ভ্রমণ- পাহাড়ি গ্রামের গল্প- খাতি-ইন্দ্রনাথ- পুরোনো জয়ঢাক৫০-শরৎ ২০১৫

পাহাড়ি গ্রামের গল্প- আগের পর্বগুলো

bhromonkhatibhromonkhati2

bhromonkhati3

গতবারে খাইবগড় গ্রামের কথা বলেছিলাম মনে আছে তো! পিন্ডারি গ্লেসিয়ার যাবার পথে কাপকোট ভারারি ছাড়িয়ে সেই যে গোপালরামদার বাড়ি যেখানে! তো সেই পথেই আরেকটা গ্রাম হল খাতি। তবে একটু দূরে।

পিন্ডারির পথে পাহাড়ের মাথায় একটা বিখ্যাত জায়গা হল ঢাকুরিখাল। এই ঢাকুরিখাল পেরিয়ে আট কিলোমিটার গিয়ে তবে খাতি গ্রাম। পাহাড়ের মাথায়, তায় আবার খাল। শুনে অবাক হচ্ছ তো! খাল মানে গিরিপথ। পাহাড়ের গিরিশিরার মধ্যে অপেক্ষাকৃত নিচু অংশ, যেখান দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশে মোটামুটি সহজভাবে পারাপার করা যায় তাকেই ইংরিজিতে পাস আর আঞ্চলিক কথ্যভাষায় খাল বলা হয়।

ঢাকুরিখালের ঊচ্চতা কমবেশি ৯০০০ ফুট। সুন্দরডুংগা উপত্যকাতে যারা ট্রেকিং বা পর্বত পদযাত্রার জন্য যান তাঁদেরও এই খাতি পেরিয়েই যেতে হয়। তবেই দেখছো এই এলাকাতে দুটি দর্শনীয় স্থানে যেতে হলে এই গ্রামটা পেরোতে হচ্ছে। বস্তুত সুন্দরডুংগা নদী আর পিন্ডার নদী দুপাশ থেকে এসে এই গ্রামের পায়ের কাছে এসে মিলেছে। এবারে নদী পেরিয়ে যার যেদিকে যেতে ইচ্ছে করে চলে যাও।

প্রথমবার যখন আমি এই গ্রামে আসি সে এক মজার কান্ড। দিন দশ বারো পাহাড়ের জনমনিষ্যিহীন এলাকাতে ঘুরে ঘুরে ফেরাপথে সুন্দরডুংগা নদী ধরে তো আমরা রওনা দিয়েছি খাতির দিকে। এতদিন খাবার বলতে আটার রুটি আর আলু-কুমড়ো বা লাউয়ের সবজি ব্যস। সেদিন মনে খুব আনন্দ। খাতি গ্রামে একটা চায়ের দোকান আছে শুনেছি, তার লাগোয়া একটা চাল ডাল আনাজপাতির দোকানও আছে। সেখানে ডিম পাওয়া যায় আর চা দোকানিকে বললে সে কি আর এক আধটা ডিম ভেজে দেবে না? তো সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা তো প্রাণপণে হাঁটছি।

বিকেলের আলো মরে আসার আগেই আমরা একে একে সেই দোকানির চাতালে পৌঁছেও গেলাম। আর কী! প্রত্যেকের জন্য দু দুটো ডিমের ওমলেটের অর্ডার দিতে কি আর দেরি হয়? আমাদের এক বন্ধু বেশ চালাক, সে কি করল, একসাথে দুটো ডিমের ওমলেট না খেয়ে একটা একটা ডিমের দুটো ওমলেট খেল যাতে আমাদেরটা শেষ হবার পরও তার খাবার পর্বটা চলতেই থাকে।

খাতি বেশ বড়ো গ্রাম। এখানে আট ক্লাস অবধি স্কুল আছে। চাষের খেতও আছে অনেকখানি। সেখানে গম রামদানা আলু আর নানা রকম সবজির চাষ হয়। গরু ভেড়া ছাগল প্রায় প্রতি বাড়িতেই পালন করা হয়। ইদানীং ভ্রমনকারী বেড়ে যাওয়াতে বেশ কতগুলি থাকার জায়গাও হয়েছে । গ্রামের মানুষেরা হোটেলের ব্যবসা চালিয়ে দু পয়সা আয় করছে। কেউ কেউ ড্রাইভারি শিখে গাড়ি চালাচ্ছে। লোকসংখ্যাও আশপাশের অন্যান্য গ্রামের তুলনায় খাতি গ্রামেই বেশি। পিন্ডারির পথে এটাই শেষ গ্রাম কিনা। তাই এর গুরুত্বও অনেক বেশি।

এই এলাকার চার পাঁচটা গ্রাম নিয়ে যে পঞ্চায়েত তার মূল কেন্দ্র খাতিতে। গাড়োয়াল মন্ডল বিকাশ নিগম ছাড়াও লোকনির্মান বিভাগের বাংলোও আছে। সেখানেও লোক এসে থাকতে পারে।  আগে এ গ্রামে হেঁটেই আসতে হত। বছর দুই হল রাস্তা প্রায় এর গোড়ায় পৌঁছে গেছে। শেষের কিলোমিটার চারেক এখন হেঁটে গ্রামের ভেতর ঢুকতে হয়। গতবছর থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটি পোঁতার কাজও আরম্ভ হয়েছে তবে প্রথাগত বিদ্যুৎ সেখানে কবে পৌঁছবে তা বলা মুশকিল। আপাতত সৌরবিদ্যুতেই কাজ চলছে। গম ভাঙানোর কাজে কিন্তু পিন্ডারির খরস্রোতই ভরসা। জল এসে একটা পাথরের চাকা ঘোরাচ্ছে আর সেখানেই গম পেষাই। তার পাশ দিয়ে রাস্তা উঠে গেছে গ্রামের অন্যপাশে। সে পথে একটু এগোলে গ্রামের মন্দিরে ওঠার লম্বা সিঁড়ি। সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলে গ্রামের একেবারে মধ্যিখানে। মন্দিরের ঘন্টা বাজিয়ে পেন্নাম ঠুকে বাঁ হাতে খানিক গেলেই লোক নির্মান বিভাগের বাংলো আর তার গা লাগোয়া চায়ের দোকান।

জলবিভাজিকা কাকে বলে জানো নিশ্চই। দুটি উপত্যকার মাঝের পাহাড়শ্রেণী। এপাশের জল বৃষ্টি এপাশে ওপাশের জল বৃষ্টি ওপাশে। ওই যে বললাম সুন্দরডুংগা আর পিন্ডারি এসে গ্রামের পায়ের কাছে এসে মিলেছে। তো খাতিগ্রামের ওপর থেকে  এই দুই উপত্যকার জলবিভাজিকার পাহাড় চমৎকার দেখা যায়। যেন মনে হবে ভুগোল বই থেকে আঁকা ছবিটাই এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। দূরের পাহাড়গুলো পরপর ছায়া ছায়া হয়ে কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে। সুন্দরডুংগা নদী বরাবর আরো ওপাশে তাকালে মাইকতোলি পাহাড় দেখা যাবে। অবশ্য আকাশ পরিষ্কার থাকলে তবেই। মাইকতোলি বেশ উঁচু শৃঙ্গ। আট হাজারি না হলেও সাত হাজারির দলে পড়ে সে। আর তাতে চড়া মোটেও সহজ কার্য নয়। বেশ শক্তপোক্ত কাজ সেটা। পর্বতারোহী মাত্রেই জানেন সেটা।

bhromonkhati4

জলবিভাজিকা-বাঁয়ে সুন্দরডুংগা, ডাইনে পিন্ডারি

এই খাতিতে ঢোকার মুখে একবার এক কান্ড হয়েছিল। সেবারে ফিরছিলাম পিন্ডারির দিক থেকে। দিব্যি সুন্দর পথ। একটু আধটু ঝিরি ঝিরি যা বৃষ্টি বাদল হচ্ছে তা ধর্তব্যের মধ্যে না আনলেই হয়। খুশি মনে রাস্তা চলছি। খুব যে চড়াই উৎরাই তাও নয়। বেশ খানিকটা পথ বাকি তখনও। ডান পাশের পাহাড় বেয়ে এসে রাস্তার ওপর দিয়ে এক চিলতে ধারা বয়ে চলেছে। বড় করে পা ফেললেই তাকে ডিঙিয়ে যাওয়া যায়।

কেন জানিনা ধারাটার কাছাকাছি আসার পর, ফুট পাঁচেক দূর তখন, দেখি কি, ডানপাশ থেকে একটা নুড়ি জলের সাথে গড়িয়ে পড়ল। মন কু গেয়েছিল কিনা আজকে আর মনে নেই। থমকে দাঁড়ালাম কয়েক সেকেন্ড। আর অমনি ওপর থেকে একখানা একতলা বাড়ির সমান পাথর রাশি রাশি ছোটো পাথর কাদাগোলা জল, মাটি বালি সমেত  হুড়মুড় করে এসে পথের প্রায় সাত আট ফুট সমেত বাঁদিকের ঢালে নেমে গাছগাছালির ভিড়ে ফুট দশেক নেমে স্থির হল। হঠাৎ অমন দাঁড়িয়ে না পড়লে ওই স্তুপের নিচে আমাদেরও ঠাঁই হত বলাই বাহুল্য। মিনিট দশেক অপেক্ষা করে অতি সন্তর্পণে আমরা ওই ধসা জায়গাটা পেরোলাম। খাতি বাংলোতে পৌঁছতে এর পর আরও ঘন্টাখানেক লেগেছিল। আর পৌঁছনোর মিনিটখানেকের মধ্যে প্রবল তোড়ে বৃষ্টি নেমেছিল। সাত আট ঘন্টা সেই বৃষ্টির জেরে আমাদের পেরিয়ে আসা গ্রামে ঢোকার রাস্তার প্রায় আধকিলোমিটার সম্পূর্ণ পিন্ডারিতে নেমে গিয়েছিল। আজও গেলে পরিষ্কার দেখা যাবে কেউ যেন কেক কাটার মতো করে মসৃণভাবে পাহাড়ের একপাশ কেটে নিয়েছে অর্ধচন্দ্রাকারে। সোজা দুশো ফুট নীচে নদীর কূল অবধি। পিন্ডারি এখানে যথেষ্ট খরস্রোতা।

নায়কদাদা এই সেদিন বলছিলেন,“প্রকৃতপক্ষে অ্যাডভেঞ্চার করা যায় না,অ্যাডভেঞ্চার হঠাৎই অভিযাত্রীর সামনে এসে দাঁড়ায়।” এমনভাবেই হয়ত।

ছবি- তমালিকা কুন্ডু

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply