বাড়িটা পুরোন। এ পাড়ার সব বাড়িই তো পুরোন দেখছি। গেটটা ঠেলতেই ক্যাঁ-চ করে উঠল। শব্দটা বহুক্ষণ বাদে শুনলাম। আমার জুতোটা আর শব্দ করছে না। অনেকক্ষণ ধরেই করছে না অবশ্য। সেনসাসের কাজ করতে গেলে জুতোর শব্দ টব্দ খুব তাড়াতাড়িই উধাও হয়ে যায়।
গাড়িবারান্দা পেরিয়ে,সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। হয়রান হয়ে গেছি সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে। বেল বাজালাম। হয়রান হয়ে গেছি বেল বাজাতে বাজাতে। ভেতরে পায়ের আওয়াজ পেলাম। হয়রান হয়ে গেছি পায়ের আওয়াজ পেতে পেতে।
এক ব্যাপার,একই জিনিস-ভাবলাম আমি ঐ আসছে-আরেকখানা নাক।
সত্যি কথা,হয়রান হয়ে গেছি নাক গুনতে গুনতে।
আপনারা সমঝদার মানুষ,নিশ্চয়ই বুঝবেন ব্যাপারটা। সারাদিন হাঁটুন। বগলে নিন একখানা ভারি ব্যাগ। একই বোকা বোকা প্রশ্ন করে যান বারবার-শতবার। প্রশ্ন করা শেষ। কিন্তু শেষ করে কী হল? কী পেলেন আপনি? কোন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বেচলেন না। কোন চিরুনি বেচলেন না,কোন জুতোর ফিতে বেচলেন না। তাহলে কী হল ব্যাপারটা? কী করলেন আপনি? পেলেনই বা কী?
পেলেন চারখানা সেন্ট। সেনসাসের কাজে নাক গুনলেন,সেন্ট পেলেন চারখানা। আর উন্নতি? লবডঙ্কা। আঙ্কল স্যাম তো আর আপনাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠাচ্ছেন না। চেয়ারে বসিয়ে একখানা চুরুট এগিয়ে দিয়ে বলছেন না,“সাবাস ছোকরা!বাড়ি বাড়ি ঘোরার কাজটা বেশ ভালই করছ শুনলাম। আর তোমাকে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হবে না হে!তুমি এখন থেকে এখানে বসবে,এই ডেস্কটায়,বুঝলে!”
না স্যার,ওসব হওয়ার নয়। সারাদিন ঘুরে কাজ করার পরই আপনি পেয়ে যাবেন পরের দিনের লিস্ট,নাক গুনতির। নাক প্রতি চার সেন্ট,বড় নাক,ছোট নাক,বোঁচা নাক,খাঁদা নাক,লাল নাক,নীল নাক। নাক দেখতে দেখতে আর গুনতে গুনতে শেষটায় আপনার হয়ে যাবে নাকাতঙ্ক। ইচ্ছে হবে,দরজা খুলে আরেকটা নাক বেরোলেই সেই নাকে একখানা ঘুষি চালিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ার।
এখন অবশ্য আমি দাঁড়িয়ে আছি এই পুরোন বাড়িখানার দরজার সামনে,আরেকখানা নাক বেরোনর অপেক্ষায়। বেরোল একটা তীক্ষ্ণ চঞ্চু,তার সঙ্গে একটা অতিসাধারণ মুখ,তার সঙ্গে একখানা গিন্নিবান্নি চেহারা। অতি সাধারণ। নাকটা বাতাস শুঁকলো খানিকক্ষণ,যেন বুঝে নিতে চাইল ব্যাপারখানা কী।
“ কী চাই?”
“আমি মার্কিন সরকারের থেকে আসছি ম্যাডাম। সেনসাসের কাজ করছি। জনগণনার। ”
“ও,সেনসাস নিচ্ছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ,ম্যাডাম। ভেতরে এসে যদি দুয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতাম-”
সারাদিন ধরে চলছে এই এক বাঁধা বুলি। এক প্রশ্ন,শুধু লোকগুলোই পাল্টে যাচ্ছে,এই যা।
“আসুন। ”
ভেতরটা অন্ধকার। একটা হলঘর। একটা বৈঠকখানা। একটা বাতি জ্বলে উঠল,যখন আমি ভারি পোর্টফোলিওটা টেবিলে রেখে ফর্মটা বার করলাম।
মহিলা দেখছিল আমার ভাবলেশহীন মুখ। আটপৌরে গিন্নির মুখ। যতই বাড়িতে সেলসম্যান আসুক এনসাইক্লোপিডিয়া বেচতে,বা বিল নিতে,একটা চোখ ঠিক লেগে থাকবে কিচেন স্টোভের দিকে। বাদ দাও। পঁয়তিরিশখানা প্রশ্ন করতে হবে এখন। বাঁধা বুলি। ফর্মখানা বাগিয়ে ধরলাম। টিক মেরে গেলাম স্ত্রী পুরুষ,জাতি ইত্যাদি সংক্রান্ত বক্সগুলোয়। ঠিকানা লিখলাম। তারপর শুরু করলাম বাঁধা বুলি।
“নাম?”
“লিজা রোরিনি। ”
“বিয়ে করেছেন না একা?”
“একা। ”
“বয়স?”
“চারশো সাত। ”
“কত বললেন?”
“বললাম তো,চারশো সাত। ”
ঠিকই আছে। সারাদিন ধরে ঘুরে বেড়ালে এইরকমই হবে তো। আমি আরেকবার তাকালাম মুখটার দিকে। সে মুখ একই রকম,ভাবলেশহীন। ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি কর,পালা চুকিয়ে দাও ঝটপট।
“পেশা?”
“আমি একজন ডাইনি। ”
“অ্যাঁ? কী বললেন?”
“বললামই তো। ডাইনিগিরি। ”
চার সেন্ট মজুরিতে একাজ পোষায় না। আমি এমন ভান করলাম যেন উত্তরটা লিখে নিচ্ছি তারপর চলে গেলাম পরের প্রশ্নে।
“কাজটা করা হয় কার জন্য?”
“নিজের জন্যই করি। তবে মালিক আছে একজন। ”
“মালিক?”
“শয়তান মেকরাট্রিগ। শয়তান। ”
চার সেন্ট তো দূরের কথা। দশ সেন্টেও এ কাজ পোষাবে না। লিজা রোরিনি,বয়স চারশো সাত,পেশায় ডাইনি,কাজ করে শয়তানের অধীনে। না না,পঞ্চাশ সেন্টও একাজের জন্য যথেষ্ট নয়।
“ঠিক আছে। ধন্যবাদ। এইটুকুই জানার ছিল। চলি। ”
মহিলা গা করল না মোটে। কাগজগুলো গুছিয়ে নিলাম,ভাঁজ করে ব্যাগে পুরলাম,টুপিটা নিলাম,উঠে দাঁড়ালাম,দরজার দিকে পা চালিয়ে দিলাম।
দরজাটা লোপাট।
কী করব বলুন। দরজাটা লোপাট। মানে নেই।
অথচ ছিল দরজাটা,মিনিটখানেক আগেও। সাদামাটা একটা দরজা,সাদামাটা বসার ঘরে যেরকম থাকে। একপাশে একখানা আর্মচেয়ার,আরেকপাশে একখানা টেবিল। তা,আর্মচেয়ার আর টেবিল দুটো দিব্যি আছে নিজেদের জায়গায়,কেবল মাঝখানের দরজাটাই নেই।
অন্যদিকটা দেখলাম। হয়তো ওদিকে আছে। কিন্তু ওদিকে নেই। ঘর আছে,কিন্তু দরজা নেই।
ঠিক আছে। এরকমই হবে তো। সারাদিন রোদ্দুরে রোদ্দুরে ঘোরা তো কারোর পক্ষেই ভাল নয়। ভাল যে নয় তার একটা প্রমাণ ঐ নাকাতঙ্ক। তারপর ভুলভাল উওর শোনা। তারপর ঘরের দরজা খুঁজে না পাওয়া। বোঝা গেছে ব্যাপারটা। আমি মহিলার দিকে ঘুরলাম।
“ম্যাডাম,দরজাটা যদি একটু দেখিয়ে দেন,আমার আরো কাজ আছে-
“দরজা তো নেই। ”
আশ্চর্য!এতক্ষণ অবশ্য আমি ওর গলা খেয়াল করিনি। সে গলার আওয়াজ চাপা,কিন্তু তীক্ষ্ণ। উত্তাপহীন সে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কেমন যেন লাগছে। মজা করছে নাকি মহিলা আমার সঙ্গে?
“কিন্তু-”
“আমি চাই আপনি আরেকটু থেকে যান। আমার কপাল ভাল যে আপনি এসে পড়েছেন। ”
আপনি এসে পড়েছেন!একটা ডাইনি বলছে এটা!কিন্তু ও তো ডাইনি নয়। ডাইনি বলে কিছু নেই।
কিন্তু এ ঘরে দরজাও যে নাই।
এতক্ষণ দেখিনি,এবার দেখতে পাচ্ছি ফায়ারপ্লেসটা। আমার পেছনে। দাউদাউ করে জ্বলছে তার শিখা। তার ওপরে একটা লোহার পাত্র বসানো আছে। মহিলা ঝুঁকে পড়েছে সেদিকে। দেয়ালে পড়েছে তার ছায়া।
বাপস্!কী বড়ো,আর কী কালো সেই ছায়া! এক মহিলার ছায়া,বিশাল আর কালো,গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে দেয়াল বেয়ে। আমি লিজা রোরিনির দিকে তাকালাম। এখনো ওকে এক আটপৌরে গিন্নির মতই লাগছে। কালো চুল,পাতা কাটা,মাঝখান দিয়ে সিঁথি। ছিপছিপে চেহারা,বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়নি।
চারশো সাত বছর বয়স-
চুলোয় যাক। ওর মুখটা আবার দেখলাম। তীক্ষ্ণ নাক,আটোসাঁটো মুখ,চেরা চোখ,কিন্তু একেবারে সাদামাটা। একেবারেই সাদামাটা শুধু ঐ অগ্নিকুন্ডের আলোতে ওর লালচে মুখে একটা চতুর ছাপ পড়েছে। শেয়ালের মত ধূর্ততার ছাপ। সেই লালচে মুখ এখন হাসছে,ঝুঁকে পড়েছে অগ্নিকুন্ডের ওপর,পাত্রটা তুলে আনার জন্য।
“এক কাপ চা খাও আমার সঙ্গে। ”
“না না,এখন আর চা খাব না-”
“চা হয়ে গেছে। বসো,ভালোমানুষের ছেলে,বসো। পাত্রটা তুলে আনি আগুন থেকে। ”
পাগল মহিলা। পাগল পুরো। আগেকার দিনে-মধ্যযুগে এইসব পাগলী বুড়িগুলোকেই খোঁটায় বেঁধে লোকজন পুড়িয়ে মারত। হাজার হাজার কুচ্ছিত বুড়িকে পোড়াত ওরা এইভাবে। সব পাগলা ছিল। সব। সুস্থ মস্তিষ্কের ছিল না কেউ। পাগল ভেবেই পুড়িয়ে মারত। ডাইনি বলে কিছু হয় না,কিচ্ছু না-
শুধু ভয় লাগছে কেমন যেন।
ও হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। একটা থাবা-মানে হাত আর কি-হাত বাড়িয়ে ধরে আছে কাপটা। বাদামি ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে সেই কাপ থেকে। ডাইনির চা। খেয়ে নাও,তারপর-
ধ্যাৎ!কী সব ভাবছি আমি!বোকার মত চিন্তাভাবনা সব। কী হবে কী ওই চা খেলে? যত্তসব।
চারধারটা দেখলাম একবার দরজাটা খোঁজার জন্য। নেই। চারিদিক অন্ধকার।
আগুন কিন্তু জ্বলছে। টকটকে লাল সেই আগুন। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না বটে,কিন্তু আগুন জ্বলছে। গরম হয়ে গেছে ঘরের ভেতরটা। তাহলে চা-টা খেয়ে বেরিয়ে পড়া যাক।
ওর হাতেও অবশ্য কাপ রয়েছে একটা। চায়ের কাপ। তাহলে এতে বিষ নেই বোধহয়। ও বোধহয় কিছু মেশায়নি। ডাইনিরা কি মেশায়,অ্যাঁ? শেকড়বাকড়? ম্যাকবেথে পড়েছিলাম যেন। তখন ওরা এসবে বিশ্বাস করত। পাগলের দল।
তাহলে চা-টা খাওয়া যাক। হয়তো চা খাওয়া হয়ে গেলেই ও আমাকে দরজাটা দেখিয়ে দেবে। কথাবার্তা বলতে বলতে চা-টা খেয়ে নিই,তারপর বেরিয়ে পড়ি। সেটাই ভাল হবে।
“লোকজন বেশি আসে না এখানে,” পাগলীটা বলল নরম সুরে। টেবিলের ওপাশে,আমি দেখতে পাচ্ছি,ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি হাসি টেনে রাখলাম মুখে।
“আগে আসত । এখন ব্যাবসা খারাপ যাচ্ছে। ”
“ব্যাবসা?”
“ডাকিনিবিদ্যার ব্যাবসা। মায়াজাল। এখন আর এই ব্যাবসা চলছে না গো। কেউ এখন আর এসবে বিশ্বাসই করতে চায় না। কতদিন যে জাদু-পানীয় বানাইনি,কতদিন যে মায়াপুতুল বানাইনি। কত্তদিন। ”
“মায়াপুতুল?”
“মায়াপুতুল জান না? ছোট ছোট পুতুল গো,মোমের তৈরি। তোমার শত্তুর থাকলে তার নাম করে পিন ফুটিয়ে দাও,সে মরবে। কিন্তু মানুষ এখন আর কাউকে মারতেই চায়না। হিংসাই করে না কাউকে। কতদিন যে কাউকে পিন ফুটিয়ে মারিনি। ব্যাবসায় মন্দা যাচ্ছে খুব। ”
তা অবশ্য ঠিক। ব্যাবসায় মন্দা যাচ্ছে যখন,কারবার গুটিয়ে ফেললেই হয়। শুধু শুধু ঝাঁপ খুলে রেখে লাভ কি? উদ্যমী মহিলা,সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমার হাতটা কাঁপছে যে? চা-টা পড়ে যেত আরেকটু হলেই।
“কত ভাল ভাল কায়দা কানুন জানতাম-কিন্তু তুমি চা-টা খাচ্ছ না যে?”
ফাঁসীর আসামীকে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছে। খাও,খাও,কাজে দেবে।
“চা-টা খেয়ে নাও। ”
মুশকিলের ব্যাপার নয়? আমার মগজ বলছে চা-টা খেয়ে নিতে। না খেলে প্রমাণ হবে কী করে যে মহিলাটা পাগলা? না খেলে প্রমাণ হবে কী করে যে আমার মাথা ঠিকই আছে,ডাইনি-ফাইনি সব ফালতু,এটা খেলে আমার কিস্যু হবে না? কিন্তু মুশকিল হল,আমার হাতটা মোটেই চাইছে না যে আমি ওটা খাই। বেশ কষ্ট করে হাতটা মুখের কাছে নিতে হল। মহিলা নজর রাখছে আমার ওপর,আমার চুমুক দেওয়ার ওপর।
চা-টা তেতো,বিস্বাদ,কিন্তু উষ্ণ। কোনদেশী চা কে জানে,তবে চিনা চা নয় নিশ্চয়ই। গলা দিয়ে চা-টা নামল স্বাভাবিকভাবেই,তবে একটা বিশ্রী স্বাদ-
“তুমি আমাকে অবাক করলে,ভালমানুষের ছেলে। আমি এতগুলো কথা বললাম,তোমার তো কোন আগ্রহই দেখছি না। এমন তো নয় যে তুমি রোজই একটা করে ডাইনি দেখছ। ”
এরপর কিছু একটা না বললেই নয়।
“না না,আগ্রহ আছে বইকি,” আমি বললাম,”তবে আরেকদিন। আজকে আমার অনেক কাজ আছে। আরো অনেকগুলো বাড়ি যেতে হবে। চায়ের জন্য ধন্যবাদ। ”
বলছি আর খুঁজছি দরজাটা। আগুন জ্বলছে এখন ঘরের মধ্যে-তবে শুধু ঘরেই নয়,আগুন জ্বলছে আমার মাথাতেও। এটা সেই গরম চায়ের ধাক্কা কিনা বুঝতে পারছি না,লাল আগুনে ঘরের মধ্যে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত ছায়ামায়া,আর তারা নাচছে সারা ঘর জুড়ে,সেই ছায়ামায়ার দল নাচন জুড়েছে আমার মাথায়,আমার চোখের সামনে,সেই ছায়ামায়ার দল অবরুদ্ধ করে রেখেছে দরজাটাকে আমার চোখের সামনে থেকে। চেষ্টা করলে এখনও দরজাটা খুঁজে বার করা যায়। দরজা আছে এঘরে,দরজা কখনও উধাও হয়ে যেতে পারে না। শুধু আমি এটা দেখতে পাচ্ছি না।
যদিও আমি ওকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। ঐ মহিলাকে। ওর আটপৌরে চেহারাটা এখন আরো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওর মুখে হাসি। বয়সের ছাপহীন মুখে সেই হাসি জীবনমরণের সীমানা ছাড়িয়ে চলে গেছে আরো দূরে। এ হাসির সঙ্গে তুলনা করা যায় একমাত্র নরকরোটির-
এত কিছু দেখতে পাচ্ছি,শুধু দরজাটা ছাড়া-
“এবার আমাকে যেতেই হবে,” বললাম আমি। ওর চোখ বোঁজা,যদিও সেই চোখে রয়েছে লাল আগুন আর কালো ছায়া।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
মানে ওঠার চেষ্টা করলাম।
একবার একটা পার্টিতে নয় বোতল ভদকা খেয়ে যখন বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠেছিলাম দেখেছিলাম আমি মেঝেতে চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছি। আর এখন আমি খেয়েছি মাত্র এক কাপ চা,আর তাতেই আমি যখন উঠলাম-
-দেখলাম আমি উঠছি।
মানে উ-ড়-ছি। ভাসছি হাওয়ায়। আমার পা মাটিতে নেই। তারা বাতাসে ভর করে রয়েছে,যে বাতাস তৈরি হয়েছে লাল আগুন আর কালো ছায়া দিয়ে। পানীয়র প্রভাবে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চনমন করছে। সে পানীয় ভদকার থেকেও কড়া। কেউ যেন পিন ফোটাচ্ছে আমার সারা শরীরে।
“আমি-”
“এখন যেও না গো,” নিরুত্তাপ গলা মহিলার,যেন আমার অবস্থা সে মোটেই খেয়াল করছে না। তার হাসিটা অবশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে সে বেশ ভালই খেয়াল করছে।
“এখন যেও না গো,”বলছে লিজা রোরিনি, “আমার এখানে লোকজন বেশি আসে না। তোমাকে আমার সঙ্গে আজ রাত্তিরে একজায়গায় নিয়ে যাব। ”
“আপনার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ গো,এক জায়গায় যেতে হবে। ”
“পার্টি আছে বুঝি?” আমার অবস্থাটা যেমনই হোক,উত্তরটা ঠিক বেরিয়ে এল আমার শক্ত হয়ে যাওয়া ঠোঁটের থেকে।
সে হাসল,”তা বলতে পার। সেখানে আমার তোমাকে দরকার,ভদ্রতা রাখার জন্য। ”
ডাইনির ভদ্রতা!আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? হাওয়ায় ভাসছি আর ডাইনির সঙ্গে ভদ্রতার কথা কইছি?
“দেখ,” বলল লিজা রোরিনি,”আমাদের কিছু নিয়ম মানতে হয়। তোমরা যেমন,ডিনার টেবিলে তেরোজন হলে বসবেই না। আমাদের আবার তেরোজন না হলে আসরই বসবে না। উনি পছন্দ করেন না। ”
“উনি?”
“শয়তান মেকরাট্রিগ। ” আবার হাসল সে।
বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল সেই কথা শুনে। অপেক্ষা করতে লাগলাম পরের কথাটার জন্য-যেভাবে কোন আসামী অপেক্ষা করে পরের চাবুকটা খাওয়ার জন্য।
“তোমাকে আমার সঙ্গে আজকের আসরে যেতে হবে,” বলল লিজা রোরিনি।
“ডাইনির আসর ?”
“ঠিক। পাহাড়ের মাথায় বসবে। অনেকখানি রাস্তা যেতে হবে। তুমি তৈরি হয়ে নাও। ”
“উঁহু,আমি যাচ্ছি না। ”
বাতাসে ভাসছি আমি খলবল করতে করতে,আর বলছি আমি যাচ্ছি না। ঠিক যেমন তিন বছরের বাচ্চাকে তার মা বাবা ঘুম পাড়াতে পাঠালে সে বলে আমি যাব না। অবশ্য আমি বুঝতে পারছি আমার কী হবে। ওর হাসিতেই ধরা পড়ছে সেটা।
“তুমি যাচ্ছ। ম্যাগিট তোমাকে তৈরি করে দেবে। ”
ম্যাগিট এল। ঘরে কোন দরজা নেই, তবুও এল। ম্যাগিট জিনিসটা যে কী সেটা বুঝতে পারলাম না। হ্যাঁ,জিনিস। ছোটখাট,রোমশ চেহারা,খুব ছোট্ট ছোট্ট মানুষের মত হাতওয়ালা,আর একটা মুখ আছে। সেই মুখ মানুষের মত নয়,যদিও তাতে চোখ,কান,নাক,ঠোঁট সবই আছে। আর সেই মুখে আছে একটা হাসি আর নারকীয় ছাপ,যে ছাপ কোন মানুষ বা পশুর মুখেও দেখা যায় না।
মেঝের ওপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে এল ম্যাগিট,বলল, “লিজা গিন্নীমা?” তীক্ষ্ণ সেই স্বর যেকোন মানুষের রক্ত জল করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
ম্যাগিট হচ্ছে-যা বুঝলাম,ডাইনির খাস চাকর। স্বয়ং শয়তান একে দিয়েছে ডাইনির কাজে সাহায্য করার জন্য। যদিও কোন বাস্তবতা দিয়েই একে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। দেখলাম,সেই কাল্পনিক জিনিসটা তুরতুর করে উঠে এল আমার গা বেয়ে,যদিও আমি এখনো হাওয়ায় ভাসছি। কল্পনার মধ্যেই দেখলাম,লিজা টেবিলের ওপরে রাখা একটা বয়াম থেকে বার করে দিল খানিকটা হলদেটে চটচটে বস্তু,ম্যাগিট দুটো ছোট থাবা দিয়ে সেটা আমার বুকে আর গলায় বেশ মালিশ করে দিল,মালিশ করে দিল আমার হাতে,পায়ে,সর্বাঙ্গে। দুঃস্বপ্নের মধ্যেই অনুভব করছিলাম আমার সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে সেই চটচটে বস্তুর প্রভাবে।
“ঐ হল উড়ুক্কু মলম,”বলল লিজা রোরিনি। আমার শরীর কাঁপতে শুরু করল সেই কথা শুনে। “চল,এবার যাওয়া যাক। ”
এতক্ষণে খেয়াল করিনি,এইবার করলাম। লিজাও তার শরীরে মেখেছে উড়ুক্কু মলম। ওর শরীরে পোশাক নেই,তার বদলে আছে ওর মাথায় চুল,সারা শরীর ঢাকা পড়েছে বোরখার মত সেই চুলের আবরণে। ওর শরীরও এখন হাওয়ায় ভাসছে। এসে গেছে ঠিক আমার পাশটিতে।
সেই অবস্থাতেও আমার মাথায় একটা চিন্তা এল,যে ডাইনিরা নাকি ঝাঁটায় চড়ে উড়ে বেড়ায় বলে শুনেছিলাম,সেটা তাহলে কী? মনে পড়ে গেল,কোন একটা ম্যাগাজিনে একটা লেখা পড়েছিলাম,তার নাম ছিল “ওড়ার ভ্রান্তিবিলাস। ”এই উড়ুক্কু মলমটা তাহলে বোধহয় সেই “ওড়ার ভ্রান্তিবিলাস। ” সেই ব্যাপারটাই ঝাঁটায় এসে দাঁড়িয়েছে। পুরোটাই তাহলে কল্পনা নয়। এই মলমটা সত্যি। বাস্তব। কোন শক্তিশালী ওষুধ। অ্যাকোনাইট,বেলেডোনা বা ওইধরনের কোন কিছু দিয়ে তৈরি। এমন ওষুধ,যা কল্পনাশক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। যেকোন কেমিস্টই এটা তৈরি করতে পারবে। তাহলে আজ রাত্তিরেই পাড়ার কোন দোকানে গিয়ে এটা তৈরি করতে দিলে হয়-
কিন্তু এখন আমার নেমে আসা দরকার।
পারছি না।
“আমার হাত ধর,”সে আমার হাত ধরল শক্ত করে। যেন ইলেকট্রিক শক লাগল। এবার আমরা উঠছি। কোন দরজা নেই,তবুও তীব্র গতিতে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। ওর হাতে শক্ত করে ধরা আমার হাত। ম্যাগিট ভেসে চলেছে ওর সঙ্গেই। নীচে দেখা যাচ্ছে বাড়িটা। ডাইনির বাড়ি।
এবার আমরা ভেসে যেতে লাগলাম। শরীরে এখন আর কোন জ্বালা নেই। তীব্র বেগে বাতাস কেটে যাচ্ছে দুধারে। অনেক নিচে দেখা শহরের আলো। মিটমিট করে জ্বলছে সেই আলো,অন্ধকারকে দুরে সরিয়ে রাখার জন্য,যে অন্ধকারে শোনা যায় নেকড়ের গর্জন আর প্যাঁচার কর্কশ আওয়াজ,যে অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় মৃত অ-মৃতের দলবল।
কতক্ষণ উড়েছিলাম জানিনা,তারপর দেখলাম,আমরা নামছি। নামছি একটা পাহাড়ের মাথায়। একটা আগুন জ্বলছিল সেখানে। কতগুলো চেহারা গুঁড়ি মেরে বসেছিল সেখানে-কালো পাহাড়ের সামনে তাদের দেখাচ্ছে সাদা,আর আগুনের সামনে কালো। সংখ্যায় তারা এক,দুই,চার,ছয়,নয়,দশ,এগারো।
তার সঙ্গে আমি আর লিজা রোরিনি।
ডাইনিদের আসর।
তেরোজন।
অবশ্য আরেকটা জিনিসও ছিল। একটা কালো ছাগল। বলি দেওয়ার জন্য। বলির জন্য সেটাকে লিজা রোরিনিই টেনে নিয়ে গেল আগুনের সামনে একটা পাথরের কাছে। আরেকজন একটা ছুরি দিয়ে কেটে দিল সেটার গলাটা। আরেকজন একটা পাত্র ধরল তলায়। পাত্রটা যখন রক্তে বোঝাই হয়ে গেল,তখন সবাই মিলে সেই রক্ত খেল।
হ্যাঁ,বলছি তো,সবাই খেল। সব্বাই।
সারা গায়ে আবার শুরু হয়েছে সেই মলমের জ্বলুনি। মাথা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত। আমার দৌড়ে পালানো তো দূরের কথা,এই অগ্নিবৃত্তের সামনে থেকে নড়ার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই।
তারপর একটা ড্রাম বাজতে শুরু করল,আর সবাই মিলে সেই আগুনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করল। ফাঁকা পাত্রটাতে গাদাগাদি করছিল সেই লোমশ জিনিসগুলো,প্রত্যেকের আলাদা আলাদা “ম্যাগিট”,তাদের কিচিরমিচির শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছিল ড্রামের শব্দে,চিৎকারের শব্দে,কারণ নাচতে নাচতেই কাকে যেন ডাকছিল সবাই।
“লিজা আজ নতুন একজনকে এনেছিস দেখছি,”বলে উঠল একজন ।
“মেগ আজ আসবে না। ওর জায়গায় এনেছি,”বলল লিজা রোরিনি।
এটা তাদের বলা শেষ বোধগম্য কথা,যেটা আমার কানে এল,কারণ তাদের চিৎকার এখন সপ্তমে উঠেছে,পালা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আগুনের শিখা।
অবশেষে তিনি এলেন।
কোন আলো জ্বলল না,কোন আগুনের শিখা তৈরি হল না,কোন নাটুকে ব্যাপারই নয়।
তিনি বেরিয়ে এলেন স্রেফ একটা পাথরের আড়াল থেকে,বগলে একখানা বড়ো খাতা,ঠিক ব্যাঙ্কের হিসেব পরীক্ষকদের কাছে যেরকম থাকে।
যদিও হিসেব পরীক্ষকরা এমন কালো হয় না। কোন কিছু দিয়েই এ কালোর তুলনা হয় না। চোখের তারা-কালো,আঙুলের ডগা কালো। তাঁর পোশাকটাও কালো,না একটা কালো ছায়া ঢেকে রয়েছে তাঁর শরীর,আমি বুঝতে পারলাম না। কিন্তু তিনি ঢুকতেই সবাই একবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। তিনি তাঁর খাতা খুললেন,সবাই তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল। এবার তাদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। আমি গুঁড়ি মেরে বসেছিলাম একটা পাথরের সামনে। লিজা রোরিনি কথা বলছিল তাঁর সঙ্গে,আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল আমাকে। তিনি ঘাড়টাও ঘোরালেন না,কিন্তু আমি জানি,তিনি আমাকে দেখছেন। আমার দিকে তাকিয়ে হাসা,ঘাড় নাড়া বা হাত নাড়ানো-কোনটাই তিনি করেননি,কিন্তু আমি জানি,তিনি করেছেন।
তারপর কাজ শুরু হল। কাজ মানে আর কিছুই না,মিটিং। ব্যাবসার মিটিং। শয়তান অ্যান্ড কোম্পানির বোর্ড মিটিং হচ্ছে পাহাড়ের মাথায়। তিনি অর্ডার দেখছেন,শুনছেন সবার রিপোর্ট। কোথায় কটা আত্মা বিক্রি হল,কোথায় কী কী অশুভ কাজ হল-সব তিনি লিখে নিচ্ছেন তাঁর খাতায়। আমি কাঁপতে কাঁপতে দেখছিলাম সব কিছু,ছোট ছোট লোমশ জীবগুলো জড়ো হয়েছিল আমার পায়ের কাছে। যদিও কাঁপুনি লাগার মত কিছুই হচ্ছিল না,কারণ তাঁর কাজে ভয়ংকর কিছুই ছিল না,তিনি সব কিছুই করছিলেন নীরস,নিরুত্তাপভাবে। সেটাই আমার কাছে ভয়ংকর লাগছিল।
তারপর একটা ঘটনা ঘটল। সব সাদা মূর্তিগুলো চিৎকার করে উঠল কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে,কারণ আমাদের মধ্যে উদয় হয়েছে আরো একজনের। আর সেটা হল-মেগ,যে ডাইনির আজ আসার কথা ছিল না। তাকে দেখেই এই সমস্বরে চিৎকার ,“মেগ!মেগ এসেছে!”
তারপর তিনি কথা বললেন। সেই কন্ঠস্বরের বর্ণনা দেব,এমন সাধ্য আমার নেই। ভয়াবহ বজ্রপাত,আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত,অতি তীব্র ঝড়ের শব্দ-কোন কিছু দিয়েই তুলনা চলে না সেই দানবিক স্বরের।
“আসরে আজ চোদ্দ জন। “
সবাই কাঁপতে শুরু করল সেই আওয়াজ শুনে। লিজা রোরিনি টলতে টলতে এগিয়ে এল আমার দিকে,আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল তাঁর দিকে,আমি বাধা দেওয়ার আগেই।
“আমি জানতাম মেগ আসছে না-”
“আসরে আজ চোদ্দ জন। চোদ্দ জন। “
কন্ঠস্বর বুঝিয়ে দিচ্ছিল তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছেন।
“কিন্তু আমি-”
“আমাদের একটা নিয়ম আছে। নিয়ম ভাঙলে শাস্তিও আছে। ”প্রতিটি কথা কেটে কেটে মেপে মেপে বলা।
“ক্ষমা-”
ক্ষমা?ওঁর কাছে?আমি নিজের চোখেই দেখলাম। তিনি লিজার হাত ধরলেন,লিজা এক হাতে নিজের গলা চেপে ধরল। তারপর পাক খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে,থরথর করে কাঁপতে লাগল খানিকক্ষণ শুলবিদ্ধ জন্তুর মত,তারপর স্থির হয়ে গেল।
তারপর তিনি আমার দিকে ঘুরলেন। তাঁর কালো চোখের কালো তারা স্থির হল আমার ওপর।
“তেরোজনই হতে হবে। ওই হল নিয়ম। কাজেই তুমি এখন লিজার জায়গা নিলে। সই কর। ”
“আমি?”
অবশ্য তাঁকে প্রশ্ন করার মানেই হয় না।
তিনি তাঁর খাতাটা এগিয়ে দিলেন একজনের দিকে। সে আমার হাত ধরল। আরেকজন ধরল সেই পত্রটা। তারপর অনুভব করলাম ম্যাগিট উঠে আসছে আমার গা বেয়ে। তারপর সে আমার গালটা কামড়ে ধরল। ঝিরঝির করে রক্ত পড়তে লাগল পাত্রটার মধ্যে। সেই রক্তের মধ্যে ডোবান হল একটা তীক্ষ্ণ শলাকা। তারপর সেটা গুঁজে দেওয়া হল আমার হাতে।
“সই কর,”বজ্রনির্ঘোষ শোনা গেল তাঁর গলায়।
তারপর তিনি তাঁর কালো হাত বাড়িয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন। তারপর একটা ঝড় বয়ে গেল আমার দেহের ওপর দিয়ে-
মাটিতে কে যেন একটা পড়ে আছে। কিন্তু এ তো লিজা রোরিনি নয়!চেনা চেনা লাগছে যেন শরীরটা। ও টা কি আমারই নাকি,অ্যাঁ?
“তোমার খ্রিষ্টধর্ম বাতিল করে দিলাম আমি-”বললেন তিনি।
ম্যাগিট কানের পাশে ফিসফিস করে বলল,ওড়ো এবার-”
ডাইনি লিজা রোরিনির বাড়িতেই ফিরলাম আমি। ঘুমোতে গেলাম দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে,যে ঘুম থেকে উঠলেই দেখব দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে।
সকালে ঘুম ভাঙল।
আয়নার দিকে তাকালাম।
দেখলাম আয়নাতে লিজা রোরিনি,তাকিয়ে আছে আমার দিকেই।
ম্যাগিট কুটকুট করছে আমার পায়ের কাছে।
এ সবই এক সপ্তাহ আগের ঘটনা। এই এক সপ্তাহে ম্যাগিট আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। দেখিয়েছে লিজার খাতাপত্তর,তার শেকড়বাকড়। শিখিয়েছে কীভাবে মায়াপুতুল বানাতে হয়,কিভাবে শরীরকে বয়সের হাত থেকে মুক্ত রাখতে হয়,কিভাবে পানীয় বানাতে হয়,কিভাবে মলম বানাতে হয়। ম্যাগিট বলেছে আজ রাত্তিরে পাহাড়ের মাথায় আবার আসর বসবে।
প্রত্যেকটা জিনিসই আমার মনে পড়ে গেছে। এবার আমি বুঝতে পেরেছি ওই খাতায় সই করার সঙ্গে সঙ্গেই লিজা রোরিনির জায়গা নিয়েছি আমি। আমার আর মুক্তি নেই-
মুক্তি নেই,যদি না আমি লিজার পদ্ধতিটা প্রয়োগ করতে পারি। আর তা হল,আরেকজনকে ঐ আসরে নিয়ে যাওয়া-
এটাই একমাত্র রাস্তা।
আজ,ঠিক এক সপ্তাহ হল। সেনসাস অফিসের লোকেরা নিশ্চয়ই আমার খোঁজ করছে। ওরা নিশ্চয়ই অন্য লোক পাঠাবে,যে কাজ করবে আমার রাস্তাগুলোতেই। মনে হচ্ছে হার্ব জ্যাকসন দায়িত্বটা নেবে,কারণ ও এখানকার লোক। হয়তো আজ শেষ বিকেলেই ও এসে দরজায় ঠকঠক করবে,লিজা রোরিনির সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।
ও যখন আসবে,আমাকে তৈরি থাকতে হবে।
তাহলে এখন জাদুপানীয়টা তৈরি করে ফেলা যাক।
[রবার্ট ব্লচ রচিত “এ কোশ্চেন অব এটিকেট” অবলম্বনে]
গ্রাফিক্সঃ শংখ করভৌমিক ও ইন্দ্রশেখর
1 thought on “বিদেশী গল্প একটি ভদ্রতার প্রশ্ন– রবার্ট ব্লচ অনুবাদ অমিত দেবনাথ”