টাইম মেশিন ফেলে আসা কলকাতা সুজয় রায় বসন্ত ২০১৮

সুজয় রায় -এর সব লেখা একত্রে

একসময় কলকাতায় ছিল সাহেবপাড়া আর ব্ল্যাক টাউন। শেষোক্ত টাউন কিন্তু সাহেবপাড়া নয় , নেটিভ পাড়া। সুদূর পশ্চিমের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জাপানের পূর্ব উপকূলের মধ্যে এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে মানুষের রুচিজ্ঞান এমনভাবে আঘাত করে। তবে কলকাতায় তখন ট্যাংক স্কোয়ার আর চৌরঙ্গি ছিল। চৌরঙ্গি দেখে অনেকে মন্তব্য করেছিলেন অমন বাহারে শহর তখন এশিয়াতে আর নেই।

কিন্তু ব্ল্যাক টাউন ছিল তামসিকতার সব ক্লেদ ও আবর্জনায় ভরা। কি বিশৃঙখলা, এলোপাথাড়ি,খানা, ডোবা, ও গলি দিরে ভরাট ছিল। অশান্তি। কলকাতার দশ ভাগের একভাগ বস্তি। শহরের এক চতুর্থাংশ লোক সেখানে বসবাস করে। আজও সমান পরিস্থিতি। কৃষ্ণাঙ্গ শহরে কিছু বিরাটাকার এক তলা, দোতলা পাকা বাড়ি ছিল, বাদ বাকি ছিল টালির ঘর, বাকি খড় দেওয়া ঘর। এই সব পাকা বাড়িতে শহরের ব্রাউনেরা বাস করতেন। তাদের ছিল প্রচুর অর্থবল ও প্রতাপ। তারা উৎসবে প্রচুর খরচ করতো, সাহেবদের খানা-পিনা দিত। সাহেব তাদেরকে খাতির  করে ডাকতো ‘বাবু’। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ সে শহর আবর্জনাময়। এখানকার বাড়ি ঘরদোর দেখলে মনে হত আয়ার্ল্যাণ্ডের দরিদ্রতম শ্রেণীর কেবিন যেন। কেউ বলতেন মিসিসিপির তীরে অসভ্য কাঠুরিয়াদের জীবনযাত্রার তুলনায় দীন। বাঙালিদের মতো অন্য কোনো দেশে বোধ হয় শতকরা নয় ভাগ লোক খোলা মেঝেয় শোয় না। চারিদিক আবর্জনাময়। অদ্ভুত এখানকার বাসিন্দারা। ধোঁয়া ভিন্ন এদের মশার ওষুধ আর কিছু নেই। তাবিজ এদের কলেরার ধন্বন্তরি। এদের খাদ্যাখাদ্য, ভালমন্দ বিচার নেই। ঋণ ছাড়া উপার্জনের পথ নেই, জুয়া ছাড়া খেলাধুলা জানে না। তৎসত্বেও এখানে সামান্য নিমু মল্লিকের মাতৃক্রিয়াতে তিন লাখ টাকা খরচ হয়। সুতরাং এই  শহরে মহারাজা নবকৃষ্ণের মায়ের শ্রাদ্ধে নয় লক্ষ টাকা খরচ হবে অবিশ্বাস্য কী। ব্ল্যাক টাউনে খরচ জোগাতেন সেখানকার মানুষেরা, হোয়াইটদের শরণাপন্ন হতেন না। ব্ল্যাক টাউন একেবারে অথই আঁধার ছিলনা। এখানে যাত্রা, কবিগান, বুলবুলির লড়াই ,বেড়ালের বিয়ে, সঙের মিছিল ইত্যাদি ক্রীড়া-কৌতুক ছিল।

গোবিন্দরাম মিত্র ছিলেন কলকাতার তদানিন্তন কৃষ্ণাঙ্গ জমিদার। পরিহাস নয়, সেটাই ছিল তাঁর সরকারি খেতাব। কলকাতায় তখনও মিউনিসিপাল শাসন গড়ে উঠেনি। সেকালে শহর কলকাতায় মাত্র একজন শাসক ছিল, সে ছিল জমিদার। কর্ণওয়ালিসের জমিদার ও এই জমিদারের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। এই জমিদার ছিলেন সাহেব এবং রাজকর্মচারী এবং তিনিই ছিলেন শহরের সর্বময় কর্তা।  তিনি শহরে কর ধার্য করা, হিসাব রাখা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দেওয়ানি ফৌজদারি মামলা মোকদ্দমার বিচার করা, জেল খাটানো, এমনকি ফাঁসি দেওয়া এই সাহেব জমিদারের এক্তিয়ারে ছিল। এই সাহেবের বেতন ছিল দুই হাজার টাকা। তাছাড়া কিছু কমিশনও তিনি পেতেন। এছাড়া অন্য স্বাধীন ব্যাবসাও তার ছিল।

অথচ এহেন লোভনীয় পদটির জন্য বছরে স্থায়ী পদ ছিল না। তার ওপর আরেক মুশকিল হিসেবপত্র রাখতে হবে সব দেশি ভাষায়। ১৭২০ সালে  নিযুক্ত হলেন নগরের ডেপুটি বা ব্ল্যাক জমিদার গোবিন্দরাম। মাইনে মাসে ৩০ টাকা। এই মাইনে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল পঞ্চাশ টাকা। কিন্ত অকষ্মাৎ গোবিন্দরামের ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ১৭৫২ সালে হলওয়েল হলেন কলকাতার জমিদার এবং গোবিন্দরামকে চেপে ধরলেন। কোম্পানির কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থোপার্জনের নালিশ করলেন সাক্ষ্যপ্রমাণ সহ। কিন্তু গোবিন্দরাম অচিরেই কোম্পানির কর্তাদের অর্থবলে বলে বশ করে বিনা শাস্তিতে হলওয়েলের নাকের সামনে ছড়ি ঘুড়িয়ে বেরিয়ে এলেন কৃষ্ণাঙ্গ জমিদার।

গোবিন্দরাম সকলকে অবাক করলেন ধর্মেকর্মে। কৃষ্ণাঙ্গ শহরবাসী অবাক হয়ে দেখল গোবিন্দরাম বিরাট মন্দির গড়ছেন চিৎপুরে। লোকেরা বিষ্মিত হয়ে দেখল ১৬৫ ফুট আকাশছোঁয়া মন্দির তুলছেন, হলওয়েল মনুমেন্টের তুলনায় অনেক বড়। কয়েক মাইল দূর থেকেও দেখা যায় চিকচিক করে মন্দিরের উপরকার সোনার কলস, ধ্বজা। নবরত্ন মন্দির। কৃষ্ণাঙ্গ শহরে ধন্য ধন্য রব পরে গেল।

এই ধন্য ধন্য রবের মাঝখানেই বিগত হলেন গোবিন্দরাম। ক্রমে ১৭৩৭ সালে এক প্রবল ঝড়ে গুঁড়িয়ে গেল নবরত্ন মন্দির। বেঁচে রইল ব্ল্যাক টাউন। বেঁচে রইল ব্ল্যাক জমিদারও। অবশ্য বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবে সাহেবদের হারিয়ে আজও প্রথম ও শেষ জমিদার। কলকাতা সাহেবকে হারিয়ে রইল পুরোপুরি কৃষ্ণাঙ্গ , অথই অন্ধকার।

 

টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Leave a Reply