পাহাড়ি গ্রামের গল্প- আগের পর্বগুলো


আলাদা করে এই গ্রামটা কেউ নজরই করে না, অথচ বহু লোক এর ওপর দিয়ে যে গিয়েছেন সেকথা আমি হলফ করে বলতে পারি। ছোট্ট জনপদ, আলাদা করে তার অস্তিত্ব কে-ই বা লক্ষ্ করবে যদি তার লাগোয়া বেশ বড়সড় একটা জায়গা থাকে। বড় জায়গাটার মধ্যে ছোট জায়গাটা গুটিশুটি মেরে এক কোণ ঘেঁষে পড়ে থাকে। সত্যি বলতে কি আমাদেরও চোখ সে এড়িয়েই যেত যদি না গোপালদার বাড়ি ওই খাইবগড় গ্রামে হত।
পিন্ডারি গ্লেসিয়ারের নাম তো সকলেই শুনেছে। যেখান থেকে পিন্ডারি নদীর উৎপত্তি। সেই গ্লেসিয়ারে যাবার জন্য গাড়িপথ গেছে কাপকোট ভারারি হয়ে সরযূ নদীর পাশে পাশে। ভারারি বেশ বড় জনপদ আর তার প্রায় লাগোয়া এই খাইবগড়। যেখানে আমাদের গোপালদার বাড়ি। গোপালদা, মানে গোপালরাম দেখতে বেশ শক্তপোক্ত, তবে মনটা বেশ নরম। আমার সঙ্গে তার আলাপ হয় প্রায় পনের বছর আগে। আমরা আমাদের বন্ধুরা বহুবার তার সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গেছি। আমাদের অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে গোপালদা। একবার স্রেফ গোপালদার বাড়ি যাবো বলেই হাজির হলাম খাইবগড়ে। সরযূর পাড়ে আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতই খাইবগড়। ভারারির লাগোয়া বলে যেকোনো কাজেই লোকে দৌড়ে ভারারি চলে যায়, মাত্র দু কিলোমিটার বই তো নয়। পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে গেল। রাতে মাংস রান্না করবে বলে আমার এক বন্ধু ভারারি বাজার থেকেই খাসির মাংস কিনে নিয়ে চলল। সে মাংস রান্না নিয়ে সে এক বিপত্তি। প্রেশার কুকারে সিটির পর সিটি দিয়েও সে মাংস যথেষ্ট শক্ত রয়ে গেল।

পাহাড়ে যাবার জন্য লোক উপস্থিত হলেই গোপালদা সব ছেড়েছুড়ে চলল তাদের সাথে। সেসময় বৌদি বেচারার ওপর খুব চাপ পড়ে যায়। ঘরের কাজ, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা, শ্বশুর শাশুড়ির সেবা তারপর মাঠে চাষের কাজ। একবার ফসল কাটবার সময় আমরা সদলবলে গিয়ে উপস্থিত। পরদিন ভোরেই বেরোতে হবে। বৌদি খুব রাগ করতে লাগল ফসল ওকে একলাই কেটে আনতে হবে বলে। সে ভারি পরিশ্রমের কাজ। সব সামলে একলা করা চাট্টিখানি কথা? গোপালদা মুখে রা কাড়ল না, মুচকি হেসে শুয়ে পড়ল। যথারীতি সকালে বেরিয়েও পড়ল। রাতে খাবার সময় সেবারের কথা মনে করানোতে বৌদি আঁচলের তলায় মুখ ঢেকে নিঃশব্দে হাসতে লাগল, আর গোপালদা হা হা করে। বোঝা গেল রাগ করলেও তার প্রশ্রয়ও ছিল।
বাড়ির পেছন দিয়েই সরযূ নদী বয়ে গেছে। রাতে তার স্রোতের আওয়াজ সারাক্ষণ কানে এসেছে। সকালে তার রূপ দেখা গেল। উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে এসেছে পাহাড়ি নদী। প্রবল তার স্রোত পাথরে পাথরে ধাক্কা লেগে ছিটকে ছিটকে উঠছে জল। আমরা একেবারে নদীর কিনারে গিয়ে বসে রইলাম। এক ভদ্রলোক মাছ ধরছিলেন। নদীর মধ্যে নেমে স্রোতের বিরুদ্ধে জল ঠেলে জল ঠেলে এগোচ্ছেন আর হাতের সুতো বাঁধা বঁড়শি ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন মাঝ নদী বরাবর। কখোনো-সখোনো তাতে মাছ উঠছিল। কাঁধের সাদা রঙের ঝোলাতে মাছগুলি জমাচ্ছিলেন তিনি। আমাদের কাছাকাছি এসে নদীর জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে এলেন। গায়ের পোশাক ভিজে শপশপ করছে। ওই ঠান্ডায়। আমরা তার কাছে গিয়ে দেখি ট্রাউট মাছ। বিঘৎ খানেক। গোটা পনেরো ষোলো।
সারাদিন গ্রামের বাড়িতে শুয়ে বসে কাটল আমাদের। গোপালদার ছোট ছেলে অমিত স্কুল ফেরৎ হই হই করে তার বন্ধুদের নিয়ে এসে পড়ল। বাড়িতে আমরা অতিথি মেহমান। ক্লাস ফোর এর বন্ধুদের কাছে তার কদর বেড়ে গেছে অনেক। “আও দেখো ইয়ে হামারা দাদালোগ।” অজয়, করণ, বশির, বিক্রম আর অমিত। আমাদের সঙ্গে গল্প হল খুউব। মাঝে মাঝে বৌদি চা করে দিয়ে গেলেন। গোপালদা পাশের ক্ষেতে কাজ করতে করতে আওয়াজ দিলো হো হো ও ও ও ও ও করে। তখন ধান পেকে ওঠার সময়। সবজি ক্ষেতে তদারকির সময়। দূরে একচিলতে বরফে মোড়া চূড়া। আঙ্গুল দিয়ে ওইদিক দেখাতে হাতে রোদ আড়াল করে গোপালদার বৃদ্ধ বাবা বললেন উয়ো কাফনি সাইড কা হ্যায় বেটা।

রাতে খাবার সময় চমক। ট্রাউট মাছ। যিনি মাছ ধরছিলেন তাঁর বাড়ি এ বাড়ির পাশেই। মেহমান বলে কথা, অতিথি দেবো ভব। সুতরাং সকালে ধরা মাছ এবাড়িতে চলে এসেছে। আর সে মাছের ঝোল আমাদের পাতে। খাওয়া দাওয়ার পর ছাতে চাদর মুড়ি দিয়ে এক আকাশ তারার নীচে বসে বসে গপ্প করতে করতে ঠিক করা হল সকালে মূল শিখর নারায়ণ মন্দির যাওয়া হবে। সেখান থেকে হিমালয়ের অসংখ্য বরফচূড়া দেখা যায় দিগন্তের প্রায় ১৮০ ডিগ্রি জুড়ে।
অমিতের স্কুল ছুটি। সেও চলল আমাদের সাথে। সারাদিনের শিখর মন্দিরের ঘোরাঘুরি আমার চিরকাল মনে থাকবে। মনে থাকবে কারণ ছোট্ট অমিতের খুশি ও আনন্দের ভাগীদার ছিলাম আমরা। সারাটা দিন আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় মন্দির চত্বরেই কাটল। পরদিন ফিরে আসবার সময় অমিতের চোখ ছলোছলো। অল্পেতেই তার নরম মন আমাদের সঙ্গে বেশি বেশি জড়িয়ে পড়েছে। ফিরে আসার পুরো পথটাই মন ভার হয়ে রইল অমিতের মুখখানা মনে করে। সেও প্রায় সাত আট বচ্ছর হবে। এখন বোধকরি অমিত বেশ বড়সড় হয়েছে তার বাবার মতো। বাবার পাশে পাশে কাজ করার জন্য সবল হয়ে উঠেছে তার কাঁধ। আবার একবার আমাদের দেখা হবে নিশ্চয়ই। একদিন। পাহাড়ের কোলে।
ছবি- অর্ণব