গল্প প্রতিযোগিতার পুরষ্কৃত গল্প- সলিউশন এক্‌স্‌ দোয়েল বন্দ্যোপাধ্যায়-নবম

চৌকির উপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছে নাড়ুমামা। একটা ঠ্যাং আরেকটির উপর তোলা। গানের তালে তাল দেওয়ার মতো মৃদু-মৃদু নড়ছে পাদুটো। চোখের দৃষ্টি কড়িকাঠের দিকে স্থির। আমি জানি এসব কীসের লক্ষণ! নির্ঘাত একটা গুলগাপ্পা মার্কা গপ্পো ফাঁদছে। মানে আমার বিকেলে ফুটবল খেলাটা মাটি হবে। বাড়ির সকলে বেড়াতে গিয়েছে। আমি পেট কামড়াচ্ছে বলে যাইনি। পেট কামড়াচ্ছে না কচু! আজ গোকুলবাগানের ছেলেদের সঙ্গে আমাদের একটা ফাটাফাটি ম্যাচ আছে। এসপার নয় ওসপার। ওদের ক্যাপ্টেন ষষ্ঠীর খুব দেমাক। আজ ব্যাটাকে দেখে নেব। দুপুর থেকেই উত্তেজনায় ফুঁসছিলাম। তার মধ্যে কোথা থেকে বাক্স-প্যাঁটরা সমেত নাড়ুমামা এসে হাজির। নাড়ুমামাকে দেখে আমার মাথাটা ঝাঁ করে গরম হয়ে গেল। একে তো বাড়িতে কেউ নেই, তাই মামার হাজারো ফাইফরমাশ আমাকেই খাটতে হবে। শুধু তাই নয়, নাড়ুমামার একরাশ হাবিজাবি মনগড়া গপ্পোগুলোও শুনতে হবে। তবে নাড়ুমামা যে এতটা অপয়া, জানতাম না। ভেবেছিলাম দুপুরটা কোনওমতে টালবাহানা করে কাটিয়ে দেব আর মামা যখন ঘুমোবে টুক করে মাঠে চলে যাব। ও বাবা, সে গুড়ে বালি! নাড়ুমামা যখন একপেট খেয়ে ইয়াব্বড়ো একটা ঢেঁকুর তুলে তার ল্যাকপ্যাকে শরীরটা নিয়ে পায়চারি করছে, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ধুত্তোর! এ তো মহা জ্বালা হল। এতক্ষণ তো দিব্যি কটকটে রোদ্দুর ছিল। আর বৃষ্টি হওয়া মানেই ম্যাচ পণ্ড হওয়া। ব্যস! সেই সুযোগে আমাকে একলা পেয়ে নাড়ুমামা আমায় উষ্টুম-ধুষ্টুম গপ্পো শুনিয়ে আটকে রাখবে।

আমি নাড়ুমামার দিকে মোটেও না তাকিয়ে একমনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম। “হে ঠাকুর বৃষ্টি থামিয়ে দাও, আর কোনওদিন রান্নাঘরে ঢুকে চুরি করব না। হে ঠাকুর, বৃষ্টি থামিয়ে দাও। আর কোনওদিন অঙ্ক পরীক্ষায় ফেল করব না, হে ঠাকুর বৃষ্টি থামিয়ে দাও, আর কোনোদিন…”

“তুই হাড়জিরজিরি গ্রামের নাম শুনেছিস?” নাড়ুমামা মৌনব্রত ভাঙলেন। আমি জিভ ভেংচিয়ে বললাম, “জম্মে শুনিনি। ওরকম অলুক্ষুণে, আককুটেপানা গ্রামের নাম শুনতে আমার বয়েই গিয়েছে। হে ঠাকুর…”

“ঠাকুরকে আর ডাকিসনি রে নেবু, বৃষ্টি আজ আর থামবে না।”

“খবরদার বলছি, এরকম কথা বলবে না। বৃষ্টি থামবে, আলবাত থামবে।”

“সে যখন থামবে তখন দেখা যাবে। হাড়জিরজিরি গ্রাম থেকেই ডাইরেক্ট তোদের বাড়ি এলুম কিনা, তাই জিজ্ঞেস করছি।” এই বলে হে হে করে দাঁত বের করে হাসল।

বুঝতে পারলাম গপ্পো আস্তে আস্তে দানা বাঁধছে। আর নিস্তার নেই। তা এখন আমার যা অবস্থা, বাড়িতে কারেন্ট নেই, ফুটবল নেই, বোনের সঙ্গে খুনসুটি নেই। আমার তো মনে হচ্ছে চৌকির উপর আপাতত পদ্মাসনে বসে থাকা দি গ্রেট নাড়ুমামা আর আমি ছাড়া এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কিছুই নেই।

নাড়ুমামা বললেন, “ভাবিস না মিথ্যে বলছি। হাড়জিরজিরি গ্রাম সত্যি আছে। খুব ছোটোবেলায় যখন একবার গিয়েছিলুম, তখন দেখেছি বুঝলি। ওখানকার মানুষজন থেকে শুরু করে গরু, ছাগল, কুকুর এমনকী গাছপালা পর্যন্ত হাড়পাঁজরা বের করা। সেই থেকেই ওই নাম। এখন অবিশ্যি দেখলে বুঝবি না। আর এসব সম্ভব হয়েছে ক্ষ্যান্তপিসির জন্য।”

“তা তোমার এই জঘন্য গ্রামটা কোন জেলায় শুনি? আর এই ক্ষ্যান্ত পিসিই বা কে?”

“তুই আর জেলা-টেলার কোথা বলিসনি নেবু। তোর ভূগোলের দৌড় কতখানি সে আমার জানা আছে। মেদিনীপুরের পাশেই হচ্ছে সিঙ্গাপুর একথা লিখিসনি তুই পরীক্ষার খাতায়? আর ক্ষ্যান্তপিসি হচ্ছেন…”

এই পর্যন্ত বলে নাড়ুমামা আচমকা চৌকি থেকে নেমে সাঁ করে আমার পাশে সেঁটে দাঁড়িয়ে বললেন, “আগে বল পুরো গপ্পোটা শুনবি?”

“ঠিক আছে বাবা শুনব, উপায় কী না শুনে!”

“পুরোটা না শুনে বল পেটাতে যাবি না?

“না রে বাবা।”

মূলোর মতো দাঁত দেখিয়ে নাড়ুমামা এবার নিশ্চিন্ত হলেন। চৌকির উপর পুনরায় গুছিয়ে বসে বললেন, “তবে শোন। আমার মাসতুতো বোন পুঁটির শ্বশুরবাড়ি হল রতনপুর। হাড়জিরজিরির ঠিক পাশে। মাসির সঙ্গে ছোটোবেলায় ওখানে গিয়েছিলাম। সে অনেক কাল আগের কথা। তারপর ভয়ানক রকমের বড়ো হয়ে যখন মস্ত গোয়েন্দা হলুম…”

“ত-ত-ত-তুমি আবার গোয়েন্দা হলে কবে?” নিজের কানে শুনেও বিশ্বেস হচ্ছিল না আমার।

“হলে কবে মানে কী? আমি তো গোয়েন্দাই!”

“তবে যে মা বলল তুমি বাতের ব্যথার তেল বিক্রি করো!”

“করিই তো। ওটা হচ্ছে ছদ্মবেশ। ইংরিজিতে যাকে বলে ক্যামোফ্লাজ। ওসব তুই বুঝবি না। অনেক উচ্চমানের ব্যাপার কিনা।”

“বটে!” আমি মুখ হাঁড়িপানা করে বললাম। নাড়ুমামা পাত্তা না দিয়ে বলল, “যাক গে। যা বলছিলাম, গোয়েন্দা হওয়ার পর ওখানে গিয়ে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। সক্কলের চেহারা ফিরে গিয়েছে। কুকুরগুলো তেজী হয়ে খ্যাঁকখ্যাঁক করে কামড় দিতে আসছে, গরুগুলো গাঁকগাঁক করে গুঁতোতে আসছে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড। মানুষজনের চেহারাও দিব্যি খোলতাই হয়েছে। কী দেমাক তাদের ! ভাবলাম ব্যাপারটা একটু সরেজমিনে তদন্ত করতে হবে। কিন্ত পুঁটির আস্তানায় থেকে সেটা সম্ভব নয়। জানিসই তো ভালো গোয়েন্দারা সব সময় স্পটে গিয়ে তদন্ত করে।”

“কোন গণ্ডগ্রামের লোকেদের শরীর স্বাস্থ্য চেকনাই হল, তা নিয়ে তোমারই বা এত তদন্তের কী দরকার ছিল বাপু?”

“মেলা ফ্যাঁচফ্যাঁচ করিসনি তো। পুরোটা শোন আগে। হাড়জিরজিরিতে পুঁটির আপন দেওরের আপন শালীর আপন বান্ধবীর আপন মামীর বাড়িতে ডেরা জমালাম।”

“তোমার মাসতুতো বোনের দেওরের শালীর বান্ধবীর মামী তোমায় থাকতে দিল?”

“দেবে না কেন শুনি? তখনকার দিনে অত আপন-পর ছিল না। তাছাড়া আমার নামডাক শুনে তো মামী এক্কেরে আহলাদে আটখানা! তো সেই মামীর কাছ থেকেই প্রথমে কথা বের করার চেষ্টা করলাম। মামী জানাল কোনও এক ক্ষ্যান্তপিসির তৈরি আচার খেয়ে সকলের নাকি সব রোগব্যাধি সেরে গিয়েছে। পিসির তৈরি আচারে নাকি বিশেষ একটা জিনিস মেশানো হয়। কিন্ত সেটা যে কী, সেটা পিসি ছাড়া কেউ জানে না। আর জানে না বলেই নাম দিয়েছে সলিউশান এক্স। ব্যস! তদন্তের প্রথম সূত্র হাতে এসে গেল। মনে মনে পিতিজ্ঞে করলুম এই অজানা জিনিসটা কী আমাকে জানতেই হবে। নইলে আমার নাম নাড়ু গোয়েন্দা নয়।

 

“যেমন ভাবা তেমনি কাজ। পরের দিন থেকেই তদন্তে নেমে পড়লুম। খুব গোপনে রীতিমতো প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকটা তথ্য জোগাড় করলুম ক্ষ্যান্ত এবং তার আচার সম্পক্কে। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী বোঝা গেল, ক্ষ্যান্তর সাত পুরুষের ভিটে হল এই হাড়জিরজিরি। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে এখানেই আস্তানা পাতলেন পিসি। মাঝে মধ্যে আচার তৈরি করে পাড়ার লোকজনদের বিক্রি করতেন। গ্রামের মাতব্বররা পিসিকে এই আচারের ব্যবসা করার পরামর্শ দিলেন। তা বাপু গেরামভারী গোছের উপদেশ দিলেই তো আর হল না। ব্যবসাপত্তর করতে তো টাকা লাগে, সে আর তিনি পাবেন কোথায়। এমন সময় ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। আমার অবিশ্যি সব শুনে-টুনে খুব একটা পেত্যয় হইনি। ধাপ্পাও হতে পারে।”

“অনেকটা তোমার গল্পের মতো।” আমি আস্তে করে ফুট কাটলাম। বৃষ্টি আর বাজের শব্দে নাড়ুমামা বোধ হয় কথাটা ঠিক শুনতে পেল না।

“কী বলছিস?”

“কিছু না, বলছি সে তো হতেই পারে।”

“হ্যাঁ, আমারও সেটাই বক্তব্য। তবে ঘটনাটা ভারী মজার। তোর মতো হুঁকোমুখোদের তো আরও বেশি করে শোনা দরকার। হে! হে! হয়েছিল কী, হাড়জিরজিরিতে নদীর উপর সেতু তৈরি করার জন্য এলেন এক মস্ত সাহেব ইঞ্জিনিয়ার, সঙ্গে এলেন তার মেম। সেতু তো ধীরে-ধীরে তৈরি হতে থাকল, কিন্তু এখানকার জল হাওয়ায় মেমের বেদম অসুখ হল। এই ডাক্তার সেই ডাক্তার, হাকিম বদ্যি সকলেই হার মানল। এদিকে সাহেবের তো মাথায় হাত। এমন সময় মেমের অসুখের খবর পেয়ে কোঁচড়ে আচারের শিশি নিয়ে ক্ষ্যান্ত সেখানে এসে হাজির। সাহেব ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন, ‘হোয়াট ইজ দিস?’ ক্ষ্যান্তও দমে যাবার পাত্রী নন। তিনিও তোর মতো জঘন্য ইংরিজিতে জবাব দিলেন, ‘সাহেব, দিস আচার, মেম ইট, একদম ফিট!’ বলেই আচারের শিশি খুলে মেমের লম্বা নাকের সামনে ধরল। মেমও বাপু বলিহারি যাই। আচারের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে দিল এক খাবল মুখে পুরে। ব্যস! আর যায় কোথা। ওই জাঁদরেল টক আচার খেয়ে মেম তো খো-খো-খি-খি-খোয়াস-খোয়াস করে হেঁচে কেশে অস্থির হয়ে বিষম খেতে-খেতে কাটা কলাগাছের মতো দুম করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। সাহেব তো পুরো রেগে ফায়ার। ক্ষ্যান্তরও মুখ শুকিয়ে আমসি। অবশেষে আধবালতি বরফ জল মেমের মাথায় ঢেলে আর সাহেবের মস্ত জুতোখানা শোঁকাবার পর মেমের জ্ঞান যখন ফিরল, দেখা গেল মেমের সব রোগ সেরে গিয়েছে। পেট কামড়ানো, দাঁত কিড়মিড়, মাথা ব্যথা, কান কটকট, অম্বল, চোঁয়া ঢেকুর সব উধাও! মেম তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে ইংরিজিতে অনেক কঠিন-কঠিন শব্দ বলে ক্ষ্যান্তকে জড়িয়ে ধরল আর সাহেবেরও হুলোপানা মুখে এক চিলতে হাসি দেখা গেল। মোদ্দা কথা হচ্ছে সাহেব দেশে ফেরার আগে ক্ষ্যান্তকে মোটা রকমের বকশিশ দিয়েছিলেন, সেই টাকাতেই আচার ব্যবসার শুরু। তবে সাহেব তো এ্যাদ্দিনে মরে ভূত। মেমসাহেবও খুনখুনে বুড়ি। তো আমি করলাম কী, সাহেবের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দুর্দান্ত ইংরিজিতে চিঠি লিখে যোগাযোগ করলাম। আমার চিঠি পড়ে তো সাহেবের ছেলেমেয়েরা অবাক। আমাকেও ওদের মতো সাহেব-টাহেব ভেবে…”

“বুঝেছি। আর সলিউশন এক্স?”

 

“ইয়েস,সলিউশন এক্স। ওরা জানাল,ক্ষ্যান্ত নাকি সাহেবকে শর্ত দিয়েছিল,এই কথাটা জিজ্ঞেস করা চলবে না। আর সাহেবদের তো জানিস কথা ইজ কথা! কবরে যাওয়া পর্যন্ত স্পিকটি নট। তাই শেষমেষ আমাকেই মাঠে নামতে হল। মানে আমি ইতিমধ্যেই মাঠে ছিলাম, শুধু কোমর বাঁধলাম কষে।”

“হুলোবেড়ালের মতো।” আমি ভালোমানুষ মুখ করে বললাম।

“বাজে বকিস না।” নাড়ুমামা খেঁকিয়ে উঠল।

“আমার গোয়েন্দাগিরি সম্পক্কে তোর কোনও ধারণাই নেই।আমি প্রথমেই ক্ষ্যান্ত পিসির থেকে ঝটপট কয়েক বোতল আচার কিনে ফেললাম। আম,জাম,তেঁতুল,লেবু… আচার খেয়ে খেয়ে আমার চেহারা ফিরে গেল। কিন্ত কিছুতেই বুঝতে পারলাম না, ওতে কী এমন আলাদা জিনিস মেশানো আছে। কিন্তু হাল ছাড়লে তো চলবে না। জানিসই তো আমার আবার দেশে-বিদেশে বন্ধুর ছড়াছড়ি। আচারের খানিকটা নমুনা পাঠালাম আমার জাপানি বন্ধু হামাগুড়িকে। হামাগুড়ি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে আমায় জানাল, এতে আছে ম্যাঙ্গো,অয়েল,সুগার আর…”

“আর?” আমি চোখ গোল করে জানতে চাইলাম।

“আর সল্ট,মানে ইয়ে নুন!” কাঁচুমাচু মুখে বলল মামা।

“মানে?”

“মানে আমার মুন্ডু। হামাগুড়িও ধরতে পারল না ওতে স্পেশ্যাল কী মেশানো হয়। আমি তখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে ক্ষ্যান্তকে সর্বত্র ফলো করতে লাগলাম। ক্ষ্যান্ত ডালে-ডালে আমি পাতায়-পাতায়, ক্ষ্যান্ত ফুলে-ফুলে আমি ফলে-ফলে, ক্ষ্যান্ত মাঠে-মাঠে আমি…”

“ধুত্তোর! বুঝেছি রে বাবা। এত উপমা দেওয়ার কী আছে?”

rappasolution (Small)“আরে এসব তো তোকে আমি তদন্তের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য বলছি। তবে কী জানিস নেবু,এত ফলো করেও কিচ্ছুটি টের পেলাম না। মাঝখান থেকে একদিন বাঁশবনের মধ্যে ক্ষ্যান্তকে শ্যাডো করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম। পিসি আমায় পা থেকে খড়ম খুলে আগাপাশতলা পেটালেন। তারপর বললেন, ‘বল বদমায়েশ, কেন আমার পিছু নিয়েছিস?’   “আমি কোঁ-কোঁ করে বললাম,‘আচারে কী মেশান, সেইটে জানতেই…’ “তখন আমায় ছেড়ে দিয়ে হাত ঝেড়ে পিসি বললেন, ‘ওহ এই ব্যাপার। তার জন্য এত কসরত কেন বাপু। আমি তো সলিউশন এক্স মেশাই। গাঁশুদ্ধু লোক জানে।’            “‘আরে ওই সলিউশনটা কী সেটাই তো…’                                                     “পিসি ফিক করে হেসে ফেললেন, ‘ঠিক আছে, কাল সকালে আসিস, বলে দেব।’      “সেকী? এত সহজ? কাউকে বলেনি আর তোমাকে বলে দিল?”

“এমনি কি আর দিল রে! গোটাদশেক জর্দাপান আর পিসির পেয়ারের বেড়াল লবনচুষের জন্য কুঁচো মাছ ঘুষ দিলাম তবেই না বলল।”

“শুধু গোটাকয়েক জর্দা পান আর কুঁচো মাছেই কাজ হাসিল?”

“নয়তো কী? তবে হ্যাঁ, আমার এই অধ্যাবসায় দেখেও পিসির মন গলেছিল বৈকি।”

“এবার দয়া করে এটাও বলে দাও ওতে আসলে কী আছে? মানে এই সলিউশন এক্সটা আসলে কী?”

নাড়ুমামা খুব কায়দা করে পা দুলিয়ে-দুলিয়ে বলল, “কিস্যু না! আধছটাক মনের জোর আর পোয়াটাক ভরসা।”

“ক-ক-কী?”

“হ্যাঁরে। হাড়জিরজিরে গ্রামের গরিবগুর্বো লোকগুলো কী আর খায় বল। পিসির তৈরি আচার হাতে পেয়ে ভাবল ওতে কিনা জানি মেশানো আছে। এই ভেবেই সাদামাটা ডালভাত দিব্যি আরামে খেয়ে নিল। আরে বাবা, দেশ গাঁয়ে তো আচার-টাচার তৈরি হয়েই থাকে। পিসির বুদ্ধিখানা দ্যাখ। ওই একই জিনিস কেমন আলাদা করে দিল! রহস্যেরও সমাধান হল আর আমিও পিসির পায়ে পেন্নাম ঠুকে এখানে চলে এলুম।”

 

অনেকক্ষণ বকবক করে নাড়ুমামা ক্লান্ত হয়ে আবার চৌকিতে চিৎপাত হলেন। ওদিকে বৃষ্টিও ধরে এসেছে। তার মানে ম্যাচটা হচ্ছেই। আমি খুশি মনে পায়ে বুট গলাচ্ছি। নাড়ুমামা আবার সাঁ করে আমার কাছে এসে কানে-কানে বললেন, “শোন নেবু, আমি যে গোয়েন্দা, সেটা কিন্ত কাউকে বলিস না। চারদিকে শত্তুর কিলবিল করছে। জানাজানি হলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।”

আমি হেসে ফেললাম,“ঠিক আছে,বলব না।” মাঠে লোক আসতে শুরু করেছে। চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। খেলা বোধ হয় শুরু হয়ে গেছে। আমি দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এসে নাড়ুমামাকে বললাম, “আচ্ছা,এই যে গোপন কথাটা তুমি জেনে ফেললে,তুমি যদি কাউকে বলে দাও তখন…”

নাড়ুমামা হাই তুলে বললেন,“নাহ বলব না,আমারও ওই সাহেবদের মতো ব্যাপার। কথা ইজ কথা! আর তাছাড়া…”

নাড়ুমামার বাকি কথাটা শোনা হল না। মাঠ থেকে সমবেত চিৎকার এল, “গো-গো-গো-ল!”

 

ছবিঃ শ্রী শাম্ব

1 thought on “গল্প প্রতিযোগিতার পুরষ্কৃত গল্প- সলিউশন এক্‌স্‌ দোয়েল বন্দ্যোপাধ্যায়-নবম”

Leave a Reply