ভ্রমণ- পাহাড়ি গ্রামের গল্প- ডুংরি-ইন্দ্রনাথ- শরত ২০২৫

পাহাড়ি গ্রামের গল্প- আগের পর্বগুলো

bhromonkhati

“নানা! পরনাম।”

কচি গলার আওয়াজে মুখ তুলে দেখি, গ্রামের ওপরের বাড়িঘরের দিকে চলে যাওয়া পাথুরে রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে একটা বছর তিনেকের ছেলে হাসি হাসি মুখ করে হাত জোড় করে আমাদের দিকেই তাকিয়ে। আমার পথসঙ্গীটি ওর নানা অর্থাৎ দাদু। বাচ্চাটার খালি পা, মাথায় চুল চুড়ো করে বাঁধা। হাত জোড় করা এদিকে মুখময় দুষ্টুমির হাসি।

আমরা সেই রাস্তায় পা রাখতেই সে দু-পা এগিয়ে এল। তার নানামশাই একটু নীচু হয়ে আদর করতে যেতেই ছেলেটি তার কানে কানে অস্ফুটে বলল, ‘টফি লায়া?’ আস্তে বললেও আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। উত্তরে তাকে কোলে তুলে বাড়ির দিকে উঠতে থাকল তার দাদু। আমি পিছন পিছন। কয়েক পা যেতে না যেতে আরেকটি ছেলে এসে জুটে গেল আমাদের সঙ্গে। এর বয়েস পাঁচ।

আমার দিকে চেয়ে ছেলেটিকে দেখিয়ে বীরু বলে,“ঊষার বড়ো ছেলে, আয়াংশ, দাদা!”

বীরু আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। পাহাড়ে প্রায় সবসময়ের সঙ্গী। আমায় সে মাঝে মাঝেই তার বড়ো মেয়ে ঊষার অনুযোগ শুনিয়ে থাকে। কখনও দূরভাষেও। অনুযোগ এই যে আমি ঊষার শ্বশুরবাড়ি যাইনি। যাচ্ছি যাব করেও শেষ অবধি গিয়ে উঠতে পারিনি। এবারে যাব মনস্থ করায় বীরুও সঙ্গী হল স্বাভাবিকভাবেই। তার কোলেই এখন ঊষার ছোটো ছেলে, কানহা। অর্থাৎ কিনা কানু। তারপর কানহার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদ করে বীরু বলে, “এটা কিন্তু মহা বিচ্ছু দাদা!”

বাড়িতে পৌঁছোতেই কোল থেকে পিছলে নেমে বাড়ির ভেতর ছুট লাগাল কানহা। এখন গাড়ি গ্রামের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়। সে-জায়গাটা একটু চওড়া, সেখানে দু’চারটে দোকানপাট, গাড়ি-রাস্তার পাশে ছাড়া ছাড়া গ্রামের মানুষদের দু’চারটে বাড়িঘর। পাথুরে রাস্তাটা এঁকে বেঁকে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে এসেছে, গ্রামের ভেতরের দিকে, মূল অংশে। এই রাস্তার পাশে গায়ে গায়ে বাড়ি। মাটির গন্ধ, পুয়ালের গন্ধ, গোবরের গন্ধ, কাঠের জ্বালের ধোঁয়ার গন্ধ মিশে রয়েছে গ্রামের সকালের বাতাসে। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই গোরু-মহিষ পালন করা হয়। ইদানীং গ্রামের ছেলেরা বাইরে নানান সরকারি বেসরকারি চাকরি অথবা আর পাঁচটা পেশার কারণে চলে যাওয়ায় গ্রামের বাড়িঘরের ছবিটাও বদলে গেছে। এইসব বাড়িঘরের সংস্কার হওয়ায় কিংবা নতুন করে তার নির্মাণ হওয়ায়, তার সঙ্গে আর পাঁচটা শহুরে জনপদের বাড়িঘরের নির্মাণের আর কোনো তফাৎ নজরে আসে না। তফাৎ নজরে পড়ে না তরুণ-তরুণীর বেশভূষাতেও। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো বাড়ির পাথরের প্রাচীন দেওয়ালে দেওয়ালে কিংবা গোয়ালের ছাতের পাথুরে টালি, পাথরের খিলান কিংবা বয়স্ক পুরুষ অথবা নারীর কাজকর্মে, বেশভূষায় চিরাচরিত গাড়োয়ালি ছবি উঁকি মারে। ঊষার শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেই আমার তেমনি প্রাচীন একটি গাড়োয়ালি ছবি নজরে এল। বাড়ির সামনের উঠোনের অর্ধেকটা জুড়ে খেত থেকে তোলা মুসুরডাল প্লাস্টিকের ওপর ঢেলে রাখা। ঊষার শাশুড়ি তাতে রোদ খাওয়াচ্ছিলেন এবং বাছাবাছি করছিলেন। আমায় দেখে একবার হাত তুলে নমস্কার করেই কাজে মন দিলেন। ঊষা একঝলক হেসেই রান্নাঘরে ঢুকে গেল জল এনে দিতে। বাড়ির একপাশে গোয়ালঘর, একটু নীচে। অন্যদিকে থাকার ঘর। পুরোনো ইমারতের ওপরে নতুন একপ্রস্থ ঘর তুলে দোতলা হয়েছে। উঠোন থেকে লোহার সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার বারান্দায়। উঠোনের একপাশে বাড়ির সীমানা বরাবর এক ফুট উঁচু করে ইট গাঁথা। ওপরটা ফুট দেড়েক চওড়া। সেইখানে দিব্যি বসা যায়। আমি ওই পাঁচিলের ওপরে বসে বসে ছোট্ট ঊষার পাকা গিন্নি হয়ে ওঠাটা দেখছিলাম তারিয়ে তারিয়ে। চটকা ভেঙে গেল একটা কচি হাত এসে গায়ে লাগতে।

“আপ বড়ে নানা হো?” কানহার গলায় এক ছটাক প্রশ্নের সঙ্গে চার ছটাক কৌতূক মেশানো। কচি ছেলেটির চোখে হাসির ঝিলিক। আমি তার কথার জবাবে ঘাড় নেড়ে পকেট থেকে লজেন্স বের করে হাতের তালুতে রাখতেই সে আরেকটু কাছ ঘেঁসে এল আমার।

ডুংরি গ্রামের উত্তর পশ্চিম দিকে পাহাড়ের ঢাল ক্রমে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সেইদিকে তাকালে একেবারে পেছনে যে পাহাড়ের ধার অবধি চোখ যায় সেটা টপকে গেলে কল্পেশ্বর হয়ে আসা রুদ্রনাথজির তীর্থপথে পড়া যায়। ওই জায়গার স্থানীয় নাম তালি, আরও কিছু পথ এগিয়ে গেলে ডুমক গ্রাম। এসব অঞ্চল চামোলি জেলার মধ্যে পড়ে।

ঊষার বরের নাম রিপু, রিপু ঝিঙ্কোয়ান। তার টেন্টহাউজের ব্যাবসা। অর্থাৎ ডেকরেটরের। আশপাশে দুচারটে গ্রামের যেকোনো পালা-পার্বন, বিয়েশাদি, অন্নপ্রাশন, সদ্যজাতের নামকরণ সবেতেই ও চেয়ার টেবিল প্যান্ডেল ভাড়ার বরাত পায়। সেইসঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ভিডিও ফটোগ্রাফি। এ জিনিসটার খুব জনপ্রিয়তা দেখেছি গাড়োয়ালি গ্রামের বিয়েতে। আমাদের এখানে যেমন মালাবদল, তেমনিই ওদের সে অনুষ্ঠানটাকে বলা হয় জয়মালা। বিয়েতে অন্যতম মুখ্য আকর্ষণ। কৃত্রিম ফুলের মালা এবং টাকার মালা তার অন্যতম উপচার। ওই অনুষ্ঠানই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেকক্ষণ চলে। এহেন দৃশ্যের ক্যামেরাবন্দি হওয়া তো বাধ্যতামূলক। ভিডিও ক্যামেরাম্যানের তাই আলাদা খাতিরদারি। তবে শুধু তা দিয়ে তো আর এই ছোট্ট জনপদে সংসার চলে না। তাই চাষের কাজ, ঘরদোর সারানো, রঙ করা, যখন যা পায় তেমন হাতের কাজকর্মও করে ঊষার জামাই। ছেলেটিও বেশ ভালো, কম কথা বলে, বেশ লাজুক প্রকৃতির। ঊষাকে দেখেও মনে হল সেও বেশ সুখেই আছে।

রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ ভেসে আসছিল। ঊষা রান্নাঘরের দরজার বাইরে মাটিতে থেবড়ে বসে ঝুড়িতে শাক কুচিয়ে রাখছিল। বীরু বলল, “চলো দাদা, রান্না হতে হতে ভৈরবনাথের মন্দির থেকে ঘুরে আসি।” শোনা মাত্র ছোটো দুই ছেলে ঝড়াকসে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল নানার দু-পাশে। তাদের স্নান করিয়ে দিয়েছিল তার মা। মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, মুখটা ভালো করে মোছানো, পরিষ্কার জামা গায়ে, পায়ে চপ্পল – দুজনেই তখন ফুলবাবু। মহা সমারোহে আমরা গ্রামের পথে চললাম। দু-পা যেতে না যেতেই এক বাড়ি থেকে ডাক। এক ভদ্রলোক বাড়ির সামনেই চেয়ার নিয়ে বসে কাজকর্মের তদারক করছিলেন। কাজকর্ম মানে ঘরদোর মেরামতি। পুরোনো বাড়িটার জীর্ণ দশা। বহুদিন সেখানে বসবাস হয়নি। ভদ্রলোক ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। উত্তরাখণ্ডেই নানান শহুরে জনপদে থাকতে হয়েছে। ছেলেমেয়েরাও বাইরে বাইরে। এইবারে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছেন গ্রামে। সেকারণেই ঘরদোর মেরামতির কাজ চলছে। পাশেই তাঁর ভাইপোর বাড়ি। তারও চাকরিস্থল চামোলি জেলাসদর গোপেশ্বর। তবে সে সেখানে একাই থাকে। সপ্তাহান্তে বাড়িতে যাতায়াত করে। একথা সেকথা চলতে চলতেই ভাইপোর বাড়ি থেকে চা বিস্কুট চলে এল। আমরা রাস্তার পাশে বাড়ির দাওয়াতেই পাথরের ওপর বসে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। ছোটো ছেলেদুটির এবাড়িতে অবারিত দ্বার। তারা দিব্যি মহা হট্টগোল, হুড়োহুড়ি এবং নানাবিধ কসরৎ দেখাতে শুরু করে দিল। চা পর্ব শেষ হলে আমরা গ্রামের কংক্রিট-পাথর-বাঁধানো পায়েচলা পথে উঠতে থাকি। গ্রামদেবতার মন্দির, সুতরাং তাঁর স্থান গ্রামের সর্বোচ্চ বিন্দুতে। শুনশান একরত্তি মন্দির চত্বর। মন্দিরের দরজায় তালা। পুরোহিত সকালের পুজোপাঠ সেরে চলে গেছেন। ফের সন্ধ্যায় এসে আরতি করে ঠাকুর শয়ান দেবেন। মন্দির লাগোয়া খানিকটা বিস্তৃত সমতল এলাকা। চারপাশে পাঁচিলঘেরা। পাঁচিলের গায়ে সিমেন্টের রোয়াক রয়েছে বসার। আমরা সেইখানে বসে খোশগল্প করতে লাগলাম। আর দুটি বালক মন্দির চত্বরে আপন মনে খেলে বেড়াতে লাগল। মন্দিরের অবস্থান গ্রামের একেবারে ওপরে এবং শেষ মাথায় হওয়ায় সামান্যতম কোলাহলও নেই। কথা বলতে বলতে কখন চুপ করে গিয়েছি, রোদ্দুরের আমেজে চোখ বুজে এসেছে টেরই পাইনি। বীরুর ডাকে ঘুম ভাঙে, “দাদা, ওঠো। নীচে যেতে হবে।”

দুপুরের খাওয়া হল ভাত, ডাল, শাকভাজা আর ঘরে পাতা ঘন দই। যত্ন করে আমাকে আর তার বাবাকে থালায় ভাত বেড়ে দেয় ঊষা। শাশুড়ি একপাশে বসে দেখভাল করেন। অতিথি নারায়ণ বলে কথা! রিপু নীচে একটি বাড়িতে রঙের কাজে গিয়েছিল। দুপুরে সেও খেতে এসেছিল বাড়িতে। খেতে খেতে তার সঙ্গে কথাবার্তা হল। সে যত না জবাব দেয় তার চেয়ে ঘাড় নাড়ে বেশি। আর তার হাত চলে আরও অনেক বেশি, সবসময়ই এটা সেটা কাজ করেই চলেছে সে। নিদেন ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, নয়তো ছেলেদের মৃদুস্বরে শাসন, ডালের বস্তাগুলো ঘরে তুলে রাখা, জলের বালতিটা ওপরের তলায় তুলে আনা – কাজের কি শেষ আছে? এরই মধ্যে ঊষার সঙ্গে তার সাংসারিক কথাও হয়ে যায় একঝলক, সেসব আমাদের কানে আসে না অবশ্য। তবে বড়ো গোপন, নরম ও শান্ত সে বার্তালাপ। তা দেখে আমার মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে সুখে শান্তিতে আছে দেখলে কার না মন খুশি খুশি হয়! খেয়েদেয়ে আঁচিয়ে এসে বারান্দার চৌকিতে বসতে না বসতে ফের চোখ জুড়িয়ে আসে।

ঘুম ভাঙল যখন রোদ পড়ে এসেছে। ছেলেরা পাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গেছে। ঊষার শাশুড়ি সারাদিনের ঘরের কাজ সেরে গোয়ালে গেছেন গরু মহিষের পরিচর্যা করতে। ঊষা হাতের কাজ সেরে বাড়ির বারান্দায় বসে সোয়েটার বুনছে। আমি বীরুকে ডেকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি। এপাশটায় পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নীচে, এদিকটায় গ্রামের ঘরবাড়ি তেমন নেই। গ্রামের মানুষের চাষের খেত এদিকটায়। পাহাড়ের ঢালে গাছপালায় ঢের হয়ে আছে। পাথর বাঁধানো রাস্তা নীচের দিকে নেমে চলেছে। গ্রামকে পাক দিয়ে আসা গাড়ি রাস্তায় গিয়ে মিলবে এ-রাস্তা। যদিও এপাশটায় এখনও গাড়ি চলে না। গাড়ি এসে গ্রামের পায়ের কাছে যেখানে থামে, সেই অবধিই মোটামুটিভাবে পিচ রাস্তা। সেখান থেকে গ্রাম ছাড়িয়ে রাস্তা আরও মাইলখানেক এগিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু তা গাড়ি চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠেনি এখনও। ফলে রাস্তার সে অংশে আপনা থেকেই জংলি গাছ গাছড়া, ঘাস গজিয়ে রয়েছে। এহেন রাস্তায় নেমে আসার দশ কদম আগে বাঁদিকে একটা প্রাচীন পাথরের নির্মাণ দেখে চোখ আটকে গেল। ঘরের মতো একটা ছোটো খুপরি। পাথরের দেওয়াল, ছাত। তার ভেতরটা কুয়োর মতো। গাড়োয়ালের গ্রামে পানীয় জল সংরক্ষণের প্রাচীন ব্যবস্থা। বীরুও ঘাড় নাড়ে, “আগে এখান থেকেই গ্রামের জল যোগান যেত দাদা।” এখন আর লোকে ব্যবহার করে না। দেখছ না কেমন শ্যাওলা পড়ে গেছে। আগাছা গজিয়েছে। চকিতে মনে পড়ল সিস্টার নিবেদিতার কেদারবদ্রি তীর্থ ভ্রমণের লেখায় এমন পাহাড়ি উৎসের পানীয় জল সংরক্ষণ এবং তাকে দূষিত না হতে দেবার ব্যবস্থার কথা আমি পড়েছি। উনি এই নির্মাণ এবং তার নানান চিহ্ন ও নিদর্শন দেখে এগুলির উপর বৌদ্ধ প্রভাবের কথা ব্যাখ্যা করেছেন। গ্রামের একপ্রান্তে থাকায়, এটির ব্যবহার না হলেও টিকে আছে। কিছুদিন বাদে হয়তো এটুকুও থাকবে না।

পাহাড়ের বহু প্রত্যন্ত গ্রামে এখন গাড়ির রাস্তা, বিদ্যুত ও মোবাইল টাওয়ার পৌঁছে গেছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার কয়েকগুণ উন্নতি হয়েছে। লোক হলে, সওয়ারি-গাড়ি কেবল এক-দুটো চলাচল করে, কেননা ওপথে যাওয়াআসার লোকজন খুব বেশি হয় না। নিয়মিত সকাল বিকেল নির্দিষ্ট সময় অন্তর সওয়ারি-গাড়ি চলাচল স্বাভাবিকভাবেই নেই। তবে রাস্তা আছে যেহেতু, একটু খোঁজাখুঁজি করলে গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যায়। যাতায়াত খরচ কিছু বেশি পড়ে। গ্রামের সীমানা ঘুরে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে দেখি গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে বিজলি বাতি জ্বলে উঠেছে। আজ প্রায় সব বাড়িতেই টুনি বালব দিয়ে সাজানো। কারণটা পরে জানতে পেরেছিলাম। ফেরার পথে আরেকটা ব্যাপার ঘটেছিল। বীরু সঙ্গে থাকায় গ্রামের যে লোকের সঙ্গেই দেখা হল তারই সঙ্গে কুশল বিনিময় হল এবং অন্তত চার পাঁচটা বাড়িতে চা খেতে হল। ঘন মহিষের দুধ দেওয়া মিঠে চা। শেষ বাড়িটির গিন্নিমাকে হাত জোড় করে অনেক বলে কয়ে নিরস্ত করতে হল যে উপর্যুপরি আর চা পান পেরে উঠছি না।

ফেরার পর ঊষা জানাল যে, আমাদের ফের ওই নীচের গাড়ি রাস্তার কাছে ওর ভাসুরের বাড়ি যেতে হবে। মালপত্র এখানেই থাক, চাদর আর পাজামা নিয়ে গেলেই হবে। রাতটুকু ওবাড়িতেই কাটাতে হবে। বিষয়টা হল এই যে সেদিন পার্বনের দিন। দিনটিকে এরা বলেন ছোটি দিওয়ালি। তাই এত আলোর মালা। এখন ছোটো ভাইয়ের বাড়িতে দ্বিপ্রহরে অন্নগ্রহণ হয়েছে অতিথির। ওদিকে বড়ো ভাইয়ের বাড়িতে পাত না পাড়লে যে গৃহস্থের অকল্যাণ। বিকেলে জা এসে বাড়িতে বলে গিয়েছেন যে দুই অতিথি যেন রাতটা অবশ্যই ওবাড়িতে কাটাই। রিপু ঝিঙ্কোয়ানের বড়ো ভাই কেদার-বদ্রি মন্দির কমিটির গেস্টহাউজের দেখভাল করেন বদ্রিনাথ-এ। সেখানে মন্দির বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর পোস্টিং হয় চামোলি বা কর্ণপ্রয়াগে। সেসময় তিনি বাড়ি থেকেই যাতায়াত করেন।

ঊষার বাড়িতেও দোতলা জুড়ে টুনিবালবের সজ্জা। ঝিকিমিকি লাল হলুদ সবুজ নীল আলো জলছে নিভছে। বীরু ওর নাতিদের জন্য পটকা কিনে দিয়ে এসেছিল। নীচের ভাসুরের বাড়িটিতেও দুটি ছোটো ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদের জন্যও ও আসবার পথে গ্রামের দোকান থেকেই রং মশাল কিনে আনল। আমরা নীচের বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই পিছু পিছু কানহা আর আয়াংশ এসে হাজির। বাড়ি তাদের খুব দূরে নয়। তবু গ্রামের রাস্তা, অন্ধকার তো বটে। তো জানা গেল তারা এবাড়িতে একত্রে পটকা ফাটাতে এসেছেন। ওপরের বাড়িতে ফাটালেই চলত কিন্তু নানা যেহেতু চলে এসেছে, অগত্যা। তো সেসব হুল্লোড় শেষে বীরু গেল তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে আর আমি অন্ধকারে ওপাশের পাহাড়ে আলোর রোশনাই দেখতে থাকলাম। গ্রামের গাড়িরাস্তার ধারে চারকামরার একতলা বাড়ি ঊষার বড়ো ভাসুরের। চওড়া, উঁচু বারান্দা। পাহাড়ের গায়ে বাড়িগুলোয় আলোর মালা। মাঝে মাঝে ছোটি দিওয়ালির পটকা ফাটে। আকাশে তুবড়ির আলো সাদা হলুদ লাল রঙে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকারের বুকে বেশ লাগে দেখতে। ঊষার বর রিপু এসে খাওয়া শোওয়ার ব্যবস্থার তদারকি করল। ঊষার জা, লক্ষ্মী, ঊষার চেয়ে মেরেকেটে চার পাঁচ বছর বড়ো হবে। তো বৌদির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে রিপু রুটিও বানাতে সাহায্য করল। রুটি ডাল আর কুমড়োর তরকারি। সামান্য আয়োজন কিন্তু এত ভালোবাসা আর যত্নের ছোঁওয়া তাতে যে মাথা আপনা থেকেই ঝুঁকে আসে। মন কানায় কানায় ভরে ওঠে ভালোলাগায়।

ঠিক হয়েছিল ছিনকা হয়ে দুজনে হেঁটে ফিরব। ছিনকা গ্রাম অলকানন্দার ডানপাড়ে। চামোলি পেরিয়ে বদ্রিনাথের দিকে কিছুটা এগিয়ে জাতীয় সড়কের ঠিক উল্টোদিকে। ডুংরি গ্রাম থেকে পাহাড়ি ঢাল ধরে জঙ্গলের রাস্তা ধরে সোজা সেখানে নেমে আসতে কিলোমিটার ছয়েক পথ হাঁটতে হয়। ভোররাতে উঠে বেরিয়ে পড়ব শুনে ঊষা হাঁ হাঁ করে ওঠে, “না না তাউজি, অত ভোরে না। ও জঙ্গলে ভালুক বেরোয় প্রায়ই। আলো না ফুটলে যেও না।” তার কথা মেনে নিয়ে সকালে দুটো রুটি চায়ে ডুবিয়ে খেয়ে তবে বেরোই। ঊষাও আমাদের পিছু পিছু গ্রামের শেষ মাথা অবধি আসে, তারপর আমরা জঙ্গলের রাস্তায় ঢাল বরাবর পা রাখতেই সে আর সামলাতে পারে না -ডুকরে কেঁদে ওঠে। ফিরে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ষাটষাট করেও কান্না থামানো যায় না। ওদিকে তার বাপেরও চোখ ভরে উঠেছে জলে। বীরুরই ধাত পেয়েছে তার মেয়ে। একরকম জোর করে ফের জঙ্গলের পথে নেমে চলি। মনটা খারাপ লাগে। সকালে ওর ভাসুরের বাড়ি থেকে বিদায় নেবার সময়, লক্ষ্মী তার হাতে ধান-হলুদের টিকা আর প্রদীপ জ্বালিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। পার্বনের দিনে অতিথি বিদায় এভাবেই দিতে হয়। গাড়োয়ালি রীতি। তাকিয়ে দেখি মেয়েটির চোখে জল। খুবই আশ্চর্য হই। এ তো আমায় চেনেও না ভালো করে। তাহলে? ‘তাহলে’র উত্তরও পেয়ে যাই লক্ষ্মীর কথায়।

“তাউজি, আবার এই এত দূরের গ্রামে কখনও আসবে কিনা আমি জানি না। তবে এলে খুব খুশি হব। জেনো এগ্রামে তোমার আরেকটা মেয়ে তোমাকে মনে রেখেছে।” সম্পর্কের এই বহুমূল্য অথচ সহজ সমীকরণটা আমরা রাতদিন উন্নতির দৌড়ের ঠেলায় ভুলেই গিয়েছি একরকম।

চারপাশে আমলকি, বাঞ্জ, বাঁশগাছের প্রবল হুড়োহুড়ি। এত ভিড় আর ঠাসাঠাসি যে ডাইনে বাঁয়ে নজর চলে না। রাস্তার ওপরেও আগাছার ভিড়ে রাস্তা দেখা যায় না। গাড়ির রাস্তা হয়ে ইস্তক গ্রামের মানুষ এই রাস্তা প্রায় ব্যবহারই করে না। ফলে জঙ্গল তার দখল নিয়ে নিয়েছে। মাঝে মাঝে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি। গাছপালার আড়ালে ঢেকে গেছে ডুংরি গ্রাম। ক্রমে ছিনকা কাছে আসে। অলকানন্দার ওপর পুলের খানিক আগে ছিনকার শিবমন্দিরের কাছকাছি এসে একটু দাঁড়াই। গ্রামের পুরোহিতের সঙ্গে দেখা হয়। রঘুনন্দনজি। ডুংরি থেকে জঙ্গল রাস্তায় হেঁটে নেমেছি বলে বেশ খুশি হন, বীরুকে হেঁকে বলেন, “দিখাও দিখাও, দাদাকো দিখাও! গাড়োয়ালকা এহি তো হ্যায় আসলি রূপ।” কুশল বিনিময়ের পর উনি চলে যান ওর কাজে আর আমরা অলকানন্দার পুলের ওপর উঠে আসি ওপারের সড়কে পৌঁছোবো বলে।

সড়কের ধারে চা-দোকান থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে আসছিলেন। ডুংরি গ্রাম থেকে বয়ে আনা, মসৃণ ছোটো লাঠিটা তার হাতে তুলে দিলাম। ডান হাতে সেটা নিয়ে দুবার মাটিতে ঠুকে দেখে, সারাটা মুখ হাসিতে ভরিয়ে হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন বৃদ্ধ মানুষটি। কখনও কখনও অনেক শব্দের বদলে সামান্য হাসিই ঢের বেশি কথা বলে। 

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply