ভ্রমণ-অতীত ভ্রমণের অন্তরালে– রাখী নাথ কর্মকার

bhromon07 (Small)ঘটনাটা ঘটল ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটা টেক অফ করার ঠিক পরেই ! ‘ফাসন সিটবেল্ট’ চিহ্নটা বন্ধ হয়ে যাবার খানিক পরেই ঠুমরিদের রো-এর ঠিক সামনের সিটের ভদ্রলোকটি উঠে দাঁড়িয়ে ওপরে ওভারহেড বিনসে রাখা তার ব্যাগটা থেকে কিছু বার করার চেষ্টা করছিলেন। খুব সম্ভবত ভদ্রলোকের চশমাটা। টারমিনালের ডিপারচার লাউঞ্জেই ভদ্রলোককে দেখেছিল ঠুমরি,সামনের দিকে বসে মন দিয়ে একটা পত্রিকা পড়ছিলেন। বেশ লম্বা চেহারা,মাথায় কোঁকড়ানো কালো চুল,গায়ের রংটা একটু চাপা,বাদামের মত মাঝারি চোখের সবুজ তারায় বেশ একটা নিশ্চিন্ত ভাব,গোলচে মুখ, ভাঙা চোয়াল,পরনে কালো বিজনেস স্যুট,চোখে সোনালি ফ্রেমের হাফ রিমলেস চশমা ।
সেই চশমাটা এখন ব্যাগ থেকে বার করতে গিয়েই বোধহয় যত বিপত্তি! ভদ্রলোকের টানাটানিতে ব্যাগের কোণ থেকে একটা ছোট্ট অথচ ভারী চামড়ার থলে মতন কীভাবে যেন গলে বেরিয়ে গিয়ে টুপ করে এসে পড়ল ঠুমরির পায়ের কাছে! থপ করে একটা আওয়াজও যেন শুনতে পেল ও। ভদ্রলোক বোধহয় খেয়াল করেন নি। ফের বসে পড়লেন হাতের পত্রিকাটা খুলে।
পাশের সিটেই মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল ও। টেনশনে ক্লান্ত মা সবে চোখটা একটু বুঁজেছেন। টেনশন তো হবেই,এভাবে সব্বাইকে ছেড়ে এত দূরে মা আর ও দুজনে-একা–কোনদিন,কোত্থাও যায় নি। এখনো ওর চোখের কোণ জলের তিরতিরে ধারার ভেজা… দাদুন,দিদুন,মামা,দাদা,ঠাম্মা,ছোটপিসি… সব্বাইকে এয়ারপোর্টে ফেলে রেখে ওদের ফ্লাইটটা যখন মেঘের ওপর ডানা মেলল,তখনও দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে ঠুমরির। অথচ চারমাস আগে অফিসের কাজে ইউ এস চলে যাওয়া বাবার সাথে কতদিন দেখা হয়নি বলে
গতকাল রাতেও মনটা দুমড়ে উঠেছে,কত তাড়াতাড়ি রাতটা ভোর হবে, কত তাড়াতাড়ি প্লেনে উঠবে,কত তাড়াতাড়ি ইউ এস পৌঁছে বাবার হাতটা ছুঁয়ে বলবে–“দেখেছো তো বাবা,আমি একদিন একটুও দুষ্টুমি করিনি,মাকে একটুও জ্বালাতন করিনি !” আর বাবা আদর করে ঠুমরির টোল পড়া গালটা টিপে দিয়ে কোলে তুলে নেবে…ওর জন্য একটা রিমোট কন্ট্রোল হেলিকপ্টার কিনে রাখবে বলেছে বাবা,ভালো হয়ে থাকলেই ওটা ওর পুরস্কার!

bhromon08 (Small)কিন্তু আজ সকাল থেকেই ওদের বাড়িতে এসে হাজির হওয়া দাদুন,দিদুন, মামার ফোঁসফাঁস ভাঙা গলার আওয়াজ,দাদা,ঠাম্মা,ছোটপিসির ছলছলে চোখ–এতগুলো ভালোবাসার মানুষজনের জন্য যে এরকম দুমড়ানো-মুচড়ানো ভয়ানক কষ্ট হতে পারে, তাও কি আগে ও ভেবেছিল ছাই!
এক এক সময় মনে হচ্ছিল,কেন ওকে সবাইকে এখানে ফেলে রেখে চলে যেতে হবে ? স্কুলের বন্ধু তিয়াশা আর ওর মা কাল রাতে এসেছিল ওদের সাথে দেখা করতে-দুই বন্ধু ভেউভেউ করে কেঁদেছে। স্কুলের বন্ধুদের ছেড়ে,আঁকার স্কুলের বিল্টু,তান্নিদের ছেড়ে,কাজের মাসি দীপুমাসিকে ছেড়ে,পাড়ার বন্ধু টপ্পা,তিঙ্কুদের ছেড়ে,প্যারিস পাড়ার এই চৌহদ্দি ছেড়ে,মোড়ের মাথায় লেজ নাড়ানো হ্যাংলা রকিকে ছেড়ে…ওকে কত্তদূরে চলে যেতে হবে!
মা তখন বুঝিয়েছিল,কাজই মানুষের পরিচিতি আর পরিবেশ তৈরি করে দেয়। বাবার চাকরির প্রয়োজনে ওদেরকে এই বদলটা মেনে নিতেই হবে। মেনে নিতে হবে এই সাংঘাতিক কষ্টটা যেটা ওর কাছে ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছিল। দমফাটা ব্যাথার হাওয়াটাকে ও বালিশ চাপা দিয়ে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল যখন মা বলেছিল,ওর প্রিয়জনেরা সকলেই ওর কাছাকাছিই থাকবে,ওর মনের মাঝে,বাস্তবে তাঁদের ছুঁতে না পারলেও হৃদয়ের উষ্ণ গহ্বরে ওরা সব্বাই আগের মতই ভালবাসার মিঠে আবেশে ভরিয়ে রাখবে ওর প্রতিটি দিন!
আর এখন,এইমুহূর্তে কিন্তু চামড়ার থলিটার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না ঠুমরি । ওর সামনের সিটটার কোণার দিকে ঢুকে গেছে ওটা, সিটবেল্টটা খুলে নীচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে হাত দিয়ে বার করতে গেল ওটা,পারল না । এবার প্রায় নীচে গড়িয়ে পড়েই এক নিঃশ্বাসে টেনে বার করল ও থলিটাকে। মা সচকিত হয়ে চেয়ে দেখছিলেন ওর কান্ড,ব্যাপারটা আন্দাজ করে বললেন, “গুড। এবার যাও,যার জিনিস তাকে দিয়ে এস।”
থলিটা হাতে নিয়ে ম্যাগাজিনে ডুবে থাকা ভদ্রলোকের সামনে ধরল ঠুমরি।
“ও মাই গড!! থ্যাঙ্কু ভেরি মাচ মাই চাইল্ড! তুমি জানো না তুমি আমার কী উপকার করেছ!” চোস্ত ইংরেজিতে ফেটে পড়লেন ভদ্রলোক,দু’চোখ উপচে পড়ছে কৃতজ্ঞতায়,এখনো বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছেন না,অসাবধানে এমন একটা কান্ড ঘটে গেছে!
“সিট হিয়ার, মাই লি’ল এঞ্জেল!…এটা যে কী গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমি তোমায় কী করে বোঝাব।”
প্লেনটা অনেকটাই ফাঁকা,ভদ্রলোকের পাশের সিট দুটো ফাঁকাই পড়ে আছে,তার একটাতে হাত দিয়ে থাবড়ে ইশারা করলেন তিনি। এদিকওদিক তাকালেন ভদ্রলোক, আশেপাশে সবাই যে যার নিজের মত ব্যস্ত দেখে একটু যেন সামলে নিলেন নিজেকে । কোলের পত্রিকার মাঝে থলিটা রেখে চেনটা টেনে বার করলেন অদ্ভুত সুন্দর, চার-পাঁচ ইঞ্চির একটা ছোট্ট পিরামিডের মত বাক্স।
পিরামিড কী জিনিস তা স্কুলের সোশ্যাল স্টাডিজে একটুখানি জানা হয়েছে ঠুমরির। অসাধারণ কারুকাজ করা বাক্সটার গায়ে,নানা ধরনের মানুষের মূর্তি,পাখি,জন্তুর চেহারা ছাড়াও নানারকমের চিহ্ন খোদাই করা। একইরকম দেখতে বাক্সটার তিনটে দেওয়ালের একটায় কতগুলি মানুষের মূর্তির নির্দিষ্ট জায়গায় কম্পিউটারের কিবোর্ডে পাসওয়ার্ড দেওয়ার মত করে আঙুলগুলি চটাপট চালিয়ে চাপ দিলেন ভদ্রলোক,খট করে খুলে গেল পিরামিডের তিনকোণা ঢাকনাটা। পাশে বসে গোলগোল চোখ করে ঠুমরি গিলতে লাগল অজানা মুহূর্তের আকর্ষণ।
বাক্সের ভিতরে আঙুল গলিয়ে কয়েকটা কয়েন বার করে আনলেন ভদ্রলোক, “এই যে বাক্সটা দেখছ,এটার বয়স নয় নয় করেও প্রায় পঁচাত্তর বছর হতে চলল। এবার আমার পরিচয়টা একটু দিয়ে নি,আমি এহসান সুলেমান শাহ,আর্কিওলজিস্ট। আর্কিওলজিস্ট কী জানো তো? যাঁরা পুরাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা বা কাজ করেন। ইন্ডিয়ায় এসেছিলাম আমি একটি ব্যক্তিগত কাজে,এবার দিল্লি হয়ে ফিরে যাচ্ছি ইজিপ্ট। আমার প্রপিতামহ ছিলেন ইজিপ্টের মহম্মদ আলি রাজবংশের দশম রাজা ফারুকের অমাত্য অর্থাৎ সভাসদ। রাজা ফারুক এই বাক্সটা আমার দাদুকে দিয়েছিলেন তাঁর বিশ্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে। ১৯৫২ সালে ইজিপশিয়ান রেভোলিউশনের সময় দাদু রাজাকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন, যদিও এক সময় রাজা সিংহাসনচ্যুত হন, রাজতন্ত্র ধ্বংস করে ইজিপ্টে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
“সেসব গল্প থাক। শুধু এটুকু জেনে রাখ, বাক্সের মধ্যে অনেক তাবিজ,কবচ,স্মারকচিহ্ন রয়েছে যেগুলি নানা সময়ে আমার বাবা,কাকারা সংগ্রহ করেছিলেন বা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন। এই কয়েনগুলি হল ‘গুড লাক কয়েন’ বা ‘ম্যাজিক কয়েন’। এগুলিও রাজার কাছ থেকেই পাওয়া । দেখ, এই পিতলের কয়েনগুলির একদিকে ফারাওএর ছবি, তার চারিদিকে এগুলো হাইরোগ্লিফিক চিহ্ন–জানো তো হাইরোগ্লিফিক কি? মিশরীয় চিত্রলিপিতে ব্যবহৃত বর্ণমালা, আর অন্য পিঠে বাঁদিকে মুখ করা স্ফিংক্সের ছবি,পিছনে চারটি পিরামিড যেগুলি ডানদিক থেকে বাঁদিকে ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে,আর সেই সঙ্গে এদিকেও রয়েছে বেশ কিছু হাইরোগ্লিফিক চিহ্ন। এই যে দেখ, এটি ইজিপশিয়ান দামী রত্নবসানো গুবরে-পোকা,এছাড়াও এই বাক্সের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ম্যাজিক্যাল পাথর,শুকনো শিকড়বাকড়—এসবই বংশপরম্পরায় আমাদের রক্ষা করে আসছে। এগুলো থাকতে আমাদের কক্ষণো কোন ক্ষতি হবে না। তাছাড়া এগুলোর নানা অলৌকিক ক্ষমতাও আছে,যা অনেকেই বিশ্বাস করবে না। যেমন এই যে ইজিপশিয়ান দামী রত্নবসানো গুবরে-পোকা বা স্ক্যারেব বিটলটি দেখছ,যা ইজিপশিয়ান পৌরাণিক কাহিনীতে সূর্য,পুনর্জন্ম,সুরক্ষার চিহ্ন-এটি আমার প্রপিতামহ এক ক্ষমতাশালী পুরোহিতের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। আমার এক এপিগ্রাফার বন্ধু,যে বিভিন্ন এপিগ্রাফ,ইন্সক্রিপশনের অর্থাৎ প্রাচীন অভিলিখনের পাঠোদ্ধারের কাজ করে, কিছুদিনের জন্য এটি ধার নিয়েছিল এর উল্টোপিঠে খোদাই করা হাইরোগ্লিফিক লিপিটার মানে উদ্ধার করার জন্য। অবাক ব্যাপার যেদিনই ও এটি হাতে নিয়ে কাজ শুরু করার কথা ভেবেছে সেইদিনই কোন না কোন কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি, উলটে নানা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে ও এটি আমাকে ফেরত দিয়ে যায়। কিন্তু এটি হাতে নিলে আমার শরীরে এক অলৌকিক ক্ষমতার সঞ্চার হয়,শরীরের যে কোন ক্ষত,যে কোন কষ্ট,যে কোন অসুস্থতা নিমেষে মিলিয়ে যায়। তাই এগুলি কোনভাবেই আমরা কাছ ছাড়া করিনা,বংশের একমাত্র বংশধর হিসেবে এগুলি এখন আমার জিম্মায়,তাছাড়া পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবেও এগুলির মূল্য এখন খুব একটা কম নয়। “
এবার তাঁর গলার ভিতরে আঙুল গলিয়ে চেনের সঙ্গে আটকানো একটা চোখের মত দেখতে পেন্ডেন্ট বার bhromon09 (Small)করে আনলেন ভদ্রলোক, “এটি হল ‘আই অফ হোরাস’। এই পেন্ডেন্টটিও রাজা ফারুকেরই দেওয়া । অত্যন্ত পবিত্র এই কবজটি রাজকীয় ক্ষমতা, সুস্থতা এবং সুরক্ষার প্রতীক। এই পবিত্র’চোখে’র ছয়টি অংশ আছে। প্রতিটি অংশ ছয়টি ইন্দ্রিয়ের সংগতি প্রকাশ করছে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো,আমাদের বংশের দাদা,কাকা,বাবা বা আমি ছাড়া এই পিরামিড বাক্সটি খোলা কারোর পক্ষে সম্ভব নয়,আর এর ম্যাজিক্যাল ক্ষমতাও আমাদের সঙ্গ ছাড়া পুরো ভোঁতা!”
এই বলে ভদ্রলোক নিশ্চিন্ত হয়ে সিটে ঠেস দিয়ে বসে এক গাল হাসলেন। তারপর ফের বললেন, “এই দেখেছো, এতক্ষণ ধরে খালি আমার কথাই বলে গেলাম,এবার তোমার কথা বল। তোমার নাম কী? মায়ের সঙ্গে কোথায় চলেছ?”
ইতিমধ্যেই মা একবার ঠুমরির খোঁজ নিতে উঁকি মেরে গেছেন,এহসান সুলেমান শাহ সাহেব ‘আপনার মেয়ের সাথে একটু গল্প করার অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি’ বলায় মা-ও আর না করতে পারেননি।
ঠুমরির সঙ্গে ওর স্কুল,বন্ধুবান্ধব,পরিবারপরিজন,ওর ভালোলাগা,খারাপলাগা নিয়ে একপ্রস্থ বকবক করার পর যখন ভদ্রলোক শুনলেন,ওর সায়েন্স সাবজেক্টটা ভীষণ ভাল লাগে, কিন্তু ইতিহাস ভূগোল এক্কেবারেই পছন্দের নয়,এহসান সুলেমান শাহ সাহেব কেমন যেন অননুমোদনের ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন, “কিন্তু অন্বেষা,ইতিহাস বা অতীতকে ঠিকভাবে না জানলে বিজ্ঞান তোমায় কোনভাবেই সাহায্য করতে পারবে না। ইজিপ্টের বিখ্যাত গিজার পিরামিডের নাম শুনেছ তুমি? গিজা সমাধিক্ষেত্রের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম পিরামিডটি ইজিপ্টের ফ্যারাও খুফুর মৃত্যুর পর তার সমাধির ওপর নির্মিত হয়েছিল, খুব সম্ভবত ২৫৪০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। ৩৮০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটিই ছিল মানুষের তৈরি উচ্চতম স্থাপত্যের নিদর্শন । এক অত্যাশ্চর্য অতীত ইঞ্জিনিয়ারিংএর নমুনা,যা তৈরি হয়েছিল ২,৩০০,০০০ চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে যার একেকটির গড় ওজন ছিল প্রায় আড়াই টনের কাছাকাছি। পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে এই একটিই এখনো টিঁকে আছে যার সুবিশাল আয়তন এবং সঙ্গতি এবং ভারসাম্যের নির্ভুলতা আজও বর্তমান টেকনোলজির কাছে প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ারিংএর এক বিস্ময়! বর্তমান উন্নত টেকনোলোজির সাহায্যেও এখনো অবধি এর অনুরূপ কোনকিছু তৈরি করা সম্ভব হয়নি । “
খানিকক্ষণ দুজনের কারো মুখেই কোন কথা নেই। ঠুমরি অবাক হয়ে এইমাত্র শোনা কথাগুলোই ভাবছিল। খানিক বাদে কী যেন একটা ভাবতে ভাবতে এহসান সুলেমান শাহ সাহেব বলে উঠলেন–bhromon06 (Small)“হুঁমমম–আমার এতবড়ো একটা উপকার করার জন্য তোমাকে একটা জিনিস আমি দিতে পারি। এটা অবশ্য তেমন স্মৃতিবিজড়িত নয় বা পুরোনোও নয়। আমার ছোটকাকার খুব কিউরিওর শখ ছিল, পুরোনো কায়রোর বড়বাজার থেকে এই ‘আওয়ার গ্লাস’ বা বালিঘড়িটি কিনেছিলেন তিনি। এটার বিশেষত্ব কী জানো? এটি আধ ঘন্টার মত প্যাসেজ অফ টাইম পরিমাপ করে,এবং এই আধ ঘন্টায় তুমি ঘুরে আসতে পার অতীতের যেকোন জায়গায়,যেকোন সময়ে –“
উত্তেজিত হয়ে ঠুমরি প্রশ্ন করে উঠল, “টাইম ট্রাভেল? যেমনটি স্টিফেন স্পিলবার্গের ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচারে’ ঘটেছিল?”
গত সপ্তাহেই মামাবাড়িতে ঐ সিনেমাটা দেখেছে ঠুমরি, আর তখন থেকেই ওই নিয়েই ভেবে চলেছে,হাজারো প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে চলেছে মা থেকে শুরু করে মামা অবধি সক্কলকে!
“না, ঠিক টাইম ট্রাভেল নয়,তবে অনেকটা ভার্চুয়াল টাইম ট্রাভেল বলতে পার। এই ‘আওয়ার গ্লাস’টি হাতে নিয়ে তুমি যে সময়ের কথা চিন্তা করবে,তুমি পৌঁছে যাবে সেখানে! সশরীরে নয়,কিন্তু তুমি অনুভব করতে পারবে তোমার চারদিকের পরিবেশ বদলে গেছে,জগত বদলে গেছে,সময় বদলে গেছে,কাল-পাত্র সব বদলে গেছে–তোমার চারপাশে ঘটে চলবে সেই অতীত ঘটনাবলীর রি-টেলিকাস্ট! না,তোমার কিন্তু তেমন কিচ্ছু করার থাকবে না, শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া ! তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা তো আছেই । দুটো পয়েন্ট সবসময় মনে রাখবে,বাস্তবে যে জায়গায় থাকবে তুমি,কেবলমাত্র সেই স্থানেরই অতীতে পৌঁছতে পারবে,মানে কলকাতায় বসে তুমি ফিনল্যান্ডের অতীতে চলে যেতে পারবে না। আর বছরে মাত্র তিনবার তুমি এই ‘আওয়ার গ্লাসে’র এই সুযোগটা নিতে পারবে,অন্য সময় এটি সাধারণ’আওয়ার গ্লাস’ ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। আসলে ‘তিন’ নম্বরটি কিন্তু এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নম্বর, গ্রীক গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক পিথাগোরাসের মতে,’তিন’ হল পারফেক্ট নম্বর। ‘তিন’ হল কাল অর্থাৎ টাইমের দ্যোতক- অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ,বিভিন্ন ধর্মেই ‘তিন’ এক পবিত্র নম্বর,’তিন’ হল ম্যাজিক নাম্বার, ‘তিন’ হল প্রাইমারি কালার–আর কত বলবো! মোদ্দা কথা ‘তিনে’র মহিমা অপার! তবে একটা কথা তোমায় জানিয়ে রাখি, একবার আমি ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’এ ফ্যারাও তুতেনখামেনের সমাধির কাছে গিয়ে ১৩২৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে তাঁর মৃত্যুর সময়ে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিলাম,আওয়ার গ্লাস তা পারেনি। খুব সম্ভবত বুঝেছি, ১৭-১৮শতকের আগের কোন সময়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এর নেই! তবে সাবধান,কাউকে জানাতে যেওনা এর ক্ষমতার কথা। একান্তে একাকী পরখ করে দেখতে পার এর কার্যকারিতা,আর হ্যাঁ, এটা মনে রাখবে ‘আওয়ার গ্লাসে’র ওপরের প্রকোষ্ঠ পুরোপুরি খালি হওয়ার আগেই কিন্তু এটাকে উলটে দিতে হবে,তাহলেই তুমি থুড়ি তোমার আত্মা আবার বাস্তবে ফিরে আসবে। নাহলে কী হবে তা আমার জানা নেই। জানার চেষ্টাও করিনি কখনো । “
কথা বলতে বলতে কখন যেন অনেকখানি সময় ফুড়ুৎ করে বেপাত্তা হয়ে গেল। নিউদিল্লি ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছতে খুব বেশি একটা বাকি নেই। সিটবেল্ট বেঁধে নেওয়ার জন্য ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে। পেন্সিল টর্চের মত ছোট্ট ‘আওয়ার গ্লাস’টিকে জিন্‌সের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে ভদ্রলোককে ধন্যবাদ এবং বিদায় জানিয়ে ঠুমরি এসে বসল মায়ের পাশে। সিটবেল্ট বেঁধে নিয়ে থিতু হওয়ার কিছু পরেপরেই ও বুঝতে পারল প্লেনটা এবার ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে !
bhromon04 (Small)নিউদিল্লিতে প্লেন থেকে নেমে ভদ্রলোক কোনদিকে যে চলে গেলেন,ঠুমরি ঠিক খেয়াল করে উঠতে পারল না। মায়ের সঙ্গে অনেকগুলি চেকিংএর পর্ব শেষ করে যখন ওরা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে করে চোদ্দ-পনেরো ঘন্টার একঘেয়ে জার্নির শেষে নিউ ইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছল,ক্লান্তি আর টেনশনে মা মেয়ে দুজনেই তখন অনেকটা কাহিল। বাবা আর বাবার অফিসের রজতকাকু এয়ারপোর্টের ইন্টারন্যাশনাল অ্যারাইভ্যালে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন…।পার্কিং লটে রাখা গাড়িতে বসে বাবার কাঁধে মাথা রেখে কখন যেন ও ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে……।
ক্রমশ

1 thought on “ভ্রমণ-অতীত ভ্রমণের অন্তরালে– রাখী নাথ কর্মকার”

Leave a Reply