বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-নীলামের গল্প-স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়-বসন্ত২০২১

“… বুড়ো বলল, ‘কি আশ্চর্য! উনিশদিন পার হয়ে গেল, এখনো হিসেবটা হয়ে উঠল না?’

কাক দু-চার মিনিট খুব গম্ভীর হয়ে পেনসিল চুষল, তারপর জিগগেস করল, ‘কতদিন বললে?’

বুড়ো বলল, ‘উনিশ।’

কাক অমনি গলা উঁচিয়ে হেঁকে বলল, ‘লাগ্‌ লাগ্‌ লাগ্‌ কুড়ি।’

বুড়ো বলল, ‘একুশ।’ কাক বলল, ‘বাইশ।’

বুড়ো বলল, ‘তেইশ।’ কাক বলল, ‘সাড়ে তেইশ।’ ঠিক যেন নিলেম ডাকছে। …”

হ য ব র ল-র এই লাইনগুলো আমাদের অনেকেরই ছোটবেলার উজ্জ্বল স্মৃতি। নিলেম, যাকে সোজা বাংলায় নিলাম বলে, বলতেই আমাদের চোখে প্রথম যে ছবিটা ভেসে ওঠে সেটা হল, একটা বিরাট হলঘর, সেখানে বেশ কয়েকজন লোক জড়ো হয়েছে, একটা টেবিল রয়েছে, তার এপাশে সামান্য কয়েকজন আর ওপাশে বাকিরা, টেবিলের ওপরে বা পাশে কিছু একটা রাখা রয়েছে আর টেবিলের ওপাশের লোকগুলো কিছু একটা হাঁকছে, বলা ভালো হেঁকেই চলেছে; কি হাঁকছে? না, দর হাঁকছে আর সেই দর ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, অবশেষে কোনও এক সময়ে এসে সেই দর হাঁকাহাঁকি থামল, তখন একজন টেবিলের এপাশে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে কেউ একজন টেবিলে তিনবার হাতুড়ি ঠুকলেন, এই তিনবারের মধ্যে যদি আরও উঁচু দর কেউ না হাঁকে, তাহলে ঐ শেষ দরটিকেই চূড়ান্ত ঘোষণা করা হল এবং সেই দর অনুযায়ী দামে কিছু একটা বিক্রি হল। প্রশ্ন হচ্ছে, কীসের দর? কোনও একটা বা তার বেশি জিনিসের, যেগুলো অনেকে কিনতে চায়, কিন্তু জিনিসগুলো এত পরিমাণে নেই যে সবাই পেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হল, এত কষ্ট করার কী আছে ? দোকানে যাও, পয়সা ফেল আর নিয়ে যাও – ব্যাস, ল্যাঠা চুকে যায়! তা না করে এত দরাদরির কী দরকার বাপু? তা ছাড়া দোকানে বাজারে তো বাঁধা দামে জিনিসপত্র আরামসে পাওয়া যায়, তাহলে? আর দর যদি করবে, তাহলে দাম কমানোর জন্য করলে তবু একটা মানে হয়, তা নয়, উল্টে দাম বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে, আর সবাই মিলে হেঁকে হেঁকে সেই দাম আরও বাড়িয়েই চলেছে ! কী অদ্ভুত রে বাবা !

অদ্ভুত ! ঠিক কথা, কিন্তু অকারণ নয়। আসলে মজার ব্যাপার হল নিলামে বেশিরভাগ সময় সেইসব জিনিস বিক্রি হয় যাদের জন্য কোনও বাজার নেই। ভ্যান গঘ বা পিকাসোর ছবির কি কোনও বাজার হয়? কিম্বা রানি ক্লিওপেট্রার রাজদণ্ডের (অবশ্য যদি সেটা খুঁজে পাওয়া যায় তবেই!)? মনে কর, সম্রাট আকবরের জোব্বা কিম্বা সম্রাট অশোকের রাজমুকুট খুঁজে পেয়ে কেউ চাইল বিশাল বড়লোক হতে। তাহলে সে তো সব সময় চেষ্টা করবে যত বেশি দামে পারে সেটা বিক্রি করতে। কিন্তু যেভাবে রোজ বাজারে গিয়ে সবজিওয়ালা শাকসবজি কিংবা মাছওয়ালি মাছ বিক্রি করে সে-ও কি সেভাবে পারবে এইগুলোকে বিক্রি করতে? বোঝা শক্ত নয় যে এই জিনিসগুলো সবজি বা মাছের মত রোজ বেচা সম্ভব হবে না ! দাম যে সে বেশি পাবে এ নিয়ে তার কোনও সন্দেহ নেই, কারণ এই জোব্বা বা রাজমুকুট তো আর পাড়ার দর্জি বা স্যাকরার দোকানে বললেই তৈরি করে দেবে না, আর যে কারণে এরা এমন মহামূল্যবান, সেই ইতিহাসও তো সেখানে পাওয়া যাবে না। সুতরাং এদের এমন কিছু বিশেষত্ব আছে যা অন্য কোনও ভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। এই বিশেষত্বই রয়েছে তাদের দামি হয়ে ওঠার মূলে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দাম কে দিতে পারে তা জানার উপায় কী? জিজ্ঞেস করলে সত্যিই কত দাম দিতে চায় তা কি কেউ খুলে বলবে? যারা কিনতে চায় তারাও তো চেষ্টা করবে যথাসম্ভব কম দামে ঐ বস্তু হস্তগত করতে। সুতরাং নিলামে তুললে যারা কিনতে চায় তাদের মধ্যে একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে যার জন্য দাম চড়তে থাকবে। এই করতে করতে একসময় সবচেয়ে বেশি যত দামে বস্তুটিকে বিক্রি করা যায় সেই দামে পৌঁছনো সম্ভব হবে।

এ তো খুব সাধারণ একটা ব্যাপার, তাহলে হঠাৎ ২০২০ সালে নোবেল প্রাইজ কমিটি কেন অর্থনীতিতে নোবেল দিয়ে বসলেন পল মিলগ্রম ও রবার্ট উইলসন নামের দুজন অর্থনীতির অধ্যাপককে নিলাম তত্ত্বে তাঁদের অবদানের জন্য? নিলাম তত্ত্ব! সেটা আবার কী? এই যে সবাই হাঁকডাক করে দাম বাড়িয়ে জিনিসপত্র কিনছে, এটাই তো নিলাম, এর জন্য আবার তত্ত্ব কিসের? এ তো একটা অতি সাধারণ ব্যাপার, যার ইচ্ছে হবে সে গিয়ে দর হাঁকবে, যদি জিতে যায় তাহলে টাকা দেবে, আর জিনিস নেবে – মোদ্দা গল্পটা তো এই! এ তো একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও বোঝে! এইটুকু বোঝার জন্য তত্ত্ব?

আসলে ব্যাপারটা অতটা সিধেসাদা বস্তু নয় কিন্তু। ছোটবেলা থেকে গল্পের বই পড়ে বা আশেপাশে নিলামের সম্পর্কে শুনে নিলাম বলে আমরা যেটাকে চিনেছি সেটা আসলে নিলামের একটা ধরণ মাত্র, তার নাম ইংরেজি নিলাম। ইংল্যাণ্ডে বহুল প্রচলিত হওয়ার জন্যই এর এমন নাম। এটা একরকম মুক্ত আরোহী নিলাম। নামগুলো শুনেই অদ্ভুত লাগছে তো? তাহলে একটু ব্যাখ্যা করে বলার চেষ্টা করা যাক। মুক্ত, অর্থাৎ খোলামালা – আসলে এই নিলামে তো খোলাখুলি সবাই দর হাঁকছে, সবাই সবার দর শুনতেও পাচ্ছে, জানতেও পারছে, তাই ঐরকম নাম। আর আরোহী? দাম তো ক্রমশ ওপর দিকে উঠছে, অর্থাৎ আরোহণ করছে, সুতরাং –

বেশ, খুব ভালো কথা, কিন্তু এতে তো আরও অন্তত দুটো প্রশ্ন উঠে গেল – নিলাম কি অবরোহী হওয়া সম্ভব? অথবা মুক্ত-র বিপরীত অর্থাৎ গোপন? দুটো প্রশ্নেরই উত্তর হল, হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। আবারও শুরু করা যাক আমাদের পরিচিত নিলাম অর্থাৎ ইংরেজি নিলাম থেকে। এটা দুভাবে করা যেতে পারে – এক, সরাসরি কে কত দাম দিতে ইচ্ছুক জিজ্ঞেস করে, অথবা, দুই, বিক্রেতা একটা দাম বলে সেই দাম দিতে কতজন ইচ্ছুক তা জানতে চেয়ে। প্রথমটার ক্ষেত্রে যা ঘটে সেটাই আমাদের সবচেয়ে পরিচিত ছবি। সবাই মিলে দর হেঁকে চলেছে আর দর তরতর করে বেড়ে চলেছে। দ্বিতীয়টাতে বিক্রেতা একটা দাম বললেন, অনেকে হাত তুলল, তখন বিক্রেতা দাম খানিক বাড়ালেন, আবারও অনেকে হাত তুলল, এভাবে বিক্রেতা দাম বাড়াতে থাকলেন যতক্ষণ না মোটে একজন উৎসাহী ক্রেতা হাত তোলেন। যে দামের জন্য এমনটি ঘটল, সেই দামে সেই ক্রেতাকে জিনিসটি বিক্রি করা হল। এও কিন্তু একপ্রকার ইংরেজি নিলাম এবং মুক্ত আরোহী নিলামও বটে, কারণ দর ঊর্ধ্বগামী আর যা ঘটছে একদম খোলামেলাভাবে সকলের চোখের সামনে ঘটছে।

এবার এই ব্যবস্থাটাকে একটু উল্টে দেওয়া যাক। বিক্রেতা এক অত্যন্ত উচ্চমানের দাম হাঁকলেন আর জানতে চাইলেন কেউ সেই দাম দিয়ে বস্তুটি কিনতে ইচ্ছুক কি না। কেউ হাত তুলল না। তখন বিক্রেতা দাম একটু কমালেন আর আবারও একই কথা জানতে চাইলেন। এবারও কেউ হাত তুলল না। তখন বিক্রেতা আবারও দাম কমালেন, আবারও একই কথা জানতে চাইলেন এবং এভাবেই ব্যাপারটা চলতে লাগল যতক্ষণ না অন্তত একজন ক্রেতা হাত তুলে তাঁর কেনার ইচ্ছে প্রকাশ করছেন। যে দামে ক্রেতাটি হাত তুললেন, সেই দামে বস্তুটি তাঁকে বিক্রি করা হল। ইংরেজি নিলামের সঙ্গে এখানেই প্রধান পার্থক্য হয়ে গেল, দর এখানে বাড়ার বদলে কমে গেল। এই নিলামের নাম ডাচ বা ওলন্দাজি নিলাম। নেদারল্যান্ডে এই পদ্ধতিতে ফুলের নিলাম খুবই চালু এবং জনপ্রিয়, তাই এমন নামকরণ। পরিষ্কার বোঝা গেল, এটি একটি অবরোহী নিলাম। খোলামেলায় ঘটেছে, তাই এটি হল একটি মুক্ত অবরোহী নিলাম।

যাক, তাহলে আরোহীর উল্টো অবরোহী নিলাম তো পাওয়া গেল, মুক্ত নিলামের উল্টো গোপন নিলামের গল্পটা কী? তাও আছে – নিলামের ক্রেতারা যদি দর মুখে না হেঁকে দরপত্রে কত দামে কিনতে ইচ্ছুক সেটা লিখে মুখবন্ধ খামে ভরে বিক্রেতাকে জমা দেয় তাহলেই তা হয়ে যাবে গোপন নিলাম। এমন নিলামও কিন্তু বহুল প্রচলিত। সাধারণত এরকম নিলাম ব্যবহার হয় কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ বা সরকারী সম্পত্তি বিক্রি করার সময়।

এতক্ষণ ধরে তো আমরা সেই সব নিলামের কথাই বলে যাচ্ছি যেখানে বিক্রেতা নিলাম করছেন আর ক্রেতারা তাতে অংশগ্রহণ করছেন। এর উল্টোটা হওয়া সম্ভব কি? উত্তর হল, অবশ্যই সম্ভব, এবং শুধু তাই নয়, রীতিমত ব্যবহারও হয়ে থাকে। যেমন, কোনও প্রতিষ্ঠান যদি কিছু কিনতে চায়, ধরা যাক কম্পিউটার, তাহলে ইচ্ছুক এবং সম্ভাব্য বিক্রেতাদের কাছ থেকে দরপত্র চাওয়ার রেওয়াজ ভালোরকম প্রচলিত। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘরবাড়ি, বেঞ্চ, আলমারি ইত্যাদি বানাতেও এরকম দরপত্র চাওয়া খুবই চালু আছে। এটাও কিন্তু একরকম নিলাম। একে বিপরীত নিলাম বলা যেতে পারে, আবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হচ্ছে বলে একে সংগ্রহ নিলামও বলা যায়। সরকারী বিভিন্ন সামগ্রী কেনার সময়ও এমন নিলাম ব্যবহার হতে দেখা যায়।

নিলাম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে আজকাল। আমরা যখন গুগল বা কোনও ওয়েবসাইটে কিছু খুঁজি তখন তার আশেপাশে নানারকম বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কোনওটা থাকে সবার ওপরে, কোনওটা আবার পাশের দিকে, কোনওটা আবার নীচের দিকে, কোন কোনও বিজ্ঞাপন অল্প সময়ের জন্য দৃশ্যমান, কোনওটা আবার আরেকটু বেশি সময়ের জন্য। কোন বিজ্ঞাপন কোথায় বা কতক্ষণের জন্য দেখা দিতে পারবে সেটাও কিন্তু ঠিক হয় নিলামের মাধ্যমে। ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র কেউ বিক্রি করতে চাইলে ই-বে জাতীয় কিছু ওয়েবসাইটে গিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিলাম করাও ক্রমশ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। টেলিকম লাইসেন্সের নিলাম নিয়ে তো খবরের কাগজে প্রায়ই লেখালেখি হয়। এছাড়া কয়লা খনি, তেলের খনি ইত্যাদি থেকে খনিজ আহরণের অধিকারও নিলামের মাধ্যমে বন্টিত হয়ে থাকে।

এসব দেখে মনে হতেই পারে যে নিলাম একটি অত্যাধুনিক পদ্ধতি যা এখনকার কালে বেশ ভালো রকম ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়। নিলামের ইতিহাস অনেক পুরানো। খ্রিস্ট জন্মের সামান্য কিছুকাল পরেও যে নিলাম ব্যবহার হত তার প্রমাণ ইতিহাসে আছে। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধরণের পণ্যসামগ্রীর ব্যাবসার ক্ষেত্রে নিলামের ব্যবহার ছিল বহুল প্রচলিত। মোটামুটি এটুকু জানা যায় যে নিলামে তোলার আগে জিনিসপত্রের কিছু নমুনা দেখিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু সেই নিলামের নিয়মগুলি কী ছিল, আরোহী না অবরোহী, তা পরিষ্কার জানা যায় না। তবে এই নিলামগুলি আরোহী প্রকৃতির হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। চার ধরণের লোক এই সব নিলামের সঙ্গে জড়িত থাকতেন – এক, যাঁর তরফ থেকে পণ্য বিক্রি করা হত; দুই, যিনি নিলামের পরিকল্পনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন, সম্ভবত এঁরা নিলাম পরিচালনার খরচের ভারও বহন করতেন; তিন, যাঁরা নিলামের বিজ্ঞাপন ও প্রচার চালাতেন এবং দর হাঁকার পদ্ধতিটি নিয়ন্ত্রণ করতেন; এবং চার, যাঁরা সর্বোচ্চ দর হেঁকে পণ্যগুলোকে কিনতেন।  

রোমান সাম্রাজ্যে আরও নানান বিচিত্র ধরণের জিনিসের নিলামের হদিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে কয়েকটি উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। চূড়ান্ত অভাব অনটনের মুখে পড়ে অনেকেই তাঁদের বাড়ির আসবাবপত্র, গয়নাগাঁটি ইত্যাদি নিলামে বিক্রি করে দিতেন। এমনও শোনা যায় যে রাজকোষের ঘাটতি পূরণের জন্য একবার কিছু রাজকীয় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও আসবাবপত্র নিলামে বিক্রি করা হয়েছিল। রোমান সৈন্যরা যুদ্ধজয়ের পর তাদের লুঠ করে আনা সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করত। এর মধ্যে কখন কখনও যুদ্ধবন্দীরাও থাকত যাদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হত। মনে করা হয় যে এসবের জন্য প্রায়ই বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতেন, যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি নিলামে সস্তায় কেনা অথবা বিক্রি করে অনেক রোজগার করার জন্য।

তবে ইতিহাসের পাতায় যে নিলামটি সবচেয়ে অদ্ভুত বলে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, সেটি হল গোটা রোমান সাম্রাজ্যের নিলাম। ১৯৩ খ্রীষ্টাব্দে রোমান সম্রাট পার্টিনাক্সকে হত্যা করার পর প্রিটোরিয়ান গার্ড সিদ্ধান্ত নিলেন যে পুরো রোমান সাম্রাজ্যটাকেই নিলামে তুলবেন। নিলামে বিজয়ীর মাথায় তুলে দেওয়া হবে সম্রাটের রাজমুকুট। যেমন ভাবা তেমন কাজ, আর কেনার লোকও জুটে গেল বেশ কিছু। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ দর হাঁকলেন ডিডিয়াস জুলিয়ানাস নামে এক ব্যক্তি। জনপ্রতি তিনি ২৫,০০০ সেস্টার্স বা ৬,২৫০ দ্রাকমা দিতে সম্মত হলেন এবং হয়ে উঠলেন রোমান সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। কিন্তু এ-সুখ তাঁর কপালে বেশিদিন সইল না, ঠিক দু’মাসের মাথায় বিদ্রোহী সেপ্টিমিয়াস সেভারাসের হাতে তাঁর মাথা কাটা গেল। ডিডিয়াসের পর রোমান সাম্রাজ্য এই সেপ্টিমিয়াসের হাতেই গেল। এটিকেই পৃথিবীর সর্বপ্রথম “বিজয়ীর অভিশাপ” বলে ধরা হয় এবং এটি বিজয়ীর অভিশাপের চূড়ান্ততম রূপও বটে (বিজয়ীর অভিশাপ নিলাম তত্ত্বের এবং ব্যবহারিক নিলামের ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ নিয়ে আলোচনা পরে করা হবে।)

কেবলমাত্র প্রাচীন রোম নয়, প্রাচীনকালে চীনদেশেও নিলাম ব্যবস্থা খুব চালু ছিল। খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে বৌদ্ধ গুম্ফাগুলি মৃত সন্ন্যাসীদের জিনিসিপত্র নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ বিভিন্ন গুম্ফার তহবিলে দান করত। তবে এই নিলামের পদ্ধতি সম্পর্কেও বিশেষ জানা যায় না। যতটুকু আন্দাজ করা যায়, নিলাম পরিচালনার দায়িত্বে যিনি থাকতেন, সাধারণত কোনও সন্ন্যাসীই এই দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন, তাঁর বিক্রয়যোগ্য জিনিসিগুলির দাম সম্পর্কে ধারণা থাকতে হত, এবং জিনিসগুলির মান সম্পর্কে, অর্থাৎ পুরানো বা নতুন, কতখানি ব্যবহারযোগ্য ইত্যাদি সম্পর্কে বিশদে জানাতে হত।  

ইংল্যাণ্ডেও নিলামের ব্যবহার ছিল বহুল পরিমাণে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে কফির দোকান বা সরাইখানাগুলিতে ছবির নিলাম হত। আরও অনেক রকম নিলাম হত ইংল্যাণ্ডে – ব্যবসাযোগ্য পণ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া লোকের সম্পত্তি, বড় বড় এস্টেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট জমির টুকরো – সবই। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, এই সব নিলামের নিয়মগুলো এখনকার কালের নিলামের মতোই বা তার খুব কাছাকছি কিছু একটা ছিল। ১৭৪৪ সালে পৃথিবীবিখ্যাত নিলাম কোম্পানি সথবি’জ স্থাপিত হয়। আর একটি প্রায় একই রকম বিখ্যাত নিলাম কোম্পানি ক্রিস্টি’স তৈরি হয় ১৭৬৬ সালে।

আমেরিকায় ইংল্যান্ড থেকে অভিবাসীদের সঙ্গে অনেক রকমের চিন্তাধারা ও প্রতিষ্ঠান পৌঁছেছিল, সেই সঙ্গে পৌঁছেছিল নিলাম ব্যবস্থাও। আমেরিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনায় আইনী জটিলতায় ফেঁসে থাকা সম্পত্তি, বিক্রি হত নিলামে, বিক্রি হত পড়ে থাকা পণ্যসামগ্রীর অবশিষ্টাংশ, মূলধনী দ্রব্য, বিক্রির মরসুম শেষের মুখে অবিক্রিত জিনিসপত্র আমদানিকারকদের হাতে তুলে দিতে নিলামই ছিল ভরসা, এছাড়াও ব্যবহৃত আসবাব, বাসনপত্র, গৃহপালিত পশু এসবও বিক্রি হত নিলামে। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের আগে আমেরিকার দক্ষিণ ভাগে দাস ব্যবসাতেও নিলামের ব্যবহার ছিল।

তবে নেদারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, হংকং ইত্যাদি দেশে নিলাম অনেক পরে প্রচলিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জার্মানি আর নেদারল্যান্ডে যথাক্রমে মাছ ও মৎস্যজাত দ্রব্যের নিলাম শুরু হয়। জাপান ও হংকং-এ নিলামের ব্যবহার শুরু হয় অনেকটাই বাজার সংস্কারের একটি ধাপ হিসেবে। এই দেশগুলিতে যে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিল তাতে শাসকশ্রেণীর হাতে উৎপাদক ও প্রাথমিক বিক্রেতাদের শোষণ ছিল অবাধারিত এবং বহুমাত্রিক। তাই সেই ব্যবস্থার সংশোধন করে বাজার অর্থনীতিকে সঠিকভাবে রূপায়িত করার পথে নিলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় পদ্ধতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কেবলমাত্র মাছই নয়, নেদারল্যান্ড বিখ্যাত এখানকার ফুলের নিলামের জন্যও। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে ফুল ও পুষ্পজাত দ্রব্য ডাচ বা ওলন্দাজী নিলামের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা শুরু হয়। এখানকার ফুলচাষীরা কো-অপারেটিভ তৈরী করতেন এবং নিজেদের আঞ্চলিক বাজারগুলিকে সুসংগঠিত করতেন। এখনও পর্যন্ত নেদারল্যান্ড পৃথিবীতে ছাঁটা ফুলের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ও পরিবেশক।

ভারতেও উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একধরণের নিলামের কথা জানা যায়, যাকে বলা যায় নিলামের মাধ্যমে কর-ধার্যকরণ। এটি তৎকালীন গুজরাটে প্রচলিত ছিল। ভারতবর্ষের পশ্চিম দিকে অবস্থিত গুজরাট রাজ্যটি ব্যাবসাবাণিজ্যের এক বড় কেন্দ্র ছিল। নির্মাণদ্রব্য উৎপাদনেরও কেন্দ্রভূমি ছিল এই গুজরাট। এখানকার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা একরকম সংগঠন তৈরি করতেন, যেগুলি পরিচিত ছিল গুজরাটি গিল্ড অথবা গুজরাটি সমবায় নামে। এই সমবায়গুলি নানান পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করত। তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি ছিল কোনও একদিন একটি ছাড়া সব দোকান বন্ধ রাখা এবং কোন দোকানটি খোলা থাকবে সেটা নিলামের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ যেত সমবায়ের তহবিলে। সাধারণ প্রথাগত কর-ধার্যকরণের যে প্রক্রিয়া, তার তুলনায় এইভাবে অর্থসংগ্রহ করার পদ্ধতিটি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়।   

ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত নিলামের পদ্ধতি ও নিয়মাবলী ক্রমাগত বিবর্তিত হয়েছে। ক্রমশ প্রথাগত ভাবে যেসব জিনিস বিক্রির ক্ষেত্রে নিলাম ব্যবস্থা চালু ছিল তার বাইরেও নিলাম ব্যবস্থার ব্যবহার আরও বেশি করে জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার বন্টনের ক্ষেত্রে নিলামের ব্যবহার উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে নিলামের পরিমাণও ক্রমবর্ধমান। কেন অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় নিলামের ব্যবহারিক মূল্য বাড়ছে তা বোঝার জন্যই নিলাম তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিলাম তত্ত্ব নিলামের বিশ্লেষণ করে, কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরণের নিলামের নিয়ম সবচেয়ে কার্যকরী, নিলাম তত্ত্ব তার ধারণা দেয়। কেবলমাত্র তাই নয়, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিলাম তত্ত্ব কি ধরণের নিলামের নিয়ম ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে তারও ধারণা দেয়, এমনকি নতুন নতুন নিলামের নিয়ম বের করতেও সাহায্য করে। আর এখানেই মিলগ্রম এবং উইলসন তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে সে গল্প আরেকদিন হবে।     

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

5 thoughts on “বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-নীলামের গল্প-স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়-বসন্ত২০২১

  1. বেশ লাগল,তিষ্যকে রোমান ইতিহাসটা বললুম ।

    Like

  2. নিলামের ইতিহাস বহুল গল্প। সুন্দর বিশ্লেষণ। তবে আরও বাকি আছে বার বার মনে হচ্ছে। ইতিহাসের বিবর্তন এ নিলাম তো কত কিছুরই হয়েছে, আজও হচ্ছে। স্যার মিলগ্রম আর উইলসন এর গল্পটা বলিস। আর বাকি থেকে গেছে বিজয়ীর ইতিহাস শোনা।
    লেখাটা চোখের সামনে সিনেমা ফুটিয়ে তুলুল।
    The Vinchi বা National treser এ যেমন সিনেমা তে ইতিহাসের বিবরণ দেখায়, এই লেখাটা পড়ে আমি সেই সিনেমাই দেখলাম।
    সিনেমা গল্প বলে দৃশ্য সাজিয়ে আর এই গল্প সিনেমা দেখালো। সাবাস।

    Like

  3. অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব সহজ সরল ভাবে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে উপস্থাপনার মধ্যে একটা মুন্শীয়ানা লাগে,…এখানেই স্রবন্তী একশো ভাগ সফল।

    Like

  4. অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব সহজ সরল ভাবে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলার মধ্যে একটা মুন্শীয়ানা থাকে,…স্রবন্তীর লেখায় সেটাই একশো ভাগ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s