জাতক কথা -ছোট্টো চড়াই ও বাজপাখি -নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

jatok53 (Small)

সে ছিল এক ছোট্টো চড়াই। একখানা চষা ক্ষেতই ছিল তার রাজ্যপাট। রোজ সকালে বাসা ছেড়ে সে চলে আসত এই ক্ষেতে। সমস্তদিন এখানেই সে কাটাত। কখনো বন্ধুদের সাথে হুটোপাটি তো কখনো খাবার খোঁজা– এই ছিল তার কাজ। এখানে যা খাবার জুটত তাতেই তার ছোট্টো পেট ভরে যেত।

ছিল না তার অভাব কোনও

ছিল সে যে মনের সুখে—

কিন্তু একদিন তার কী দুর্মতি হল,সে গেল বনের ধারে আরেক ক্ষেতে।

শীতের দিনের নরম রোদ গায়ে মেখে সে দিব্যি ঘুরছিল। এমন সময় এল বিপদ। একটা ইয়াবড়ো বাজপাখি অনেকক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ্য করছিল। মওকা বুঝে সে ছোঁ মেরে ধরল চড়াইকে। দু’পায়ের নখের মধ্যে আটকে নিয়ে উড়ে চলল তার বাসার দিকে।

বাজের পায়ের ফাঁকে ছটফট করতে করতে চড়াই নিজের মনেই বলতে লাগল,”হায়রে,কেন  আমি মরতে এখানে এলাম! আমার নিজের জায়গায় থাকলে এ কি আমায় এত সহজে ধরতে পারত? বরং যুদ্ধ করেও আমাকে ওখানে হারাতে পারত না।”

চড়াই-এর কথা শুনে বাজের ভারি মজা লাগল। ছোট্টো চড়াই-এর সাহস কত! আমাকে নাকি ও হারাবে! ঠিক আছে ওর যুদ্ধের শখ আমি মেটাব।এই ভেবে সে চড়াইকে বলল,”আমার সাথে লড়াই করার ভারি শখ দেখছি। তা তোর নিজের জায়গাটা কোথায় শুনি ?চল তোকে  রেখে আসি। সেখানেই তোর সাথে আমার লড়াই হবে।”

চড়াই-এর দেখানো পথ ধরে বাজ তাকে নিয়ে এল তার নিজের জায়গায়,সেই চষা ক্ষেতে। সেখানে পৌঁছিয়ে চড়াই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এ তার নিজের জায়গা। এখানে নিজেকে রক্ষা করার সব কলাকৌশল তার জানা। সে তীক্ষ্ণ চোখে বড় পাথরের উপর রাখা চোখা ফলার ছোট ঢেলাটাকে দেখে নিল। ওদিকে ঘন ঘন হুঙ্কার ছাড়ছে বাজ। ধারালো নখে শিকারকে ফালাফালা না করতে পারলে যেন তার শান্তি নেই!

চড়াই কিন্তু নিরুদ্বেগ। ধীরেসুস্থে  উড়ে গিয়ে ধারালো পাথরটার উপর বসল। তারপর যুদ্ধং দেহি বলে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল।

আর যায় কোথা! একে পেটে খিদে,তার উপর তুচ্ছ চড়াই-এর এই পিত্তি জ্বলানো তাচ্ছিল্য! হাওয়ায় তীব্র আলোড়ন তুলে ঠোঁট কিড়মিড় করতে করতে বাজ ধেয়ে এল চড়াই-এর দিকে।

এটাই তো চাইছিল চড়াই। শেষ খেলাটা দেখাতে হবে তাকে। ধীরভাবে অপেক্ষা করতে লাগল সে। আরেকটু—আরেকটু কাছাকাছি আসুক শমন।

এদিকে তিরবেগে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাজ। কিন্তু কাছাকাছি আসতেই  চড়াই ডিগবাজি খেয়ে ঢিলের আড়ালে সরে গেল। বাজ কিছু বুঝতে পারার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল। ব্যস! ওমনি বাজ সটান আছড়ে পড়ল ওই পাথরটার ওপর। ফলাটা সোজাসুজি গেঁথে গেল তার বুকে। আর সঙ্গে সঙ্গে সে মরে গেল।

শিষ্যদের এই গল্প বলে বুদ্ধদেব বললেন,”কাজেই বুঝতে পারলে তো নিজের জায়গায় সবাই শক্তিশালী। সে জন্মে আমিই ছিলাম ঐ চড়াই।”

1 thought on “জাতক কথা -ছোট্টো চড়াই ও বাজপাখি -নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়”

Leave a Reply