বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সহজ বিজ্ঞান-টন কীভাবে হল হিমায়নের মাপকাঠি সুজিতকুমার নাহা শরৎ ২০১৭

সহজ বিজ্ঞান সব পর্ব একত্রে 

লোহালক্কর, সিমেন্ট এসবের বেচাকেনায় একক হিসেবে যে ‘টন’ ব্যবহৃত হয়, সেটা সকলেরই জানা। কিন্তু বরফকল কিংবা এয়ার কন্ডিশনারের ঠান্ডা করার ক্ষমতা যখন জানানো হয় ‘টন’-এ, তখন পড়তে হয় ধন্দে । ঠান্ডা করার ক্ষমতার সাথে ভারি বস্তু বেচাকেনার  যোগাযোগ যে কোথায় তা সাধারণ বুদ্ধিতে বোধগম্য হয় না। ধন্দ দূর করতে হলে প্রযুক্তির ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হবে এবং এটা করলে যে তথ্য উঠে আসবে তা শুধু যে কৌতূহলপ্রদ তাই নয়, রীতিমতো আশ্চর্যজনকও ! 

আসলে, ঠান্ডা-যন্ত্রের   ক্ষমতা  মাপার  ‘দায়িত্ব’ টন-এর ওপর বর্তেছিল স্রেফ বিক্রিবাটার খাতিরে ! বিপণনের চাপ না থাকলে হিমায়ন ক্ষমতার মাপকাঠি হিসেবে  স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসত অন্য কোনো একক। ভারি জিনিস মাপার একক টন কীভাবে হিমায়ন ক্ষমতার একক হিসেবেও আধিপত্য বিস্তার করল সেই আশ্চর্য কাহিনি এবার সংক্ষেপে বলা যাক।

সময়ের স্রোত উজিয়ে পেছিয়ে যেতে হবে প্রায় দেড়শো বছর। তখন ঠান্ডা করার একমাত্র পন্থা ছিল প্রাকৃতিক বরফ প্রয়োগ। বরফ আমদানি করা হত ঠান্ডা এলাকা থেকে। যান্ত্রিক উপায়ে শৈত্য  সৃষ্টির পদ্ধতি উদ্ভাবনের  হাত ধরেই হিমায়ন শিল্পের (রেফ্রিজারেশন ইন্ডাস্ট্রি) যাত্রা শুরু হযেছিল ।   প্রাথমিক পর্বেই এক বিচিত্র সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল হিমায়ন শিল্পকে ।

দীর্ঘকাল যাবৎ বরফ ব্যবহার করার কারণে ঠান্ডা করার কোন্‌ কাজে কত টন বরফ লাগবে সেই ব্যাপারে সকলেরই সোটামুটি ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। হিমায়ন শিল্পের কেষ্টবিষ্টুরা উপলব্ধি করলেন, যদি বরফের পরিমাণ দিয়ে যন্ত্রের ক্ষমতা জানানো হয় তবেই কেবল ক্রেতারা সেটা বুঝতে পারবে। ক্রেতাদের বোঝার পরিধির বাইরে অন্য কোনো মাপকাঠিতে ‘কুলিং পাওয়ার’ প্রকাশ করলে বিক্রিবাটা লাটে উঠবে এবং মুখ থুবড়ে পড়বে  নবজাত এই শিল্প।  হিমায়ন ক্ষমতার সহজবোধ্য মাপকাঠি কী হবে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় 1880 খ্রিষ্টাব্দ থেকেই।

শূণ্য ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার বরফ থেকে একই উষ্ণতার জল বানাতে প্রয়োজন তাপের। এই তাপের  যোগান যদি  আসে ঘরের বাতাস থেকে তাহলে শীতল  হবে  ঘর।  সারাদিনে (অর্থাৎ 24 ঘন্টায়) 1 টন বরফ গলাতে যে তাপ লাগে তাকেই বলা হয় 1 হিমায়নের টন (প্রযুক্তির ভাষায়, ‘ওয়ান টন অফ রেফ্রিজারেশন’, সংক্ষেপে 1 TR)। এক হিমায়নের টন প্রায় 3.5 কিলোওয়াটের সমতুল।

সহজবোধ্যতার কারণে হিমায়ন ক্ষমতার মাপকাঠি হিসেবে টন গ্রহণীয় হল সাধারণ মানুষের কাছে। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে সাবালক হল হিমায়ন শিল্প। বিশ শতকের শুরুতেই উদ্ভাবিত হল বাতানুকুল যন্ত্র (এয়ার কন্ডিশনার)। চলতি ধারা বজায় রেখে টন দিয়েই বাতানুকুল যন্ত্রের ক্ষমতা বলা হতে থাকল। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে !

গ্রাফিক্‌সঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

 

Leave a Reply