FUN-বিজ্ঞান- টেকনো টুকটাক-মূর্তি-কিশোর ঘোষাল-জয়ঢাক৪৮

স্ট্যাচু অব ইউনিটি

biggantechno4801

সম্প্রতি ভারতের গুজরাট প্রদেশে বারুচ শহরের অনতিদূরে, সাধুবেট নামক নর্মদানদীর একটি ছোট্ট দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই মূর্তিটির নাম “একতা মূর্তি” বা “স্ট্যাচু অব ইউনিটি”। মূর্তিটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের। তাঁর কঠোর প্রশাসনিক দক্ষতার জন্যে সারা দেশের মানুষ তাঁকে ভালবেসে “লৌহমানব” বলে ডাকত।

যদিও এই একতা মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব ঘোষিত হয়েছিল ২০১০ সালের ৭ই অক্টোবর, কিন্তু  গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী সবে মাত্র এই সেদিন – ২০১৩ সালের ৩১শে অক্টোবর, সর্দার প্যাটেলজির ১৩৮তম জন্মদিনে, এই মূর্তির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত করেছেন। এই মূর্তির ভিত্তির উচ্চতা হবে ৫৮ মিটার আর মূর্তির উচ্চতা ১৮২ মিটার, তার মানে মাটি থেকে ২৪০ মিটার উঁচু হবে সম্পূর্ণ কাঠামোটি। লোহার বিশাল খাঁচা আর কংক্রিটে গড়ে উঠবে এর মূল কাঠামোটি, তারপর ব্রোঞ্জের প্রলেপে রূপ পাবে সর্দার প্যাটেলজির চেহারা।

২০১৪ সালের ২৬শে জানুয়ারি এই মূর্তির কাজ শুরু হবার কথা। এটি বানাতে সময় লাগবে ৪ বছর ৮ মাস। তার মধ্যে ১৫ মাস লাগবে মূর্তিটির প্রযুক্তিগত হিসেবপত্র আর নকশা বানাতে, আর বাকি সময় লাগবে মূর্তিটিকে গড়ে তুলতে। এখনও পর্যন্ত এই মূর্তি গড়ার খরচের হিসাব অনুমান করা হয়েছে প্রায় ২০৬৩ কোটি টাকা। অবশ্য এই খরচের হিসেবের মধ্যে এই মূর্তি ছাড়াও, নর্মদা নদী পার হয়ে দ্বীপে পৌঁছানোর জন্য একটি সেতু ও প্রায় ১২ কিমি লম্বা নতুন রাস্তা নির্মাণের খরচও ধরা আছে। এই সম্পূর্ণ খরচের টাকা আসবে পিপিপি, তার মানে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে। অধিকাংশ টাকাই আসবে ভারতের জনগণের দান থেকে, কিছু অংশ বহন করবে সরকার।

এই মূর্তি বানাতে যে লোহার প্রয়োজন সেই লোহা দান হিসাবে যোগাড় করা হবে সারা ভারতের গ্রামে গ্রামে চাষীভাইদের থেকে। তাদের ঘরে ঘরে পড়ে থাকা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যন্ত্রপাতির ভগ্নাংশ যোগাড় করার জন্যে সারা ভারতে খোলা হয়েছে মোট ৩৬টি সংগ্রহ কেন্দ্র।

আমাদের দেশের মানুষের বিশাল এই কর্মকাণ্ডের সার্বিক প্রচেষ্টায় বছর পাঁচেকের মধ্যে “একতা মূর্তি” বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি হয়ে উঠবে। এই প্রসঙ্গে বিশ্বের আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উঁচু মূর্তির কথা বললে বুঝতে পারবে, আমাদের দেশের এই “একতা মূর্তি” একটি অসাধারণ কীর্তি হতে চলেছে।

 স্প্রিং টেম্পল বুদ্ধ

biggantechno4802

বৈরোচন বুদ্ধের এই ১২৮ মি উঁচু মূর্তিটি চিনের হেনান প্রদেশের ঝাউকুন শহরে একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর স্থাপিত হয়েছিল ২০০২ সালে। ২০ মি উঁচু পদ্মের সিংহাসনের উপর ১০৮ মি উঁচু বুদ্ধের মূর্তিটি গড়ে তুলতে সেই সময়েই খরচ হয়েছিল প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা। প্রায় ১০০০ টন তামা ১১০০টি অংশে ঢালাই করা হয়েছিল এই মূর্তিটি গড়ে তোলার সময়। এই মূর্তির ঠিক নিচেই আছে একটি বৌদ্ধ গোম্ফা। ২০০১ সালে তালিবান জঙ্গীদের হাতে আফগানিস্তানের প্রাচীন বামিয়ান বুদ্ধ মূর্তিগুলি ধ্বংস হবার পরেই এই মূর্তি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় চিনা সরকার।

যে পাহাড়ে এই মূর্তিটি স্থাপিত হয়েছে, তার অদূরে আছে তিয়ানরুই উষ্ণ প্রস্রবণ বা হট স্প্রিং যার জলের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি। এই উষ্ণ প্রস্রবণের নামেই এই মূর্তির নাম স্প্রিং টেম্পল বুদ্ধ। বর্তমানে এই মূর্তিটিই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি।

 ল্যাকিউন শেৎকিয়র

biggantechno4803

এটিও গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। ১৩.৫ মি উঁচু সিংহাসনের উপর ১১৬ মি উঁচু এই বুদ্ধ মূর্তিটি মায়ানমারের মোইনোয়া শহরের কাছে খাতাকান টোং গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৮ সালে। এই মূর্তি গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এই মূর্তিটির ভিতরটি ফাঁপা, মূর্তির ভিতরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যায় এবং সেখান থেকে মূর্তির গায়ের জানালা দিয়ে দেখে নেওয়া যায় চারপাশের  দৃশ্যাবলী। এখনও পর্যন্ত এই মূর্তিটিই বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম মূর্তি।

 উশিকি দাইবুৎসু

biggantechno4804

এটিও অমিতাভ বুদ্ধের মূর্তি। জাপানের হনসু দ্বীপের ইবারাকি প্রিফেকচারের উশিকিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। প্রিফেকচার অনেকটা আমাদের দেশের জেলার মতো, এর আগেকার নাম ছিল হিতাচি প্রভিন্স, ১৮৭১ সালে নাম পাল্টে হয়ে যায় ইবারাকি। ১০ মি উঁচু ভিত্তির ওপর, ১০ মি উঁচু পদ্ম সিংহাসন, তার ওপরে ১০০ মি উঁচু এই মূর্তিরও ভিতরটি ফাঁপা। মূর্তির ভিতরেই চারতলা একটি বাড়িতে আছে ছোট্ট একটি মিউজিয়াম। মূর্তির ভিতরে একটি এলিভেটর চড়ে ৮৫ মি উঁচুতে একটি প্ল্যাটফর্মে ওঠা যায়, সেখান থেকে মূর্তির চারপাশের ফুলের বাগান ও ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানার দৃশ্য দেখার মতো।  ব্রোঞ্জে বানানো এই মূর্তির ওজন ৪০০৩ টন, কানের মাপ ১০ মি, চোখের মাপ ২.৫৫ মি আর নাকটি ১.২০ মি। এখনও পর্যন্ত এই মূর্তিটি বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম মূর্তি।

 স্ট্যাচু অফ লিবার্টি  

আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মূর্তির সঙ্গে আমরা অল্পবিস্তর সকলেই পরিচিত। এই সুন্দর মূর্তিটি স্বাধীনচেতা আমেরিকানদের মুক্তচিন্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লিবার্টাস নামে এক রোমান দেবীর এই মূর্তিটি। ডান হাতে উঁচু করে ধরে আছেন একটি মশাল, আর অন্য হাতে ট্যাবুলাস আনসাটা, যার ওপরে রোমান হরফে খোদাই করা আছে ৪ঠা জুলাই ১৭৭৬, আমেরিকার স্বাধীনতার দিনটি। মূর্তির পায়ের কাছে পড়ে আছে ভাঙা শিকলের টুকরো। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যে যুদ্ধজয়ী সৈন্যবাহিনীর সেনানায়ককে প্রশংসা বা কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সম্রাটরা একটি ধাতু বা চামড়ার পাত দিতেন, সে পাতের ওপর রোমান হরফে লেখা থাকত তাঁদের কৃতিত্বের কথা, সেই পাতটিকেই বলত ট্যাবুলাস আনসাটা, অনেকটা আমাদের রাজাদের আমলের তাম্রপত্রর মতো।

সমুদ্রপথে আমেরিকায় ঢোকার মুখে এই মূর্তিটি বিদেশ থেকে আসা সকলকে যেন বুঝিয়ে দেয় আমেরিকার অধিবাসীদের স্বাধীনতার প্রতি ভালোবাসার কথা। ৪৬ মিটার উঁচু এই মূর্তিটি ৪৭ মিটার উঁচু বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন অংশে মূর্তিটি বানানো হয়েছিল ফ্রান্সে, বিশাল বিশাল বাক্সে ভরে সেইসব অংশ ফ্রান্স থেকে জাহাজে আমেরিকায় পাঠানো হয়েছিল। আমেরিকায় নিউইয়র্ক হার্বারে লিবার্টি দ্বীপের মাঝখানে বানিয়ে তোলা বেদিটির উপর ফ্রান্সের শিল্পীরা মূর্তিটিকে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করেছিল ১৮৮৬ সালের ২৮শে অক্টোবর।

এই মূর্তির ভিতরে দুটি ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে মূর্তির মুকুট পর্যন্ত ওঠা যায়, সেখানকার জানালা দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত দেখে নেওয়া যায় চারপাশের দৃশ্য। মূর্তির ডানহাতের ভিতরে আর একটি সংকীর্ণ ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়া যায় মশালের চারদিকের ঝোলানো বারান্দায়। মাটি থেকে ৯৩ মি উঁচু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দর্শকরা এমন একটি সৃষ্টির জন্য অনুভব করতে পারতেন গর্ব এবং রোমাঞ্চ। নিরাপত্তার কারণে ১৯১৬ সাল থেকে এই বারান্দাটি সাধারণ দর্শকের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১২৭ বছরের বহু ঝড়ঝাপটা সামলে বিশ্বের চতুর্থ উচ্চতম এই মূর্তিটি আজও স্বমহিমায় বিরাজিত।

 মাদারল্যাণ্ড কলস

File source: http://en.wikipedia.org/wiki/File:The_Motherland_Calls.jpg

২৩শে আগষ্ট ১৯৪২ থেকে ২রা ফেব্রুয়ারী ১৯৪৩ পর্যন্ত ২০০ দিন ধরে স্তালিনগ্রাড যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে মনে করা হয়। এই ভয়ংকর যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজের হাতে ভীষণভাবে পরাস্ত হয়েছিল জার্মানির নাৎসী বাহিনী। সেই যুদ্ধজয়ের স্মৃতিতে ১৯৬৭ সালে রাশিয়ার ভলগোগ্রাড শহরের মামায়েভ কুরগানে ৮৭ মি উঁচু এই মূর্তিটি স্থাপিত হয়। মাদারল্যাণ্ড কলস মানে মাতৃভূমির আহ্বান, মাতৃরূপী এই মূর্তি হাতে উদ্যত তলোয়ার নিয়ে দেশবাসীকে ডাকছেন, দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে। মূর্তির উচ্চতা ৫২ মি, ডানহাতে উদ্যত তলোয়ারটির দৈর্ঘ ৩৩ মি। ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর এই মূর্তিটির কাছে উঠতে ২০০ ধাপের সিঁড়ি পার হতে হয়, ২০০ সিঁড়ি, ২০০ দিন যুদ্ধের স্মারক। এই মূর্তিই এখন বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম মূর্তি।

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply