বিচিত্র দুনিয়া- হোলো বান্দর- হুলক গিবন-অরিন্দম দেবনাথ-বসন্ত’২৫

প্রতি মাসের চতুর্থ রবিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী মন কি বাত অনুষ্ঠানে নানা কথা শোনান ২৫ আগস্ট, ২০২৪-এ শুনিয়েছিলেন এক বাঁদরের কথাভারতের একমাত্র উল্লুক, হুলক গিবন যাকে এই বাঁদরের অন্যতম আবাস আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের এক ছোট্ট জঙ্গলের পাশের গ্রামের বাসিন্দারা আদর করে হোলো বান্দর বলে ডাকে, তাদের খাওয়ার জন্য আলাদা করে কলার চাষ করে লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ

অসমের ছোট্ট গ্রাম বারেকুরি। গ্রামের খানিক দূরেই তিনসুকিয়া-সহ আরও বেশ কিছু তৈল শহর। শহরের কাছে হলেও এই গ্রাম এখনও সবুজে ভরা। বাঁশগাছের ঝাড়-সহ আরও অনেক বড়ো বড়ো গাছ গ্রাম ঘিরে। আর এই গাছেই বাস কয়েকটি গিবন বা উল্লুক পরিবারের। মোরান উপজাতীয় গ্রামের বাসিন্দারা এই হুলক গিবন প্রজাতির বাঁদরদের পরিবারের সঙ্গী করে নিয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দারা আলাদা করে কলা চাষ করেন শুধুমাত্র এই বাঁদরদের খাওয়ার জন্য।  বাঁদরের আলাদা আলাদা নামে ডাকেন এঁরা এবং সেই ডাকে বুদ্ধিমানের মতো সাড়া দিয়ে কাছে আসে বাঁদররা। বারেকুরি গ্রামে কারও বাড়িতে সন্তান জন্মালে সেই গ্রামের মানুষরা সবাই মিলে আনন্দে মাতেন। ঠিক সেইরকম কোনও বাঁদরের সন্তান জন্ম নিলেও গ্রামের মানুষরা অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন। পৃথিবীতে এমন গ্রাম খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে এক প্রজাতির বাঁদর মানুষের পরিবারের অংশ হয়েই থাকে।

হুলক গিবন দুই প্রজাতিরওয়েস্টার্ন হুলক গিবন, আর ইস্টার্ন হুলক গিবন। আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর ছাড়াও বাংলাদেশ আর মায়ানমারে দেখা পাওয়া যায় ওয়েস্টার্ন হুলক গিবনের। এই প্রজাতির গিবন বা উল্লুক পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম। বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্তম উল্লুক প্রজাতি ‘সিয়ামাং’-এর দেখা পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া আর থাইল্যান্ডে।

এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ হতে ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ থেকে ৯ কেজি হয়। গাছের কচি পাতা আর ফল খেয়ে গড়ে ২৫ বছর বাঁচা পুরুষ উল্লুক আর মেয়ে উল্লুক আকারে প্রায় সমান হলেও এদের গায়ের রঙের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বানর প্রজাতির উল্লুক পুরুষদের গায়ের লোমের রঙ কালো, কিন্তু চোখের কোল সাদা। মেয়ে উল্লুকের গায়ের রঙ ধূসর-বাদামি। মেয়ে উল্লুকের চোখ ও মুখের চারপাশে গোল সাদা লোমে ঢাকা যা অনেকটা মুখোশের মতো দেখতে।

ইস্টার্ন হুলক গিবনের দেখা মেলে একমাত্র ভারতের অরুণাচল প্রদেশের দিবাং উপত্যকা আর আসামের তিনসুকিয়া জেলার সাদিয়া রিজার্ভ ফরেস্টে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সমীক্ষায় সাদিয়ার জঙ্গলে মাত্র ১৭টি ইস্টার্ন হুলক গিবনের দেখা পাওয়া গেছিল। তার মধ্যে ১৪টা প্রাপ্তবয়স্ক আর তিনটে শিশু গিবন। পুরুষ আর মেয়ে গিবনের অনুপাত ছিল ১:১। ২০০৬ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, অরুণাচলে এই গিবনের সংখ্যা ছিল ১৭০। ওয়েস্টার্ন হুলক গিবন আর ইস্টার্ন হুলক গিবনের পার্থক্য মূলত মুখের লোমের রঙ বিন্যাসে। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে গিবনের শরীরের রঙের চেয়ে হাতের রঙ হালকা হয়। ভারত ছাড়া ইস্টার্ন হুলক গিবন দেখা যায় চিন আর মায়ানমারে। যদিও এই দুই দেশেও প্রায় বিলুপ্তির পথে ইস্টার্ন হুলক গিবন। ২০০৫ সালের এক সমীক্ষায় ১২,০০০-এর মতো ওয়েস্টার্ন হুলক গিবনের খোঁজ পাওয়া গেছিল পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতে। তার মধ্যে প্রায় ২০০০ পাওয়া গেছিল আসামে।

১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হওয়ার ঠিক ১৮ বছর আগে ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ সরকার চা ব্যাবসাকে আরও কার্যকরী করে তুলতে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ পাশের জোরহাট জেলার ১৮৮১ সালে স্থাপিত গিবন ওয়াইল্ড লাইফ স্যানচুয়ারির মধ্যে দিয়ে রেললাইন পাতে তিনসুকিয়া, জোরহাট আর ডিব্রুগড় জেলার মধ্যে দ্রুত ও কম খরচে মাল পরিবহণ করার জন্য। ১৯৯৭ সালে গিবন ওয়াইল্ড লাইফ স্যানচুয়ারির নাম বদলে হয় ‘হুল্লোঙ্গাপার গিবন স্যানচুয়ারি’। সে-সময় রেললাইনের একপাশে এই স্যানচুয়ারির ১৫০ হেক্টর আর অন্যপাশে ১৯৫০ হেক্টর জমি পড়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেললাইন বদলে ন্যারো গেজ থেকে মিটার গেজ, তার থেকে ব্রড গেজ হওয়ার পর দেখা গেল জঙ্গল ভাগ হবার প্রভাব গিবনদের ওপর মারাত্মকভাবে পড়েছে। গিবনরা মাটিতে নামা পছন্দ করে না; এরা গাছের মাথায় ঘন পাতার আড়ালে থাকতে ভালোবাসে ও গাছ বেয়েই যাতায়াত করে। রেললাইন ব্রড গেজ হবার পর দু-ভাগ জঙ্গলের মাঝে ফাঁক বেড়ে ৫০ মিটার মতো হয়ে যাওয়াতে দুই জঙ্গলের গিবনদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল, কারণ গাছ বেয়ে তারা রেললাইনের ও-পারের জঙ্গলের গাছে যেতে পারছিল না। রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ শেষ হবার পর দেখা গেছিল ১৫০ হেক্টর জমিতে গিবনদের তিনটে পরিবার আর ১৯৫০ হেক্টর জমিতে ২৩টি গিবন পরিবার টিকে আছে। গিবনরা মূলত ফল খেয়েই বেঁচে থাকে। গিবনদের মলের সঙ্গে বার হয়ে আসা অপাচ্য ফলের বীজ থেকে নতুন গাছের জন্ম বনের বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতে পাওয়া ২৬টি আদিম প্রজাতির পশুর মধ্যে হলুক গিবন একমাত্র বানর প্রজাতির প্রাণী যা বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির তালিকাভুক্ত, যার পরম সুরক্ষা প্রয়োজন। হুল্লোঙ্গাপার গিবন স্যানচুয়ারি হল ভারতের একমাত্র বন যা এই বানরদের সংরক্ষণের জন্য নিবেদিত।

২০০৬ সালে আসামের আরণ্যক নামের একটি এন.জি.ও হুলক গিবনদের সংরক্ষণ নিয়ে কতগুলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা শুরু করেছিল। তার মধ্যে ছিল অভয়ারণ্যের মধ্যে ও চারপাশে গাছ লাগানোর কর্মসূচি। ৭১ প্রজাতির ৩০০০ গাছ লাগিয়েছিলেন তাঁরা রেললাইনের পাশে, যাতে সেই গাছ বেড়ে উঠে ছাতার মতো হয়ে রেললাইনের দু-পাশের গাছের মধ্যে সেতুর কাজ করে গিবনদের দু-পাশের জঙ্গলে যাতায়াতে উৎসাহিত করে।

২০১৯ সালে এসে দেখা গেল আরণ্যকের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। গাছের মাথা দিয়ে ঝুলতে ঝুলতে রেললাইন পার হয়েছে এক গিবন। জঙ্গলের একদিকে শুধু খাদ্য নয়, সংকট দেখা দিয়েছিল গিবনদের বংশবৃদ্ধিতেও। গাছের ছাতা শুধু গিবনদের রেললাইনের অন্য প্রান্তে গিয়ে খাদ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করেনি, সঙ্গী পেতেও সাহায্য করেছিল। গিবনরা খুব প্রাচীনপন্থী, নিজ পরিবারে ‘বিয়ে’ করে না এরা।

২০২১ সালের এপ্রিল মাসে দেখা গেল একটা চারজনের গিবন পরিবার গাছ বেয়ে রেলের লাইন পার হয়ে জঙ্গলের বড়ো অংশে উপস্থিত হয়েছে। এবং অন্য গিবন পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে। আরণ্যকের এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছিল জোরহাট বনবিভাগ ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আর অর্থ জুগিয়েছিল সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউ.এস. ফিশ ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস (গ্রেট এপ কনজারভেশন ফান্ড)।

এখনও পর্যন্ত এই অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে যাওয়া লামডিং-ডিব্রুগড় ব্রড গেজ লাইন বৈদ্যুতিক না হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে রেলের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী দূষণ কমাতে তা হয়ে যাবে। পাশাপাশি এক লাইনের বদলে দুটি লাইন হবে এই পথে। গিবনদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে আরণ্যক সমর্থ হয়েছিল অনেকটাই। কিন্তু রেল চলাচলের পথ সুগম রাখতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত গাছের ডাল ছেঁটে ফেলতে হয়, ফলে গাছের প্রাকৃতিক সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে এবং আসাম রাজ্য বনবিভাগ তাই রেললাইনের ওপর দিয়ে চিনের অনুকরণে সেতু তৈরি করেছে গিবনদের পারাপারের জন্য। যদিও গিবনদের এই সেতু খুব একটা আকর্ষণ করতে পারেনি। কারণ, ওদের পছন্দ সত্যিকারের গাছ। গিবনদের বাঁচিয়ে রাখতে রেল কর্তৃপক্ষ এই রেললাইন অভয়ারণ্যের বাইরে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবার কথা ভাবতে শুরু করেছে। গিবনদের বাঁচাতে যে সবাই উদ্যোগী, তার প্রমাণ দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসা এই বানরদের প্রসঙ্গ।

যদি হুল্লোঙ্গাপার গিবন স্যানচুয়ারি কাছাকাছি গ্রামে যাওয়া যায়, তবে প্রায়শই বাচ্চাদের চিৎকার শোনা যায় ‘হোলো, হোলো,’ হুলক গিবনের ডাক নকল করে তারা এই উল্লুকদের নাম দিয়েছে হোলো বান্দর। আসামের সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে আসামের শিশুরা ছোটবেলা থেকে হোলোকে নিয়ে ছড়া কাটতে অভ্যস্ত হয়ে যায় ‘হোলো উথিল তোউক গোসত, লগাই খোদাউ মোদু…’ হোলু তরতর করে তাল গাছে উঠছিল, উঠতে গিয়ে শিশিরে ওর লোম ভিজে গেছে…।


ভালুকের খপ্পরে  বড়োদিনের বারবেলা     একটি ঈগলের কাহিনী আকাশের ‘ডাক’  পাইথন শিকার অভিযান    বল্গাহরিণের খোঁজে  চাই গো আমি রাজা হতে   বামনের দেশ        হীরক জ্বর   পোষ্যের অন্তিম যাত্রা   খেদাই বাগদির বেঁচে ফেরা    তিমির গান    চামপ্লিন হ্রদের দানো   মই ছাড়া বলদ দৌড়  ফ্রাঙ্কলিন সাহেবের ট্রেন   কাদার ফাঁদ   আটহাজার বছর প্রাচীন পদ্ধতির মধু শিকার কি শেষের পথে   ভারতের মিস্টার ভ্যাকসিন কৃষ্ণমূর্তি এল্লা    ঘুড়ির টানে সমাধিপুরী আস্তানা হোইয়া-বাকুই    নিষিদ্ধ স্নেক আইল্যান্ড   ঈশ্বর পর্বতের মৃত্যু হ্রদ  চিয়েঙ্গির বোমা ঘেরা গ্রাম ঝাড়ুদারি কারচায় লেক মাকড়শা সাপ লম্বা চুলের দেশ মরুভূমির লেক-এ মাছ ধরা লম্বা গলার গ্রাম জুতা আবিষ্কার ভূতুড়ে রেডিও স্টেশন মোবাইল ফোন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ

 

 

Leave a Reply