টাইম মেশিন-ভারত ভ্রমণ

time01পত্র – ১০

সেনা পরিদর্শন শেষ হলে আমরা দমদম ছেড়ে কলকাতার দিকে এগোলাম। ১৭৭২ সাল। আমরা কলকাতায় এসে পৌঁছোলাম। প্রথম ব্রিগেড, যারা ফোর্ট উইলিয়ামে ছিল, দানাপুর রওনা হল আর আমাদের একাংশ তাদের জায়গা নিল। এরা হল থার্ড ব্রিগেড। এক ব্যাটেলিয়ান ইউরোপিয়ান সৈনিকেরা ফোর্ট উইলিয়ামের দখল নিল। তিন রেজিমেন্ট সেপাইদের আশ্রয় হল চিৎপুরের সেনা ছাউনিতে । মিস্টার বেকারসহ  বাকি ইউরোপিয়ান সৈন্যদের আর তিন রেজিমেন্ট সেপাইদের বহরমপুর যাবার আদেশ দেওয়া হল। কয়েকদিন থেকে তারা যথারীতি পাততাড়ি গোটাল।

কলকাতা এক বর্ধিষ্ণু শহর, ইংরেজ কোম্পানির সদর দপ্তর। পদ্মার অনেকটা পশ্চিম দিকে ২২ ডিগ্রি ৪৫ মিনিট  উঃ অক্ষাংশ এবং ৮৭ ডিগ্রি পূঃ দ্রাঘিমাংশে এর অবস্থান। বালেশ্বর থেকে১৩০ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে আর হুগলির ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে। চওড়া সোজা সোজা রাস্তা, লোকেদের বাড়িঘর, বাগান, বেড়ানোর জায়গা, মাছভর্তি পুকুর, কি নেই কলকাতায়! আর সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো যেটা সেটা হল এর জনসংখ্যা। ছ লাখের ওপর।

শহরের মূল রাস্তাগুলো মোটামুটি এরকম। চাঁদনিচক, হরেকরকম মাল পত্র বিকিকিনির স্থান। চায়না বাজার, চিনে জিনিসপত্র বেচাকেনার জায়গা। তারপর লালবাজার, ধর্মতলা, চৌরঙ্গী, বৈঠকখানা, মেছোবাজার আর চাঁদপাল ঘাট। এই অঞ্চলগুলিতেই মূলত প্রায় সমস্ত ইউরোপিয়ানদের বাস। ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, আর্মেনিয়, হাবসি, ইহুদি সকলের জমায়েত এইখানে। ব্যবসায়ী, উৎপাদনকারী, দালাল – ভারতবর্ষের বিভিন্ন কোণ থেকে এসে জড়ো হয়েছে এখানে।

time02চাঁদপাল ঘাটের কাছেই পুরোনো কেল্লা। ওরই মধ্যে থাকত কোম্পানির রসদ। পাহারার দায়িত্বে রাখা হত অল্প শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং ভাড়াটে সৈন্যদের। অর্থসংগ্রাহক, খাদ্যবন্টনকারী আর করণিকদের বসবাস ছিল এখানে। আমাদের সময়ে এখানে ছিলেন মিস্টার প্যাক্সন। উনি ছিলেন ট্যাঁকশালের নির্দেশক বা সুপারিনটেনডেন্ট। টাকা আনা পাইপয়সা ছাপানোর জায়গা। শহর থেকে মাইলটাক দূরে ফোর্ট উইলিয়াম। ভারতের মধ্যে এই কেল্লাই সবচেয়ে বিস্তৃত। বিষম চতুর্ভুজ আকৃতির জমিতে এই দুর্গটি ইট আর চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। চুন,সুরকি,গুড় আর শন দিয়ে সিমেন্টের মতো এমন মিশ্রণ বানানো হত যা পাথরের মতোই শক্ত-পোক্ত। দুর্গের চারপাশ ঘিরে ছ’শ কামান মোতায়েন। মূল অন্দরে প্রবেশের জন্য ছয়খানা দরজা যার চারটে সবসময় খোলা রাখা হয়। আর দুর্গের বাইরের দিকে মোট চোদ্দটা প্রবেশদ্বার, নানান রাস্তা থেকে ভেতরের দরজা অবধি প্রবেশের জন্য। চারখানা দরজার একটা নদীর দিকে, একটা হাসপাতাল, একটা খিদিরপুর আর একটা কলকাতার বিপরীতে অবস্থিত। চারটে দরজার পাশেই একখানা করে কুয়ো খোঁড়া হয়েছিল। সৈন্যদের প্রয়োজনীয় জল ইঞ্জিনের সাহায্যে তোলা হয় ওগুলো থেকে। সেনাদলের সর্বাধিনায়ক থাকেন দুর্গের মধ্যে একটা সুন্দর প্রাসাদে। সৈন্যদলের সমস্ত চাহিদা মেটানোর জন্য ভেতরেই একটা বাজার বসে।

সেনাধ্যক্ষের ঠিক নীচুতলার অফিসারদের জন্যও চমৎকার সুদৃশ্য বাড়ি বানানো হয়েছিল। কেল্লার ভেতরেই এই বাড়িগুলি অন্দরমহলের দরজার ভেতরের দিকে গোল করে সাজানো; একটু উঁচু থেকে দেখলে পুরো ব্যাপারটা একজন দর্শকের কাছে অপূর্ব লাগবে।

বাকি অফিসার ও একেবারে নীচুতলার সৈনিকদের জন্য মোট আটখানা ব্যারাক ছিল কেল্লার ভেতরে। গোলাবারুদ, সাজসজ্জা ও যন্ত্রপাতির গুদামঘর; অস্ত্রশস্ত্র, গুলি বন্দুক; কামান ও গোলা বানানোর কামারশালা সমস্ত ব্যবস্থাই ছিল। এখান থেকেই মূলত ভারতের সর্বত্র কোম্পানির সৈন্যদলের সাধারণভাবে ব্যবহারের সবরকম রসদ যোগান দেওয়া হত। মোটের ওপর ফোর্ট উইলিয়াম হল মানুষের বানানো এক অত্যাশ্চর্য কর্মশালা,  আর এক বৃহৎ অবস্থান যেখানে দশ হাজার লোক একত্রে থাকতে পারে।

time03অন্যান্য সাধারণ নির্মাণগুলির মধ্যে রইল আদালত, জেলখানা আর চার্চ। তিনখানা আদালত ভবন রয়েছে এখানে, লালদিঘির পারে, বড়োলাটের প্রাসাদের পাশে আর চাঁদপালঘাট অঞ্চলে। দুটো জেলখানার একটা লালবাজারে আর একটা চৌরঙ্গীতে। আর অনেকগুলি চার্চ। ইংরেজদের চার্চ ছাড়া, আর্মেনিয় আর পর্তুগিজ চার্চগুলিও উপাসনার জন্য যথেষ্ট উল্লেখ করার মতো। তাদের গঠনশৈলী, আকার-আয়তন এবং কারুকার্য কোন অংশেই কারো চেয়ে কম নয়।

নদীর অপর তীরে জাহাজঘাটা। সেখানে জাহাজের মেরামতি, পরিষ্কার ইত্যাকার কাজকর্ম হয়। শহরের বাইরে রয়েছে একটা হাসপাতাল। গাছপালা দিয়ে ঘেরা। আর রয়েছে মনোহর কতগুলি বাসা। ইউরোপীয় ভদ্রলোকেদের গ্রীষ্মাবাস।  ফুলের বাগানঘেরা বাসা, চমৎকার বাঁধানো হাঁটার পথ, পথের দুপাশে ঝুঁকে থাকা গাছ । টলটলে পুকুর, জলে মাছ। তার পাড় জুড়ে গাছের ভিড়। আকাশের নীল চাঁদোয়ার ছায়া পড়েছে জলে। শহরের মধ্যে একটা  খাল, খুব সুন্দর জলপথ। মিস্টার টলি নিজের খরচে কাটিয়েছেন ওটা। এলাকার মাঝ বরাবর সোজা খিদিরপুর থেকে পাঁচ ছ মাইল দক্ষিণে নালাটা গঙ্গানদীকে সুন্দরবনের নদীর সঙ্গে যোগ করেছে। নৌকো যাতায়াতের পক্ষে আদর্শ পথ। সড়কপথে মাল পরিবহনের থেকে জলপথে সুবিধেজনক বলে মিস্টার টলি এ থেকে কর আদায়ে বেশ লাভবান হয়েছিলেন।  ক্রমে বাংলার বিভিন্ন অংশে মাল পরিবহনের জন্য এই জলপথ অন্যতম প্রধান রাস্তা হয়ে ওঠে।

 অনুবাদকের সংযোজনঃ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার থেকে জানা যাচ্ছে, গঙ্গার মজা একটা খালের সংস্কার করেন মেজর উইলিয়াম টলি। ১৭৭৬ সালে। এটা ছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এ কাজে তাঁকে বেশ কিছু জমির পাট্টা দেয়া হয় ও জলপথে পরিবহনের কর আদায়ের অধিকার দেওয়া হয়। সংস্কার করা নালা বহুলভাবে ব্যবহার শুরু হয় ১৭৭৭ সালে। ১৮০৪ সালে সরকার বাহাদুর এই নালা অধিগ্রহণ করেন। শুরুতে এর দৈর্ঘ্য ছিল অত্যন্ত কম, পরে ক্রমশ তা বিস্তৃত হয়। টলি নালার উৎপত্তি খিদিরপুর থেকে শুরু হয়ে তারাদহ অবধি ১৭ মাইল বিস্তৃত ছিল। এই নালা হুগলি নদীকে বিদ্যাধরী নদীর সংগে যোগ করেছিল।  অর্থাৎ দীন মহম্মদ যখন দেখেন তখন এই নালা সংস্কার সবে শুরু হয়েছে এবং অল্প স্বল্প পরিবহন চলছে।

পত্র – ১১

কলকাতায় এত অল্প সময় ছিলাম যে কেবল শহরের খানিকটা বিবরণ, কেল্লা আর তার চারপাশের পরিবেশটুকুই সংক্ষেপে লিখতে পারলাম। আমি সত্যিই ভাবছিলাম যে মানুষজনের আচার আচরণ এসব সম্বন্ধে বিশদে কিছুই আপনাকে জানানো হল না। আর হঠাৎ করেই এর মধ্যে আমাদের বহরমপুর চলে যাবার আদেশ এল।

১৭৭৩ সাল নাগাদ বহরমপুর পৌঁছোলাম। পথে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি বলাই বাহুল্য। ভাগীরথী নদীর তীরে এখানকার সেনাছাউনি। বাইশটা ব্যারাক, গোলাবারুদ রাখার জায়গা, মালপত্রের গুদাম আর দপ্তর । নদীর কাছে, দক্ষিণদিকের দুটো ব্যারাক কর্নেল এবং মেজরদের জন্য। পুবে আর পশ্চিমে ছটা করে ব্যারাক অন্যান্য অফিসারদের থাকার জন্য। উত্তরে নিচুতলার অফিসারেরা এবং গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনীর সৈন্যদের থাকার জায়গা। সর্বাধিনায়কের জন্য একটা দারুণ বাড়ি, নিচুতলার অফিসারদের ব্যারাক থেকে কিলোমিটারখানেক তফাতে। ব্যারাকগুলোর মাঝের জায়গাটা চৌকো মতো মাঠ। সেখানে সেপাইরা শারীরিক কসরৎ করে।

বহরমপুর খুব ঘনবসতিপূর্ণ। বহরমপুর আর মুর্শিদাবাদের মাঝে ছড়ানোছেটানো বিচ্ছিন্ন বসতি। মাঝামাঝি দুটো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কল্কাপুর আর কাশিমবাজার। সিল্ক ও সুতির কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত। ভারতের অন্যান্য যেকোনো জায়গার চেয়ে সহজ ও সুবিধেজনক শর্তে ব্যবসায়ীরা কাপড় সংগ্রহ করে এখান থেকে। কৌতূহলবশত মুর্শিদাবাদ শহর দেখতে গেলাম। বেশ বড়ো ব্যবসায়ী শহর। দেশীয় মানুষদের ব্যবসাবাণিজ্যের পীঠস্থান, যেখানে মোগল পার্শি মুসলমান হিন্দু সকলেরই অবাধ গতায়াত। বাড়িগুলি পরিচ্ছন্ন, কিন্তু সুসজ্জিত নয়। প্রত্যেকটা বাড়ি তার মালিকের শখ ও মর্জিমতো তৈরি করা। ব্যবসায়ীদের বাড়িগুলি সাধারণভাবে মোটামুটি ঠিকঠাক নকশা অনুযায়ী বানানো আর তাতে উন্নতমানের ইট ব্যবহৃত।

অন্যদিকে শহরের কাছে কোম্পানির কর্মচারীদের বাড়িগুলিও যথেষ্ট ছিমছাম। মুর্শিদাবাদ শহর আর শহরতলী মিলে লম্বায় নয় মাইল, প্রায় বহরমপুর অবধি বিস্তৃত। মাঝের ছাড়া ছাড়া এলাকাতে বড়োমানুষদের বসতবাড়ি, প্রাসাদ, ইত্যাদি। যার মধ্যে মুবাররক উদ দৌলার প্রাসাদ অন্যতম।  অন্যান্য প্রাসাদের থেকে একেবারে স্বতন্ত্র ও সর্বোত্তম। মর্মর পাথরের খিলান দেওয়া স্তম্ভ, নানা রঙের নকশা করা পর্দা লাগানো তাতে। খিলানের ওপরে নহবৎ। বাজনদারদের দল নানান বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সকাল সন্ধ্যায় সঙ্গীত পরিবেশন করে।

time04প্রাসাদের একপাশ দিয়ে একেবেঁকে ভাগীরথী বয়ে চলেছে। অন্যপাশে চকবাজার। সেখানে ঘোড়া বিক্রি হয়। বাজপাখি বেচাকেনা হয়। বুনো এবং পোষা দুইই। গাইয়ে পাখি পাওয়া যায়। ভারতের যাবতীয় উৎপাদিত জিনিসই মেলে এই বাজারে। এখানে আসার পরপরই নবাবের জৌলুসে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। একদিন নবাব তাঁর হাজারতিনেক সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে জাঁকজমক করে প্রাসাদ থেকে নিজের এলাকার মন্দির দর্শনে চলেছেন। তাদের দামি পোশাক-আশাক, জামাকাপড়ের জেল্লা সব মিলিয়ে আমার দেখা সেরা মিছিল।

একটা বড়ো ঢাকা পালকির মতো আসনে নবাব বসে আছেন। সেটা বয়ে নিয়ে চলেছে ১৬ জন বেহারা। তাদের সকলের পরনে লাল রঙের পোশাক। পালকির চাঁদোয়া খুব উজ্জ্বল রঙের কাপড়ে তৈরি, রুপোর মিনে করা ভেলভেটের পাড় বসানো তাতে। চাঁদোয়ার চার কোণ চারটে রুপোর দণ্ডের ওপর আটকানো। সবমিলিয়ে একটা সুন্দর হাতলওয়ালা কেদারার মতো দেখতে। ডিম্বাকার ও অভিজাত। নবাব তাইতে পা মুড়ে, নরম তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে। দুপাশের হাতলগুলিও টকটকে লাল ভেলভেটে মোড়া আর তার ওপর সোনার ফুলকারি কাটা। নবাবের পাশে পাশে দুজন, কি জানি কোন পশুর ল্যাজ দিয়ে বানানো দুটো চামর নিয়ে মশা মাছি তাড়াতে তাড়াতে চলেছে। চামর দুটোর হাতলগুলো রুপোর। অতবড়ো মানুষটার মাথায় সাদা মসলিনের ছোট্ট পাগড়ি, চুয়াল্লিশ হাত লম্বা তো বটেই, যার ওজন মাত্র ছ সাতশ গ্রাম। পাগড়ির সামনের দিকে পাড় বরাবর ছোটো ছোটো ঝালর নবাবের ডান কপালের ওপর ঝুঁকে। পাগড়ির সামনে নিখাদ ও time06নিখুঁত একখানা হিরে বসানো। মসলিনের পাতলা কাপড়ে দেহখানি ঢাকা, তার ওপরে আরেকখানা মাখনরঙা সাটিনের দেহঢাকা লম্বা পোশাক; একই কাপড়ের পাৎলুন। পোষাকের ধারগুলো রুপোয় মোড়া, প্রতিটি বোতাম রুপোর তৈরি। উটের লোম দিয়ে তৈরি দামি একখানা শাল আলগোছে কাঁধে ফেলা। আরেকখানা কোমরে জড়ানো। দ্বিতীয় শালটির মধ্যে গুঁজে রাখা তার তরবারি। সেটিও একটি অসাধারণ কারিগরীর নিদর্শন। হাতলটা সোনার তৈরি, তাতে হীরে বসানো আর ছোটো ছোটো সোনার চেন লাগানো। নবাবের জুতোও লাল ভেলভেট কাপড়ে বানানো, চারধার রুপোয় মোড়া আর মুক্তো বসানো।

দুজন সচিব ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে তার পাশে পাশে চলেছেন। এদের তুলনায় নবাবের পোশাকআশাকের সামান্যই তফাৎ তবে পাগড়িতে বসানো হীরেটা নিশ্চিতভাবে অনেকটাই তফাৎ গড়েছে। ঘোড়াদের জিন-এ নানান রকম কারুকাজ, ঝালর লাগানো। নবাবের সামনে পেছনে অসংখ্য পাইক বরকন্দাজ। নবাবের সিংহাসন-লাগোয়া ঘোড়ার পিঠে তাঁর নিজস্ব দেহরক্ষী। সকলের পোশাকআশাকেই আলাদারকম বিশেষত্ব নজরে পড়ে। পৃথিবীও যেন তার সমস্ত ঐশ্বর্য দিয়ে এদের সাজিয়েছে। কারিগররা তাদের সমস্ত দক্ষতা দিয়ে ঘোড়াদের নানা সাজে সাজিয়েছে। নবাবের হাতে গড়গড়ার নল, স্থানীয় ভাষায় হুকা। নলটা পেঁচানো, নয় হাত লম্বা। নলের মাথাটা নবাবের হাতে, আর গড়গড়ার বাকি অংশ নীচে হেঁটে চলা এক পরিচারকের হাতে। রুপোর তকলিতে  সুগন্ধি, মধু, গোলাপজল আর মিহি করে কাটা তামাক দিয়ে সাজা। মিশ্রনটা  টিকের হাল্কা তুষের আগুনের ওপরে রাখা, তার মিহি সুগন্ধি ধোঁয়া একটা হলদে মতো তরলের মধ্যে দিয়ে এসে লম্বা গড়গড়ার নলের ভেতর দিয়ে সোজা নবাবের মুখ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

পরিচারকের হাতে ধরা যে অংশটা, সেটা কাচের, তাতে এক লিটার মতো জল ভরা। পাত্রটার চারদিক দিয়ে সুন্দর করে ছোটো ছোটো সোনার চেন লাগানো; লম্বা নলটির দু প্রান্তেই সোনার মুখ লাগানো। মাঝখানের অংশটা সাটিন, সিল্ক আর মসলিন দিয়ে বোনা একটা লম্বা নল বিশেষ। মুখে ধরার অংশটা তো সোনা দিয়ে তৈরিই, ঠোঁটের যে অংশটা নলকে স্পর্শ করবে সেখানটায় হীরে বসানো।

দেশীয় গাইয়ে বাজিয়েদের একটা দল রয়েছে তার সাথে সাথে। উটের পিঠে চাপানো মস্তো একটা ঢোল। অনেক দূর থেকে এটার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। পুরো মিছিলটার আগে আগে ঘোষক বা হরকরা, নবাবের আগমন ঘোষণা আর রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে চলেছে সে। আশেপাশের লোকেরা ভেঙে পড়েছে দেখার জন্য। আমি খানিক অপেক্ষা করে রইলাম, সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে নবাবের মন্দিরে ঢোকার অপেক্ষায়। সকলে মন্দিরের পবিত্র চত্বরে প্রবেশের আগে বাইরে জুতো খুলে রেখে ঢুকল। এই অসামান্য আড়ম্বরপূর্ণ শোভাযাত্রায় আমি যারপরনাই মুগ্ধ হলাম, আর বেশ কিছুদিন মুর্শিদাবাদে থেকে যাবার ইচ্ছে হল।

ক্রমশ

1 thought on “টাইম মেশিন-ভারত ভ্রমণ”

Leave a Reply