উমা ভট্টাচার্যের সব লেখা

কিছুদিন আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম জাপানে।প্রথম দিনই দেখতে গিয়েছিলাম হিরোশিমাকে।চোখে ভাসছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে পারমাণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমার নানা চিত্র।ভাবছিলাম কেমন হবে আজকের সেই হিরোশিমা? কেমন আছে সেখানকার মানুষজন?
গিয়ে দেখলাম এক আনন্দময় সবুজ,শ্যামল হিরোশিমাকে।দেখলাম এক মৃত্যুঞ্জয়ী হিরোশিমাকে।এবারের বিশ্বের জানালা পর্বে শোনাব সেই প্রাণবন্ত নতুন হিরোশিমা আর পুরনো হিরোশিমার কথা।আজকের হিরোশিমা ১৯৪৬ সালের পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা হিরোশিমা।
বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানের সাম্রাজ্যবাদী রাজাকে শিক্ষা দিতে একটা গোটা বর্ধিষ্ণু অঞ্চলের ওপর ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট ‘লিটল বয়’ নামক পারমাণবিক বোমাটি নিক্ষেপ করেছিল আমেরিকা।হিরোশিমার ডাউনটাউন, ব্যাবসাবাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল, হিরোশিমার প্রাণকেন্দ্র নাকাজিমা অঞ্চলের ওপর নেমে এসেছিল এই আঘাত। হিরোশিমার মূল নদী, প্রাণদায়িনী ‘ওটা’ নদী নাকাজিমা জেলার উত্তরে এসে দুইভাগে ভাগ হয়ে পূর্ব আর পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেখে মনে হবে যেন দুদিকে দুটি হাত প্রসারিত করে আদরে ঘিরে রেখেছে নাকাজিমা জেলাকে।পূর্ব দিকের নদীটির নাম ‘মোতাইয়াসু’ আর পশ্চিম দিকের নদীটির নাম ‘হন’-দুজনে বয়ে চলেছে দক্ষিণ দিকে।স্থানটি ছিল খুবই শান্ত, সুন্দর,বর্ধিষ্ণু,উন্নত আর গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৭১ সালে হান বংশের রাজত্বকাল শেষ হয়ে জাপানে মেইজি রাজতন্ত্রের শাসনকাল শুরু হয়েছিল। চালু ছিল ১৮৭১ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত। এই সময়ের শুরুতেই হিরোশিমা নগরটি ‘হিরোশিমা প্রিফেক্চার’-এর রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মেইজি রাজারা এসেই সমস্ত প্রাদেশিক রাজাদের অধিকার শেষ করে দিলেন,প্রদেশগুলোকে ভেঙে দিয়ে সমগ্র জাপানকে ভাগ করলেন কতকগুলো প্রিফেক্চারে।তারই একটি হল হিরোশিমা প্রিফেক্চার। ১৮৭১ সালেই হিরোশিমাতে গড়ে উঠেছিল আধুনিক সেনাবাহিনী। দুর্গও তৈরি হয়েছিল। ১৮৯৫ সালের মাত্র চারদিনের চিন-জাপান যুদ্ধের সময় হিরোশিমা হয়ে উঠেছিল পুরোপুরি একটি সুগঠিত সামরিক শহর।
মোতাইয়াসু আর হন,দুটি নদী দিয়ে ঘেরা ত্রিভুজাকৃতি ভূখন্ড হিরোশিমাতে অর্থাৎ পূর্বতন নাকাজিমা জেলায় নদী দুটির ধার ধরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বাজার,দোকান,ব্যাঙ্ক,স্কুল,কলেজ,হাসপাতাল,উপাসনালয়, সিনেমা হল আর অসংখ্য মানুষের শান্তির নীড়। এখানকার সাতটি সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের শেষ ৬টি এই সময়েই স্থাপিত হয়েছিল।একটি ছিল আগের আমলের। শিল্প স্থাপিত হয়েছিল প্রচুর। পণ্য পরিবহনের সুবিধার জন্য ১৮৮০ সালে উজিনা বন্দর স্থাপনে হিরোশিমার মাথায় আরেকটি পালক লাগে, হিরোশিমা হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী।নদী দিয়ে ভেসে চলত পণ্যবোঝাই নৌকা।নদীপথেই আসত এলাকার প্রয়োজনীয় দ্রব্যের যোগান।আমদানি-রপ্তানি,যাতায়াত চলত নদীপথে।

সবদিক থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ, উন্নত, জনবহুল শহরকেই প্রথম পারমাণবিক বোমার লক্ষ করা হয়েছিল।সেই ভয়ঙ্কর অস্ত্রের আঘাতে জাপানের সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছিল আমেরিকা।চূড়ান্তভাবে সফলও হয়েছিল।৪৪০০ কেজি ওজনের ৩মিটার লম্বা আর ৭১০ মিলিমিটার ব্যাসের সেই ‘ছোট্ট ছেলে’ বা ‘লিট্ল বয়’ মারণাস্ত্রটি এক লহমায় ধ্বংস করেছিল বিশাল এলাকার শহরটিকে, লাখো মানুষ সঙ্গেসঙ্গেই মারা গিয়েছিল, কিছু মানুষ হাসপাতালে মারা গিয়েছিল।
হাসপাতালে দীর্ঘদিন যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে যারা টিকে গিয়েছিল সেই ‘হিবাকুশা’(সারভাইবার)দের আত্মীয়স্বজন ছিল না। খাদ্য,বস্ত্র, আশ্রয় কিছুই ছিল না। শিশু,যুবক,বৃদ্ধ নির্বিশেষে সব হিবাকুশাদের ঠাঁই হয়েছিল রাস্তায়।
মোতাইয়াসু নদীর পূর্বদিকে ১৯১৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল হিরোশিমা শহরের বাণিজ্যদ্রব্যের প্রদর্শন গৃহ। নাম ছিল ‘হিরোশিমা প্রিফেকচারাল প্রোডাক্টস্ এক্সিবিশান হল’-যা এ্যাটম বোমের তান্ডবে পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি মাথায় গম্বুজ আকারের লোহার তৈরি শক্ত খাঁচাটি নিয়ে, সারা অঙ্গে বর্বরতার ক্ষতচিহ্ন ধারণ করে আজও কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে আছে।নাম তার গেন্-বাকু-ডোম বা এ্যাটমিক বোম্ ডোম।বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ বিল্ডিং-এর মর্যাদা পেয়েছে তা।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম হিরোশিমার ধ্বংসলীলার মূর্তিমান সাক্ষীকে-যেটি অচিরেই হয়ে উঠেছিল হিরোশিমার ল্যান্ডমার্ক।বোমাক্রান্ত হিরোশিমার ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে সে ধিক্কার জানাচ্ছে সভ্য বর্বরদের। যেন বলছে,পৃথিবী যেন আর কখনোই পারমাণবিক বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন না হয়।পৃথিবী হোক শান্তির আলয়।
সেদিন সারা নাকাজিমা জেলাটিই নিমেষে পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে,আজ সে ঘুমিয়ে আছে মাটির নীচে। একসময়ের সেই প্রাণবন্ত জেলার শূন্যস্থানের ওপরেই ১৯৫৪ সালে জাপান গড়ে তুলেছে বিশ্বশান্তির প্রতীক ‘হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক’ বা ‘হিরোশিমা জাতীয় শান্তি-স্মৃতি উদ্যান’। জাপানি ভাষায় নাম হল ‘হিরোশিমা হেইওয়া কিনেন কোয়েন’। মোটামুটি ১,২২,১০০ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে এই পার্ক। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্টের সেই বিস্ফোরণের পর অগ্নিদগ্ধ যন্ত্রণাকাতর হাজার হাজার মানুষ দেহ শীতল করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোতাইয়াসু নদীর জলে।হাজার হাজার মৃত মানুষের দেহে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল নদীর বুক। শীতল জলের নদীটি মানুষের রক্তে পরিণত হয়েছিল রক্তনদীতে। সেসব মানুষদের আত্মার শান্তির জন্য আর হৃদয়হীন যুদ্ধবাজ মানুষদের নীরব তিরস্কার জানাতে নদীর তীর ধরেই গড়ে তোলা হয়েছে এই শান্তির উদ্যান। এই উদ্যানেই আছে ‘পিস ক্লক টাওয়ার’- যেখানে প্রতিদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে-বিস্ফোরণের সময়টিতে টাওয়ারের ঘড়িটিতে এক প্রতীকি এ্যালার্ম বেজে ওঠে। সংকেতধ্বনিটি যেন পৃথিবীকে জানাতে চায় আর যুদ্ধ নয়, শান্তি নেমে আসুক পৃথিবীর প্রতি দেশে,প্রতি কোণে।১৫৯০ সালে নির্মিত যে হিরোশিমা ক্যাসেল ঘিরে গড়ে উঠেছিল উন্নত হিরোশিমা সেটিও বোমায় বিধ্বস্ত হয়েছিল। সেটিও ১৯৫৮ সালে পুনর্নির্মিত হল, ফিরে গেল আগের রূপে, নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রেখে।
সবুজ গাছে গাছে ছাওয়া পিস পার্কের ঠিক মাঝখানেই নির্মিত হয়েছে ‘সিনোট্যাফ’- অনেকটা জাপানি কফিনের মত দেখতে,সাদা রঙের আর্চ।হিরোশিমায় বোমার আঘাতে মৃত হাজার হাজার মানুষের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ দিতে,১৯৫২ সালের ৬ই আগস্ট তৈরি হয়েছিল এই সিনোট্যাফ। এর নিচে জাপানি ভাষায় লেখা আছে একটি প্রতিজ্ঞা,আর মৃতদের আত্মার শান্তি কামনার বাণী।যার মর্মার্থ,“তোমরা এখানে শান্তিতে ঘুমোও,আর আমরা কেউ দ্বিতীয়বার এই ভুল করব না।”
এই সিনোট্যাফের কাছেই আছে একটি বিশাল আকারের ‘শান্তিপ্রদীপ।’ পরমাণু বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রণাকাতর সকল মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৯৬৪ সাল থেকে এখানে জ্বালানো রয়েছে এই ‘অনির্বাণ শান্তিপ্রদীপ।’ এই প্রদীপের অবিরত জ্বলে যাওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ।
পার্কের পশ্চিমের অংশে আছে ‘পিস বেল্ টাওয়ার’।এই টাওয়ারের মাথার ওপরের ক্রমশ উঁচু হয়ে ওঠা ডোম আকৃতির ছাদটি আসলে ইউনিভার্স-এর প্রতীকী রূপ।ছাদ থেকে ঝুলছে ১.২০০কিলোগ্রাম ওজনের একটি বেল-শান্তির ঘন্টা।এটির গায়ে আঁকা আছে জাতীয় সীমারেখাহীন বিশ্বের মানচিত্র-যেন প্রতিফলিত করছে ‘এক বিশ্বের’ধারণাকে। যেখানে কোন ভেদাভেদ থাকবে না,শত্রুতা থাকবে না,যুদ্ধ থাকবে না,পরমাণু বোমা থাকবে না।ঘণ্টাটির গায়ে,যেখানে আঘাত করে মানুষ ঘণ্টাটি বাজাবে সেই জায়গাটিতে আঁকা আছে পারমাণবিক হাতিয়ারের প্রতীক চিহ্ন।যেন পরমাণু অস্ত্রের প্রতীকের ওপর আঘাত হেনে পৃথিবী থেকে পারমাণবিক অস্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করবে সাধারণ মানুষ।ঘন্টাটির গায়ে গ্রিক, জাপানি ও সংস্কৃত ভাষায় একটি বাণী লেখা আছে যার অর্থ-‘নিজেকে জানো’।
বেল টাওয়ারের মাথার ডোমের গায়ে আছে দাঁড়ানো একটি বালিকার মূর্তি, হাত দুটি তার ওপরের আকাশের দিকে তোলা।যেন কিশোরী সাদাকো সাসাকি দাঁড়িয়ে আছে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার হাত পেতে। বম্বিং-এর সময় দু’বছরের ছিল মেয়েটি, তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় বারো বছর বয়সে।মারা যার লিউকেমিয়ায়।পিস বেলের কাছাকাছি একটি মিউজিয়ামের বাক্সে রাখা আছে তার হাতে বানানো ৬৪২টি কাগজের সারস। জাপানের উপকথায় আছে কেউ যদি ইচ্ছাপূরণের বাসনা নিয়ে ১০০০ কাগজের সারস বানাতে পারে তবে তার ইচ্ছাপূরণ হয়।সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবার বাসনা নিয়ে সে হাসপাতালের বিছানায় বসে বসে ৬৪২ টি রঙিন কাগজের বক বানানোর পর মারা যায়। সাসাকির স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁর সহপাঠীরা বানায় ‘পেপার ক্রেন ক্লাব’। পিস পার্কে আজও ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিন কিছু কাগজের সারস বানিয়ে উৎসর্গ করে সাসাকি ও তার মত যেসব শিশুরা মারা গেছে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। এরই কাছাকাছি আছে ‘চিলড্রেন্স পিস মনুমেন্ট’,সেখানে আছে একটি সারস আর একটি কিশোরীর স্ট্যাচু।
এখনও প্রতি বছর ওই তারিখে,সন্ধ্যাবেলায় মোতোইয়াসু নদীতে কাগজের লন্ঠন ভাসিয়ে দেন মৃত আত্মাদের শান্তি কামনা করে।মনে হয় যেন আলোকিত আত্মারা ভেসে চলেছে শান্তির দেশের উদ্দেশ্যে।
পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত হিরোশিমা ন্যাশনাল পিস মেমোরিয়াল হল।দ্বিতল এই বাড়িটির সবটাই অবস্থিত মাটির নিচে,বাইরে আছে শুধু একটি ঘড়ির(প্রতীকী)মিনার,ঘড়ির কাঁটাটি থেমে গেছে ঠিক ৮টা বেজে ১৫মিনিটে।এই মিনারের চারদিক ঘিরে বানানো হয়েছে জলের ফোয়ারা। বোমার আঘাতে যে সব মানুষ মৃত্যুর আগে পানীয় জলের জন্য আর্ত চিৎকার করে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন তাঁদের তৃষ্ণার্ত আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই ফোয়ারার জল।এই হলের একতলায় আছে সেমিনার হল,একজিবিশন হল,পরমাণু বিস্ফোরণ সংক্রান্ত তথ্যে পূর্ণ লাইব্রেরি।দ্বিতীয় তলে আছে ‘ভিক্টিম্স্ ইনফরমেশন হল’ আর ‘হল অফ রিমেমবারেন্স’।এখানে বোমার আঘাতে তৎক্ষণাৎ মৃত ১৪০,০০০মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৪০,০০০ টাইল্স্ দিয়ে চিত্রায়িত হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত হিরোশিমার ছবি।দেওয়ালে চিত্রের নিচের দিকে লেখা আছে মৃতদের নাম।হিরোশিমার নির্মম ট্র্যাজেডির মূর্ত প্রতীক এই দেওয়ালচিত্র।
পিস পার্কের একেবারে দক্ষিণে, শেষপ্রান্তে আছে ১৯৫৫ সালে গড়ে তোলা পিস্ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম।এটি পুরনো বিল্ডিং,সাজানো মূলত মডেল, ফটো আর বোমার আঘাতে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের অংশ,আর সেই মৃত্যুদূত লিটল বয়ের খোলটি দিয়ে।এছাড়া ও আরও অনেক কিছু।ছবি আছে সেই কালো বিষের ধোঁয়ার।যে কালো ধোঁয়া খানিক উঁচুতে উঠে বাটন মাশরুমের আকার ধারণ করেছিল,আর নেমে এসে বিধ্বংসী এক চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল হিরোশিমার ওপর।গিলে ফেলেছিল একটা জীবন্ত শহরকে আর ছিবড়েগুলো ছড়িয়ে রেখে গিয়েছিল শ্মশানের ছাই আর পোড়া কাঠকয়লার মত ধ্বংসস্তূপরূপে।
আরও অনেক না জানা কথাই জানালেন আমাদের গাইড কাজুমি সান। আমাদের দেশে যেমন নামের শেষে জি বা দাদা দিদি লাগিয়ে সম্বোধন করা হয়,জাপানে তেমনি কাউকে সম্বোধন করতে হলে নামের শেষে সা বা সান ব্যবহার করতে হয়।
জাপানের হিরোশিমা নীরব প্রতিবাদ করতে যেসব আয়োজন করেছে তা এক কথায় বিস্ময়কর।এত মানুষের মৃত্যুর জন্য হা-হুতাশ করে বসে না থেকে জাপান আর হিরোশিমাকে আবার গড়ে তুলেছে জাপানিরা। প্রচন্ড পরিশ্রম, একাগ্রতা আর ডিসিপ্লিনে তারা গড়ে তুলেছে গুঁড়িয়ে যাওয়া দেশকে,অর্থনীতিকে। বাঁচিয়ে তুলেছে তাদের শিল্প, কৃষ্টি আর সংস্কৃতিকে। হিরোশিমার ধ্বংসের ইতিহাসের সাক্ষী হতে গিয়ে মনে হচ্ছিল আইনস্টাইন বোধ হয় আত্মদহনে ভুগেছিলেন তাঁর সেই যুগান্তকারী ফর্মূলা আবিষ্কারের জন্য। মনে হচ্ছিল যে ফর্মূলার ওপর ভিত্তি করে আমেরিকার মানহাটান প্রজেক্টের গবেষণার ফল-পারমাণবিক বোমা সৃষ্টি হয়েছিল আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী নিরীহ ফর্মূলা E=MC2 এই ধ্বংসলীলার পরে যেন হয়ে দাঁড়িয়েছিল মৃত্যুর সহজ ফর্মূলা।
বীভৎস সেই হত্যালীলার সমস্ত অবশেষ প্রমাণ হিসাবে সংগ্রহ করে রেখেছে জাপান।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হত্যানায়কদের বীভৎসতম কুকাজের সব তথ্যই জাপান সযত্নে রক্ষা করেছে ‘ওয়ার মিউজিয়ামে’।পর্যটকদের মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষের কাছে নীরবে পৌঁছে দিচ্ছে বিশ্বে শান্তি রক্ষার
আজকের হিরোশিমাতে আছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি রেলস্টেশন,দীর্ঘ প্রশস্ত রাজপথ, আধুনিক যানজট নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি,অসংখ্য বহুতল বিল্ডিং,মাটির নীচে বেসমেন্টে স্থাপিত শপিং মল।আরও কত কী। ১৯৪৯ সালে আইন পাশ করে হিরোশিমাকে ‘শান্তি-শহর’হিসাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন জাপানের সম্রাট হিরোহিতো।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার জাপানের সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশার শেষ হল, রাজতন্ত্রের জাপানের যুদ্ধবাজ নীতি পরিত্যক্ত হল হিরোশিমা ও নাগাসাকির নামে দুটি নগর আর মানুষের ধ্বংসের বিনিময়ে। জাপান সরকারের যুদ্ধোত্তর নীতি গড়ে তুলল নতুন হিরোশিমা।শান্তিময় হিরোশিমা।প্রত্যয়ী হিরোশিমা।
হিরোশিমার প্রাচীন ইতিহাস বেশি দিনের নয়।প্রায় চারশো বছর আগেকার কথা। ‘সেতোইনল্যান্ড’ সাগরের বুকে ‘ওটা’ নদীর মোহনার গড়ে ওঠা হন্সু দ্বীপের পশ্চিমপ্রান্তে ছিল একটি প্রশস্ত স্থান-জাপানি ভাষায় নাম ছিল ‘গো-কামুরা’।কেউ থাকত না সেখানে।সমুদ্রের তীরে প্রশস্ত অঞ্চল জুড়ে এলোমেলোভাবে বয়ে যেত সাত সাতটি নদী-যা ছিল গো-কামুরার,পরবর্তীকালের হিরোশিমার গর্ব।আজও বয়ে চলেছে সেই সপ্তনদী।
পার্শ্ববর্তী আকিপ্রদেশে বাস করতেন সেই প্রদেশের রাজা মোরি তেরুমোতো। জাপানের বিখ্যাত মোরি বংশের উত্তরসূরী ছিলেন এই দায়মিও অর্থাৎ প্রাদেশিক রাজা।তাঁর নজর পড়লো সেই অঞ্চলটির দিকে।রাজা বুঝলেন তিনদিকে পর্বতবেষ্টিত নদীবহুল প্রশস্ত জায়গাটি শাসনকার্য পরিচালনার পক্ষে যেমন উপযোগী হবে তেমনই ব্যাবসা-বাণিজ্যের দিক থেকেও হবে সুবিধাজনক।
জায়গাটিকে নির্বাচন করার পরই তড়িঘড়ি করে একটি বিরাট সুরক্ষিত ক্যাসেল নির্মাণ শুরু করলেন। চার বছরের মধ্যে সেই জনশূন্য জায়গায় নির্মিত হল তাঁর বিরাট ক্যাসেল,অসমাপ্ত অবস্থাতেই ১৫৯৩ সালে রাজা চলে এলেন সেই ক্যাসেলে-জায়গাটির নতুন নাম দিলেন ‘হিরোশিমা’। অবহেলায় পড়ে থাকা প্রান্তর গো-কামুরা ধীরে ধীরে পরিণত হল দুর্গনগরী হিরোশিমায়।হিরো মানে প্রশস্ত আর শিমা মানে ব-দ্বীপ। প্রশস্ত সেই ব-দ্বীপ হিরোশিমার ইতিহাসে শুরু হল সেনগোকু যুগ,যা চলেছিল ১৫৮৯ সাল থেকে ১৮৭১ সালে একচ্ছত্র মেইজি রাজতন্ত্রের শাসন শুরু হওয়া পর্যন্ত।
হিরোশিমার নদীগুলির ফাঁকে ফাঁকে ছিল ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। রাজা তেরুমোতো প্রথমেই নদীগুলির ওপর সেতু তৈরি করে দ্বীপগুলিকে জুড়ে দিলেন পরস্পরের সঙ্গে।প্রশস্ত রাজপথ তৈরি করলেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম করলেন। জনবসতি বাড়তে লাগল, ব্যবসায়-বাণিজ্য বাড়তে লাগল।সাত বছরের মধ্যেই হিরোশিমা এক বর্ধিষ্ণু জনবহুল,প্রাণোচ্ছল নগরে পরিণত হল।এবার এই অঞ্চলের দিকে হাত বাড়ালেন তোকুগাওয়া রাজবংশ। সেকিগাহারা নামক স্থানের যুদ্ধে হিরোশিমার দখল নিলেন তাঁরা।এই তোকুগাওয়া রাজারা তাঁদের নিজস্ব সেনাবলে জাপানের সার্বভৌম সম্রাটের ক্ষমতাকে অস্বীকার করে ধীরে ধীরে জাপানে বলবৎ করেছিলেন তোকুগাওয়া শগুনেট বা তোকুগাওয়া শাসন। প্রায় দুশো আটষট্টি বছর ধরে জাপানে তাদের শাসন বলবৎ ছিল।এক রাজার থেকে অন্য রাজার অধীনে এলেও অবস্থানের গুরুত্বের জন্য হিরোশিমার উন্নয়ন বা বিকাশ ছিল অব্যাহত। দীর্ঘকাল ধরে সাধারণ মানুষ আর যোদ্ধা বীর সামুরাইদের পাশাপাশি অবস্থানে হিরোশিমাতে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত মিশ্র সংস্কৃতি।
উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আবার জাপানে ফিরে এল মেইজি রাজবংশের শাসন।রাজা তেরুমোতোর এক বংশধর প্রাদেশিক রাজাদের সহায়তায় তকুগাওয়া শগুনেটের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন।এই ইম্পেরিয়াল বা রাজতন্ত্রের যুগেই জাপান পেল নেশন-এর রূপ,শুরু হল জাপানের তথা হিরোশিমা্র আধুনিকীকরণ।সে কাহিনী শুরুতেই বলেছি। তাঁর পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে হিরোশিমা সাক্ষী হল পারমাণবিক আক্রমণের। কিন্তু হিরোশিমা স্বল্পকালের মধ্যেই সব ক্ষতি সামলে নিয়ে শুরু করল আধুনিকীকরণের কাজ। অচিরেই আবার শুরু হল হিরোশিমার পুনরুজ্জীবন-মৃত্যুঞ্জয়ী হল বিধ্বস্ত হিরোশিমা।আজ সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে বোঝাই যায় না যে মাত্র একাত্তর বছর আগে এক মহাপ্রলয়ের ধাক্কায় ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল হিরোশিমা। কিন্তু নিখোঁজ হয়ে যায়নি জাপানের মানচিত্র থেকে। বরঞ্চ দ্বিগুণ দৃঢ়তার সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে জাপানের বুকে।
এক নজরে কিছু তথ্য—-
- জাপানের হন্সু দ্বীপের চো-উগোকু অঞ্চলে ‘ওটা’ নদীর মোহনায় অবস্থিত হিরোশিমা প্রিফেক্চার।মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলি হিরোশিমাকে সাতটি ছোট ছোট দ্বীপে বিভক্ত করেছে,যেগুলি ব্রীজ দিয়ে সংযুক্ত।
- মোট এলাকা ৯০৬.৫৩ বর্গ কিলোমিটার।৮টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হিরোশিমা প্রিফেক্চার।
- ২০১৬সালের পয়লা আগস্টের জনগণনা অনুসারে জনসংখ্যা প্রায় ১,১৯৬,২৭৪ জন ।প্রতি বর্গমাইলে প্রায় ৩৪১৮ জনের বাস।
- ঐ অঞ্চলের বৃহত্তম নগর আর রাজধানী শহর।
- আর্দ্র উপ-নিরক্ষীয় জল বায়ুর অঞ্চল।শীতল থেকে মৃদুশীতল শীতকাল।আর্দ্র,উষ্ণ গ্রীষ্মকাল।সবচেয়ে গরম পড়ে আগস্ট মাসে,দিনগুলি রৌদ্রকরোজ্জল। জুন-জুলাই মাসে বেশী বৃষ্টিপাত হয়।
- হিরোশিমার মাথাপিছু জাতীয় আয় খুবই বেশি।
- শিক্ষার হার খুব বেশী।শিল্পের শহরও আজকের হিরোশিমা।পৃথিবীখ্যাত মাজুদা বা মাজ্দা মোটর কারের জন্মস্থান এখানকার ‘মাজ্দা মোটর কোম্পানি’।আগে এই কোম্পানির নাম ছিল ‘তোকুগাওয়া কোম্পানি লিমিটেড’।আছে যন্ত্র আবিষ্কারের গবেষণাগার ও যন্ত্রাংশ নির্মাণের কারখানা।আর আছে উন্নত স্টিল ইন্ডাস্ট্রি।
- শিল্পের মত শিল্পীরও অভাব নেই এখানে।আছে ‘সিমফোনি অরকেষ্ট্রা’, ‘মিউজিয়াম অফ আর্ট’,‘হিরোশিমা প্রিফেক্চারাল আর্ট মিউজিয়াম’।
- আমোদ অনুষ্ঠানেরও কমতি নেই।ফ্লাওয়ার ফেস্টিভ্যাল,ইণ্টারন্যাশনাল এ্যানিমেশান ফেস্টিভ্যাল’, ‘হিরোশিমা ডে উদ্যাপন’,হিরোশিমা ল্যাণ্টার্ণ ফেস্টিভ্যাল, এ সব চলে সারা বছরের নানা সময় জুড়ে।
- খেলাধূলাতেও পিছিয়ে নেই হিরোশিমা।সারা জাপানের সঙ্গে এখানেরও প্রিয় খেলা বেসবল।বাস্কেট বল,ফুটবল,গল্ফও প্রিয় খেলা। আছে হিরোশিমা মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়াম।
- এই শহরের ঐতিহ্যের আর একটি নিদর্শন হল এখানকার ট্রাম।এই ট্রাম ব্যবস্থাও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।নিজের চেষ্টায় আর বিদেশী সহায়তায় সেইসব ধ্বংসপ্রাপ্ত বেশ কয়েকটি ট্রামকে মেরামত করে কিছুদিনের মধ্যেই চালু করেছিল,যেগুলির মধ্যে চারটি এখনও চলছে,জানালেন আমাদের গাইড,দেখলামও দুটি ট্রাম।
- হিরোশিমা বিখ্যাত সেখানকার বিখ্যাত খাবার ‘ওকোনোমি ইয়াকি’-একধরণের প্যানকেক্।নানা রকমের সব্জি,মাংস আর সামুদ্রিক মাছের মিশ্রণে তৈরি করা হয় এই প্যানকেক।পরতে পরতে থাকে বাধাকপি, কল বেড়োনো বিনস্,পর্কের পাতলা টুকরো।টপিং দেওয়া হয় নুড্ল আর সস্ দিয়ে।আর এক ধরনের প্রিয় খাদ্য ‘ইয়াকি খাকি’ – সেটি হল বিশেষ পদ্ধতিতে সেদ্ধ করা ঝিনুক,যা খোলার মধ্যে রেখেই পরিবেশন করা হয়।এছাড়া স্টিকি রাইস আর বেক্ড ফিস-সুসিও এখানকার প্রিয় খাবার।
- চিকিৎসা ব্যবস্থাও খুব উন্নত।এখানে আছে ছটি হাসপাতাল।
সব মিলিয়ে আজকের হিরোশিমা এক শান্তির নিলয় ।
রঙিন ছবিগুলি তুলেছেনঃ লেখক
বিশ্বের জানালা সব পর্ব