বিদেশি গল্প জাপানি-সংহিতা

bideshijapan021 (Small)

চতুর্থ পর্ব

এই সময়ে ইয়ামাতো প্রদেশে এক দাইমিও থাকতেন, নাম তাঁর হন্ডা দাইনাইকি। একদিন অনুচরপরিবৃত অবস্থায় তিনি একটি তলোয়ার বের করলেন এবং বাজি ধরলেন যে তলোয়ারের ফলা দেখে কেউ বলতে পারবে না যে কোন কামারশালাতে সেটা তৈরি হয়েছিল।

“আমার মনে হয় এটা মাসামুনে তলোয়ার।” বললেন ফুওয়া বানজায়েমন।

“না”, বললেন নাগোয়া সানজা। তলোয়া্রের ফলাটা খুঁটিয়ে দেখে বললেন, “এটা মুরামাসা না হয়ে যায় না।”

তাকাগি উমানোজো নামে আরেকজন সামুরাই বলে বসলেন যে ফলাটা শিডজু কানেজির বানানো। যেহেতু তাঁরা কেউই সহমত হলেন না ব্যাপারটায় এবং নিজের নিজের বিচারে অটল রইলেন সেহেতু তাঁদের প্রভু এক বিশেষজ্ঞকে ডেকে পাঠালেন। বিশেষজ্ঞের রায়ে প্রমাণ হয়ে গেল, যেমন সানজা বলেছিলেন, যে ঐ তলোয়া্রের ফলাটা একটা আসল মুরামাসা। সানজা তো রায়ে যারপরনাই খুশি হলেন। কিন্তু বাকি দুজন বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরে গেলেন। উমানোজো যদিও তর্কে হেরে নাস্তানাবুদ হয়েছিল, তবু তার মনে কোনো খেদ ছিল না, কোনো খারাপ ইচ্ছে জাগে নি তার মনে। কিন্তু বানজায়েমনের ব্যক্তিত্ব ছিল উদ্ধত। তার আত্মশ্লাঘামথিত মনে সানজার প্রতি গভীর ঘৃণা জন্মালো। সে তক্কে তক্কে রইল একটা সুযোগের যাতে সানজাকে মহা অপদস্থ করা যায়। শেষে একদিন তার প্রতিশোধস্পৃহা এমন চরমে পৌঁছলো যে সে রাজপুত্রের দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করল, “হে সর্বময়কর্তা, সানজার অসিচালনা এক দর্শনীয় বিষয়। আপনার একবার দেখা উচিৎ। আমি তার তুলনায় কিছুই না। তবু আপনার মর্জি হলে আমি একবার তার সাথে একপ্রস্থ অসিযুদ্ধের মহড়া দিতে পারি।”

রাজপুত্র তখন সদ্য যুবা। তিনি ভাবলেন একটা জমাটি খেলা দেখা যাবে। তক্ষুণি সানজাকে ডেকে পাঠিয়ে বানজায়েমনের সাথে অসিযুদ্ধে নামার হুকুম দিলেন।

তারা দুজনে হাতে কাঠের তলোয়ার নিয়ে বাগানে উপস্থিত হলেন। এদিকে বানজায়েমনের কিন্তু মনে মনে নিজের অসিচালনা নিয়ে মহা গর্বই ছিল। সে ভাবত অসিচালনায় সে সেরা। তাই সে মনে মনে প্রস্তুত হয়েই ছিল যে সানজার সাথে অসিচালনায় সে সহজে জিতে যাবে আর তারপর তাকে তুলোধোনা পিটবে যাতে তলোয়া্রের ফলা নিয়ে তর্কে হেরে সে যে মনোবেদনা পেয়েছে তা সেরে যায়।

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল যে, সে সানজার ক্ষমতাকে যথার্থ মান দেয় নি। সানজা যখন দেখল যে তার প্রতিপক্ষ অভব্যের মতো খেলার নিয়মের বাইরে গিয়ে তাকে আঘাত করছে তখন সে সোৎসাহে এমন এক দ্রুত আঘাত হানল বানজায়েমনের কব্জিতে যে তার হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে পড়ল। সেটা বানজায়েমন মাটি থেকে হাতে তুলে নিতে পারার আগেই তার কাঁধে সানজা এমন আঘাত করল যে সে ধুলোর ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল। যতো সেনানায়ক সেখানে উপস্থিত ছিলেন সব্বাই সানজার তলোয়ার চালানোর খুব প্রশংসা করতে লাগলেন। এতে বানজায়েমন এতো লজ্জা পেল যে সে এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে গেল আর সেখানেই লুকিয়ে রইল।

এই ঘটনায় সানজা রাজানুগ্রহে প্রচুর সম্মান পেল। আর বানজায়েমন আগের থেকেও বেশি হিংসে করতে লাগল সানজাকে। সে নিজেই নিজের অ-সুখের জালে আটকে পড়তে লাগল আর  বাড়িতে বসে মনে মনে সানজাকে ধ্বংস করার ছক কষতে লাগল।

এরপর রাজপুত্র নিজে মুরামাসা ফলা নিজের তলোয়া্রে লাগাতে চাইলেন আর সানজাকে ডেকে সেই দায়িত্ব দিলেন যাতে সানজা সবচেয়ে বুদ্ধিমান কামারকে দিয়ে তলোয়ার মোড়ার খাপ আর তার সজ্জা বানায়। ফলাটা তৈরি হলে পর সানজা সেটা এনে নিজের বাড়িতে এনে যত্নে সরিয়ে রাখল। এই খবরটা শুনে বানজায়েমন আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠল। কারণ সে মনে করল যে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উপযুক্ত সময় দেখা দিয়েছে।

বানজায়েমন পণ করল যে সে দরকার পড়লে সানজাকে প্রাণে মারতেও পিছপা হবে না, কিন্তু তলোয়ারটা তাকে চুরি করতেই হবে। ওটার রক্ষণাবেক্ষণের গুরুদায়িত্ব রাজপুত্র বিশ্বাস করে সানজাকেই দিয়েছেন এবং সেহেতু তলোয়ারটা খোয়া গেলে সানজা আর তার পরিবার পথে বসবে। স্ত্রী কিংবা সন্তানাদি না থাকায় একলা মানুষ বানজায়েমন নিজের সমস্ত আসবাব বেচে দিয়ে, নিজের তাবৎ স্থাবর সম্পত্তিকে টাকা করে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিল।  প্রস্তুতি  শেষ হলে পর এক মধ্যরাত্রে সে চুপি চুপি ঢোকার চেষ্টা করল সানজার বাড়িতে। কিন্তু দরজা জানলা সব ভেতর থেকে ছিটকিনি এঁটে বন্ধ করা ছিল। এমন কোনো ফাঁকফোকরও ছিলনা যেখান দিয়ে বানজায়েমন সিঁদ কেটে ঢুকতে পারে। সব কিছু নিঃস্পন্দ যেন। নিশ্চিতভাবেই বাড়ির বাসিন্দারা ঘুমেই পড়েছে অনেকক্ষণ আগে। তাই বানজায়েমন দেওয়াল বেয়ে দোতলায় পৌঁছোল আর একটা জানলার পাল্লা যাহোক কায়দা করে খুলে ফেলল। অবশেষে সে ঢুকে পড়ল সানজার বাড়িতে। বিড়ালের মত হালকা পায়ে চলে সে নেমে এলো একতলায়। তারপর এঘরে ওঘরে উঁকি মেরে দেখতে পেল একটা ঘরে সানজা ঘুমিয়ে আছে মাদুরের ওপর, মধ্যিখানে লেপের মধ্যে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে তাদের তের বছরের ছেলে কোসানজা। রাতবাতির শিখা তখন প্রায় নিবু নিবু।  কিন্তু সেই bideshijapan02 (Small)আধো অন্ধকারেও বানজায়েমন দেখতে পেল যে ঘরের উঁচু অংশে তলোয়ার রাখার তাকের ওপর রাখা রয়েছে রাজপুত্রের অহঙ্কার মুরামাসা তলোয়ারখানা। সে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেল তলোয়ারটার কাছে আর সেটা পুরে নিল নিজের কোমরবন্ধে। তারপর সানজার কাছে এসে, তার ঘুমন্ত শরীরের দুপাশে নিজের দু পা রেখে তলোয়ারটা ঘুরিয়ে এক কোপ বসাল সানজার গলাতে। কিন্তু উত্তেজনায় বানজায়েমনের হাত কেঁপে গেল। ফলে সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো এবং সানজার গায়ে একটা আঁচড়মাত্র পড়ল। সানজা চমকে জেগে উঠল আর লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করল। তাতে সে টের পেল যে কেউ তাকে নীচে চেপে রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে শত্রুর সাথে কুস্তি করার সময় যখন  এল, তখন পিছু হটে, রাতবাতি উল্টে, জানলার পাল্লা খুলে বাগান দিয়ে বানজায়েমন পালাল। ছোঁ মেরে নিজের তলোয়ারটা বাগিয়ে তার পিছু নিল সানজা। তার বউ একটা লন্ঠন জ্বেলে, একটা কুড়ুল গাঁথা বর্শা হাতে চলল কর্তাকে সাহায্য করতে। সঙ্গে রইল তার ছেলে, হাতে ছোরা নিয়ে।

বানজায়েমন লুকিয়ে ছিল একটা বড়ো পাইন গাছের আড়ালে। লন্ঠন দেখে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সেই একটা পাথর তুলে ছুঁড়ল লন্ঠন তাক করে যদি সেটা  ভেঙে গিয়ে আলোটা নিভে যায়; আর হলও তাই। সেই সুযোগে সে চম্পট দিল বেড়া ডিঙিয়ে। অনেকক্ষণ বাগানের আনাচেকানাচে ব্যর্থ খোঁজাখুঁজির পর ঘরে ফিরল সানজা। তারপর তার চোটটাকে পরীক্ষা করে দেখল সে যে সেটা তেমন কিছু নয়। তখন সে নজর দিল চোরে কিছু নিয়ে গেছে কিনা ঘর থেকে তাই খোঁজাতে। তাকের ওপর যেখানে মুরামাসা তলোয়ারখানা ছিল সেখানে চোখ পড়তেই দেখল যে সেটা নেই। সে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল, কিন্তু কোথাও পেল না সেটা। যে মহার্ঘ ফলাখানা তাকে বিশ্বাস করে রাজপুত্র রাখতে দিয়েছিলেন সেটা চুরি গেছে, তার দায় বড়ো ভারি হয়েই চাপবে তার কাঁধে। বেদনায়, লজ্জায়, বড়ো দুশ্চিন্তায় রাত ভোর হলো সানজা আর তার স্ত্রীর এবং তাদের পুত্রের। তারপর সে রাজপুত্রের এক পারিষদকে সম্পূর্ণ ঘটনা জানিয়ে একান্তে অপেক্ষায় রইল রাজপুত্রের আদেশের।

খুব শিগগির জানা গেল যে দেশছাড়া বানজায়েমনই চোর। পারিষদরা সেই মতো জানালেনও রাজপুত্রকে। রাজপুত্র বানজায়েমনের হীন কাজের জন্য তার প্রতি নিজের প্রবল অপছন্দের কথা স্বীকার করলেও সানজাকে তার দায়িত্বপালনের অক্ষমতার দোষ থেকেও মাপ করলেন না কারণ সানজা আরও সাবধান হতে পারত রাজপুত্রের তলোয়া্রের মহার্ঘ মুরামাসা ফলাখানা নিজের কাছে রাখার সময়। তাই এই সিদ্ধান্ত হলো যে সানজাকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে আর তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে এই শর্তে যে সে যদি বানজায়েমনকে খুঁজে বার করে মুরামাসা ফলাখানা উদ্ধার করতে পারে, তাহলে তাকে তার পদে পুনর্বহাল করা হবে।

শুরুর থেকেই সানজা তৈরি ছিল কঠিন শাস্তির জন্য, তাই বিনা বাক্যব্যয়ে সে রাজাজ্ঞা মেনে নিল। স্ত্রী-পুত্রকে আত্মীয়দের কাছে রেখে প্রস্তুত হলো রনিন হয়ে দেশ ছাড়ার আর বানজায়েমনকে খুঁজে বার করার জন্য।

চলবে

1 thought on “বিদেশি গল্প জাপানি-সংহিতা”

Leave a Reply