কুটক মানে হামানদিস্তা। আর্যভট (আর্যভট্ট নয়। ভুলটা ধরিয়ে দেবার জন্য ডঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ। কেন তা নয় জানতে এ সংখ্যার চিঠিপত্র বিভাগ দেখো।) হামানদিস্তার আবিষ্কারক ছিলেন বললে কেমন শোনাবে?
কথাটা কিন্তু সত্যি। হামানদিস্তায় কী হয় জানো তো? একটা শক্ত জিনিসকে তার মধ্যে ফেলে একটা লোহার ডাঁটি দিয়ে তাকে কোটা হয়। এক এক ঘায়ে সেটা ভেঙে ছোটো থেকে আরো ছোটো টুকরো হতে হতে শেষে একেবারে গুঁড়ো হয়ে যায়।
আর্যভট অংকের জন্যে এইরকম একটা হামানদিস্তা বানিয়ে রেখে গেছেন। তার নাম কুটক পদ্ধতি। জিনিসটা রয়েছে আর্যভটীয় পুঁথির গণিতপদ অধ্যায়ে।
ধরো একটা সমীকরণ আছে এইরকমঃ
ax+by =c
প্রশ্ন হল, দুটো অজানা রাশি আর একটা সমীকরণ –সেক্ষেত্রে কিন্তু এর বহু উত্তর সম্ভব।
কীভাবে?
এই দেখোঃ
ax+by=c {এখানে a,b,c হল ধ্রুব সংখ্যা। (যেমন ধরো , ২,৪,১ বা (-২),৫, ৭ বা ১/২, ৩/৪,২/৫ এইরকম)}, আর x,y হল অজানা রাশি । a,b,c-র কোন নির্দিষ্ট তিনটে মানের জন্য সেই অজানা রাশিদুটোর মান বের করতে হবে।
- x= (c-by)/a
- ধরো a,b,cর মান যথাক্রমে ৩,২ ও ৫
- তাহলে সমীকরণটা হবে 3x+2y=5
- x= (5-2y)/3
এবারে y এর একেকটা মান ধরলে তার জন্য x এর একেকটা মান বেরোবে।
যেমন ধরো y=1 ; তাহলে x=1 । ধরো y=2 ; তাহলে x=1/3—এইরকম অগণিত মান হতে পারে (x,y)এর।
এইখানে একটা মজা হল, a,b,c এদের মধ্যে a,b,র গসাগু দিয়ে যদি c বিভাজ্য হয় একমাত্র তাহলেই x,y এর পূর্ণসংখ্যার মান হওয়া সম্ভব। জিনিসটা তোমরা পরীক্ষা করে দেখতে পার।
এবারে ধরো সমীকরণটা আছে এইরকম-
৩৫ক+ ৪৩খ=৩৮
এখানে ৩৫ আর ৪৩ এর গসাগু হল ১। সেটা দিয়ে ৩৮ বিভাজ্য। অতএব এইক্ষেত্রে ‘ক’ ও ‘খ’ এর অসংখ্য জোড়া মানের মধ্যে একখানা জুটি থাকবে যেখানে ক আর খ দুটোর মানই হবে পূর্ণসংখ্যা। চেষ্টা করে দেখো দেখি সেইটে বের করতে পারো কি না? বেজায় ঝামেলা হবে সেইটে করতে গেলে। সমীকরণটাকে ক= (৩৮ -৪৩খ)/৩৫ এইভাবে লিখে তারপর খ এর বিভিন্ন মান লিখে লিখে চেষ্টা করে চলতে হবে যতক্ষণ না কপাল খোলে।
কোন বহুরাশিক (পলিনোমিয়াল) সমীকরণ, যাতে যতগুলো অজানা রাশি তার চেয়ে কম সংখ্যক সমীকরণ আছে এবং যার অজানা রাশিদের পূর্ণসংখ্যার সমাধানই খোঁজা হচ্ছে শুধু তাদের অংকের ভাষায় ডায়োফান্টেন সমীকরণ বলে। তৃতীয় শতাব্দিতে আলেকজান্দ্রিয়ার ডায়োফ্যান্টাস নামে এক গণিতজ্ঞ এই ধরনের সমীকরণের ওপরে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর নামেই এ ধরনের সমস্যার এই নাম।
এখনকার যুগে ক্রিপটোগ্রাফি, নাম্বার থিওরি এইসব এলাকায় এর প্রয়োগ হয়।
ডায়োফ্যান্টাসের অনেক আগে থেকেই, প্রাচীনকালের ভারতবর্ষে যজ্ঞবেদি তৈরির জ্যামিতিতে, জ্যোতির্বিদ্যায় এই সমীকরণদের পূর্ণসংখ্যার সমাধান জরুরি হত। বুঝতেই পারছ, কতো খুঁজে খুঁজে সেইসব মান উদ্ধার করতে হত তখন একেকজন অংকওয়ালাকে। যদি বুঝতে না পারো তাহলে ৩৫ক+ ৪৩খ=৩৮ এই সমীকরণটার পূর্ণসংখ্যার মানদুটো খুঁজে বের করবার চেষ্টা করো, তাহলেই টের পাবে।
এই ঝামেলার কাজটাকে সহজ করবার জন্যই আর্যভট তাঁর আর্যভটীয় পুঁথিতে ঐ হামানদিস্তার আবিষ্কার করেছিলেন।
ধরো সমীকরণটা হল ২৬ক + ৩৪খ = ২৪
ক ও খ এর মান নির্ণয় করতে হবে।
২৬ ও ৩৪ এর গসাগু=২
২ দিয়ে দুপাশে ভাগ করে দিলে পাইঃ ১৩ক + ১৭খ = ১২
এবারে ১৩ আর ১৭র গসাগু বের করবার মতন করে ক্রমাগত ভাগ করে চল যতক্ষণ না ভাগশেষ ১ আসে।
এইবারে শেষ ভাগের ভাজক আর অবশিষ্টকে দিয়ে সমীকরণটাকে ফের লেখো- ৪গ + ১ঘ = ১২
মূল সমীকরণটা থেকে এটা অনেক সোজা। এর থেকে মুখে মুখে গ আর ঘ এর মান পাবে ধরো গ =২ আর ঘ = ৪
তাহলে কী করা হল? একটা বড়ো অংক, যাতে দুখানা অজানা রাশি রয়েছে , সেটাকে সরাসরি আক্রমণ না করে তার বড়ো রাশিগুলোকে ক্রমাগত ভাগের হাতুড়ি মেরে ভেঙে ভেঙে ছোটো করে একটা সহজ সমীকরণ বানানো হল।
এইবারে দেখো এই সহজ উত্তরটাকে ধরে পিছু হেঁটে কেমন কঠিন অংকের উত্তর খুঁজতে যাওয়া হয়।
কীভাবে? এই দেখো
৪গ + ১ঘ = ১২
মুখে মুখে এর একটা সমাধান হয় গ =২ আর ঘ = ৪
তাহলে, ৪ x ২ + ১ x ৪ = ১২
বা, (১৭-১৩) x ২ + (১৭ – ১৩) x ১ = ১২
বা, ১৭ ( ২ + ১) + ১৩ ( -২ -১) = ১২
বা ১৭ x(৩)+১৩x(-৩) =১২
মূল সমীকরণের (একই নীল রঙে রয়েছে ওপরে)সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ক,খ এর মান পাবে -৩, ৩
আবার ধরো ৪গ + ১ঘ = ১২ এর মুখে মুখে আর একটা সমাধান হয় গ= ১ আর ঘ= ৮।
তাহলে ৪ x ১ + ১ x ৮ = ১২
বা, (১৭-১৩) x ১ + (১৭ – ১৩) x ২ = ১২
বা, ১৭ ( ২ + ১) + ১৩ ( -২ -১) = ১২
বা ১৭ x(৩)+১৩x(-৩) =১২
মূল সমীকরণের (একই নীল রঙে রয়েছে ওপরে)সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ক,খ এর মান পাবে -৩, ৩
আবার ধরো ৪গ + ১ঘ = ১২ এর মুখে মুখে আর একটা সমাধান হয় গ= ৫ আর ঘ= (- ৮ )।
তাহলে ৪ x ৫ + ১ x ( – ৮ ) = ১২
বা, (১৭-১৩) x ৫ + (১৭ – ১৩) x ( – ২ ) = ১২
বা, ১৭ ( ৫ – ২ ) + ১৩ ( -৫ + ২) = ১২
বা ১৭ x(৩)+১৩x(-৩) =১২
মূল সমীকরণের (একই নীল রঙে রয়েছে ওপরে)সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ক,খ এর মান পাবে -৩, ৩ ।
এইভাবে,মূল সমীকরণটার পূর্ণসংখ্যার সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হল আর্যভটের হামানদিস্তা দিয়ে বড়ো সংখ্যাগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে একেবারে ছোটো চেহারায় নিয়ে এসে।
আর্যভটের পরবর্তী যুগে তাঁর আবিষ্কৃত এই কুট্টক বা হামানদিস্তার পদ্ধতিকে ব্রহ্মগুপ্ত ও ভাস্কর-১ ও বারংবার উল্লেখ করেছেন। আর্যভট মাত্রই কয়েকটা শ্লোকে পদ্ধতিটার কথা বলেছিলেন ‘আর্যভটীয়’র গণিতপাদ অধ্যায়ে। ভাস্কর – ১ পরবর্তীকালে তার ওপর অনেক ব্যাখ্যাট্যাখ্যা লিখেছিলেন যা থেকে আজকের গণিতবিদরা আর্যভটের পদ্ধতিটার কথা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছেন।
ডায়োফান্টেন শ্রেণীর সমীকরণ সমাধান করবার জন্য এই ক্রমাগত বিভাজনের যে পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন আর্যভট, তার ব্যবহার করে পরবর্তীকালে ভারতীয় গণিতবিদরা বেশ কিছু আকর্ষণীয় সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তেমন দুটো সমস্যা এখানে উল্লেখ করলাম। সমাধান দেবো না। সেইটে তোমাদের বুদ্ধির খেলার জন্য রইল-
ভাস্কর-১ à ২, ৩, ৪, ৫, ৬ দিয়ে ভাগ করলে প্রত্যেকবার ১ অবশিষ্ট থাকে কিন্তু ৭ দিয়ে বিভাজ্য এমন ক্ষুদ্রতম সংখ্যাটা কত?
( উত্তর ৩০১)
মহাবীর ( খৃ ৮৫০ ) à পাঁচ ঝুড়ি ফলের সঙ্গে দুটো ফল জুড়ে তা নজন পরিব্রাজককে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হল । ছয় ঝুড়ি ফলের সঙ্গে চারটে ফল জুড়ে তা আটজন পরিব্রাজককে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হল । চার ঝুড়ি ফলের সঙ্গে একটা ফল জুড়ে তা সাতজন পরিব্রাজককে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হল। একেক ঝুড়িতে সবচেয়ে কম কতগুলো ফল আছে?
আর্যভটের বহু শতাব্দি বাদে ইউরোপে ১৬২১ সালে এই পদ্ধতির পুনরাবিষ্কার করেন ব্যাচেট। তারপর ১৭৩৫ সালে ফের তা আরেকবার নতুন করে তৈরি করেল অয়লার। ফার্মা, উচ্চতর সূচকের ডায়োফান্টেন সমীকরণের ( ax2+by2=c, বা ax3+by3+cz3=d এই জাতীয় সমীকরণ) সমাধান সম্ভব কিনা তা প্রমাণ করতে গিয়ে বিখ্যাত ইনফাইনাইট ডিসেন্ট পদ্ধতির প্রমাণের ক্ষেত্রেও এই কুটক পদ্ধতির প্রয়োগ করেছিলেন।
ইনফাইনাইট ডিসেন্ট পদ্ধতির কথা
(এইটে ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভে যারা পড়ো তাদের জন্য)
ইনফাইনাইট ডিসেন্ট হল অঙ্কশাস্ত্রের একটা বিশেষ ধরনের প্রমাণ পদ্ধতি। এ কায়দাটা দিয়ে যা করা হয় সেটা ভারী মজার।
কোন একটা সমীকরণ দেয়া হল ধরো। এখন দেখতে হবে তার কোন সমাধান সম্ভব কি না যাতে তার উত্তরগুলো হবে ন্যাচরাল নাম্বার, মানে ১,২,৩,৪, এইরকম রাশিগুলো।
এইখানে একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝাই।
ধরো সমীকরণটা হল √2 = ক/খ। প্রশ্ন হল, এই সমীকরণটার এমন কোন সমাধান কি সম্ভব যাতে ক আর খ দুটো পূর্ণসংখ্যা? আমরা জানি যে √2 একটা অমূলদ সংখ্যা। একে দুটো পূর্ণসংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু যদি বলি একে যে দুটো পূর্ণসংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না তার প্রমাণ করো?
ফার্মার পদ্ধতিটায় সমীকরণটাকে ধরে প্রথমে ধরা হয় যে হ্যাঁ এর একটা সমাধান সম্ভব যাতে উত্তরগুলো ন্যাচরাল নম্বরের জুটি। তারপর পরীক্ষা করা হয় যে এ সমীকরণটার ক্ষেত্রে এই সমাধানটা সম্ভব হলে এর চেয়েও ছোট দুটো পূর্ণসংখ্যার সমাধান সম্ভব হবে কিনা।
যদি পরীক্ষায় সেটা প্রমাণিত হয় যে হ্যাঁ তা সম্ভব, তাহলে, তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে সেই দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতর সমাধান জুটি থাকলে তার চেয়েও কোন ছোটো পূর্ণসংখ্যার জুটি থাকবে।
এক কথায় তার অর্থ দাঁড়াবে যে এই সমীকরণের ক্ষেত্রে এইরকম ক্রমাগত ছোটো থেকে আরো ছোটো পূর্ণসংখ্যার অসীম সংখ্যক জুটি থাকবে। কিন্তু যেহেতু ন্যাচারাল সংখ্যা ১-এ এসে শেষ হয়ে যায়, অতএব বাস্তবে সেই ক্রমাগত ছোটো থেকে আরো ছোটো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার জুটি থাকা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ সমীকরণটার এইজাতের সমাধান সম্ভব ধরে নিলে তার থেকে একটা অসম্ভব সিদ্ধান্তে পৌঁছোচ্ছি আমরা। তার মানে গোড়ার সিদ্ধান্তটা ভুল, মানে এই সমীকরণের কোন পূর্ণসংখ্যার জুটির সমাধান সম্ভব নয়। অর্থাৎ √2কে দুটো পূর্ণসংখ্যার অনুপাত দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না, বা এটি একটি অমূলদ সংখ্যা।
ডায়াফন্টেন সমীকরণের সমাধানের বাস্তব প্রয়োগের একটা উদাহরণ দিয়ে এবারের মত শেষ করি। এটা একটা গোয়েন্দা গল্প।
ধরো তুমি ভারতের গুপ্তচর। শত্রুদেশ ভারতে একজন খুনিকে পাঠিয়েছে। তার নাম খুঁজতে অন্যদেশে গিয়ে তুমি জানলে তার নাম ‘জো’। এই JO শব্দটা তুমি এমনভাবে সাংকেতিক লিপিতে ভারতে পাঠাবে যাতে শত্রুরা সেটা ধরতে না পারে।
তুমি করলে কী, প্রথমে JO শব্দটাকে লিখলে 10,15 (মানে বর্ণমালার দশম ও পনেরো নং অক্ষর)
এইবার তুমি একটা সমীকরণ বানালে ৩৭ক+৫২খ =১১৫০। এই সমীকরণটার বাঁদিকের রাশিদুটোর গসাগু ১, যা দিয়ে ডানদিকের রাশিটাকে ভাগ করা যায়। অতএব এর একটা পূর্ণসংখ্যার সমাধান সম্ভব। সমাধানটা করলে উত্তর আসবে ওই ১০,১৫, মানে JO.
এইবার তুমি আরো কয়েকটা সমীকরণ বানাও—
৩৮ক+১৯খ=২৫০০, ৪০ক+১৮খ =৩৭৯১ , ৩ক+৯খ=২৫।
তারপর তুমি একটা চিঠি লেখ। ধরো তোমার বোনকে লিখছà
শত্রুদেশ তো আর জানে না তুমি কীভাবে সংকেত বানিয়েছ। তারা ওর থেকে কিছুই বুঝবে না। কিন্তু তোমার দেশের সাংকেতিক লিপির পাঠ উদ্ধার করবার লোকজনকে তুমি আগেই বলে গেছ কী কায়দায় তুমি সংকেতটা পাঠাবে। তাই সমীকরণগুলোকে দেখে তারা প্রথমে খুঁজবে ওর কোনটার পূর্ণসংখ্যার সমাধান হয়। তারা দেখবে সেটা হয় তিন নম্বর সমীকরণটার ক্ষেত্রে। তখন কুটক পদ্ধতিতে সেটা সমাধান করলেই কেল্লা ফতে। খুনির নাম তারা জেনে যাবে JO. এইবার তাকে খুঁজে বের করতে আর সমস্যা থাকবে না।
ক্রমশ


1 thought on “বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-অংকের বিচিত্র জগত-বৈজ্ঞানিক”