জয়ঢাকের বিপুল ভূতের আড্ডা

পার্ক স্ট্রিট থেকে মল্লিক বাজারের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে দক্ষিণ পার্ক স্ট্রিট কবরখানা। শ্যাওলা পড়া, গাছা গাছালিতে ঢাকা ভিনদেশী কবরগুলো সময়ের সাথে সাথে মিলিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়।
একেতেই সেকালে মানুষের আয়ু বেশি হত না। তার উপর বিদেশি আবহাওয়া, যুদ্ধ, মহামারি এসবের প্রকোপে ইংরেজদের কবর দেওয়ার জায়গার অভাব পড়ে। এইজন্যই সতেরশো সাতষট্টি সালে তৈরি করা হয় এই কবরখানাটিকে।
আজ যা পার্ক স্ট্রিট তখন তার নাম ছিল বেরিইং গ্রাউন্ড রোড বা বাংলায় বললে, কবরখানা রোড। নামেই বোঝা যায় হয়তো সে সময় কী হারে মানুষ মারা গেছিলেন। এই কবরখানা উইলিয়াম জোন্স ,ডিরোজিও , জর্জ বগল এবং আরো অনেক বিখ্যাত ইংরেজদের সমাধিস্থল ।
শেওলায় ঢাকা এই কবরখানা বর্তমানে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্ররবেক্ষন বা আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার এর তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। কবরখানার দরজা রোজ সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে। কবরখানার স্থাপত্য সময়ের সঙ্গে শ্যাওলা জমে আর রঙ চটে এক অদ্ভুত সুন্দর রূপ নিয়েছে। ভিতরে ঢুকলে মনে হয় যেন শহরের বুকের মধ্যে থেকেও শহর থেকে অনেক দূরে নির্জন কোথাও এসে পড়া হয়েছে, যেখানে হয়তো বা আসা বারণ, হয়তো বারণ সেইখানকার একাকিত্বে বাধা দেওয়া। প্রচুর মানুষ প্রায় প্রতিদিনই এখানে আসেন ছবি তুলতে, আড্ডা মারতে বা নেহাতই নির্জনে সময় কাটাতে। কবরখানার প্রচুর ছবি ইন্টারনেট ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু যা শুধু অনুভব করা যায়, দেখা যায় না। যা চোখের পলক ফেলতেই হারিয়ে যায় অন্ধকারে তাকে ক্যামেরায় বন্দি করলে সমস্যা হতে পারে।

দুহাজার সাত সালে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী সেমিটেরিতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তখন তারা বেশ কিছু ছবিও তোলেন। ছবিগুলো প্রিন্ট হয়ে আসলে বেশ কটা ছবিতেই কিছু কালো ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। ছবির রিল আবার ওয়াশ করালেও সেই ছায়া থেকে গিয়েছিল। একবার সেমিটেরিথেকে বেরোবার পরই আমার এক পরিচিত রাস্তার মাঝখানে বমি করতে শুরু করে। সুস্থ সবল ছেলেটা হঠাৎ বমি করতে শুরু করলে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় তার নাকি হঠাৎই মনে হয়েছিল তার স্পাইনাল কর্ডে কেউ আঁচড় কাটছে।
এরকম বমির ঘটনা আরো অনেকের সাথে হয়েছে আগে। একজন তাঁর নিজস্ব ব্লগে লিখেছেন, “আমি ছবি তুলে বেরোবার পর থেকেই আমার হঠাৎ করে হাঁপ উঠে গেল , কিছু বুঝলাম না কেন। আমার তো হাঁপানিও নেই।”
এখানকার প্রহরীরা অবশ্য এই ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ আষাঢ়ে গল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকেই অপার্থিব কিছু দেখার আশা নিয়ে এসে ফিরে গেছেন খালি হাতে। তবু এটা মনে রাখতেই হবে, সবার পঞ্চেন্দ্রিয় সমান হয় না। আর এইসব অনুভূতি দেখে বোঝা সম্ভবও হয়না হয়তো। সেমিটেরিতে ঢোকার পরথেকেই গা ছমছম করাটাও স্বাভাবিক। কবরের নীচের মানুষগুলোর মতই এই কবরখানাও মৃত যে। তার আত্মাটাও তো শান্তি পায়নি।