বিচিত্র দুনিয়া- ডাইনি গ্রাম-অরিন্দম দেবনাথ-শরত’২৫

 

ক্যালকাটা ভেকিয়া (Calcata Vecchia) ইতালির এক গ্রাম। জনশ্রুতি, যখন তীব্র গতিতে হাওয়া বয় তখন এই প্রাচীন মধ্যযুগীয় গ্রামের গলিতে গলিতে ডাইনিদের গান শুনতে পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, এই গ্রাম একসময় জাদুবিদ্যা চর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছিল। লিখেছেন – অরিন্দম দেবনাথ

রোম শহর থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে সবুজে ছাওয়া ট্রেজা উপত্যকার লাজিও অঞ্চলের এক পাহাড়ের মাথায় রয়েছে এক বহু প্রাচীন গ্রাম। গ্রামের প্রাচীন বাড়ি, আঁকাবাঁকা রাস্তাঘাট সেই মধ্যযুগের। নয় নয় করেও হাজার তিনেক বয়স হবে গ্রামটার। দুর্গ গ্রামে রূপান্তরিত হবার আগে এটি ছিল একটি রোমান বসতি। এই গ্রাম প্রথম থেকেই খ্যাতি অর্জন করেছিল জাদু ও ডাকিনী বিদ্যার চর্চাকেন্দ্র হিসেবে। যদিও এই নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কিংবদন্তি বলে, গ্রামটি একসময় মূলত জাদু এবং এই ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের আশ্রয়স্থল ছিল। বলতে গেলে জাদুকরি বা ডাকিনীবিদ্যা চর্চাকারীদের অভয়ারণ্য ছিল। এই মহিলা বা ডাকিনীরা নানা তন্ত্রমন্ত্র জানত। এরা প্রকৃতিকে বশ মানাতে, লোকের অসুখ সারাতে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাতে পারত। এমনকি চাইলে মানুষকে অন্য পশুতে রূপান্তরিত করতে পারত। প্রচলিত বিশ্বাস, জোরালো বাতাস বইলে যেসব অদ্ভুত শব্দ শোনা যায় তা আসলে না দেখা ডাইনিদের মন্ত্র উচ্চারণের গান।

ইতালিয় জাদুবিদ্যার চল প্রাচীন মূর্তিপূজার (পৌত্তলিক) রীতিনীতির সঙ্গে খ্রিস্টধর্ম প্রসারের পাশে পাশে নানা ইতালিয় উপদ্বীপে টিকে ছিল। এই জাদুবিদ্যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খ্রিস্টীয় প্রথার সঙ্গে মিশে নতুন রূপ পেয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কিছু ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান ও ইতালিয় লোককাহিনির পন্ডিতদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রাচীন কলার প্রতি আগ্রহ নতুন করে দেখা দিয়েছে। ‘স্ট্রেঘেরিয়া’ (stregheria)  – এই কলা নিয়ে চর্চার নতুন নাম। শোনা যায়, বেশ কিছু অঞ্চলে এই চর্চার চল আছে। যেমনি আমাদের দেশে চল আছে মারণ উচাটন, ডাকিনীবিদ্যা ইত্যাদির।

এখানে গেলে মনে হবে সময় বুঝি থমকে আছে। এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে দেখা হলে বা মিলিত হলে শরীরে একটা আলাদা অনুভূতি হলেও হতে পারে। বলা হয়, এখানে যারা একজায়গায় জড়ো হয়, তারা জড়ো হয় অন্য জগতের শক্তির সঙ্গে মোলাকাত করতে। কথিত, প্রাচীন কাল থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শহর ডাইনিদের বাসস্থান ছিল, যা এই গ্রাম সম্পর্কে অন্ধবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই গ্রাম প্রতি অক্টোবর মাসে বার্ষিক জাদুকরি উৎসব পালন করে। এই সময় নানা জায়গা থেকে আসা রঙচঙে অদ্ভুত পোশাক পরা মানুষের ভিড়ে গ্রামের রাস্তাঘাট ভরে যায়। সুরেলা শব্দ বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খায়। মিষ্টি অথচ মাথায় ঝিম-ধরানো গন্ধে ভরে ওঠে পাহাড়ের মাথায় পাহাড়ি গ্রাম।

জাদুকরি গ্রাম বলে পরিচিত হলেও বর্তমানে এই গ্রাম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। বর্তমানে প্রায় ১০০ জনেরও শিল্পীর বাস এই গ্রামে। গ্রামের সরু গলির দু-পাশের ছোটো ছোটো দোকান ঠাসা হাতে তৈরি শিল্প বস্তুতে যা স্থানীয় শিল্পীরা বানিয়ে গ্রামে ঘুরতে আসা পর্যটকদের বিক্রি করে। সারাবছর ধরে যাতে পর্যটকরা ক্যালকাটা ভেকিয়ায় আসে সেই জন্য এখানে শিল্প প্রদর্শনী, সংগীত উৎসব, সাহিত্য সমাবেশ লেগেই থাকে। আরে এর টানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে বছরভর।

এহেন সাংস্কৃতিক গ্রামের ইতিহাস বহু পুরোনো, প্রায় ৩০০০ বছরের। অর্থাৎ, সেই প্রাগৈতিহাসিক কালের বলা যেতে পারে। অন্য অঞ্চলের মানুষ তিনি ইতিহাসপ্রেমী, অপার্থিব সন্ধানী বা ইতালিয় গ্রামপ্রেমী যাই হোন না কেন, গ্রামের আঁকবাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় যে অদ্ভুত রহস্যময় গা ছমছমানি অনুভূতিতে ভুগেছেন, সে-কথা এই গ্রামে ঘুরে যাওয়া পর্যটকদের অধিকাংশই স্বীকার করেছেন। অনেকেই বলেছেন তাঁরা যাদের মুখ থেকে যে অনুভূতির কথা শুনে এসেছেন, ঠিক সেই অনুভূতি পেয়েছেন গ্রামে একাকী ঘুরে বেড়ানোর সময়। পাশে কেউ নেই অথচ আছে। আর এই অনুভূতি বছরের পর বছর ধরে পর্যটকদের টেনে এনেছে এই গ্রামে।

যে অঞ্চলে ক্যালকাটা ভেকিয়া গ্রামটি অবস্থিত, সেটি অ্যাগ্রো ফ্যালিস্কো (Agro Falisco) নামে পরিচিত ছিল। যা ইতালির মাঝামাঝি অংশ। এটি টাসিয়া অঞ্চলের একটি অংশ যেখানে ফালিসি নামে এক প্রাচীন ইতালিয় উপজাতি বাস করত। ফালিসিরা ল্যাটিন ঘেঁষা ফালিস্কান ভাষায় কথা বলত। রোমান আধিপত্য বেড়ে যাওয়াতে অশান্তি এড়াতে রোমানদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় সেই সময়কার লোকজন। পাহাড়ের মাথায় মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এই গ্রাম খ্রিস্টপুর্ব ৮০০ শতাব্দীতে পত্তন হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন এই গ্রামের ইতিহাস তারও পুরোনো – ফালিস্কি কালের। সেই সময় ওই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জঙ্গলের মাঝে পাহাড়ের মাথায় বসতি বানাত আর গ্রামকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখত। আর এমনসব পাহাড়ের মাথায় গ্রাম তৈরি হত যেখানে সহজে চড়া মুশকিল। সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচতে গ্রামের অবস্থান অনেক হিসেব কষে বাছা হত।

এই ধরনের আত্মরক্ষামূলক বসতিগুলি ত্রেজা নদীর তীরে (যা বর্তমানে একটি সংরক্ষিত অঞ্চল, পার্ক ভ্যালে দেল ত্রেজার অন্তর্গত) গড়ে উঠেছিল। ত্রেজা উপত্যকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ফালিস্কি সময়কালের সমাধিসহ অনেক পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন উঠে এসেছে।

ক্যালকাটা ভেকিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর প্রতিরক্ষাজনিত অবস্থানে। এই খাড়া পাহাড়ের মাথায় ওঠা খুব কঠিন কাজ ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইতালি এবং সমস্ত ইউরোপ যখন একটা অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছিল, তখন ধনী পরিবারগুলো নিজেদের বাঁচাতে এমনসব জায়গা খুঁজছিল যেখানে আত্মরক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। তখন ত্রেজা নদীর ধারের খাড়া পাহাড়গুলো হয়ে ওঠে অন্যতম গন্তব্য। আনুমানিক ১২০০ সালে অ্যাঙ্গুইল্লারা নামে একটি ধনী পরিবার এই গ্রামে এসে গ্রামের মাঝে একটি দুর্গ তৈরি করে বসবাস শুরু করেছিলেন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু পরিবার গিয়ে ওই গ্রামে বসতি বানায়, ফলে গ্রামটি হয়ে ওঠে ঘিঞ্জি। পাশাপাশি গ্রামটি তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিতি পায়, ফলে বহু মানুষ ওই গ্রামে যায় পুণ্য অর্জনের জন্য। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে এই গ্রামের পতন শুরু হয়। ১৯৩০ সালে ইতালি সরকার প্রায় শহরে পরিণত হয়ে যাওয়া এই গ্রামটিকে বসবাসের অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করে। কারন টুফা পাথরে গড়ে ওঠা বাড়িঘর ক্ষইতে শুরু করেছিল। (টুফা হল ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) দিয়ে গঠিত একটি ছিদ্রযুক্ত, হালকা প্রকৃতির পাললিক শিলা।) ফলে অতিপ্রাচীন বাড়িগুলো বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিল। কাছাকাছি অঞ্চলে ক্যালকাটা নুওভা বলে একটি শহর তৈরি করে সেখানে এই গ্রামের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে ক্যালকাটা ভেকিয়া পরিত্যক্ত হলেও শেষ হয়নি। ১৯৬০-এর দশকে শিল্পী তথা হিপিদের একটি সম্প্রদায় জায়গাটিতে আস্তানা গাড়ে এবং মধ্যযুগের খালি বাড়িগুলোতে বাস করতে শুরু করে। শিল্পী আর সৃজনশীল ব্যক্তিদের একটি বিশাল দল গ্রামটিকে সংস্কার করে অনেকটাই বসবাসের উপযুক্ত করে তোলে। গ্রামের মধ্যযুগীয় রাস্তায় প্রাণ ফিরে আসে। সরকার অনেক দিক বিবেচনা করে গ্রামে বসবাসের অনুমতি দিয়ে সম্পত্তি কেনাবেচার অনুমোদন দেয়। ঘুমন্ত ভবঘুরেদের আস্তানায় গড়ে ওঠে শিল্পীদের স্টুডিও ও ক্যাফে। কাছাকাছি শহর থেকে একদিনের জন্য ঘুরে আসার পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠে একসময়ের মধ্যযুগীয় জাদুবিদ্যার চর্চার গ্রাম।

এই গ্রাম নিয়ে অনেক গল্পগাথা প্রচলিত আছে। জনশ্রুতি, ১৫২৭ সালে এক ভাড়াটে জার্মান সৈন্য, যে রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লসের রোম দখলের অংশ ছিল, সে সান জিওভানি ব্যাসিলিকা (Basilica of San Giovanni) নামের এক পবিত্র চার্চ লুঠ করে একটি রত্নখচিত বাক্স নিয়ে পালিয়ে গেছিল। কিন্তু সে জানত না যে ওই বাক্সে পবিত্র প্রিপিউস অর্থাৎ যিশুখ্রিস্টের লিঙ্গাগ্রচর্ম রাখা আছে (কথিত)।

সম্রাটের সৈন্যরা পলাতক সৈন্যটিকে ক্যালকাটা ভেকিয়া গ্রামে খুঁজে পেয়ে ওখানেই একটি ঘরে বন্দি করে রাখে। কিন্তু সেই রত্নখচিত বাক্সটির সন্ধান পাওয়া পায়নি। জানা যায়, জার্মান সৈন্যটি ধরা পড়ার আগেই ওই ঘরে বাক্সটি লুকিয়ে রেখেছিল। এর ৩০ বছর পর ১৫৫৭ সালে বাক্সটি ওই ঘর থেকে উদ্ধার হয়। বাক্সটিকে রাখা হয় গ্রামেরই একটা চার্চে। তারপর থেকে প্রতিবছর ১ জানুয়ারি গ্রামের মানুষজন ওই বাক্সটি নিয়ে গ্রামে শোভাযাত্রা শুরু করেন। এরপর থেকে ওই বাক্সের দর্শন পেতে প্রতিবছর বহু লোক গ্রামে আসতে শুরু করেন। এতে নাকি পাপ ধুয়ে যেত। গ্রামটি হয়ে ওঠে এক তীর্থস্থান।

এরপর এই বাক্সের মালিকানার দাবি ওঠে ইউরোপের নানা চার্চ থেকে, ফলে ক্যালকাটা ভেকিয়া চার্চ ১৯০০ সালে এই বাক্স প্রদর্শন ও এই নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করে দেয়। বলা হয়, গ্রামের কেউ এই বিষয়ে কথা বললে তাকে শাস্তি দিতে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হবে।

১৯৮৩ সালে ক্যালকাটা ভেকিয়ার প্যারিশ পুরোহিত দারিও ম্যাগনোনি ঘোষণা করেন যে এটি চুরি গেছে। তিনি বলেন ধর্মদ্রোহী চোরেরা এটি ওঁর বাড়ি থেকে চুরি করে পালিয়ে গেছে। তিনি এটিকে একটি বাক্সে ভরে বাড়ির মধ্যে আলমারির মধ্যে রেখেছিলেন। যদিও স্থানীয়রা অনেকেই এই কথা বিশ্বাস করেনি। অনেকেই মনে করেন অর্থের বিনিময় উনি এটা বেচে দিয়েছেন। কে জানে এটা ডাইনিদের কাজ কি না!


বিচিত্র দুনিয়া- আরো পর্ব–>

ভালুকের খপ্পরে  বড়োদিনের বারবেলা     একটি ঈগলের কাহিনী আকাশের ‘ডাক’  পাইথন শিকার অভিযান    বল্গাহরিণের খোঁজে  চাই গো আমি রাজা হতে   বামনের দেশ        হীরক জ্বর   পোষ্যের অন্তিম যাত্রা   খেদাই বাগদির বেঁচে ফেরা    তিমির গান    চামপ্লিন হ্রদের দানো   মই ছাড়া বলদ দৌড়  ফ্রাঙ্কলিন সাহেবের ট্রেন   কাদার ফাঁদ   আটহাজার বছর প্রাচীন পদ্ধতির মধু শিকার কি শেষের পথে   ভারতের মিস্টার ভ্যাকসিন কৃষ্ণমূর্তি এল্লা    ঘুড়ির টানে সমাধিপুরী আস্তানা হোইয়া-বাকুই    নিষিদ্ধ স্নেক আইল্যান্ড   ঈশ্বর পর্বতের মৃত্যু হ্রদ  চিয়েঙ্গির বোমা ঘেরা গ্রাম ঝাড়ুদারি কারচায় লেক মাকড়শা সাপ লম্বা চুলের দেশ মরুভূমির লেক-এ মাছ ধরা লম্বা গলার গ্রাম জুতা আবিষ্কার ভূতুড়ে রেডিও স্টেশন মোবাইল ফোন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ, হোলো বান্দর

 

 

Leave a Reply