গল্প-কুয়াশার ডাক-পুষ্পেন মণ্ডল

golpokuasha01 (Small)

ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাত্রিবেলা গাড়ি চালাচ্ছি। শীতকালের রাত।ঘড়িতে প্রায় বারোটা বাজে। গন্তব্যস্থল উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসি থেকে মধ্যপ্রদেশের সাতনা। কোম্পানির খুবই জরুরি একটা মেশিনের পার্টস রাত্রের মধ্যেই সাতনা প্লান্টে গিয়ে ফিটিং করে দিতে হবে। পান্না ন্যাশনাল পার্কের গা ঘেঁসে রাস্তা, এন.এইচ.৭৫। গাড়ির সব কাচ তোলা।হেডলাইটের আলোয় দশ ফুট সামনে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।তারপর ধূসর কুয়াশা। যত এগোচ্ছি কুয়াশা তত ঘন হচ্ছে। ফগ লাইট জ্বেলেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। পাশের জঙ্গলে বুনোশুয়োর,হরিণ,অন্যান্য জন্তুও মনে হয় অনেক আছে। মাঝেমাঝেই রাস্তার ওপরে দু’একটা উঠে আসছে। ঘন অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে তাদের চোখ। কিছুক্ষণ আগে একটাকে মারতে মারতে বাঁচিয়েছি।

“বাংলোটা আর কত দূর?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“আমিও তো অনেকদিন পরে আসছি এ রাস্তায়।ঠিক মনে করতে পারছিনা। শেষ বার যখন এসেছিলাম রাস্তাটা এত ভালো ছিল না।চওড়াও ছিল না।যতদূর মনে পড়ছে ডানদিকে একটা কাঁচা রাস্তা পড়বে।সেখান দিয়ে ঢুকে মিনিট পাঁচেক লাগবে বাড়িটাতে পৌঁছাতে।” জানাল মৈনাক।

আমরা ঠিক করেছি রাতটা কোথাও কাটিয়ে ভোরবেলা বেরিয়ে দশটার মধ্যে ফ্যাক্টরিতে পৌঁছাতে পারলেই হবে। আবার জিজ্ঞাসা করলাম,“সেই ডানদিকের কাঁচা রাস্তাটা চিনতে পারবে তো?”

“একটা ঝাঁকড়া মোটা মেহগনি গাছ ছিল। সেটাই ল্যান্ডমার্ক।”

“রাস্তা চওড়া হওয়ার সময় যদি গাছটা কেটে ফেলে থাকে?”

“তাহলে মনে হয় সেই রাস্তাটা চিনতে পারব না।”

“তখন কী হবে? রাত্রে একটা থাকার জায়গা চাই তো?”

“সারারাত ধীরে ধীরে গাড়ি চালালে ভোরবেলা আমরা সাতনা পৌঁছে যাব।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,“সামনে দেখ,যে হারে কুয়াশা পড়ছে আধঘন্টা পরে সেকেন্ড গিয়ারেও গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে যাবে। বুনো জন্তুগুলো রাত বাড়তেই রাস্তার দখল নিচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে।”

সে আমার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল, “ধুস্‌! তুমি শুধুশুধু ভয় পাচ্ছ। অ্যাক্সিডেন্ট হলেও মানুষ তো আর মরবে না। বুনো জন্তু মরতে পারে। ঘণ্টাদুয়েক হল কোন মানুষের দেখা এ রাস্তায় পাওয়া যায়নি।”

“কেন,মিনিট পনের আগে একটা ট্রাক ক্রস করল উল্টোদিক থেকে দেখতে পাওনি? ট্রাকটা একদম সামনাসামনি চলে এসেছিল,কী করে যে বেঁচে গেলাম কে জানে!আরও ভয় পাচ্ছি,তার কারণ গাড়ির স্টেপনি চাকাটাও লিক হয়ে আছে,ইঞ্জিন থেকেও আওয়াজ হচ্ছে।এই অতিবৃদ্ধ অ্যাম্বাসাডার গাড়ি নিয়ে এত রাতে না বের হলেই ভালো হত। গাড়িটা মাঝে মাঝেই হেঁচকি তুলছে। যদি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়!”

হঠাৎ মৈনাক চেঁচিয়ে বলল,“ওইতো সেই বড়ো গাছটা। এই ডানদিকের সরু রাস্তায় ঢুকে পড়।”

আমি এক ঝলক দেখেই একটা হালকা ব্রেক মেরে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলাম। এ গাড়ির স্টিয়ারিং আবার দু পাক ফলস খায়।একটা গোঁত খেয়ে এবড়োখেবড়ো কাঁচা সরু রাস্তায় নেমে গেল।ঘন জঙ্গল দু পাশ থেকে চেপে রাস্তাটাকে আরও ছোট করে দিয়েছে।ডালপালাগুলি ঘসে যাচ্ছে গাড়ির গায়ে।হেডলাইটের আলোয় অন্ধকারের মধ্যে শুধু দু-একটা জন্তুর চোখ জ্বলজ্বল করছে।

“আর কতটা?” প্রশ্ন করলাম।

“মিনিট দুয়েক। সামনেই দেখতে পাবে।” মৈনাক বলল।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। পাথুরে রাস্তা, আঁকাবাঁকা,সামান্য চড়াই উৎরাই। কিছুটা গিয়ে একটা বাঁক নিতেই সামনে বড়ো গেট দেখা গেল। হেডলাইটের আলোয় বেশ ঝকঝক করছে। গেটের দু’দিকে দুটো বড়ো বাহারি আলো। পাশে স্টিলের নেমপ্লেটে বাংলায় লেখা “কুয়াশা”। অবস্থাপন্ন বড়োলোক বোঝাই যাচ্ছে।

তিনবার হর্ন বাজাতেই এক বৃদ্ধ গেট ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে হিন্দিতে জানতে চাইল,“কাকে চাই?”

মৈনাক গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে বাংলায় বলল,“বলরামবাবু আছেন? বলুন মৈনাক ঘোষ কলকাতা থেকে এসেছে।”

লোকটি ভিতরে ঢুকে যেতে আমিও গাড়ি থেকে নামলাম, “কী ব্যাপার বলো তো মৈনাক? এরকম অদ্ভুতুড়ে জায়গায় এত দামি বাংলো! কোন বাঙালির? তুমিই বা একে চিনলে কী করে?”

“সে অনেক কথা বরুণদা। আগে ভেতরে চলো,তারপর শুনবে।”

মিনিটখানেকের মধ্যেই লোকটি দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল,“আসুন বাবু, গাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে দিন।”

বাংলোর পোর্টিকোর মধ্যে গাড়িটা রেখে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। পোর্টিকোতে একটা দামি লম্বা গাড়ি দাঁড় করানো রয়েছে। বাড়ির ভেতরটা আলোআঁধারি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন করা। কালো আর ধূসর রঙের আধিক্য। খুব সুন্দর।ভদ্রলোক যেই হোন,তাঁর রুচির তারিফ না করে পারছি না।

আমরা লোকটির সাথে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। একটা বড়ো বসার ঘরে দামি সোফায় বসতে বলে সে ভিতরে চলে গেল। মৈনাককে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এবার তো খুলে বল। আমার পেটের ভিতরে বেড়াল আঁচড়াচ্ছে।”

“আর একটু সবুর করো। উনি আসছেন।”

বলতে বলতেই ঘরে ঢুকলেন এক সৌম্যকান্তি লম্বা চওড়া বয়স্ক মানুষ। সাদা সিল্কের মত বড়ো বড়ো চুল কাঁধ পর্যন্ত। পরনে কালো সিল্কের ধুতি পাঞ্জাবী। গম্ভীর সুন্দর গলায় বললেন, “কেমন আছো মৈনাক?”

মৈনাক এগিয়ে গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বলল, “আমি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন স্যার?”

“আমার আর কী? ওই একই রকম। সেই বিদঘুটে শখ নিয়ে কেটে যাচ্ছে। ইনি কে? তোমার বন্ধু? নমস্কার।” আমাকে দেখে হাত জড়ো করলেন।

আমিও উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিসম্ভাষণ জানালাম। মৈনাক পরিচয় করিয়ে দিল, “ইনি অফিশিয়ালি আমার বস। কিন্তু আমার দাদার মত। বরুণ সেন। আমরা যাচ্ছিলাম সাতনা প্ল্যান্টে একটা আর্জেন্ট কাজে।রাস্তায় এত কুয়াশা পড়েছে যে গাড়ি চালানোই মুশকিল। তাই ভাবলাম আপনার এখানে রাতটা কাটিয়ে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ব। কোন অসুবিধা করে দিলাম না তো?”

“আরে না না। জানোই তো আমার যত কাজ সব রাত জেগে।”

“আমি তো জানি,কিন্তু বরুণদাকে আপনার সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তাই ওর কাছে সবটাই রহস্য।”

“বোসো,আগে ডিনারটা সেরে নাও।তারপর কথা হবে।”

“না স্যার,আমরা আসার পথে একটা ধাবাতে ডিনার করে নিয়েছি।ও নিয়ে ব্যস্ত হবেন না।”

“ঠিক আছে শীতের রাতে একটু কফি তো খাও।” এই বলে তিনি কফি আনতে বললেন।

সোফায় বসে কথা শুরু হল। মৈনাকই প্রথম শুরু করল,“ইনি হলেন বলরাম মোদক চৌধুরী। সাইকোলজির প্রফেসার। সারাজীবন বিদেশে কাটিয়ে, রিটায়ারমেন্টের পরে এখানে এসে প্যারাসাইকোলজি নিয়ে চর্চা করছেন। এই বাড়িটা এরকম জঙ্গলের মধ্যে বিশেষভাবে তৈরি ওঁর কাজের জন্য। আমার সাথে আলাপ প্রায় বারো বছর আগে। বেঙ্গালুরুতে একটা প্যারাসাইকোলজির কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলেন। সেই সময়ে এক বন্ধুর সাথে ওখানকার একটা প্ল্যানচেট ক্লাবে গিয়ে এঁর সাথে পরিচয় হয়। কথা বলে জানতে পারি ইনি আমাদেরই পুরানো পাড়ার বাসিন্দা।”

আমি মৈনাককে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “প্ল্যানচেট— মানে পরলোক চর্চা?”

“হ্যাঁ, মৃত আত্মাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা।”

আমি মৃদু হেসে বললাম, “আজকের দুনিয়ায় বসে আপনারা এসব মানেন?”

“কী বলছ বরুণদা? তোমার সামনে যিনি বসে আছেন ইনি একজন জীবন্ত কিংবদন্তী, বিশ্বের সব থেকে সেরা মিডিয়ামদের মধ্যে একজন। যে কোন মৃত ব্যক্তির আত্মা ইনি গ্যারান্টি দিয়ে নামাতে পারেন। দেশ-বিদেশের কত ক্লায়েন্ট এঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে।”

“আরে না না, মৈনাক একটু বাড়িয়ে বলছে। স্পিরিচুয়ালিজম নিয়ে আমার বহু গবেষণাপত্র প্যারাসাইকোলজির অনেক পত্রপত্রিকায় বেরিয়েছে। আফ্রিকার ব্ল্যাক ম্যাজিক, দক্ষিণ আমেরিকার ভুডু ডল, প্রেততত্ত্ব, টেলিপ্যাথি, স্বপ্নাদেশ, এসব নিয়ে আমার গবেষণা বিশ্বের বড়ো বড়ো মনস্তত্ত্ববিদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার দুরাহামের ‘প্যারাসাইকোলজিকাল এ্যাসোসিয়েশন’, আমেরিকার ‘রেনে রিসার্চ ইন্সটিটিউট’, লন্ডনের ‘সোসাইটি ফর সাইকোলজিক্যাল রিসার্চ’-এর আমি সদস্য।

“স্যার উইলিয়াম জেমস,কার্ল জিনার,জোসেফ বি.রেনে,হেনরি সিডুইক,থমসন জয় হুডসনদের মত পৃথিবী বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদরা প্রমাণ করে গেছেন মৃত্যুর পরেও আত্মার অস্তিত্ব থাকে।স্বামী অভেদানন্দের “মরণের পারে” বইটিও প্যারাসাইকোলজিকে সমর্থন করে। আর প্ল্যানচেটটা আমার বহু বছরের একটা নেশা,সারা রাত ধরে প্ল্যানচেট করে ভোররাতে ঘুমাতে যাই।এখনও তিনতলার চিলে ছাদের ঘরে আমি প্ল্যানচেটে বসেছিলাম। প্রতিদিন মনের অবস্থা তো আর ভালো থাকে না। আজকে তেমনই মনঃসংযোগ করতে দেরি হচ্ছিল। এক মাড়োয়ারি ক্লায়েন্টের মুম্বাই থেকে আসার কথা ছিল। কোন কারণে হঠাৎ সে আসতে পারেনি। তারপর সদাশিব গিয়ে তোমাদের কথা বলল।”

কফির পেয়ালাটা হাতে তুলে নিয়ে আমি বললাম,“কিছু মনে করবেন না,আমি কিন্তু যুক্তিবাদী।ভুত বা আত্মাতে আমার বিশ্বাস নেই।কলেজজীবনে এইসব বুজরুকির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। তাই এই ব্যাপারগুলো আমার ঠিক হজম হচ্ছে না।”

চৌধুরীবাবু বললেন,“আমাদের চারপাশে এমন অনেক কিছু আছে যা ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা সম্ভব নয়। ঈশ্বর বা আত্মা এরকমই সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যাপার। এটা সবার দ্বারা অনুধাবন করা অসম্ভব। যেমন ধরো কোন জন্মান্ধ ব্যক্তি কি কখনও সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে আনন্দ পেতে পারে? অন্যের কথা শুনে কতটা বোঝা সম্ভব?”

“আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বিজ্ঞান এখন এতটাই উন্নত হয়েছে যে তার চোখ দিয়ে সব কিছু দেখা সম্ভব। জন্মান্ধ ব্যক্তিরাও এখন মেডিক্যাল সায়েন্সের কৃপায় চোখের দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে। তাছাড়া প্যারাসাইকোলজি কোনদিনই বিশুদ্ধ বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। অনেকেই দাবি করেছেন যে তাঁরা নাকি আত্মার ছবি তুলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুসন্ধান করে দেখা গেছে সে সবই এক রকম ট্রিক। ধরুন জগদীশচন্দ্র বসু এবং মার্কনি প্রায় একই সময়ে রেডিও তরঙ্গ আবিষ্কার করলেন। এরপরে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে বহু বিজ্ঞানী ঐ একই পরীক্ষা করে একই ফল পেয়েছেন। এবং সেটাকে বিজ্ঞান স্বীকৃতি দিয়েছে। প্যারাসাইকোলজির ক্ষেত্রে এরকমটা হয়না। কেউ হয়ত কখনও কিছু একটা দাবি করল, কিন্তু পরে সে আর প্রমাণ করতে পারল না। যেমন এই টেলিপ্যাথি বা স্বপ্নাদেশ।”

তিনি হেসে বললেন,“যুক্তিবাদীদের একটা ভালো দিক হচ্ছে যে তারা সবকিছু প্রমাণসাপেক্ষে বিশ্বাস করে।এখন তোমাকে যদি আমি প্রমাণ করে দেখাই যে আত্মা সত্যিই আছে,আর তাদের সাথে ভালো মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে যোগাযোগও করা যায়,তোমার সামনে যদি তাদের এনে হাজির করাই,তাহলে নিশ্চয়ই মানবে?”

“অবশ্যই মানব,” আমিও জোরের সাথে বললাম।

“চলো তাহলে আমার সাথে। তুমি যাকে বলবে আমি সেই আত্মাকেই আজকে ডেকে আনব,” বলে ভদ্রলোক উঠে পড়লেন।

বুঝলাম তিনি আমার ওপর ভালোরকম অসন্তুষ্ট হয়েছেন।আমি জানি এই ব্যাপারগুলো প্রায় সবই শেষে ভাঁওতাবাজি বা বুজরুকির জায়গায় যায়। মৈনাকও গুম হয়ে গেছে। তার এত শ্রদ্ধেয় স্যারকে অবিশ্বাস করে চ্যালেঞ্জ করেছি। এটা মনে হয় ও আমার কাছ থেকে আশা করেনি।

আমরা সবাই তিনতলার একটা ছোট্ট অন্ধকার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। ভিতরটা চন্দন কাঠের ধূপের গন্ধে মম করছে। মেঝেতে দামি কার্পেটের ওপর ছোট্ট কাঠের একটা টেবিল। চারদিকে ঘিরে চেয়ার। একটা মোটা মোমবাতি জ্বলছে টেবিলের ওপরে। আমরা তিন দিকে ঘিরে বসলাম। লক্ষ করলাম টেবিলের ওপরে দাবার ঘরের মত ঘর কেটে এ থেকে জেড পর্যন্ত লেখা রয়েছে।

“প্ল্যানচেট শুরুর আগে কয়েকটা কথা বলে নেওয়া দরকার,” বলরামবাবু শুরু করলেন, “অনেকের মতে, যারা বিশ্বাস করে না তেমন কেউ উপস্থিত থাকলে আত্মা সহজে আসতে চায় না। কথাটা ঠিক, তবে এর আগেও আমি দু’তিনবার অবিশ্বাসী মানুষের উপস্থিতিতে আত্মাকে হাজির করিয়েছি।সেক্ষেত্রে মিডিয়াম অর্থাৎ আমার ওপর মানসিক চাপ অনেক বেশি পড়ে।সময়ও একটু বেশি লাগে। আশা করি তোমরা আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবে। আর মনঃসংযোগ করার সময়ে চোখ বন্ধ রাখবে।”

কথা থামিয়ে পাশে রাখা এক গ্লাস জল তিনি পুরোটা খেয়ে নিলেন। তারপর সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বলুন বরুণবাবু কার আত্মা নামাতে চান?”

আমি প্রস্তুত ছিলাম। এই ধরনের ভণ্ডদের আমি আগেও কয়েকবার জব্দ করেছি কলেজ লাইফে। সবাই সাধারণত কোন বিখ্যাত ব্যক্তির আত্মাকে ডাকতে চায়, যাকে সবাই চেনে। এই ব্যক্তিদের জীবনী ভালো মিডিয়ামদের মোটামুটি মুখস্থ থাকে। আর তাদের জীবনের অনেক কথা বলে সবাইকে চমকে দেয়। নাহলে নিজেদের কাছের কোন মৃত আত্মীয়ের আত্মা নামাতে বললে তারা অতি সাধারণ সব কথা বলে, যেমন – আমি সুখে আছি, মৃত্যুর পরে কোন রাগ অভিমান নেই, তোমাদের সামনে একটা ফাঁড়া আসছে। তারপরেই বলে আমি আর কথা বলতে পারছি না, মর্তলোকে এসে খুব কষ্ট হচ্ছে, আমাকে মুক্তি দাও। তখন মিডিয়াম ঝিমিয়ে পড়ে। নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এরকমই হয়।

আমি বললাম, “আমার এক পিসিমা গত হয়েছেন মাস তিনেক আগে। মৃত্যুর আগে বজবজের পুরোনো বাড়িতে থাকতেন। আমায় খুব ভালোবাসতেন। তাঁর আত্মাকে কি ডাকা যাবে?”

“হ্যাঁ ডাকা যাবে। তাঁর নাম কী?”

“ঈশ্বর রেখা ঘোষ।”

“তাঁর কোন ছবি আছে তোমার কাছে?”

“এক মিনিট।” বলে পকেট থেকে আইফোনটা বের করে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বললাম, “এই যে পেয়েছি। মারা যাবার ক’দিন আগে তোলা ছবি। বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর।” বলে ওঁদের দুজনকে ছবিটা দেখিয়ে দিলাম।

বলরামবাবু বললেন, “এবার সবাই চোখ বন্ধ করে ঐ ছবিটার ওপরে মনটাকে কেন্দ্রীভূত কর। হয়ত আধ ঘণ্টার মত সময় লাগবে। রেডি।”

ফোন পকেটে রেখে চোখ বন্ধ করলাম। মনে মনে ভাবলাম, ভালো ভড়কে দিয়েছি দুজনকে। আধঘণ্টা পরে যদি আত্মা সত্যিই নামে তাহলে আমি আর হাসি চেপে রাখতে পারব না। কারণ আমার তিন কুলে কোন পিসিমা নেই। আর যে ছবিটা দেখালাম, সেটা “ওল্ড ওম্যান” শব্দটা গুগুলে সার্চ করে যে ছবিটা আমার পছন্দ হল সেটা। এইবার বলরামবাবুর মুখোশটা খুলে ফেলতে পারব। এই যে বিশাল বড়ো বাংলো বাড়ি বানিয়েছেন সেটা নিশ্চয়ই ক্লায়েন্টদের বোকা বানিয়ে হাতানো টাকায়।

অনেকক্ষণ বসে আছি কোন সাড়াশব্দ নেই। আগের একটা অভিজ্ঞতায় মনে আছে, বাগবাজারের একটা পোড়োবাড়ির চিলে ছাদে এক ভণ্ড তান্ত্রিকের কাছে আমরা চার বন্ধু গিয়েছিলাম। প্রায় একইরকম পরিস্থিতি। প্রথম টেবিলটা নড়তে শুরু করল। তারপর তান্ত্রিকটার গলার স্বর পাল্টে গেল। যে লোকটির আত্মা নামাল সেই লোকটিকে সশরীরে হাজির করানোর জন্য অন্য দুই বন্ধু তাকে নিয়ে নিচে অপেক্ষা করছিল। তান্ত্রিক যখন গোটা শরীর নাড়িয়ে নাড়িয়ে ভর হবার ভান করে কথা বলছে, তখন আসল লোকটিকে সামনে হাজির করানো হল। তাকে দেখেই মার খাবার ভয়ে তান্ত্রিক অজ্ঞান হয়ে গেল।

“চোখ খোলো।” বলরাম বাবুর আওয়াজে চোখ খুলে তাকালাম। কিন্তু চোখ খুলতে খুব কষ্ট হল। যেন কেউ চোখের পাতায় আঠা লাগিয়ে দিয়েছে। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন, “আমার জীবনে প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটল। যে আত্মাকে ডাকছিলাম, তার বদলে অন্য আত্মা এসে হাজির হয়েছে। এক নয় একাধিক আত্মা এসেছে। বুঝতে পারছ বরুণবাবু?” বলে আমার চোখের দিকে তাকালেন।

আমি মাথা নাড়লাম, “না”।

“তোমার চারপাশটা ভালো করে লক্ষ করো। দেয়ালের দিকে দেখ। মোমবাতির আলোয় আমাদের তিনজনের ছায়া দেয়ালে পড়েনি। এটা তোমার চোখ এড়িয়ে গেল কেমন করে, যুক্তিবাদী বরুণবাবু?”

আমার ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। সত্যিই তো আমাদের ছায়া পড়েনি কেন?

“কারণ আত্মাদের ছায়া হয়না। আধ ঘণ্টা আগে হাই রোডের ওপরে একটা ট্রাকের সাথে মুখোমুখি দুর্ঘটনায় তোমরা দুজনেই মারা গেছ। আর আমিও প্রায় একই সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ফলে শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। ঐ দেখ পেছনে আমার শরীর পড়ে আছে। এবার বিশ্বাস হল তো ……..”

 

1 thought on “গল্প-কুয়াশার ডাক-পুষ্পেন মণ্ডল”

Leave a Reply