আগের সমস্ত জাতক কথা
গরমটাও এবার পড়েছে জাঁকিয়ে। এই ছোট্ট পুকুরে বেচারা মাছেদের অবস্থা বড়োই করুণ।ওদের থাকার জায়গাটা দিনের পর দিন কমছে।আসলে গরমে পুকুরের জল যখন শুকোতে থাকে প্রত্যেক বছরই এই অসুবিধেটা ওদের হয়। কিন্তু কী আর করা যাবে?ওরা তো “ধুত্তোর, এখানে পোষাচ্ছে না” বলে অন্য পুকুর কি নদী খুঁজে নিতে পারে না! জল ছাড়া যে ওদের জীবনই অচল।
এবার মুশকিলটা হয়েছে অন্য জায়গায়।এত গরম পড়েছে যে অন্যান্যবারের থেকেও পুকুরের জল এবার আরো কমেছে। আর এ পুকুর থেকে মাছ কেউ খুব একটা ধরে না বলে মাছেদের বংশ বেশ একটু ফুলে-ফেঁপেই উঠেছে। লোকে বলে চাতকপাখি নাকি আকাশে মেঘ জমার অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে। তা মাছেরাই বা কম কীসে? ওরাও জলের মধ্যে থেকে আকুল হয়ে আকাশের দিকে তাকায়-আকাশের কোনো কোণায় মেঘের দেখা পাওয়া যায় যদি!
এই পুকুরের ধারে থাকে এক বক। পুকুরে মাছের ঝাঁককে ঘুরতে দেখে ওর ঠোঁট দিয়ে জল গড়ায়। কিন্তু হতভাগা মাছগুলো এমন পাজি, জলের কাছাকাছি গেলেই কী করে টের পায় কে জানে? আর সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যে সেঁধোয় তার নাগালই পাওয়া যায় না।
বক একদিন সাত-পাঁচ ভেবে এক ফন্দি বার করল। ভালোমানুষের মতো মুখ করে জলের ধারে গিয়ে ডাকতে লাগল, “মাছভাই ,মাছভাই,শুনতে পাচ্ছো?”
“কে ডাকে রে উপর থেকে?” বলতে বলতে বুড়ো মাছ মুখটা তুলল জলের উপরে, “ও,তুমি! কী ব্যাপার?”
“না, ব্যাপার আর কী? তোমাদের কষ্ট দেখে আমার বড়ো দুঃখ হয় গো!আহা!এইটুকু জলে তোমরা এতজন,কত কষ্ট হয় বল? আর খাবারও তো ঠিকঠাক মেলে না!”
“উঃ! কালে কালে কতই শুনব? মাছেদের কষ্টে নাকি বকের বুক ফাটে দুঃখে! যাও তো এখান থেকে! ফালতু কথা বাড়াতে এস না।” বুড়ো মাছ মুখ ভেঙচে ওঠে।
“আহা,শোন না! সকলকে একরকম ভাব কেন? ওই ওদিকটায়, এখান থেকে একটু দূরে ,একটা বিরাট দিঘি দেখে এলাম।সঙ্গে সঙ্গে মনে হল তোমাদের কথা। তাই ভাবলাম খবরটা তোমাদের জানাই।তোমাদের ভালোর জন্য বাড়ি বয়ে এসে খবরটা দিলাম,আর তোমরাই কিনা ভুল বুঝলে! জগৎটাই এমন!”
“তা ওখানকার দিঘির গল্প শুনে আমরা কী করবো?আমরা সেখানে যাবো কী করে? আমরা কি ডাঙায় চলতে পারি, না তোমার মতো আকাশে উড়তে পারি?”
“শোনো ভাই,ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আমি কি একটা উপায় না ঠাউরে তোমাদের এই খবরটা দিয়েছি?”
“বল শুনি কী উপায় ঠাউরেছো।” নাছোড়বান্দা বককে মাছেরা শুধোয়।
“উপায়টা খুবই সোজা। তোমাদের একজন একজন করে ঠোঁটে নিয়ে ওই দিঘিতে ছেড়ে আসব।”
“আর একজন একজন করে সাবাড় করবো।এই তাহলে তোমার মতলব বগুলা বাবাজি?” বকের কথা কেড়ে নিয়ে বুড়ো মাছ বলল।
“ছি ছি! এ কী অবিশ্বাস!তোমাদের মধ্যে যে কোনো একজনকে যদি ওখান থেকে ঘুরিয়ে আনি তবে বিশ্বাস করবে তো? এইজন্যে বলে কারো ভালো করতে নেই। তোমাদের ভালোর জন্যেই বললাম,আর তার জন্যে কত কথা!” বক নিজের মনে গজগজ করতে থাকে। যেন কতবড়ো অপমান তাকে করেছে মাছেরা।
অন্য মাছেরাও উঁকিঝুঁকি মেরে বক আর দাদুমাছের কথা শুনছিল। সবারই সন্দেহ যে মাছ ধরার জন্য পুকুরের চারপাশে সবসময় ছোঁকছোঁক করে ঘুরে বেড়ায় আজ এমন কী ঘটনা ঘটল যে সে যেচে মাছেদের উপকার করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে?
ঐ পুকুরে ছিল আর এক বুড়ো মাছ। সে আবার ছিল কানা। সে ভাবল, ‘আমি কানা বুড়ো, আর কদিনই বা বাঁচব! আমি বরং ঐ বকের সাথে গিয়ে দেখে আসি ব্যাপারখানা আর আমি যদি না ফিরি,তবু তো এরা সব বুঝতেই পারবে আর সেইমতো সাবধান হয়ে যাবে।’
সে অন্য মাছেদের আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে বকের সাথে চলল অভিযানে। বক কিন্তু ভারী চালাক। যতই লোভ হোক না কেন, ঠোঁটে করে মাছটাকে নিয়ে ঐ বড়ো দিঘিতে ছেড়ে দিল। আর চোখ বুজে আগামী দিনের সুখস্বপ্নে মশগুল হয়ে থাকল।
এদিকে কানা মাছ দিঘিতে ডুব দিয়ে তো বেজায় খুশি। সাঁতার কেটে এদিকে যায় ,ওদিকে যায়-আর শেষ খুঁজে পায় না! ঐ ছোট্ট পুকুরে তার সারাটা জীবন কেটেছে। সেটাকে ডোবা বললেও খুব ভুল হয় না। দিঘি যে এত বড়ো সেটা ওর ধারণারও বাইরে। ভারী ফুর্তি তার এখানে সাঁতার কেটে। আবার বককে সন্দেহ করেছে দেখে লজ্জাও লাগে।
খানিক পরে বকের ডাকে তার সম্বিত ফেরে। আবার বকের ঠোঁটে চেপে বাড়ির পথ ধরা। এবার বকের ঠোঁটে চাপতে আর ভয় লাগে না।
পুকুরে মাছের ঝাঁক খুব ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছিল। ভাবছিল—কানা দাদু বুঝি আর ফিরবেই না। কিন্তু বকের ঠোঁটে কানাদাদুকে দেখে সবার চোখ গোল। কানা মাছ ফিরলে সবাই ওকে ছেঁকে ধরল। সে তো দিঘির বর্ণনা দিয়ে আর থই পায় না!
বক বাবাজি একপায়ে দাঁড়িয়ে চোখ মটকে জিজ্ঞেস করে, “কী হে ,এবার মানলে তো যে আমি লোকটা তত খারাপ না!”
মাছেরা বার বার বলতে থাকে “না না দাদা,আমাদেরই ভুল। ভারী অন্যায় হয়ে গেছে। কিছু মনে কোরো না দাদা।”
“আরে না না। তোমরা কী করে জানবে বল? আমি তো দীক্ষা নিয়েছি। তাই মাছ-টাছ আর খাই না। ফল-মূল খেয়ে আর ঠাকুরের নাম-গান করে দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে।”
যাই হোক, মাছেরা তৈরি হয় দিঘিতে যাবার জন্যে। প্রথমেই যাবে কানা মাছ। তারপর একে একে আর সব মাছেরা। প্রত্যেকদিন দশ-বারোবার করে বক আসে আর একটা একটা করে মাছ নিয়ে উড়ে যায়। এই পরোপকারে বকের কোনো ক্লান্তি নেই। দেখতে দেখতে বেশ ক’টা দিন কেটে গেল। পুকুর এখন মাছশূন্য। পড়ে আছে কটা গেঁড়ি –গুগলি আর একটা কাঁকড়া।
কাঁকড়া এতদিন পাশ কাটিয়ে এসেছে। বককে কেন যেন তার পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি। মাছেদের বলেওছে সে কথা। কিন্তু ওরা বেচারাকে বকে ধমকে থামিয়ে দিয়েছে। এবার এসেছে তার পালা।
বক এসে গেছে ওকে নিতে। ভারী মোলায়েম গলায় কাঁকড়াকে ডাকে, “এসো ভাই ,আমার ঠোঁটে করে তোমায় নিয়ে যাই।”
“না দাদা,আমার ভয় করে। তার চেয়ে বরং আমি আমার দাঁড়া দিয়ে তোমার গলা জড়িয়ে ধরি,তুমি আমায় নিয়ে চল।”
অগত্যা বককে রাজি হতে হয়। কাঁকড়া তার দুই দাঁড়া দিয়ে শক্ত করে বকের গলা জড়িয়ে ঝুলতে থাকে,বক তাকে নিয়েই ওড়ে। দিঘির ধারে পৌঁছে যায় একটু বাদেই। কিন্তু দিঘির পাড়ে না নেমে বক কাঁকড়াকে নিয়ে যায় পাশেই বিরাট একটা গাছের একেবারে মগডালে। বকের মতিগতি কাঁকড়ার খুব একটা সুবিধের ঠেকে না। সে বলে, “কী ব্যাপার দাদা,তুমি আমায় এখানে এনে তুললে কেন? ওই তো সামনেই একটা মস্ত বড়ো পুকুর দেখতে পাচ্ছি। ওটাই কী সেই দিঘি?”
বকের হাবভাব এখন অন্যরকম, “এই, কে তোর সাতজন্মের দাদা রে? ওই নীচে তাকিয়ে দেখ,তোর সঙ্গীসাথীদের কী গতি হয়েছে শেষপর্যন্ত। এবার ঐ দলে তুইও ঢ়ুকবি।”বকের মুখে শয়তানি হাসি।
গাছের গোড়ায় মাছের কাঁটার স্তূপ। কাঁকড়ার এতদিন এই আশঙ্কাই ছিল। কিন্তু বকবাবাজি কাঁকড়াকে চেনেনি। কাঁকড়া তার তুই শক্ত দাঁড়া দিয়ে বকের গলাটাকে চাপতে থাকে। সাঁড়াশি চাপে বকের দমবন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়!
“ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও ভাই, তোমাকে এক্ষুণি জলে রেখে আসছি।”
কাঁকড়া মুখে কিছু বলে না, তবে চাপ একটু আলগা করে। বক গা ঝাড়া দিয়ে কাঁকড়াকে নিয়ে উড়ে যায় দিঘির পাড়ে।
জলে নামার আগে কাঁকড়ার একটা ছোট্ট কাজই বাকি ছিল। তার বন্ধুদের সাথে যে প্রতারণা হয়েছে তার প্রতিশোধ নেওয়া। দিঘির ধারে পৌঁছে বক কাকুতিমিনতি করতে থাকে, “এবার ভাই আমার গলাটা ছাড়।”
“মাছেদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যখন ছল করে তাদের মেরে খাচ্ছিলি বদমাশ, তখন তাদের কথা শুনেছিলি? এবার দেখি তোকে বাঁচায় কে?”
কাঁকড়া তার দুই দাঁড়া দিয়ে আরো জোরে চেপে ধরে বকের গলা। তারপর একসময় বকের গলাটা কুট করে কেটে ফেলে ধীরেসুস্থে জলে নেমে যায়।
বুদ্ধদেব এই গল্প বলে বললেন—“তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? বক মাছেদের ঠকিয়েছিল বলেই ওকে তার ফল পেতে হল। অন্যকে ফাঁদে ফেলতে গেলে শেষপর্যন্ত সেই ফাঁদে নিজেকেও জড়িয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ, অন্যকে ঠকিয়ে কখনো জয়ী হওয়া যায় না।”
ছবি ঃ তিতিল