FUNবিজ্ঞান- মাথা মে ট্রিক্‌স্-সুর্যনাথ ভট্টাচার্য -প্রফেসর ট্যানজেন্টের গল্প-১ জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

 মাথে মে ট্রিকস সব পর্ব একত্রে

biggancalculus01

প্রফেসর ট্যানজেন্টকে চেনো? মাথার মাঝে চুল সব পরিষ্কার হয়ে গেছে, নাকের নিচে ঝাঁটা গোঁফ। চোখে গোল আদ্যিকালের চশমা আর সর্বদা চিন্তান্বিত মুখ। এইরকম কোনও লোককে যদি আকাশের দিকে চেয়ে গড়িয়াহাটের মোড় দিয়ে হনহন করে হেঁটে আসতে, কিংবা হাওড়া ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে গঙ্গার জলের ঢেউ গুনতে দেখো, জানবে তিনিই প্রফেসর ট্যানজেন্ট। অদ্ভুত মেধাসম্পন্ন অত্যাশ্চর্য এক গণিতবিদ। বিজ্ঞান ও গণিতের বিশিষ্ট সব মৌলিক তত্ত্ব সর্বদা তাঁর মাথায় গজগজ করে। এ আলাদা কথা যে সেসবের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। তাই তিনি প্রফেসর ট্যানজেন্ট নামে খ্যাত, আসল নাম তাঁর লোকে ভুলে গেছে।

এইরকম একটি প্রতিভাধর মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া কিন্তু সহজ নয়। তাঁর সাথে দেখা করতে সেই হ-য-ব-র-ল এর গেছোদাদার মতো আগে দেখতে হয় তিনি কোথায় কোথায় নেই! তাঁকে তাঁর বাসস্থানের সন্ধান দিতে বললেও তিনি বলবেন, আমার বাড়ি আর ডক্টর পাজলের বাড়ি বুড়োশিবতলার মন্দিরে ঠিক সাড়ে আটত্রিশ ডিগ্রি কোণ তৈরি করে! আর ডিগ্রির কথায় মনে এলো, একবার এক পরীক্ষায় ফুটন্ত অশুদ্ধ জলের স্ফুটনাংক কত জিজ্ঞেস করায় প্রফেসর ট্যানজেন্ট বলেছিলেন, এক সমকোণ! দেখা গেল থার্মোমিটার দেখাচ্ছে নব্বই ডিগ্রি!

এই প্রফেসর ট্যানজেন্টের যে কতো মৌলিক গবেষণা আছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। মানুষের আয়ু নিয়ে যুগান্তকারী এক গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, যে দেশের মানুষের গড় বয়স বেশি সেই দেশের লোক বেশিদিন বাঁচে! গবেষণাপত্রে তাঁর মন্তব্য, আপনারা আরও বেশি করে জন্মদিন পালন করুন, কারণ এটি প্রমাণিত হল যে জন্মদিন উদযাপনের সাথে দীর্ঘ জীবনের নিবিড় সম্পর্ক আছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যে সব মানুষ বেশি জন্মদিন পালন করেছেন, তারাই বেশিদিন বেঁচেছেন!

আর একটি গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীর যত চোর আছে, তাদের দশ শতাংশ বাঁহাতি! গবেষণার অন্তিম সিদ্ধান্তটি আরও চমকপ্রদ। সেখানে তিনি বলছেন, এও দেখা গেছে যে পৃথিবীর সব মেরুভল্লুকই বাঁহাতি। সুতরাং আপনার কিছু চুরি হলে জানবেন শতকরা দশ ভাগ সম্ভাবনা এটি কোনও মেরুভল্লুকের কাজ!

এই হলেন প্রফেসর ট্যানজেন্ট। তিনি বুদ্ধিমান, না বোকা, না ধূর্ত, না উন্মাদ তা তোমরাই বিচার কোরো। এসো প্রফেসর ট্যানজেন্টের আরও কিছু কথা শোনা যাক।

***

একবার এক জুলজির প্রফেসরের সঙ্গে কুমীরের সংখ্যার ওপর পরিসংখ্যানতত্ত্বের প্রভাব নিয়ে তুমুল তর্ক লেগেছিল। তিনি বললেন, “শুনুন বলি। আমার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান গবেষণায় পাচ্ছি, পৃথিবীতে প্রতি বছর কুমীরেরা চার কোটি কুড়ি লাখ ডিম পাড়ে। এদের মধ্যে দু’ভাগের এক ভাগই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এই সব বাচ্চার পঁচাত্তর শতাংশই জন্মের ছত্রিশ দিনের মধ্যেই অন্যান্য প্রাণীর শিকার হয়। বাকি যা থাকে তার মাত্র পাঁচ শতাংশ পূর্ণ জীবন পায়। তাহলে বুঝেছেন পরিসংখ্যান মানবজাতির কত উপকার করছে?”

জুলজির অধ্যাপক কী বলবেন বুঝতে না পেরে বললেন,“আপনি যে কী বলেন মশায় বুঝি না! এর মধ্যে পরিসংখ্যান আবার কোথায়?”

“দূর মশায় আপনি তো কিসুই বোঝেন না,” প্রফেসর ট্যানজেন্ট ধমক দিলেন, “পরিসংখ্যান যদি না থাকতো তাহলে যে আপনার পশ্চাদ্দেশটি এখন একটি কুমীরের ওপর থাকতো, সেটা ধরতে পারলেন না?”

***

প্রফেসর ট্যানজেন্ট ও ডক্টর পাজলের আলোচনা চলছে। দু’জনেই উচ্চস্তরের দার্শনিক। নিগুঢ় তত্ত্বের আলোচনায় জীবনের সত্য, আত্মার প্রকাশ, মহাকাশের ব্যপ্তি, অসীমের পরিমাপ ইত্যাদি অতিক্রম করে মর্ত্যলোকের আর একটু কাছাকাছি অভিকর্ষ ও আপেক্ষিকতার পথ ঘুরে বর্তমানে গতিজাড্যের এক সমস্যার সমাধান করতে এসে ঠেকেছে চার গুণিতক দুই কত হয়। দুরূহ তত্ত্বসমুহের ধুম্রজালের মাঝে অর্ধনিমীলিত চক্ষে ডক্টর পাজল বললেন, “দেখুন এই মুহূর্তে চার গুণিতক দুইয়ের মান  হয়তো আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে তার একটা নির্দিষ্ট সসীম মান আছে।

প্রফেসর ট্যানজেন্ট চরম তত্ত্বজ্ঞানের নিকষে তাঁর বক্তব্যকে যাচাই করে বললেন, “নিঃসন্দেহে। আপনার এ সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে যুক্তি তো এইটাই যে ৪ গুণিত ২ মানেই ৪ গুণিত ১/(১-(১/২)), যা কিনা ১ দিয়ে শুরু একটা অসীম গুণোত্তর শ্রেণীর সমষ্টি যার সাধারণ অনুপাত ১/২, তাই নয় কি?”

“ঠিক। আর যেহেতু সাধারণ অনুপাতটি একের চেয়ে কম, সমষ্টিটি অবশ্যই সসীম। ধন্য আপনার প্রজ্ঞা।”

উভয়েই স্মিতহাস্যে চক্ষু মুদ্রিত করলেন। খানিকক্ষণ কাটল। অতঃপর প্রফেসর ট্যানজেন্ট পুনরায় বাহ্যজ্ঞান প্রাপ্ত হলেন। বললেন, “আচ্ছা, তাই যদি হয়, তাহলে আমরা হয়তো সেই মানের অন্তত কাছাকাছি একটা অনুমান করতে পারি। তাই না?”

ডক্টর পাজল নির্লিপ্ত জিজ্ঞাসায় চক্ষু মেললেন। প্রফেসর ট্যানজেন্ট বললেন,“যেমন ধরুন গুণোত্তর শ্রেণীটি তো ১+(১/২)+(১/৪)+(১/৮)+(১/১৬)+… এইভাবে চলবে। সুতরাং দুই-এর বর্গ ও তার বেশি সূচকের পদগুলি যদি অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে সমষ্টিটি দাঁড়ায় প্রায় ১+(১/২) মানে ৩/২, তাই নয় কি? অর্থাৎ ৪ গুণিত ২ এর একটা নিকটবর্তী মান আমরা পেলাম ৪ গুণিত (৩/২), বা ৬। কী বলেন?”

ডক্টর পাজল সপ্রশংস অনুমোদনে মাথা দুলিয়ে আবার চিন্তাসাগরে তলিয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। তারপর তিনি আবার মুখ খুললেন,”এর চেয়ে আরও নিকটতর একটা অনুমানের পথ কিন্তু আমি পেয়েছি।”

“সেটা কি রকম?”

“ধরুন ২ এর অবস্থান তো ১.৯ আর ২.১ এর মাঝে। সেইরকমই ৪ এর স্থিতি ৩.৯ ও ৪.১ মাঝে কোথাও। সেক্ষেত্রে ৪ গুণিত ২ এর মান নিশ্চই ১.৯ গুণিত ৩.৯ এবং ২.১ গুণিত ৪.১ এর মাঝেই হতে হবে। কি ঠিক বলেছি?”

প্রফেসর ট্যানজেন্ট হর্ষোৎফুল্ল স্বরে বললেন,”অসাধারণ আপনার মেধা! এখন তো ব্যাপারটা অনেকটাই আয়ত্তের মধ্যে এসে গেল। দেখাই যাক না।”

সাথে সাথে স্লাইড রুল বেরিয়ে এল। প্রফেসর ট্যানজেন্টের হাতে স্লাইডারটি ঘনঘন বেশ কয়েকবার ডাইনে-বাঁয়ে চলাচল করলো। তারপর তিনি সোল্লাসে ঘোষণা করলেন, “এই তো হয়েছে। আপনার প্রদর্শিত পন্থায় ৪ আর ২ এর গুণফলটি অবশ্যই ৭.৩৯ ও ৮.৬৫ এর মাঝে কোথাও হতেই হবে। আমরা অনেকটাই কাছাকাছি আসতে পেরেছি মনে হচ্ছে।”

উভয়ে পুনরায় স্বস্তিতে চক্ষু বুজলেন। কিন্তু অল্প পরেই প্রফেসর ট্যানজেন্টের কপালে দেখা দিল ভ্রুকুটি। চোখ মেলে তিনি বললেন, “আচ্ছা, স্লাইড রুল যখন রয়েইছে, আমরা তো সোজাসুজি গুণ অঙ্কটি কষেও তো দেখতে পারি!”

ডক্টর পাজল উত্তেজিত ভাবে স্লাইড রুল ছিনিয়ে নিয়ে বললেন,“তাই তো,কি মূর্খ আমরা!”

আবার স্লাইডারের দোলাচল। তারপর তাঁর ঘোষণা, “হয়েছে। ৪ গুণিত ২ মানে এই ৭.৯৮। অসাধারণ!”

কাছেই অষ্টমবর্ষীয় এক শিশু আপনমনে কাগজের নৌকা বানাচ্ছিল। কী বুঝেছিল কে জানে, হঠাৎ বলে উঠলো, “৪ গুণ ২ তো ৮। হি হি…”

দুই দার্শনিক একটু হতচকিত হয়ে এ ওর মুখে তাকালেন। তারপর সামলে নিয়ে প্রফেসর ট্যানজেন্ট বললেন, “আহা শিশু তো! অবোধ… তা তুমি কী করে বললে বাছা?”

“কেন, কালই তো টিচার ৪ এর নামতা শিখিয়েছে, চারেক্কে চার, চাদ্দুগুণে আট…। হি হি হি…”

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Leave a Reply