গল্প-রামতনুবাবু আর তাঁর গান-শৌভিক ব্যনার্জি

golporamtanu01

রামতনুবাবুর আজকে মন খারাপ। আজকে ওঁর বয়েস সাতষট্টি বছর, আটমাস,তিন দিন। গত আটমাস তিন দিন ধরে ওঁর মন খুবই ভাল ছিল। ভাল থাকার কারণ জানতে হলে তোমাদের একটু পিছন দিকে যেতে হবে।

ছোটোবেলার থেকেই রামতনুবাবুর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর খুব ঝোঁক,বিশেষ করে যেদিন জেনেছেন যে তানসেনের আগের নাম ছিল রামতনু পাণ্ডে,সেদিন থেকে ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস উনি সঙ্গীতের জগতে একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ।

তোমরা যারা তানসেনের নাম শোননি তাদের জন্য একটু বলি,তানসেন ছিলেন মোঘল সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার একজন রত্ন। জন্ম আন্দাজ ১৪৯৩ – ১৫০৬ (সঠিক সময় জানা যায় না) আর মৃত্যু ১৫৮৬ – ১৫৮৯ এর মধ্যে। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে ওঁর অনেক মৌলিক অবদান আছে।

রামতনুবাবু ছোটোবেলার থেকেই গান বাজনার মধ্যে মানুষ,ওঁর ঠাকুরদা মানে বাবার বাবা ছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পণ্ডিত। কিন্তু কেন কে জানে রামতনুবাবুর গলাতে ঠিক গান আসে না। প্রথমদিকে উনি বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে নাড়া বেঁধেছিলেন কিন্তু কেউই ওঁকে বেশিদিন শেখাতে রাজি হননি। শেষ বারে পণ্ডিত বিজয় চক্রবর্তী  ওঁকে বলেই ফেললেন “রাম তোর অধ্যবসায় আছে ঠিকই, কিন্তু সবার দ্বারা তো সবকিছু হয় না, তুই বরং অন্য কিছু চেষ্টা করে দেখ।”

কিন্তু রামতনুবাবু এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন। সেই থেকে উনি তানসেনের একটি ছবির সামনে একলব্যের মত সঙ্গীতসাধনা জারি রেখেছেন। প্রচুর বইও পড়েছেন ওঁর গুরুর সম্বন্ধে। অধ্যবসায়ে যে একেবারে ফল দেয়নি তাও নয়,এই যেমন উনি পড়েছেন যে তানসেনের গান শুনে নাকি পশুপাখিও বশ মানত,একবার তো একটা পাগলা হাতি পর্যন্ত তানসেনের গান শুনে শান্ত হয়ে গেছিল। তা সেদিনকে উনি সকালে উঠে গলা সাধা সেরে বারান্দায় বসে আদা দেওয়া চা খাচ্ছিলেন, এমন সময় ফজল মিয়াঁ এলো,হাতের ঝুড়িতে একটা কুমড়ো,বেশ কয়েকটা বেগুন আর কিছু কাঁচা লংকা। ফজল মিয়াঁর পাঁচ কাঠা জমি আছে রামতনুবাবুর বাড়ির পাশেই। রামতনুবাবু দাম দিতে গেলে,ফজল মিয়াঁ জিভ কেটে জানাল “কী যে বলেন বাবু,আপনার থেকে কি দাম নিতে পারি! এত কাকতাড়ুয়া লাগালাম,টিন পিটলাম কিছুতেই কিছু হয় না,প্রতিবার পাখিতে, কাকে ঠুকরে ঠুকরে সব নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু এবার আপনার ওই চিৎকার থুড়ি,মানে ওই গান আর কি!  ত্রিসীমানায় আর কেউ নেই।” তারপর এই যেমন তপন মালাকার, কথা নেই বার্তা নেই একদিন সকালে এক হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে হাজির। তপন বাবু একেবারে বদ্ধ কালা, খুব ভোরে উঠে উনি মর্নিং ওয়াক্‌ করতে করতে রামতনুবাবুর বাড়ির কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন,আচমকা কানের কাছে একটা বোমা ফাটার মতো শব্দ,তারপর থেকে ওঁর কান একদম পরিষ্কার। এখন নাকি কেউ জোরে শ্বাস ফেললেও উনি শুনতে পাচ্ছেন! এতসব সত্ত্বেও  রামতনুবাবু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে ওঁর গান ঠিক গান হয়ে উঠছে কিনা।

সেদিন ওঁর জন্মদিন,নিশীথ রাত্রিবেলা উনি মনের দুঃখে বিলাসখানি তোড়ি গাইতে লাগলেন। বিলাস খান ছিলেন তানসেনের ছেলে,বাবার মৃত্যুর পরে বাবার স্মৃতি এবং দুঃখে উনি এই রাগটি রচনা করেন। রামতনুবাবু খুব দরদ দিয়েই গাইছিলেন। আজ যদি ওঁর গুরু থাকতেন তা হলে কি আর ওঁর এই দুরবস্থা হতো। এই চিন্তায় আর গুরুদেবের মহাপ্রয়াণের দুঃখে ওঁর দু’চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল।

এমন সময় পাশ থেকে কে যেন বলল “উহুঁ, বিলকুল গলৎ!”

রামতনুবাবু সভয়ে চুপ করে গেলেন।  এতক্ষণ গানে তন্ময় হয়েছিলেন বলে বুঝতে পারেননি,এখন বেশ বুঝতে পারলেন যে সারা ঘরময় একটা খানদানি আতরের গন্ধ, এঠিক আধুনিক সেন্ট বা ডিওডোরেণ্ট এর মত ফঙ্গবেনে গন্ধ নয়। এদিক ওদিক দেখে উনি বললেন, “কে? কে বলল কথাটা? শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সবাই বুঝতে পারে না!”

এবার বেশ একটা মোগলাই ধমক ভেসে এলো। “বেয়াদপ! গুরুর সঙ্গে কথা বলার সহবৎ  জানিস না ?”

প্রথমটা ভয় পেলেও  রামতনুবাবু সামলে নিলেন,বেশ বুঝতে পারলেন এ হল ওঁর এতদিনের অধ্যবসায়ের ফল। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে মেঝের ওপর গড় হয়ে একটা প্রণাম ঠুকলেন,বললেন “মাপ করে দেবেন গুরুদেব,আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তা আপনাকে প্রণাম করলে হবে,নাকি সেলাম,আদাব এসব করতে হবে? কিন্তু আমি তো ঠিক ওগুলো জানি না!” নিজের ওপরই নিজের বেশ রাগ হোল এই না জানার জন্যে। আওয়াজটা কিন্তু এবার একটু নরম হল। বলল, “শ্রদ্ধা যে ভাবেই প্রকাশ করবি তাই কবুল করব। উঠে বস এবার!”

রামতনুবাবু জোড় হাতেই উঠে বসলেন। বললেন, “গুরুদেব,আমি নামডাক চাই না,শুধু চাই একটু ভাল গান করতে। আজ বাহান্ন বছর খেটেই মরলাম,গান আর হোল না।”

ওপাশ থেকে মোলায়েম গলা বলল,“ওরে ঘাবড়াসনি। কে বলেছে হয়নি? শুধু একটু ঘষা মাজা দরকার। দেখি তোর কণ্ঠটা। গলাটা একটু উঁচু করে ধর তো!”

রামতনুবাবুর কণ্ঠনালিটা ধরে যেন একটা ঠাণ্ডা ঝড় বয়ে গেল। বিভিন্ন ভাবে টিপে টুপে,এদিক ওদিক চেপেচুপে দিল। তারপর সেই আওয়াজ বলল,“নে ধর তো এবার দরবারি কানাড়া!”

রামতনুবাবু জানেন, ওঁর গুরুদেব স্বয়ং গাইতেন এই রাগটি। মোঘল সম্রাট আকবর এর দরবারে। বেশ ভয়ে ভয়ে ধরলেন। মাঝে মাঝে পাশ থেকে কেউ শুধরেও দিল।

সেই থেকে এই আটমাস তিনদিন উনি নিয়মিত রাত্রে সাধনা করেন,আর পাশে থাকেন ওঁর অশরীরী গুরুদেব। ওঁর প্রভূত উন্নতিও হয়েছে এর মধ্যে। এই তো একমাস আগে,রাত্রে সেদিন লোডশেডিং। উনি অন্ধকারেই দীপক গাইছিলেন, প্রায় শেষের মুখে পাশ থেকে কেউ বলল, “কেয়াবাৎ,কেয়াবাৎ,বহুত্‌ খুব।” এবং দপ করে ওঁর টেবিলে রাখা হারিকেনটা  জ্বলে উঠলো।

রামতনুবাবু নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। উনি পড়েছেন যে তানসেন যখন নিজে দীপক গাইতেন তখন এরকম আগুন জ্বলে যেত। উনি তাড়াতাড়ি আর একবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে বললেন, “সবই আপনার কৃপা গুরুদেব!”

গতকাল আবার ফজল মিয়াঁ এসেছিল। যথারীতি সঙ্গে অনেক আনাজপাতি। বলল ওর একটা বলদ নাকি পাগল হয়ে গেছিল, দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে সারা মাঠ ছোটাছুটি করছিল। ফজল আর তার দুই ছেলে মিলেও কিছুতেই বাগে আনতে পারছিল না। এমন সময় রামতনুবাবু কী একটা গান ধরেন, সেই বলদ লক্ষ্মী ছেলেরে মতন গোয়ালে গিয়ে ঢুকেছে।

তপনবাবুও এসেছিলেন,তবে এবার আর মিষ্টি আনেননি। খুবই ক্ষেপে ছিলেন ভদ্রলোক। চিৎকার করে অনেক কিছু বললেন। মোদ্দা কথায়,কান সেরে যাবার পর উনি আর রামতনুবাবুর বাড়ির কাছাকাছি  মর্নিং ওয়াক্‌ করতেন না। বরং অনেক দূর দিয়েই যেতেন,পাছে ওই বিকট চিৎকারে ওঁর কানে আবার তালা ধরে যায়! সেদিন ভোরেও তাই যাচ্ছিলেন।  কিন্তু দূর থেকে একটা অদ্ভুত সুর ওঁর কানে আসে,আর সেটার টানে উনি প্রায় সম্মোহিতের মতন ছুটে আসেন। টের পান যে রামতনুবাবু নিজেই ওই সুরটা গাইছেন। মুগ্ধ হয়ে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজেই জানেননা। তারপর খানিকটা ঘোরের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যান। তারপর থেকেই টের পান যে কানে আবার কিছু শুনতে পাচ্ছেন না। কেবল ওই সুরটাই যেন কানের পাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।

আজকে বিকেলেও রামতনুবাবু প্রতিদিনের মতই একটু বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। কিছুটা দূরে একটা পার্ক আছে,সঙ্গে খানিকটা খেলার মাঠ। এখানেই একটু পায়চারি সেরে, পার্কের বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসে উনি চলে আসেন। আজও বসেছিলেন, হঠাৎ নজর করলেন পাশে একটি দশ/এগার বছরের মেয়ে বসে আছে। না একটু ভুল হল,বসে বসে নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে! একটু গলা খাঁকারি দিয়ে রামতনুবাবু বললেন “খুকি,কাঁদছ কেন?”

এতে বেশ কাজ হল, মেয়েটি কান্না থামিয়ে একটি কড়া চাউনি দিল এবং অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার নাম খুকি নয় আর আমি বয়েসেও খুকি নয়,আমার নাম অদিতি। আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি!”

রামতনুবাবু তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নিলেন, “বটেই তো,বটেই তো! তা  অদিতি তোমার কি মন খারাপ ?”

খানিকক্ষণ কথাবার্তা চলার পর জানতে পারলেন ব্যাপার বেশ গুরুতর। ছোটোবেলা থেকেই অদিতির গানের প্রতি খুব ঝোঁক। তা ওর বাবা,মা তাতে বাধাও দেননি। গানের স্কুল,গানের জন্যে প্রাইভেট টিউটর,সঙ্গত করার জন্যে তবলচি,সবেরই যোগান দিয়েছেন। এই করতে করতে অদিতি মোটামুটি রেজাল্ট করে ক্লাসে উঠলেও কোনদিন স্ট্যান্ড করতে পারেনি। ওর বাবা,মা ভেবেছিলেন যে পড়াশুনোতে অতটা ভাল না হলেও গানে নিশ্চয়ই অদিতি কিছু করে দেখাবে। কিন্তু অদিতি আজ পর্যন্ত একটাও গানের প্রতিযোগিতাতে সুবিধে করতে পারলনা। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন এখন আরও একটা সমস্যা উপস্থিত হয়েছে। অদিতির বাবা একটা বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন,সেটি এখন লাটে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে বহু লোকের বহু টাকাও গায়েব। রোজ সকালে কাগজের প্রথম পাতায় লম্বা লম্বা খবর বেরোয়। তাই অদিতির গানের স্কুল বন্ধ। স্কুলটা কোনওরকমে চালু আছে। কোনদিন সেটাও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও দু’তিন দিন পর রামতনুবাবু অদিতির সঙ্গে ওদের বাড়ি গেলেন। একথা ওকথার পরে নিজের ইচ্ছেটা প্রকাশ করলেন। গান শেখাতে চান অদিতিকে। না না, পয়সার বিনিময়ে নয়,ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটা ঘরানা যেন বেঁচে থাকে সেই জন্যই। অদিতি সেই থেকে তালিম নেয় রামতনুবাবুর কাছে।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে দেড় বছর। রামতনুবাবুর কড়া নির্দেশ ছিল,অন্তত একবছর টানা রেওয়াজ করার আগে অদিতি কোন প্রতিযোগিতাতে যাবে না। একমাস আগে একটি সর্বভারতীয় গানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে একটি টিভি চ্যানেল। খুবই জনপ্রিয় এই প্রোগ্রাম। অদিতি অংশগ্রহণ করেছিল,আজ তার ফাইনাল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের নানা প্রতিযোগীদের মধ্যে অদিতি আর একটি দক্ষিণ ভারতীয় ছেলের মধ্যে আজ ফাইনাল। সন্ধ্যের সময় রামতনুবাবু টিভি খুলে বসলেন। অন্য ছেলেটি খুবই ভাল গায়ক। দক্ষিণভারতীয় ঘরানায় খুব সুন্দর দখল। আজও অসাধারণ গাইল ছেলেটি। রামতনুবাবু পরিষ্কার বুঝলেন,জীবনের সেরা গানটা আজ না গাইলে অদিতির কোন সুযোগ নেই। অদিতি এসে বসল। সরস্বতী,গুরু এবং তাঁর গুরু বন্দনায় আলাপ শুরু করল। রামতনুবাবু দম বন্ধ করে শুনছিলেন। অদিতি মেঘমল্লার ধরল। মনপ্রাণ দিয়ে গাইছে মেয়েটা। অনেকদিন বাদে রামতনুবাবু ঘরে সেই কড়া আতরের গন্ধটা পেলেন। তন্ময় হয়ে গান শুনতে শুনতে মনে হোল কেউ বলল, “কেয়াবাৎ,কেয়াবাৎ,বড়িয়া তালিম দিয়া তুনে”।

বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি নামল, লোডশেডিং।

গ্রাফিক্সঃ ইন্দ্রশেখর

1 thought on “গল্প-রামতনুবাবু আর তাঁর গান-শৌভিক ব্যনার্জি”

Leave a Reply