই ডোনে নেমে যেতাম আমরা দলবেঁধে। আর রোজ পেছন থেকে মায়েদের উঁচু গলায় একটাই সাবধানবাণী আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেত বাতাসে, “ওরে, ওই গাবগাছ তলায় কিন্তু যাবি না একদম…”

ডোনটা পশ্চিমদিকে একটা ইটের রাস্তা থেকে শুরু হয়ে একেবেঁকে প্রায় আধা কিলোমিটার পরে একটা পুকুরে গিয়ে শেষ হয়েছে। লোকে বলে চালতাপুকুর। কয়েকটা ফলন্ত চালতাগাছ ছিল পুকুরপাড়ে। ওই ইটের রাস্তাটার ধারেই ছিল আমাদের বাড়ি। আর সেই নিষিদ্ধ গাবগাছটা ছিল আমাদের বাড়ি আর চালতাপুকুরের মাঝামাঝি একটা বাঁকে, একটু আড়ালে। সারা গায়ে আলকাতরা মেখে প্রায় ন্যাড়া মাথায় দাঁড়িয়ে থাকত গাছটা বছরভর। আমরা দুপুরবেলা অব্দি লুকান্তি, গোল্লাছুট, চোর-পুলিশ, রাজায় রাজায় যুদ্ধ ইত্যাদি হরেকরকম মজাদার খেলা খেলে, দল বেঁধে চালতাপুকুরে নেমে যেতাম ঝুপাঝুপ। ইচ্ছেমত হুটোপাটি করে শেষে পুকুরের মালিকের রাঙা চোখের বকা খেয়ে ছপাছপ উঠে পড়ে যে যার বাড়ি ফিরে যেতাম।

তবে আমরা কিন্তু সবসময় খেলতে গিয়ে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও খুব সচেতনভাবে ওই কালো গাবগাছটা এড়িয়ে চলতাম। লুকান্তি খেলার সময় মন মত লুকোবার জায়গা না পেলেও ভুলেও  ওই গাছটার কাছাকাছি যেতাম না। কারণ মায়েদের কল্যাণে আমাদের সবার মনে একটা কথা গেঁথে গিয়েছিল যে ওই গাবগাছে ভূত-পেত্নি বাস করে। কাছে গেলেই…

তো একদিন হল কী, রোজকার মতো স্কুল, ডোনে গিয়ে খেলাধুলো তারপর চালতাপুকুরে নেমে দাপাদাপি শেষে জবা ফুলের মতো চোখ লাল করে যখন ঘরে ফিরে এলাম তখন ভরদুপুর। সাড়া পেয়ে মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, তোরা কি আমাকে এভাবেই জ্বালিয়ে মারবি চিরটা কাল! সেই কখন থেকে বসে আছি তোকে একটু মামাবাড়ি পাঠাবো বলে। ছেলের যদি পাত্তা থাকে!”

মামার বাড়ির কথা শুনে আনন্দে নেচে উঠল মনটা। ভাবটা গোপন করে ভালো মানুষের মতো জিজ্ঞেস করলাম, “এখন? কেন মা?”

“ওই একটু বাঁধাকপি রেঁধেছিলাম। কালই বেরোল বাজারে প্রথম, বাবা নিয়ে এল। যাবি? একটু দিয়ে আসবি দিদাকে?”

“তা দাও। তবে তোমার ওই গামছাবাঁধা বেঁধে দিলে আমি পারব না বলে দিলাম। আমার লজ্জা করে। দিতে হয় বাটিটা একটা কাপড়ের ব্যাগে দাও।”

“তাই দেবো। এখন চটপট খেয়ে নে। খেয়ে উঠে দিয়ে আসবি।”

“না, না। এখন খেতে বসলে দেরি হয়ে যাবে। দিদা হয়ত ততক্ষণে খেয়ে নেবে। আমি ও বাড়িতেই খেয়ে নেব। তুমি জলদি ব্যাগটা দাও।”

মা একটু মুচকি হেসে আবার রান্নাঘরে চলে গেল। একটু পরেই বাবার টিফিনের একটা পুরনো ব্যাগ আমার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, “এক কাজ কর রাজা, রাস্তায় না গিয়ে ডোনটা পেরিয়ে চলে যা। তাড়াতাড়ি হবে। আর গিয়েই খেয়ে নিবি কিন্তু।”

আমি কোনওমতে ঘাড়টা কাত করে হাঁটা লাগালাম ডোনের দিকে। টিলা থেকে ডোনে নেমে একবার পেছন ফিরে দেখলাম মা দাঁড়িয়ে আছে টিলার কিনারায়। আলতো হেসে হাত তুলে অভয়মুদ্রা দেখাল মা। তারপর বাঁকের আড়ালে চলে গেলাম আমি। মাঝে মাঝেই লাউচিংড়ি, কচুর শাক, মটর পনির, এটা ওটা নিয়ে মামাবাড়ি যাই। মা এভাবেই এসে টিলার পাশে দাঁড়ায়।

আমাদের বাড়ির টিলাটা থেকে মাত্র দুটো বাঁক পেরোলেই মামার বাড়ির টিলাটা দেখতে পাওয়া যায়। ইটের রাস্তায় গেলে অনেকটা ঘুরপথ। ডোনটার ওপাশে অর্থাৎ মামার বাড়ির টিলার ঠিক নিচেই হচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর গাবগাছটা। মামার বাড়িতে উঠতে গেলে ওটার কাছাকাছি দিয়ে যেতে হয়। গাছটা চোখে পড়তেই বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল যেন। মামার বাড়ি যাবার আনন্দটা মিইয়ে গিয়ে কখন পথটা পেরিয়ে যাব সেই চিন্তাই মাথায় কাজ করতে লাগল। কোনওমতে একশ্বাসে দৌড়ে মামার বাড়ির টিলাটায় উঠতে যাব এমন সময় চোখে পড়ল, খুব সুন্দর একটা পাখি রাস্তাটার ঠিক পাশেই একটা করবী ফুলের গাছে উড়ে উড়ে মধু খাচ্ছে।

একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। এমন সুন্দর পাখি আমি জীবনেও দেখিনি। ডানাগুলোতে কমপক্ষে ছ’সাতটা রং আছে। গাবগাছের ভয়টা কেটে গিয়ে একটা বিস্ময় ফুটে উঠল আমার চোখে মুখে। পাখিটা তখন করবী ফুল গাছটাকে কয়েকটা চক্কর লাগিয়ে পাশের গাছটাতে বসেছে, আর আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে তিড়িং তিড়িং করে লেজ নাড়াচ্ছে।

একটু এগিয়ে গেলাম পাখিটার দিকে। যাওয়া মাত্রই পাখিটা ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেল। খুঁজে দেখলাম আর একটু দূরে বসে আছে ওটা। একই ভঙ্গিমায়। যেন আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। এগিয়ে গেলাম আর একটু। এভাবে একটু একটু করে কখন যে কালো গাবগাছটার ঠিক নীচে এসে পৌঁছে গেছি খেয়ালই করিনি। আমি তখন গাবগাছে পাখিটাকে খুঁজে চলেছি আকুলভাবে। কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না।

হঠাৎ দেখলাম পাখিটা আমার চোখের সামনেই একটা সরু ডালে বসে আছে। কাছে যেতেই ওটা আস্তে আস্তে একটা কাঠবেড়ালি হয়ে গেল। পিটপিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর ঝাঁকড়া লেজটা নেড়ে চলেছে।

আমি তখন সব ভুলে বসে আছি। আমার খিদে, দিদার জন্য বাঁধাকপির তরকারি, মামার বাড়ি, মা-বাবা সব। এমন কি, এই গাবগাছের ভূত-পেত্নিকেও। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে আছি। চোখদুটোতে একটা নিদ্রালু ভাব। টের পাচ্ছি হাত পাগুলো কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। এমন অবস্থায় ঝুপ করে গাছটার ওপর থেকে কী যেন একটা কিছু পড়ল বলে মনে হল। খুবই হালকা ধরণের কিছু। চকিতে ফিরে দেখি একটা থুত্থুড়ে বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে। শরীরে শুধু হাড় ক’খানা আর কুঁচকে যাওয়া চামড়াটাই আছে। চোখ দুটো যেন গর্তে ঢুকে আছে। প্রথমে হঠাৎ মনে একটা ধাক্কা লাগলেও বিশেষ ভয় পাইনি।

galpobadhakopi_3 (Small)বুড়িই আগ বাড়িয়ে কথা বলল। গলাটা কেমন খোনা খোনা। প্রায় হলুদ হয়ে যাওয়া তিন চারটে দাঁত বের করে বুড়ি জিজ্ঞেস করল, “মামাবাড়ি যাচ্ছিস বুঝি রাজা?”

আমি থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কে? আমার নাম জানো কী করে?”

“আমি সব জানি। এটাও জানি তোর হাতে কী আছে।”

 আমি সন্ত্রস্ত হয়ে ব্যাগটা শক্ত হাতে ধরলাম। তোতলাতে তোতলাতে বললাম, “মানে? কী আছে আমার হাতে?”

বুড়ি হেসে হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, “জানি, জানি… এতে বাঁধাকপির তরকারি আছে।”

তারপর হঠাৎ সুর পালটে আবদারের গলায় বলল, “এই শোন না রাজা, আমায় দে না ওই বাটিটা। বড্ড খিদে পেয়েছে রে!”

“বা-বা রে! ওটা দিদার জন্যে। তুমি খাবে কেন। তা ছাড়া আমি তোমায় চিনি না জানি না…”

“দূর বোকা, আমি তো এখানেই থাকি। এই গাছে। কেন, আমায় দেখিস নি তোরা? আমি কিন্তু তোদের সবাইকে দেখি, চিনি, এমন কি নামও জানি। খেলার সময় তোদের বল যখন অনেক দূরে চলে যায় তখন আমিই তো ওটাকে কুড়িয়ে এনে কাছাকাছি রেখে দিই।”

এতক্ষণে টের পেলাম আমার গা ছমছম করছে। হঠাৎ কেমন যেন ভার হয়ে গেছে শরীরটা। মাথাটা ঝিম মেরে আছে আর দপদপ করছে। সারা শরীরে একটা গরম স্রোত ছুটোছুটি করছে। ভয় বোধহয় একেই বলে। নিঝুম দুপুরে কাছে পিঠে একটা জনমনিষ্যিও নেই। কী করব ঠাওর করে উঠতে পারছি না। ছুটে পালাব তার উপায়ও নেই। পা দুটোতে একদম জোর পাচ্ছি না।

“কী হল রে? দিবি নে আমায়!” তাড়া এল বুড়ির কাছে থেকে।

“না।” আমার গলায় গোঁয়ার্তুমির সুর।

বুড়ির মুখের হাসিটা ঝুপ করে মিলিয়ে গেল। কঠিন স্বরে বলল, “দে বলছি ওটা। আমার দিকে ছুঁড়ে দে বলছি। নইলে… নইলে…”

“নইলে ক-কী!” কথাটা বলতে গিয়ে আমার গলাটা যেন একটু কেঁপে গেল। ব্যাগটা দিয়ে দেওয়াই ঠিক হবে ভাবতে না ভাবতেই বুড়ি রেগে আগুন হয়ে বলল, “নইলে ঘাড়টা এখনই মুচড়ে দিতাম। শুধু তোর ওই মাদুলিটা…”

আমি এক পলক আমার ডান হাতে বাঁধা জামার ভেতরে মাদুলিটার দিকে তাকালাম। বুঝলাম কথাটা বুড়ি মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে এবং এটাই আমার রক্ষা কবচ। আমাকে আর পায় কে! ওদিকে বুড়ি আমাকে শাসিয়ে যাচ্ছে খোনা গলায়, “ব্যাগটা ছুঁড়ে দে, ব্যাগটা ছুঁড়ে দে বলছি ভাল চাস তো। নইলে ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।”

আমি তারপরও থম মেরে দাঁড়িয়ে আছি। বুড়ি তো রাগে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। আমিও ব্যাগ ছাড়ছি না, বুড়িও আশা ছাড়ছে না। এভাবে কিছুক্ষণ কাটার পর হঠাৎ বুড়ি আবার আগের মতো হেসে হেসে বলল, “দিবি না তা হলে? বাব্বা, কী দস্যি ছেলে রে তুই রাজা! যাক গে, চাই না আমার বাঁধাকপি।”

আমি একটু স্বস্তি পেলাম। গা টা এতক্ষণ খুব গরম হয়ে গিয়েছিল। এবার আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হতে লাগল। বললাম, “এবার আমি যাই। অনেকক্ষণ হয়ে গেল।”

“সে কী রে! পাখিটা ধরে নিয়ে যাবি না? এই লোভেই তো আমার কাছে এলি আজ।”

“মা-মানে?”

“মানে, ওই সাতরঙা পাখিটা চাই না তোর? কী সুন্দর পাখি না রে!”

“হ্যাঁ… কিন্তু… মানে…”

 “যদি চাস তো দিতে পারি।” বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে বুড়ি।

আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। পাখিটা আমার চাই ঠিকই, কিন্তু বাঁধাকপিটা দিদাকে… “ঠিক আছে, কোথায় পাখিটা? তাড়াতাড়ি দাও। আমায় মামাবাড়ি যেতে হবে এক্ষুণি।”

“আরে দাঁড়া, দাঁড়া, বোকা ছেলে। পাখিটা নিবি কী করে? খাঁচা চাই না বুঝি? আমি খাঁচাসুদ্ধু পাখিটা নিয়ে আসছি এক্ষুণি। একটু দাঁড়া। পালাস নে যেন।”

এই বলে বুড়ি গেল তো গেলই। আর ফেরার নাম নেই। আমিও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছি এমন সময় পেছন থেকে একটা ক্ষীণ গলায় ডাক শুনতে পেলাম, “রাজা, ও রাজা, দাঁড়া, যাস নে।”

ফিরে দেখি চালতাপুকুরের দিক থেকে মিনি দৌড়ে আসছে। মিনি থাকে ওপাড়ায়। রোজ খেলতে আসে ডোনে। কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “তুই এখানে কী করছিস? জানিস না গাছটা খারাপ?”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই এই সময় কোত্থেকে এলি? ঘুমোস নি? সন্ধ্যে বেলায় স্যার আসবে না?”

“টুটনদের বাড়ি যাচ্ছিলাম একটা বই আনতে। তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“আ-আমি, আমি যাচ্ছিলাম দিদার কাছে। হঠাৎ একটা পাখি দেখে… আচ্ছা চলি।’’ চোখ নামিয়ে নিলাম মিনির চোখ থেকে।

“হুম। আমি কিন্তু দূর থেকে সব দেখেছি। তুই গাছটার সাথে কথা বলছিলি অনেকক্ষণ ধরে।”

আমি সাথে সাথে মিনির একটা হাত খপ করে ধরে মিনতি করে বললাম, “অ্যাই মিনি, কাউকে বলবি না বল! মার কানে গেলে আর এখানে খেলতে দেবে না।”

মিনি মলিন হেসে বলল, “আচ্ছা বলব না।”

তারপরেই হঠাৎ কী একটা মনে পড়তেই তড়বড় করে বলে উঠল, “অ্যাই রাজা, টুটনদের বাড়ি যাবি? টিভিতে একটা ভাল প্রোগ্রাম আছে।”

“কী প্রোগ্রাম?”

“সার্কাস দেখাবে। আমি আসলে এজন্যেই যাচ্ছিলাম। বাড়িতে বইয়ের কথা বলে এসেছি।”

মনটা নেচে উঠল। পরক্ষণেই দমে গিয়ে বললাম, “না রে! আমাকে মামাবাড়ি যেতে হবে। মা বলেছে তরকারিটা দিয়ে আসতে।” বলেই হাতে ঝোলানো টিফিনের ব্যাগটা দেখালাম।

 মিনি কী একটা চিন্তা করে গম্ভীর গলায় বলল, “রাজা, তোর ঘটে কি একটুও বুদ্ধি সুদ্ধি নেই। এই গাবগাছ তলায় তুই তরকারিটা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলি অনেকক্ষণ। ওতে ভূত-পেত্নির নজর লেগেছে। আর তুই বলছিস ওটা মামাবাড়ি নিয়ে যাবি! কী আক্কেল! ফেলে দে, ফেলে দে। কাকিমা শুনতে পেলে আস্ত রাখবে না।”

আমি অসহায় ভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “ফেলে দেব! বলিস কী! আর এই ব্যাগ আর বাটি?”

“আচ্ছা ঠিক আছে, ওই ঝোপটার আড়ালে লুকিয়ে রেখে চল। যাবার পথে ফেরত নিয়ে যাবি। বাড়িতে বলে দিস যাবার সময় কুকুরের নোংরা মারিয়ে ফেলেছিলি। তাই ওদেরকে আর দিস নি। নে তাড়াতাড়ি কর। দেরি হয়ে যাচ্ছে যে এদিকে!”

সার্কাসের লোভে মিনির কথাগুলোই যুক্তিযুক্ত মনে হল। ওর কথামত টিফিনের ব্যাগটা একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে দুজনে মিলে টুটনদের বাড়ির দিকে ছুট লাগালাম। টুটনদের বাড়িতে পৌঁছে মিনি বলল, “শোন, তুই সোজা টিভির ঘরে চলে যা। আমি ওপাশের দরজা দিয়ে ঢুকছি। যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে আমরা একসাথে প্ল্যান করে ঢুকেছি। দেখবি আমি ঠিক তোর আগে গিয়ে বসে থাকব।”

ঠিক তাই হল। টুটনদের বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। আমি আগে কয়েকবার এলেও টিভির ঘরে ঢুকি নি কখনও। তাই খুঁজেপেতে প্রায়ান্ধকার একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম পাড়ার অনেকেই টিভি দেখছে। কারণ, দু’তিনটে পাড়া মিলে তখন টিভি বলতে একমাত্র টুটনদেরই ছিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে মিনিকে খুঁজে নিয়ে ওর পাশে বসে পড়লাম। মিনি আশ্চর্য চোখে আমার দিকে এক পলক তাকিয়েই টিভিতে মন দিল।

galpobadhakopi_4 (Small)আসলে টিভিতে তখন কমনওয়েলথ গেমস জাতীয় একটা খেলার আসরের লাইভ টেলিকাস্ট চলছিল। সেদিন একটা জিমনাস্টিক ইভেন্ট দেখাবার কথা। জিমনাস্টিককেই মিনি সার্কাস বলেছিল। যথারীতি গেম শুরু হল। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। আস্তে আস্তে সারাদিনের খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। উশখুশ করতে লাগলাম। মিনি বিরক্ত হচ্ছিল দেখে চুপ মেরে রইলাম। আরও কতক্ষণ কেটে গেছে হিসেব নেই। এক সময় মরিয়া হয়ে ফিসফিস করে কাতর গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “অ্যাই মিনি, আর কতক্ষণ রে! বাড়ি যাবি না?”

“আহ, চুপ কর না! দেখতে দে।” মিনি ধমকে উঠল। আমার একটু অভিমান হল। মনে মনে ভাবলাম, দেখেছ মিনির কাণ্ডটা! আমায় প্রায় একরকম জোর করে টেনে এনে এখন ধমকাচ্ছে। আর কক্ষণো যদি মিনির সাথে কোথাও গিয়েছি! ভাবতে ভাবতে অন্ধকার ঘরে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দরজার গোড়ায় একটা হুঙ্কার কানে আসতেই সোজা হয়ে বসলাম। একটা বাঁজখাই গলায় কে যেন জিজ্ঞেস করছে, “মিনি, কোথায় বসেছিস তুই? বেরিয়ে এলি?”

ওহ, কাকুর গলা। মিনির বাবা। কে যেন ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিল। মিনি মুখ ভার করে আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগোল। পেছন পেছন আমি। কাকু ধমকে উঠে বললেন, “তোকে কতক্ষণ বলেছিলাম আমি? বলেছিলাম না স্রেফ একঘণ্টা? ক’টা বাজে জানিস এখন?”

আমি একটু মুখটা বাড়িয়ে বাইরেটা দেখেই আঁতকে উঠলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে টেরই পাইনি। এতক্ষণ আমায় দেখেনি কাকু। হঠাৎ চোখ পড়তেই চমকে উঠে বলল, “সে কী, রাজা! তুই এখানে? ওদিকে তোদের পাড়ায় যে হুলুস্থুলু পড়ে গেছে। তোর মা হাসপাতালে। তোকে খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। তোর বাবা, মামারা, পাড়াপড়শি যে যেদিকে পারছে হন্যে হয়ে গরু খোঁজা করছে তোকে আর তুই এখানে বসে বসে…” বলেই আমাকে আর মিনিকে শক্তহাতে আঁকড়ে ধরে জোর পায়ে হেঁটে চললেন আমাদের বাড়ির দিকে।

আমি ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম যে, কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। শুধু একটা কথাই মাথায় বার বার ঘা মারছিল, ‘তোর মা হাসপাতালে’। সে সময় মোবাইল তো দূরের কথা কারও বাড়িতে একটা ল্যান্ডফোনও ছিল না সারা অঞ্চল জুড়ে। তাই আমাকে বাড়িতে জমা করে দিয়ে লোক মারফত খবর পাঠাতে লাগলেন কাকু। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাকে দেখছেন তাকেই বলছেন, “রাজাকে পাওয়া গেছে। ওদেরকে খবরটা পৌঁছে দাও যেমন করেই হোক।”

আস্তে আস্তে সবাই জড়ো হতে লাগল একটা সময়ের পরে। বাবা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে আমাকে কষিয়ে এক থাপ্পড় মারল। তারপর বুকে জড়িয়ে ধরল। ছোট দুই ভাই বোন আতঙ্কভরা চোখে তাকিয়ে রইল। ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “মা? মা কোথায় বাবা?”

“আছে, হাসপাতালে। স্যালাইন চলছে একটা দেখে এসেছি। শেষ হলেই চলে আসতে বলেছি তোর ছোটমামাকে।”

আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সব ক্ষোভ, অভিমান গিয়ে পড়ল মিনির ওপর। বাবার কাছ থেকে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে কাকুর দিকে তাকিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলাম। তারপর একটু সামলে নিয়ে বললাম, “সব দোষ ওই মিনিটার, জানো কাকু! ও-ই আমাকে জোর করে নিয়ে গেল ডোন থেকে। আমি তো তখন মামাবাড়ি যাচ্ছিলাম।”

মিনির চোখমুখ থমথম করতে লাগল। দুই চোখে আগুন নিয়ে ধমকে উঠল, “অ্যাই রাজা, খবরদার, মিথ্যে বলবি না একদম বলে দিচ্ছি। আমি কখন তোকে নিয়ে গেলাম? আজ তো আমি খেলতেও যাই নি। আর তুই বলছিস…”

কাকু তখন মধ্যে পড়ে হাত তুলে বললেন, “দাঁড়া দাঁড়া। রাজা, কী বলছিলি তুই? মিনি তোকে ডেকে নিয়ে গেছে টুটনদের বাড়ি?”

“হ্যাঁ। ও-ই তো!”

“কিন্তু, ও তো আজ স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতেই ছিল শুনলাম। খেলতেও যায় নি। তারপর দুপুরের পর আমি নিজে ওকে টুটুনদের বাড়ি রেখে এলাম। সেই অব্দি তো সেখানেই ছিল। একটু আগে দু’চারজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তুই নাকি মিনির আগেই ওবাড়িতে ঢুকেছিস।”

আমি হতভম্ব হয়ে একবার মিনির দিকে আর একবার কাকুর দিকে তাকালাম। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই আমার চুলগুলো খাড়া হয়ে গেল। এটা নির্ঘাত ওই গাবগাছের বুড়ির কাজ। আমার মাদুলি থাকাতে আমায় ছুঁতে না পেরে শেষে বুদ্ধি করে মিনির বেশ ধরে… আস্তে আস্তে আমার চারদিক অন্ধকার হয়ে এল।

চোখের পাতার ওপর ঠাণ্ডা একটা ঝাপটা খেয়েই জেগে উঠলাম আমি। কতক্ষণ বেহুঁশ ছিলাম জানি না। চোখ মেলে দেখি মা’র কোলে আমার মাথা। আমার সারা গা, মা’র কোল, শাড়ির আঁচল ভিজে সপসপে হয়ে আছে। আলুথালু বেশে অঝোরে কাঁদছে মা।

পরের দিন আমার কথামত গাবগাছটার কাছে ঝোপটার ভেতর হাত ঢুকিয়ে টিফিনের ব্যাগটা টিলার নীচে নিয়ে এল বড়োমামা। যাক একেবারে অক্ষত অবস্থাতেই আছে। ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকে মুড়ে গিঁট দেওয়া অবিকল টিফিন বাটিটা বের করা হল। গিঁটটা মা ঠিক যেভাবে দিয়েছিল ঠিক সেভাবেই রয়ে গেছে। গিঁট খুলে আস্তে আস্তে বাটির ঢাকনাটা খোলা হল। ঢাকনা খুলে এবার অজ্ঞান হয়ে গেল বড়োমামা। কারণ, ঢাকনা খুলতেই দেখা গেল এই অ্যাত্তখানি বাঁধাকপি তরকারির মধ্যে আধা কাপের মতো মাত্র পড়ে আছে। বড়োমামার জন্য তাড়াতাড়ি একঘটি জল আনতে ছুটে গেল মা।

ছবিঃ অনুপম চক্রবর্তী

2 thoughts on “গল্পঃ বাঁধাকপির তরকারি– রাজীবকুমার সাহা”

Leave a Reply