তাপস মৌলিক
রথের দিন সকালবেলা বিমর্ষবর্ধনের বাড়ি ঢোকার সময় ভাই বলবর্ধনকে বারান্দায় দেখে জিগ্যেস করলাম, “কী, দাদার মুড কেমন?” বলু বলে, “নট গুড, নো ফুড। নো ব্রেকফাস্টিং, ওনলি ফাস্টিং।” বলুর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টিতে সময় নষ্ট না করে ঘরে ঢুকে দেখি ভদ্রলোক যথারীতি মুখখানা হাঁড়িপানা করে বসে আছেন।
বললাম, “কী ব্যাপার? মুখ ব্যাজার কেন আবার?”
বিমর্ষবর্ধন বললেন, “ব্যাজার নয় হে, বাজার, বাজার।”
“মানে? আনন্দবাজার কিছু লিখল? নাকি আপনিও বলুর মত ইংরিজি বলছেন? বাজার মানে তো ঘণ্টি! বিপদ ঘণ্টা মানে ওয়ার্নিং বাজার। কোনও ওয়ার্নিং বাজার বাজার কথা বলছেন?”
“ঘন্টা বলছি! কী বাজে বকছেন, বাজার মানে বোঝেন না? বাংলায় যাকে বলে মার্কেট।”
“ও, বাংলা বাজার! তা সেও তো কতরকম। আমাদের শ্যামবাজার, বাগবাজার, বড়বাজার তো আছেই। এছাড়াও আনন্দবাজার, শেয়ার বাজার, কাজের বাজার। কোন বাজার বলছেন?”
“ওঃ, আপনাদের লেখকদের নিয়ে এই এক সমস্যা মশাই। আমি বারোটা বাজার কথা বলছি। দেশটার বারোটা বেজে গেল।”
“তাতে অসুবিধের কী আছে? সবুর করুন না, একটু পরেই দেখবেন বারোটা পাঁচ, বারোটা দশ করে দেশ এগিয়ে চলেছে। দেশটা তো আর থেমে নেই।”
“থেমে যে নেই সে তো বাজারে গিয়েই বুঝলাম। বাংলাদেশের ইলিশ বলছে হাজার টাকা কিলো! আমাদের গঙ্গার ইলিশও ছ’শ টাকার কমে নেই। গেল বছরই তো সাড়ে তিন’শ-চার’শ টাকায় ইলিশ খেলাম! দেখেশুনে বলুকে বললাম, ধুত্তোর, বাজারই করব না ছাতার। খালি ব্যাগ নিয়ে ফিরে এসেছি।”
“হুঁ, বলু বলছিল বটে, জলখাবার ব্যাপারটা হয়নি আজ।”
“জল খাবার বেলা তো বারণ করিনি! জল খেয়েই থাকব শুধু, আর কিছু খাওয়া আর পোষাবে না। ভালোই হবে, ভুঁড়িটাও একটু কমবে তাতে।”
“আপনার ভুঁড়ি যদি না ভরে, গরীব লোকেরা তবে কোথায় যাবে ভেবেছেন? আপনার এত টাকা, এত বড় ব্যাবসা, আপনিই বলছেন না খেয়ে থাকবেন?”
“টাকার কোনও দাম আছে নাকি আর? মনে মনে সেই অঙ্কই তো কষছিলাম। অঙ্কে আমায় ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই, ম্যাট্রিকে সাতচল্লিশ পেয়েছিলাম। গতবছরের চার’শ টাকার ইলিশ এবার ছ’শ টাকা হওয়ার মানে, গতবছর যদি আমার ব্যাংক ব্যালান্স ছ’লাখ টাকা হয়, এখন সেটা চার লাখ টাকা। দু’দিন পর তো ফতুর হয়ে যাব মশাই, ঘটিবাটি বিক্রি করতে হবে। ব্যাংকরাপ্ট না অ্যাবরাপ্ট কী যেন বলে!”
এইসময় দরজার আড়াল থেকে বৌদির ইশারা পেয়ে বুঝলাম, কিছু একটা এবার করতে হয়, কেননা বৌদিরও মনে হল সকাল থেকে পেটে কিছু পড়ে নি। দাদাকে ফেলে উনি খাবেনই বা কী করে! এদিকে বারোটা এখনও না বাজলেও এগারোটা প্রায় বাজে।
বললাম, “বালাই ষাট, আপনি ব্যাংকরাপ্ট হতে যাবেন কেন? ও সব করাপ্ট লোকেরা হয়। আপনার মত একজন সৎ ব্যবসায়ীর বাজার কখনও পড়ে না। কিন্তু এরকম ব্যাজার হয়ে বসে থাকলে বাজার ধরবেন কী করে? খাবারের সঙ্গে পেটের যেমন যোগ আছে, মনেরও তো আছে। ফুড অফ মানেই মুড অফ।”
“মুডের নিকুচি করেছে। ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছি বাড়ির উঠোনে পাঁচ টাকা কিলো দরে ইলিশ কিনতে। আর সে ইলিশ বলে ইলিশ! একেবারে রুপোর পাতের মত ঝকঝক করছে।”
“এই এতক্ষণে আপনি ঠিক লাইনে এসেছেন। স্মৃতির জগতে ঢুকে পড়লেই দেখবেন মুড আপনি ভাল হয়ে গেছে। স্মৃতি সততই সুখের। ছোটবেলার সেই গ্রামের দিনগুলোর কথা একবার ভেবে দেখুন, কোথায় লাগে তার পাশে এখনকার দিনকাল। নস্টালজিয়াকে নষ্ট বলাটা নষ্টামো ছাড়া কিছু নয়। বর্তমানে আমরা সবাই বর্তমানে থাকি, কেউ বুঝি না যে বর্তমানের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আর ভবিষ্যতের অবর্তমানে বর্তমানের কোনও মানে বর্তায় কি? অতীত ছাড়া তবে আর রইলটা কী?”
“কিন্তু শ্যামল মিত্র যে গেয়েছিলেন – স্মৃতি তুমি বেদনা? আমারও কিন্তু ছোটবেলার কথা ভাবলে একটু কষ্টই লাগে। সেই দিঘীর জলে দু’ঘন্টা দাপিয়ে স্নান, সেই আমবাগানে জামবাগানে ঘুরে বেড়ানো, ফল চুরি, আইসপাইস আর পিট্টু খেলা – ভাবলে গলার কাছটা একটু ব্যথা ব্যথাই করে।”
“সে আপনি বেশিদিন পেছোন না বলে। স্মৃতির ব্যাপারটা মদের মত, যত পুরনো তত বেশি নেশা। আপনি নিজেই ব্যাপারটা বুঝবেন। গতবছরের কথা ভাবুন, ইলিশ তখনও চার’শ টাকা ছিল। স্মৃতি ততটা সুখের নয়। ছোটবেলায় চলে যান, পাঁচ টাকা কিলো। আরও পেছোতে পেছোতে সেই মর্তমানে চলে যান, একেবারে অ্যাবসলিউট সুখ।”
“মর্তমানে মানে?”
“মানে, বর্তমানে মানুষ বর্তমানে থাকলেও এককালে তো মর্তমানে ছিল। মানুষের ইতিহাস তাই বলে। সেখানে পেছিয়ে যেতে পারলে একেবারে নিরবচ্ছিন্ন সুখ। কেবল গাছে গাছে শাখায় শাখায় ঘুরে বেড়াও আর ফল খাও, পল্লবগ্রাহীদের মত, ধরণীর বুকের এই শোকতাপ মূল্যবৃদ্ধি আর গায়েই লাগবে না।”
“ও, মর্তমান বলতে কলার কথা বলছেন? তা সোজা করে বলুন না, এত ছলাকলার দরকার কী? কিন্তু অত আগের স্মৃতি আপনার মনে পড়ে? আমার তো ছোটবেলার স্মৃতিই কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছে।”
“আহা, স্মৃতির কথা হচ্ছে না। আমি তো আর জাতিস্মর নই। কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের মজ্জায় আছে, জিনে আছে। এককালে তো আমরা ফল খেয়েই বাঁচতাম, তাই ফল খেলেই জিনগুলো উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মনটা সঙ্গে সঙ্গে সেই মর্তমান যুগের তূরীয় আনন্দের অবস্থায় চলে যায়। তাই, জল খাবার বেলা আপনি যেমন বারণ করেন নি, ফল খাবার বেলাও বারণ করা উচিত নয়। জলখাবার যখন হয় নি, ফলখাবার তখন হতেই পারে এখন।”
বিমর্ষবর্ধন একঝলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আর একবার ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “তা, আপনি যখন বলছেন তখন একবার চেষ্টা করে দেখাই যায়। ভুঁড়িটাও একটু কমেছে বলেই মনে হচ্ছে। ওরে বলু, দেখ তো বৌদির কাছে ফল-টল কিছু আছে কিনা? আমি তো খুব একটা কিনি-টিনি না, ফল কি আর পাব এখন?”
বলু প্রায় নাচতে নাচতে ভেতরে চলে যাবার পর অবশ্যম্ভাবী জয়ের উত্তেজনায় আমি বলে চললাম, “ফল পাবেন না মানে? আলবাত পাবেন। ফল খেলেই ফল পাবেন, আর ফল পেলেই ফল খেয়ে ফেলবেন, এবং খেয়ে দেখবেন অবশ্যই ফল পাচ্ছেন। তবে ফলের তো হরেক রকমফের আছে। কর্মফল, পরীক্ষার ফল এসব অখাদ্য ফল বাদ দিলেও আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আপেল, কমলা – ফল কি আর কম? তবে সবার সেরা ফল কিন্তু সেই কলা। কলারও আবার বৈচিত্র্যের অভাব নেই। চারুকলা, শিল্পকলা, নৃত্যকলা, সঙ্গীতকলা, চন্দ্রকলা, বেনীআসহকলা – একেবারে ষোলকলা পূর্ণ। এসব চারুকলা-টলা পাবলিকে খেলেও আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যতালিকায় ছিল বলে জানা যায় না। তাঁদের খাদ্যের মধ্যে বিচিকলা, চাঁপাকলা, কাঁঠালিকলা এসব নিম্নবর্গীয় কলার পিরামিডের শীর্ষে সেই আদি ও অকৃত্রিম মর্তমান কলা। ফল খেতে হলে তাই মর্তমান কলাই খাওয়া উচিৎ।”
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বলু ভগ্নদূতের মত ফিরে এসে হার্ট ব্রেকিং নিউজটি ঘোষণা করে, “দাদা, ফল তো নেই। তুমি তো বাজার কিছু করো নি আজ। ভাঁড়ার একদম নিষ্ফলা।” দরজার ওপাশ থেকে বৌদির গজগজও কর্ণগোচর হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমি কৌশল পাল্টাই, “তবে আরও অনেকরকম ফলও আছে। সেগুলোও ফলস্ বলা যায় না। যাহা ফলে তাহাই ফল। ধানগাছে ধান ফলে, বেগুনগাছে বেগুন ফলে। এসবই মানুষের কৃষিকর্মের ফল। আপনি দেখেননি কাগজে লেখে, এবারে ধানের ফলন ভাল, ডালের ফলন খারাপ ইত্যাদি? ফলন তো ফলেরই সম্ভব। তাই চাল, ডাল এসবও ফলই বলা যায়। মর্তমান কলার মত কুলীন ফল না হলেও, ফ্যালনাও নয় কিছু। খেলে কুফল কিছু পাবেন না।”
বলু মাঝখান থেকে যোগ করে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, যাহা ফলে তাহাই ফল। জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণী যদি ফলে সেটাও তো একরকম ফলই হল। ফল ফললে অর্থাৎ ফলন হলে তাকে ফলিত বলা যায়। তখন বলে ফলিত জ্যোতিষ। এছাড়াও ফলিত গণিত, ফলিত অর্থনীতি এসবের কথাও শুনেছি। সে সবেরও নিশ্চয়ই ফলন হয়।”
বলুটার সত্যি আর বুদ্ধি হবে না। বেশ কায়দা করে চাল-ডালে নিয়ে এসেছিলাম যাতে অন্তত খিচুড়িতে পৌঁছন যায়, কোথা থেকে ফলিত গণিত-টনিত নিয়ে এল। সাধে কি আর বলি, ওর নাম বলবর্ধন নয়, বল(দ)বর্ধন। ইংরিজি নিউমোনিয়ায় যেমন পি সাইলেন্ট, বল(দ)বর্ধনে সেরকম ‘দ’এর উচ্চারণ হয় না।
বলুর ফলিত শাস্ত্রচর্চার পিটফলে পড়ে নিট ফল হল এই যে, বিমর্ষবর্ধন বললেন, “দূর মশাই, চাল-ডাল আবার কবে থেকে ফল হল? সে সব তো আর গাছে ফলে না, চাষ করতে হয়। এদের তো শস্য বলে। আমাদের লাঙ্গুলযুক্ত পূর্বপুরুষরা কোনও দিন লাঙ্গল ধরেছিলেন বলে তো জানা নেই। তাদের সময়ে পৌঁছতে গেলে ওই গাছের ফলই ভরসা। চাল-ডাল খেয়ে যদি সেই কপিযুগে পৌঁছন যেত তবে তো প্রতিদিনই একবার মানসভ্রমণ করে আসতাম। আর আপনি যেমন বললেন, ফল যদি খেতেই হয়, আর খেয়ে ফল পেতে হয়, তবে মর্তমান কলা খাওয়াই ভাল। কলার প্রতি একটা নাড়ির টান অনুভব করছি, বুঝলেন মশাই। আর বেশ বুঝতে পারছি, কলাই আমাদের পূর্বপুরুষদের সবচেয়ে পছন্দের ফল। ছোটবেলায় বাড়ির গাছে হনুমান এলেই আমরা কচিকাঁচারা সবাই মিলে ছড়া কাটতাম – অ্যাই হনুমান কলা খাবি, জয় জগন্নাথ দেখতে যাবি? নাহ, এবার থেকে কলা খেয়েই থাকব।”
দরজার আড়াল থেকে বৌদির কলা দেখানো দেখে বুঝলাম ভাঁড়ারে কলাও নেই। তৎক্ষণাৎ আমার সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ল বলুর ওপর, “তুমি ওই ফলিত গণিতের কী জানো হে বলু? পাটিগণিতেই তো দাঁতকপাটি লেগে যায়। খালি বড় বড় কথা।”
বিমর্ষবর্ধন বললেন, “আরে ও তো ফলিত গণিতেই পোক্ত। ছোটবেলা থেকেই। সে গল্প আবার কলা নিয়েই। শোনেন নি?”
“কী রকম?”
বলু এইসময় ‘আহ দাদা, তুমি না!’ বলে আপত্তি জানানো সত্ত্বেও বিমর্ষবর্ধন বলে চললেন, “আরে লজ্জা কীসের? ছোটবেলায় সবারই ওরকম কিছু না কিছু ঘটনা থাকে। শুনুন বলি। ছোটবেলায় বলু যে কীরকম বিচ্ছু ছিল সে তো আপনি দেখেননি! সারাদিন আপনার বৌদিকে উত্যক্ত করে মারত। আমি তাই প্রতিদিন সকালে বলুকে একটা অঙ্ক করতে দিয়ে গদিতে চলে যেতাম, দুপুরে ফিরে দেখতাম অঙ্ক ঠিক হল কি না। তা, এক অঙ্কেই বলু সারা সকালটা ঠাণ্ডা থাকত। একদিন ওকে একটা সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক দিলাম, বলে গেলাম এক্স ধরে করলে কিন্তু শূন্য। অঙ্কটা ছিল – একটা কলার দাম যদি পঞ্চাশ পয়সা হয়, তবে আট আনায় কটা কলা পাওয়া যাবে? তা ফিরে দেখি বলু তখনও অঙ্ক কষেই চলেছে। অঙ্কখাতা শেষ। ঘরের দেওয়ালগুলো চকের আঁকিবুঁকিতে ভর্তি। তারপর সে মেঝেতে নেমেছে। চক দিয়ে পুরো মেঝেতে হিসেব করেও অঙ্ক মেলেনি। কিন্তু আর তো জায়গা নেই! তখন মেঝের যে জায়গাটায় বলু বসেছিল, খাটের ওপর উঠে নিচু হয়ে সেই সবেধন নীলমণি খালি জায়গাটুকুতে অঙ্ক মেলাতে বসেছে। বললাম, কী রে, এখনও অঙ্ক মেলে নি? আমায় দেখেই বলু বলে কী, এই তো হয়ে এসেছে। কিন্তু দাদা, কলাটা কি পাকা ছিল না কাঁচাকলা?”
“হুম, তার মানে বলু সেই ছোটবেলা থেকেই কলার ঘোরেই আছে। এখনও তো সারাদিন কী সব কলার টিউন, কলার আই ডি হেনতেন নিয়েই ব্যস্ত।”
এইসময় বৌদি হঠাৎ ঝমঝম করে ঘরে ঢুকে একটা পেতলের কলসি মেঝেতে নামিয়ে রেখে বললেন, “বলু, আমি ঘুমোতে গেলাম। সন্ধেবেলা ডেকে দিস। তোমাদের তিনজনের দুপুরের খাবার জল রেখে গেলাম, খেয়ে আমায় উদ্ধার কোরো।”
এমনিতে আমার ওপর বৌদির অগাধ আস্থা। উনি বলেন, বিমর্ষবর্ধনের বিমর্ষতা কাটানোর মর্স কোডটা নাকি খালি আমিই জানি। কিন্তু আজ ঘর থেকে বেরোনোর সময় আমার ওপর যেমন অগ্নিদৃষ্টি হেনে গেলেন, তাতে বুঝলাম সে আস্থায় ফাটল ধরেছে বড়োসড়ো। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি সর্বনাশ, দু’টো প্রায় বাজতে চলেছে। বৌদিকে খুব যে দোষ দেওয়া যায় তা নয়। আমি তো তবু জলখাবার খেয়ে এসেছি। এঁরা তো কাল রাতের পর থেকে পেটে জল ছাড়া আর কিছু চালান করেছেন বলে মনে হচ্ছে না। ছুটির দিনে সকালবেলা আমার বিমর্ষবর্ধনের বাড়ি আসার উদ্দেশ্যই হল দুপুরবেলাটায় আর হাত পুড়িয়ে রান্না না করে এখানেই খেয়ে যাওয়া। বিমর্ষবর্ধনের তরফ থেকেই প্রতিবার প্রস্তাবটা আসে। আজ আমি বাইরে বেরিয়ে হোটেল-টোটেল দেখে খেয়ে নিতেই পারতাম। আমার তো আর উপোস নয়! কিন্তু সেটা বিমর্ষবর্ধন আর বৌদির প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা হবে না কি? তাছাড়া কালই হয়তো ‘সুখের পায়রা’ বলে একটা মোক্ষম বিশেষণ জুটে গেল।
কিন্তু এদিকে যে পরিস্থিতি ক্রমশ হাতছাড়া হতে চলেছে। প্রসঙ্গ অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। মনে মনে তাড়াতাড়ি একটু ক্যালকুলেশন করে নিয়ে তাই আমি আবার সেই ক্যালকুলাস বা কলনবিদ্যারই শরণাপন্ন হলাম, “তা কলা খেয়ে থাকার ব্যাপারটা মন্দ নয়। আপনার আর বলুর দু’জনারই যখন ছোটবেলা থেকেই কলার ওপর একটা টান আছে, তখন জিনে ব্যাপারটা আছে ঠিকই। শুধু একটু কলাকৌশলের প্রয়োজন। আর আমিও তো কলাম লিখেই কলার তুলে ঘুরে বেড়াই, আমাকে তাই কলাকার বলাই যায়।”
বিমর্ষবর্ধন বললেন, “সে তো বুঝলাম। কিন্তু কলা এখন পাই কোথায় বলুন দেখি? বাজার তো বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে কলাবতীর হালচালও তো খুব সুবিধের ঠেকছে না।”
“কেন? আজ তো রথযাত্রা। রথের মেলায় গেলেই তো কলা মেলার সুবর্ণসুযোগ। রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচার একটা চিরকালীন সম্পর্ক আছে জানেন না? অনেকেই সেখানে রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচতেও যায়।”
“ব্যাপারটা মন্দ বলেন নি। জগন্নাথ দর্শনের সাথেই বোধহয় কলার একটা সম্পর্ক আছে। আহা, ছোটবেলায় না বুঝেশুনে আমাদের পূর্বপুরুষদের কতবার উত্যক্ত করেছি। আজ নিজেরাই জগন্নাথ দর্শন করে এবং কলা খেয়ে সে পাপেরও কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। কিন্তু এই বেলা দু’টোর সময় রথের মেলা কি বসেছে?”
“মেলা তো মেলাই। ইসকনের রথ আছে, বেলঘরিয়ার রথতলায় রথের মেলা হয়, আরও কত জায়গায় ছোট ছোট মেলা হয়। কিন্তু ঝামেলা হল সে সব মেলা সন্ধের আগে বসে না। এখন গেলে যেতে হয় মাহেশের প্রাচীন রথের মেলায়। সেখানে মেলা লোকজন, মেলা আয়োজন। মাহেশের রথে গেলে ফল পাবেনই, বিফলমনোরথ হবার কোনও সম্ভাবনাই নেই।”
“মাহেশ তো অনেকদূর, সেই শ্রীরামপুরের কাছে শুনেছি।”
“দূর মশাই, মাহেশ আবার দূর কোথায়? এই বাগবাজার থেকে তিন নম্বর বাসে চেপে বসলেই হল, একঘণ্টায় পৌঁছে যাব। তাছাড়া কেষ্ট পেতে গেলে একটু কষ্ট তো করতেই হয়।”
“চলুন তবে, মাহেশেই যাওয়া যাক। রথ দেখাও হবে, কলা খাওয়াও হবে।”
বলু তো একপায়ে খাড়া। বিমর্ষবর্ধনও তাঁর সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী চড়িয়ে তৈরি হয়ে নিলেন। এমনকি, বিমর্ষবাবু কোন কলার প্রয়োগ করলেন জানা নেই, বৌদিও দেখি শাড়ি-টাড়ি পালটে দশ মিনিটে প্রস্তুত। আমরা সবাই মিলে বাগবাজার গিয়ে একটা তিন নম্বর দেখে চেপে বসলাম। রথের মেলার জন্য সেদিন তিন নম্বর মাহেশ অবধিই চলছে, শ্রীরামপুর অবধি পুরো রাস্তা যাচ্ছে না। প্রায় ঘন্টাদেড়েক পর যখন মাহেশ পৌঁছলাম, তখন খিদেয় আমারই পেট কলকল করছে। কিন্তু বিমর্ষবর্ধন অ্যান্ড পার্টির তখন নতুন উৎসাহের জোয়ার এসেছে।
মেলা তখন বেশ জমতে শুরু করেছে। চারিদিকে অজস্র লোকের কলকলানি। বাস থেকে নেমে সেই বিশৃঙ্খল ভিড়ের মধ্যে ঢুকেই বিমর্ষবর্ধন বললেন, “কই, আপনার কলা কোথায়?”
রাস্তার দু’পাশে হরেক রকম দোকান বসেছে। পাঁপরভাজা, জিলিপি, জিবেগজা এসবের সারি সারি দোকান। তারপর আছে কাঁচের চুড়ি, সস্তার হার ইত্যাদি মহিলাদের প্রসাধনসামগ্রীর দোকান, ছোট ছেলেমেয়েদের খেলনার দোকান। কলার কোনও দোকান চোখে পড়ল না। কিন্তু এযাত্রা বলু আমায় বাঁচিয়ে দিল, “দাদা, প্রথমেই কলা খাবে? জগন্নাথ দর্শন করবে না? দর্শন না করেই ফলভোগ করা কি ভক্তির নিদর্শন?”
বিমর্ষবর্ধন বললেন, “তা অবশ্য ঠিক। বলুর দর্শনটার মধ্যে দর আছে। চল, তাহলে আগে রথ দেখাটাই সেরে নি।”
রথের কাছে পৌঁছে দেখি বেজায় ভিড়। রথ তখন সবে চলতে শুরু করেছে। রথের দু’পাশে দুটো লম্বা দড়ি বাঁধা। একেকটা দড়ি ধরে অন্তত কুড়ি-পঁচিশজন লোকে রথ টানছে। যে যত বড় ভক্ত সে রথের তত কাছে। আবালবৃদ্ধবনিতা শুধু দুটো দড়ির একটা কোনও রকমে ছোঁয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে হুড়োহুড়ি করছে। আমরা সেই দড়ির ধারেকাছে পৌঁছতে পারলাম না। বিমর্ষবর্ধনকে বললাম, “আমি মশাই ওই দড়ি টানাটানির মধ্যে নেই। আপনারা ইচ্ছে হলে এগিয়ে যান।”
বিমর্ষবাবু বললেন, “পাগল! আমিও ওতে নেই। এমনিতেই তো টানাটানির মধ্যে আছি সবাই। কারণটা তো দেখতেই পাচ্ছেন। স্বয়ং জগন্নাথও দেখুন কেমন টানাটানির মধ্যে আছেন। ওরে বলু, দূর থেকেই প্রণাম করে নে। রথ দেখা তো হল। এবার দেখি চল কলা কোথায় পাই। দড়াদড়ি ছেড়ে এবার বরং দরাদরির চেষ্টা করা যাক।”
আমরা আবার মেলার স্টলগুলোর মাঝখান দিয়ে ভিড় ঠেলে এগোতে আরম্ভ করলাম। কিন্তু কলার দেখা নেই। কলার অপূর্ণ প্রত্যাশায় আমার পেটে তখন বৈকল্যই হয়েছে বলা যায়। এমনসময় হঠাৎ বৌদি একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “বলু, এদিকে আয়না।”
বলু তাড়াতাড়ি সেদিকে এগিয়ে গেল, “বলো, কী বলছ?”
বৌদি বলেন, “আয়না, আয়না, এই দোকানে আয়না।”
“এলাম তো, বলো, কী বলবে?”
“আরে, বলছি আয়না, ওই দ্যাখ আয়না।”
বোঝা গেল বৌদি একটা আয়না কেনার বায়না ধরেছেন। দরদাম কেনাকাটা হল, তারপর আবার ভিড় ঠেলে এগোনো। বিমর্ষবর্ধন প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, “কোথায় আপনার কলা মশাই? কলা ছাড়া আর তো সবই দেখতে পাচ্ছি।”
“আছে আছে। রথের মেলায় কলা পাব না তা কি হয়? তবে কলার ব্যাপারীরা একটু কোণাখাপচিতে লুকিয়ে থাকে, চট করে দেখা পাওয়া ভার। ওদের তাই কলাকুশলী বলে। একটু চোখকান খোলা রেখে হাঁটুন, ঠিক দেখতে পাবেন।”
মেলা-টেলা ছাড়িয়ে তখন প্রায় গঙ্গার ধারে চলে এসেছি। রাস্তার ধারে একটা বুড়োমতন লোক একটা লাঠির মধ্যে অনেকগুলো তালপাতার ভেঁপু বেঁধে বিক্রি করছে। বলু তড়বড় করে সেদিকে এগিয়ে গেল, “এই ভেঁপুগুলো কি বাজে?”
লোকটি বলল, “বাজে কেন হবে? বাজে হলে কি আর বিক্রি করতে এনেছি? যে ভেঁপু বাজে তা আমি বেচি না।”
“আরে বাজে বলেছি নাকি? বলছি বাজে কি না। বাজে না হলে অবশ্যই বাজে বলতে হবে। কেমন বাজে একটু বাজিয়ে দেখি। যদি দেখি বাজে না, তবে বাজেই বলব। আর যদি দেখি বাজে, তবে ভাল বলা যায়।”
এই বলে বলু একটা ভেঁপু নিয়ে সজোরে ফুঁ দিল। বিমর্ষবর্ধন অবাক হয়ে একটা দোকানের সামনে ছেলেছোকরাদের বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানো দেখছিলেন। বলুর ভেঁপুর বিকট আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, “আবার তুই এখানে সময় নষ্ট করছিস? ওদিকে কলাগুলো সব বোধহয় বিক্রিই হয়ে গেল।”
বলু কোনও রকমে ভেঁপুর দাম মিটিয়ে দিতে না দিতে বিমর্ষবর্ধন প্রায় তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে আবার মেলার ভিড়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে চললেন, “ভাল করে নজর করে দ্যাখ, কলা কোথায় আছে।”
বলু চিঁ চিঁ করে ওঠে, “অমন কলার ধরে নিয়ে যাচ্ছ কেন! আমার কলার বোনটাই যে গেল।”
“কলার বোন কিম্বা ভাই নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। আমার দরকার আদি ও অকৃত্রিম মর্তমান কলা। বিশল্যকরণী। ও ছাড়া আমি আর খাব না কিছুই। তোদেরও খেতে দেব না।”
এমনসময় বলু হঠাৎ দুটো স্টলের মাঝখানে একটা অন্ধকার ঘুপচি মত জায়গার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে উৎসাহে চিৎকার করে উঠল, “দাদা, ওই দ্যাখো, কলা ইস কলিং।”
দেখি এক বিহারী কলাওয়ালা সেখানে কলার ঝুড়ি নামিয়ে বসে আছে আর মাঝে মাঝে কেলা কেলা বলে ডাকছে। আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। চারজনই সেদিকে এগিয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি। তা মর্তমান কলাই বটে। বেশ বড় বড় পাকা মর্তমান কলা। বিমর্ষবর্ধন দেরি না করে দরাদরি শুরু করে দেন, “তোমার কেলা কিতনা করকে ভাই?”
“তিনঠো দশ রুপিয়া বাবু, ডজন চালিস।”
“একডজন দে দো জলদি।”
এক কাঁদি কলা কিনে আমরা চারজন সেখানে দাঁড়িয়েই খেতে আরম্ভ করি। অবশেষে পেটে শান্তি নামে। খেতে খেতেই বিমর্ষবর্ধন বলে ওঠেন, “বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে মশাই। জিনগুলো সত্যি উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু, ব্যাপারটা তো উল্টো হয়ে গেল। কথাটা তো ছিল রথ দেখা আর কলা বেচা। কলা বেচার বদলে তো কলা কেনা হয়ে গেল। অকল্যাণ হবে না তো?”
বললাম, “কিচ্ছু অকল্যাণ হবে না। এই বিকিকিনির হাটে কেউ বেচে, কেউ কেনে। কেউ কেনে বলেই তো কেউ বেচে! আবার কেউ বেচে বেঁচে থাকে বলেই কিনা কেউ কিনে বেঁচে থাকে, যেমন আমরা। ব্যাপারটা ওই একই।”
“কিনে বেঁচে থাকার ব্যাপারটা মন্দ বলেননি। আপনার কথা আলাদা, কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীদের বেঁচে থাকতে গেলে কিনতেও হয়, বেচতেও হয়। চলুন, রথ দেখা তো হয়েছে, কলা খাওয়াও হল, এবার সবাই কলা বেচি। এ ভাইয়া, তুমহারা ঝাঁকায় কিতনা ডজন কেলা হ্যায়?”
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। ওদিকে কলাওয়ালাটা বলল, “হোগা বাবু, বিস-পচ্চিস ডজন। কিঁউ বাবু?”
বিমর্ষবর্ধন পকেট থেকে দুটো পাঁচ’শ টাকার নোট বার করে কলাওয়ালাটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ইয়ে রখ্ লো হাজার রুপিয়া। ইয়ে সব কেলা অভি মেরা হ্যায়। তুম যাও, জগন্নাথ দরশন করকে আও।”
কলাওয়ালা বেজায় খুশি হয়ে বলল, “জী বাবু, ইয়ে ঝাঁকা ভি আপ রখ্ লিজিয়ে।”
বলে সে ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
বিমর্ষবর্ধন বলুর দিকে ফিরলেন, “কী রে বলু, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কী? তোর ভেঁপুটা বাজা আর হাঁকাহাঁকি শুরু কর।” বলে নিজেই রাস্তার ধারে ঝাঁকার পেছনে দাঁড়িয়ে হাঁকতে শুরু করলেন, “কলা নিয়ে যান, কলা। আদি অকৃত্রিম মর্তমান কলা। টাইম মেশিন কলা। দুটো খেলেই ধাঁ করে একদম কপিযুগ।”
বলু প্রথমে একটু হতভম্ব হয়ে গেলেও খুব তাড়াতাড়িই ব্যাপারটা সামলে নেয়, “কিন্তু দাদা, কত দামে বেচব? তিনটে দশ টাকা দরে একটা কলার দাম হিসেব করতে গেলে তো রেকারিং ডেসিমাল চলে আসছে। কেউ যদি তিনের গুণিতকে না কেনে ডেসিমাল সামাল দেব কী করে?”
“তিনটে দশ টাকায় বেচতে তোকে কে বলেছে? তা হলে তো ওই বিহারী কলাওয়ালাটার মত বসেই থাকতে হবে, বিক্রি আর হবে না। বলাই তো ছিল, একটা কলার দাম পঞ্চাশ পয়সা। ছোটবেলার সেই না মেলা অঙ্ক মেলাবার এমন সুযোগ আর পাবি না। নে নে ভেঁপু বাজা।”
এরপর বিমর্ষবর্ধন আমার দিকে ফিরে বললেন, “আপনি দাঁড়িয়ে দেখছেন কী? আপনি আর আপনার বৌদি একটার পর একটা কলা খেয়ে যান। বিজ্ঞাপন হবে। মাঝে মাঝে একটু আধটু হুপ- হাপও করতে পারেন।”
বলুর ভেঁপু বিকট সুরে বেজে উঠল। ভেঁপুর আওয়াজে আর এরকম ধুতি-পাঞ্জাবী পরা ধোপদুরস্ত কলাওয়ালার হাঁকডাকে মুহূর্তেই ভিড় জমে উঠল। তারপর বলুর ‘টাকায় দুটো, টাকায় দুটো’ নামতা পড়ায় সব কলা আধঘণ্টায় হাওয়া।
কলার খোসাগুলো ঝাঁকায় গুছিয়ে রেখে বিমর্ষবর্ধন বললেন, “অনেক হয়েছে, চলুন এবার ওই জিলিপির দিকটায় যাওয়া যাক।”
যাক, তাহলে ফল খেয়ে ফল কিছু ফলেছে। আমাদের মাহেশ অভিযান সফলই বলতে হবে। ফলাও করে বলার মতই ফলার হল একটা। প্রফুল্লচিত্ত বিমর্ষবর্ধন এবং বল(দ)বর্ধনকে দেখে মনে হল ওঁদের জিনগুলো যথেষ্টই উত্তেজিত অবস্থায় আছে। একেবারে কপিযুগে না পৌঁছতে পারলেও, ওঁদের সাক্ষাৎ পূর্বপুরুষ হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধনের মতই লাগছে যেন।
______________________________________
দেবাদিদেব মহাদেব শ্রীশ্রী শিব্রাম চক্কোত্তির খুরে খুরে দণ্ডবৎ। দোষ নিও না প্রভু। নন্দীভৃঙ্গী-চ্যালাচামুন্ডাদের একটুআধটু নকলনবিসিতে গুরুর গুরুত্ব কিছু টাল খায় না।
ছবিঃ শিবশংকর ভট্টাচার্য

1 thought on “গল্প-বিমর্ষবর্ধনের রথযাত্রা-তাপস মৌলিক”