আট-ন’ মাস হল পঞ্চা আমাদের কাছে এসেছে। আজকাল দেখি মামা অন্য কাজকর্ম-ব্যাবসারও খোঁজখবর নিচ্ছে। একদিন মামা বলল, “বুঝলি দশা, শুরুতে যত পয়সা হচ্ছিল, এখন আর তেমন হচ্ছে না। ছোটো জায়গা তো, এক জায়গায় খেলা দেখানোর পর দু’মাস পরেও সেখানে আবার গেলে আগের মতো সাড়া পাচ্ছি না। তাই ভাবছি—”
বলে মামা চুপ করে গেল। আর কিছু বলে না দেখে আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “পঞ্চাকে কি তবে বিক্রি করে দেবে?”
“আরে না না। এতেও যা হচ্ছে তাতে আমাদের চলে যাবে। আমি ভাবছি অন্য কথা। পঞ্চা হয়তো আর দু’চার বছর খেলা দেখাতে পারবে। তার মধ্যে আমাদের অন্য একটা পাকাপাকি ব্যাবসার ব্যবস্থা করতে হবে। হাতে কিছু জমেছে, সেটা থাকতে থাকতে নতুন কোনো ব্যাবসা শুরু করব। খেলা দেখানোটা তখন সাইড বিজনেস হিসেবে থাকবে।”
মুখে যা-ই বলুক মামা, আমার কিন্তু মনে হল মামা সব কথা খুলে বলছে না, আমার মন খারাপ হয়ে যাবে ভেবে রেখে-ঢেকে বলছে। আমি লেখাপড়া নিয়ে মেতে আছি, অন্যদিকে খেয়াল রাখি না। নিজের ওপর রাগই হল আমার। আমি যদি মামার কথা না ভাবি কে ভাববে তবে?
পরের রোববার মামার সঙ্গে বাজারে যাবার বায়না ধরলাম।
মামা বলল, “না না, তোকে যেতে হবে না, তুই পড়।”
“না,” আমি জেদ ধরে বসলাম, “আমি যাবই। অত অত সবজি বাজার থেকে একা একা টেনে আনতে তোমার কষ্ট হয়। এখন থেকে ছুটির দিনে তোমার সঙ্গে আমিও বাজারে যাব। তুমি ‘না’ বলতে পারবে না।”
“বেশ বাবা বেশ,” মামা হেসে বলল, “–তুই আমার পিতৃতুল্য, তোর হুকুম আমাকে মানতেই হবে। পিতৃতুল্যর মানে জানিস তো?”
“জানি, বাবার মতো। সে তুমি ঠাট্টা কর আর যা-ই কর, আমি এখন বড়ো হয়েছি, তোমার ভালোমন্দ আমি না দেখলে কে দেখবে?”
“ঠিক ঠিক।” মামা চোখ নাচিয়ে মাথা নাড়ল।
শীত চলে গেছে। ফুলকপি-বাঁধাকপি-মূলোর দিন শেষ। এই তিনটে সবজিরই ডাঁটাপাতা অনেক পড়ে থাকে বাজারে-এখন কোথায় সেসব? এদিকে তাকাই, ওদিকে তাকাই, পড়ে-থাকা জিনিস কিছু দেখি না।
“কী দেখছিস দশা?” মামা জিজ্ঞেস করল।
“ফ্রিতে পাওয়া যাবে এমন জিনিস কিছু দেখছি না মামা।”
“সে আবার শীত না এলে আর নয়। আলুটাই বেশি করে কিনব, আমরা খাব, পঞ্চারও পেট ভরবে। আর দেখি কী পাওয়া যায়।”
দরাদরি করে আঠেরো টাকা দিয়ে পাঁচ কেজি আলু কিনল মামা। দু’কেজি পাকা কুমড়ো নিল তারপর-বারো টাকায়। অনেকটা কুমড়োর বুকো পড়ে ছিল কুমড়োওলার পাশে। মামা তাকে বলল, “এগুলো নেব ভাই?”
“রোজ ফিরিতে কুমড়োর বুকো হয় না ভাই। তিন টাকা লাগবে।”
“এই যদি তোমার বিচার হয়-দেব। তবে কী জান ভাই, এসব তো অবোলা জীবের সেবায় লাগে…” মামা ঘুরিয়ে দাম কমাতে চাইল।
কুমড়োওলার মন তাতেও ভেজে না, “জানি ভাই, সবই জানি। যে অবোলা জীবের জন্য নিচ্ছ তার খেলা দেখিয়ে পয়সাও ভালোই পাচ্ছ।”
বোঝা গেল লোকটা কোথাও আমাদের ভালুকের খেলা দেখেছে। মামা আর কথা না বাড়িয়ে তিন টাকা দিয়ে বুকোগুলো নিয়ে নিল। তারপর পাঁচ টাকা দিয়ে এক কেজি কানা বেগুন আর এক টাকায় আড়াইশো একটু-একটু- থ্যাঁতলানো টম্যাটো কিনলাম আমরা। মনে মনে হিসাব করে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। উনচল্লিশ টাকার বাজার করেছি আমরা। পঞ্চা খাবে, আমি আর মামা খাব, তিন দিন যদি চলে এই সবজিতে তো খুব খুশি।
মামার হাতের থলেটা বড়ো, আমারটা ছোটো। আমরা বাড়ির দিকে হাঁটছি। মাঝপথে মামা আবার দুটো মুরগির ডিম কিনে নিল সাড় তিন টাকায়।
যেতে যেতে আমি মনে হিসাব করছি। সবজি ছাড়াও মামা দু’বেলাই আমাদের রান্না করা খাবারও পঞ্চাকে একটু একটু দেয়। পঞ্চার খাওয়ার খরচই লেগে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ-ছ’শো টাকা মাসে। আবার শীত না পড়তে এই রকমই চলবে। বর্ষাকালে আরো বেশি লাগবে, তখন আনাজের দাম খুব বেড়ে যায় তো। ভালুকের খেলা দেখিয়ে কত টাকা আর হয় মামার? মাসে দেড় হাজারই হোক। এতে সব খরচ চালানো সত্যিই কঠিন। সত্যি, এত তাড়াতাড়ি যে সুখের দিন শেষ হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি।
দেখতে দেখতে বর্ষা এসে গেল। ছুটির দিনে মামার সঙ্গে বাজারে যাই। আগুন দাম সবজির। আমাদের বরাবরই, পঞ্চারও এখন প্রধান খাদ্য আলু। তার দাম সাত টাকা কিলো। তিন-চার মাস আগেও ছিল আড়াই টাকা-তিন টাকা কিলো। কী যে হবে?
প্রত্যেকটা ছুটিছাটার দিনে খেলা দেখাতেও বেরোতে পারে না মামা। যা বৃষ্টি, কে আসবে খেলা দেখতে? পার্ক-টার্ক কাদায় কাদা। মামার খুব মন খারাপ। চুপচাপ থাকে। মুখ গম্ভীর। সবই বুঝতে পারি। কিন্তু আমি আর কী করব? তবে ভরসা একটাই-হার মানবার পাত্র নয় মামা, একটা না একটা রাস্তা ভেবে ঠিক বের করবেই। কত ব্যাবসা এল, কত ব্যাবসা গেল। ভালুক খেলায় না পোষালে অন্য ব্যাবসা ধরবে মামা। মামার ভাবনা সে জন্যে নয়, তা সে না বললেও জানি। মামার আমার দু’জনারই আসল ভাবনা পঞ্চাকে নিয়ে। সে আমাদের এত আপনজন হয়ে গেছে যে তাকে ছাড়া থাকবার কথা আমরা ভাবতেই পারি না। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে কী করে যে ওকে আমরা পুষব তাও বুঝতে পারছি না। খুব খারাপ সময় যাচ্ছে আমাদের। এমন যে হবে আমরা একেবারেই ভাবতে পারিনি। দূরদৃষ্টি আমাদের সত্যিই কম-মামারও, আমারও।
মামা একদিন কাঁদো-কাঁদো মুখে আমাকে ডেকে বলল, “দশা, আর যে পারা যাচ্ছে না।”
এটুকু বলেই মামা চুপ করে গেছে। আমি কিন্তু বুঝতে পারি পরের কথাগুলো আমাকে কীভাবে বলবে তা-ই ভাবতে সময় নিচ্ছে সে। কথাগুলো যে কী হতে পারে তাও আমি আন্দাজ করতে পারি।
তাই মামাকে বলার কষ্ট না দিয়ে আমিই বললাম, “চলো, পঞ্চাকে কলকাতার চিড়িয়াখানায় রেখে আসি।”
মামা মাথা নাড়ল, “নেবে না। দিশি ভালুক কত আছে ওদের!”
“কিন্তু পঞ্চার মতো অসাধারণ ভালুক কি আছে?”
“তা নেই। কিন্তু চিড়িয়াখানার কর্তারা ওসব বিচার করে না। করার দরকারও নেই তাদের। তারা জন্তুজানোয়ারকে খাঁচায় আটকে রাখে, খেতে দেয়, লোকে টিকিট কেটে দেখতে আসে। ওদের কাছে একটা বোকাহাঁদা ভালুকও যা, পঞ্চার মতো মেধাবী ভালুকও তা-ই।”
“সার্কাস কোম্পানিতে দিলে হয় না?” আমি পরামর্শ দিই।
“নাঃ,” মামা এক কথায় খারিজ করে দেয় আমার পরামর্শ, “কবে কোথায় কোন সার্কাস কোম্পানি তাঁবু ফেলবে তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকা যায় না। তারা যে নেবে তারও ঠিক নেই।”
“তাহলে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসাই ভালো।”
“জঙ্গল কোথায় এখানে? ভালুক থাকে তেমন জঙ্গল? একা একা কেউ থাকতে পারে না রে।”
“তাহলে কী করবে মামা?”
“উপায় একটা ভেবেছি,” চিন্তিত মুখে মামা বলল, “শহরের বাইরে দূরে কোথাও ওকে ছেড়ে দিয়ে আসব।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী। লোকে নিশ্চয়ই ওকে দেখে পুলিশকে খবর দেবে। যা করার তখন পুলিশই করবে।”
“পুলিশ ওকে গুলি করে মেরে ফেলে যদি…”
“দূর পাগল। কোনো বন্যপ্রাণী হিংস্র না হয়ে গেলে তাকে মারা দন্ডনীয় অপরাধ। পুলিশ খবর দেবে বন-দপ্তরকে। তাদের লোক এসে পঞ্চাকে কোনো জঙ্গলে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবে -যেখানে ওর জাতভাইরা থাকে।”
যতই অনিচ্ছা থাক আমাকে মামার কথায় সায় দিতেই হল, “তবে তা-ই করো। ”
ক্রমশ
1 thought on “ধারাবাহিক উপন্যাস-পঞ্চা নামে ভালুকটি-চিত্ত ঘোষাল”