বৈজ্ঞানিকের দপ্তর- গল্পে বিজ্ঞান–ঠান্ডা করার সহজ উপায়– রবি সোম

biggansohoj (Small)

দর্জিলদার  অদ্ভুত কাণ্ড দেখে (ঠিকভাবে বলতে গেলে ,অনুভব করে) সুজিত ও আমার দু’জনেই মনে হল , এটা নির্ঘাত ম্যাজিক! আমি মুখ ফসকে কথাটা বলতেই হো হো করে হেসে উঠল দর্জিলদা। পরে হাসি-টাসি থামিয়ে বলল , “দূর বোকা , ম্যাজিক আসলে তো হাতের বা যন্ত্রপাতির কারসাজি কিংবা দৃষ্টিবিভ্রম। সেসব কিস্‌সু নয় , এটা ঘোরতর বিজ্ঞান ! ‘ঘোরতর’ কথাটা শুনে আবার ঘাবড়ে যাস না। হার্ড সায়েন্স-এর বাংলা হিসেবেই কথাটা বললাম। খবরের কাগজ বা টিভির বিজ্ঞাপনে প্রায়ই দেখিস না, মানুষের ওপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানের নানারকম অপচেষ্টা। এটা কিন্তু সেরকম জোড়াতালির ব্যাপার  নয়,হান্ড্রেড পারসেন্ট খাঁটি বিজ্ঞান। এর পেছনে আছে যে সায়েন্স ,সেটা বোঝা মোটেই শক্ত নয়।”

এরপর বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র দর্জিলদা আমাদের মতো বিজ্ঞান-না-জানা বেচারাদের সুবিধের জন্য পুরো  বিষয়টা জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। তবে সেসব জানানোর আগে ‘অদ্ভুত কাণ্ড’ কী ছিল সেটা খোলসা করা দরকার।

আমরা থাকি বেঙ্গালুরুতে। এখানকার আবহাওয়া বেশ মনোরম। এই কারণে ‘এয়ার কন্ডিশন্ড সিটি অব ইন্ডিয়া’ খেতাবটাও জুটে গিয়েছে শহরটার। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা এবং ভৌগোলিক অবস্থিতির দরুনই এটা হয়েছে সম্ভব ।

কলকাতার প্যাচপ্যেচে গরমের থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা পরমানন্দে বিচরণ করছিলাম বেঙ্গালুরুতে। কিন্তু তাল কেটেছিল গত বছর। কেননা গ্রীষ্মকালে পড়েছিল ভালোরকম গরম। আমাদের বাড়ির ছাদে দুটো সাতশো লিটারের কালো রঙের প্লাসটিকের ট্যাঙ্ক বসানো রয়েছে। একটা বরাদ্দ ভাড়াটের (মানে,আমাদের) জন্য,অন্যটা ব্যবহার করেন গৃহস্বামী ও তাঁর পরিবার। রোদের তাপে কংক্রিটের তুলনায় প্লাসটিক ট্যাঙ্কের জল তাড়াতাড়ি গরম হয়। অফিসের দিন সকাল আটটার আগেই স্নানপর্ব সারতে হয়,তাই অসুবিধে হত না। গোল বাঁধতো শনি,রবি আর ছুটিছাটার দিনগুলোয়। বেলা দশটার পর জল বেশ গরম হয়ে উঠতো। গরমের দিনে কে আর উষ্ণ জলে চান করতে চায়? তাই বালতিতে জল রেখে সেই জল মোটামুটি ঠান্ডা হওয়ার পরই স্নান করতে হত সেই দিনগুলোয়। অদ্ভুত কাণ্ডটা ঘটেছিল এরকমই এক দিনে। 

সেদিন ছিল শনিবার। সকাল দশটা নাগাদ দর্জিলদা হঠাৎ আমাদের ফ্ল্যাটে বিনা নোটিশে হাজির হল। এসেই গড়গড় করে বলে গেল সারাদিনের প্রস্তাবিত কর্মসূচি। চান-টান করে রেডি হয়ে এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। গন্তব্য বিশ্বেশ্বরাইয়া মিউজিয়াম। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ক এই প্রদর্শশালা আকারে নাকি বেশ বড়ো। অনেকগুলো ফ্লোর। চটপট এক্সিবিটগুলো দেখলেও ঘন্টাকয়েক তো লাগবেই। দুপুর দুটো নাগাদ মিউজিয়াম দেখে কোশি’জ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সারা হবে। এরপর সিনেমা দেখে কফিশপে ঢুঁ মেরে অবশেষে ফেরা হবে বাড়ি ।

সুজিত দর্জিলদাকে বলল,“প্রোগ্রামটা জব্বর। তবে কাল রাতে জানালেই ভালো করতে। চান-টান করে রেডি থাকতাম। ট্যাঙ্কের জল এতক্ষণে গরম হয়ে উঠেছে। এখুনি চান করা যাবে না। বালতিতে ভরে কিছু সময় ফেলে রাখতে হবে। ঠান্ডা হলে তবেই গায়ে ঢালা যাবে।”

জল-ঘটিত সমস্যায় দিনের কর্মসূচি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে দেখেও দর্জিলদা একটুও বিচলিত হল না। রীতিমতো কনফিডেন্সের সাথে ঘোষণা করল,“নো প্রবলেম ! চানের জলের টেম্পারেচার চটজলদি কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে ফেলার কায়দা আমার জানা আছে। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কলঘরে চল।”

সুজিত ও দর্জিলদা চলল কলঘরের দিকে। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে আমিও ভিড়ে গেলাম ওদের দলে।

কলঘরে ঢুকে প্রথমেই দর্জিলদা কল খুলে আঁজলা করে হাতে জল নিয়ে  টেম্পারেচার আঁচ করার চেষ্টা করল। দেখাদেখি আমরাও জলে হাত দিলাম। বেশ গরম ঠেকল।

কলঘরের কোনায়  রাখা প্লাসটিকের গামলাটা দেখে দর্জিলদা বেজায় খুশি হয়ে বলল, “যাক,পাওয়া গেছে। এরকম একটা চওড়া পাত্রই চাইছিলাম।”

সুজিত ও আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। জামা-কাপড় কাচার সময় গামলাটা আমরা ব্যবহার করি। সাদামাটা প্লাসটিকের গামলা দেখে দর্জিলদা কেন এত পুলকিত সেটা আমরা আন্দাজ করতে পারলাম না।

গামলাটা শাওয়ারের নীচে বসিয়ে পুরোদমে জল চালিয়ে দিল দর্জিলদা। গামলাটা ভরে উঠতে শাওয়ার বন্ধ করল। এরপর দর্জিলদা গামলার জলে হাত ডুবিয়ে মুচকি হেসে সুজিতকে বলল,“আশা করি সুজিতবাবু এই জলে স্নান করলে মোটেই কাবু হবেন না !”

গামলায় হাত ডুবিয়ে আমরা তো অবাক ! গামলার রাখা শাওয়ারের জল কলের জলের তুলনায় অনেক ঠান্ডা। এই জলে স্নান করতে কারোরই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

এর পরের ঘটনা শুরুতেই জানিয়েছি। সেটা আর নতুন করে বলব না। তবে জল ঠান্ডা হওয়ার কারণ নিয়ে দর্জিলদা যা বলেছিল তা ছোট্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি।

ফ্রিজের আগমনের আগে গরমের সময় মাটির কুঁজোয় জল রাখার চল ছিল। মাটির কুঁজোয় জল ঠান্ডা হওয়ার কারণ কুঁজোর সছিদ্রতা। কুঁজোর দেওয়ালের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্র জলবিন্দুগুলো চটপট উবে যায় ,মানে বাষ্পীভূত হয়।  জল থেকে বাষ্প বনতে তাপ লাগে যেটা মূলত আসে কুঁজোর জল থেকে। কোনো জিনিসে তাপ ঢুকলে সেটা গরম হয় , আর ঠান্ডা হয় তাপ হারালে । তাপ হারায় বলেই  ঠান্ডা হয় মাটির কুঁজোয় রাখা জল।

শাওয়ারের জলেও এই রকমের উবে যাওয়ার ব্যাপার ঘটে থাকে। কুঁজোর দেওয়াল দিয়ে বেরিয়ে-আসা জলকণার মতো শাওয়ার-নির্গত জলবিন্দুগুলোও আকারে ছোটো হওয়ায় চায় চটপট উবে যেতে । তবে শাওয়ার থেকে বেরিয়ে কলঘরের মেঝে ছুঁতে যে অল্প সময় লাগে সেটুকু সময়ে এরা পুরোপুরি উবে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মানে ,ফোঁটার বাষ্পীভবন হয় আংশিক । এর জন্য যে তাপ লাগে সেটা আসে  জলবিন্দু থেকেই। কাজেই শাওয়ারের জলের ফোঁটা যত নীচে পড়ে ততই ঠান্ডা হতে থাকে। মজার কথা,শাওয়ারের জল মাথায় পড়ে যে উষ্ণতায়,পায়ের পাতায় পড়ে তার চেয়ে কয়েক ডিগ্রি কম উষ্ণতায় ! শাওয়ারের জল আঁজলা করে ধরে ধীরে ধীরে হাতদুটো উঁচু থেকে নীচে নামালে টেম্পারেচার কমার ব্যাপারটা সহজেই মালুম হয়।

আসলে, বিজ্ঞান-জানা দর্জিলদা ‘উবে গেলে শীতল হয়’ এই বৈজ্ঞানিক তথ্যকে ব্যবহার  করেই আমাদের দিয়েছিল তাক লাগিয়ে !

1 thought on “বৈজ্ঞানিকের দপ্তর- গল্পে বিজ্ঞান–ঠান্ডা করার সহজ উপায়– রবি সোম”

Leave a Reply