
ভারতবর্ষের সেতুর ইতিহাস বেশ পুরোনো। সেই রামায়ণের যুগেই নাকি শ্রীরামচন্দ্র বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতুটি তৈরি করেছিলেন তাঁর বানর সেনার সাহায্যে। তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম থেকে শ্রীলংকার উত্তর-পশ্চিমে মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সেই সেতুর ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৩০ কিলোমিটার। রামেশ্বরম মন্দিরের নথি থেকে জানা যায় ১৪৮০ সাল পর্যন্ত নাকি এই সেতুতে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যেত শ্রীলঙ্কার ওই দ্বীপে। ওই বছর এক ভয়ংকর ঘূর্ণি ঝড়ে ওই সেতু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
শ্রীরামচন্দ্রের পর ভারতবর্ষে সেতু নিয়ে খুব একটা ভাবনা চিন্তার আর তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে ভারতে আধুনিক সেতু গড়ার সূত্রপাত ইংরেজ সরকারের হাত ধরে মোটামুটি ১৮৫৭ সালের পর। ১৮৫৭ সাল শুনেই তোমাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাবে সিপাহী বিদ্রোহের তথা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। ঠিক তাই। তার আগে ১৮৫৩ সালের ১৬ই এপ্রিল, বম্বে (এখনকার মুম্বাই) থেকে থানে পর্যন্ত প্রথম রেল চলাচল শুরু হলেও, রেলপথ প্রসারের ব্যাপারে ইংরেজদের সে সময় তেমন গা ছিল না। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ধাক্কা, ইংরেজদের নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য করেছিল।
সেই সময় ইংরেজ সরকার অনেক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারা ভারতে ছড়িয়ে দিতে হবে রেলপথ। তোমারা কি ভাবছো আমাদের যাওয়া আসার সুবিধের জন্যে? মোটেই তা নয়। সারা ভারতে রেলপথ ছড়িয়ে দিতে পারলে, ভারতের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সৈন্যবাহিনীর যাতায়াত অনেক সহজ হবে। ভবিষ্যতে আবার কোন অঞ্চলে বিদ্রোহ হলে, চট করে পৌঁছে দেওয়া যাবে একসঙ্গে অনেক সৈন্যবাহিনী। আরও একটা বিশাল স্বার্থ ছিল, ভারতের যত সেরা পণ্য, সে শস্যই হোক আর খনিজ সম্পদ, প্রচুর পরিমাণে তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেওয়া যাবে ভারতের তিনটি বন্দর শহরে – কলকাতা, বম্বে আর মাদ্রাজ (এখনকার চেন্নাই)। এরপর যাত্রীপরিবহন হল বাড়তি পাওনা।
তাই হলো। ১৮৮০ সাল মানে মাত্র তেইশ বছরের মধ্যে ইংরেজ সরকার প্রায় ১৪৫০০ কিলোমিটার রেলপথ বিছিয়ে জুড়ে দিল ভারতের চারটে প্রধান শহর, কলকাতা, দিল্লী, মাদ্রাজ, বম্বে।
আর এই রেলপথ আর তার সঙ্গে উন্নত স্থলপথ বানাতে গিয়েই নদীমাতৃক ভারতবর্ষের অজস্র বড়ো, মেজ, ছোট নদীর ওপর বানিয়ে তুলতে হল অজস্র সেতু। শুরু হল ভারতের সেতু বানানোর প্রক্রিয়া। আজ পর্যন্ত নির্মাণ হওয়া হাজার হাজার সেতুর মধ্যে কয়েকটি সেতুর কথা এখানে বলছি–
বান্দ্রা–ওরলি সি লিংক

দীর্ঘ এই সাগরসেতুপথের নির্মাণ ২০০০ সালে শুরু করেছিল, ভারতবর্ষের অন্যতম বড়ো নির্মাণ সংস্থা হিন্দুস্থান কন্স্ট্রাকশন কোম্পানি। এটির নির্মাণ শেষ হয়েছিল ২৪শে মার্চ ২০১০ সালে, যদিও আংশিকভাবে সকলের জন্যে খুলে দেওয়া হয়েছিল ৩০শে জুন ২০০৯। দৈর্ঘ্যে এটি ৫.৬ কিলোমিটার। দুটি ৪ লেনের রাস্তা নিয়ে এই সেতু ৪০ মিটার চওড়া এবং সমুদ্রতল থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা ১২৬ মিটার। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে কংক্রিট (চলিত কথায় যাকে আমরা ঢালাই বলি) আর স্টিল দিয়ে তৈরি এই ব্রিজটির প্রধান কাঠামোটি কেব্ল্ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে উঁচু স্টিলের টাওয়ার থেকে। কেব্ল্ হল ভীষণ শক্তিশালী সূক্ষ্ম স্টিলের তারের অনেকগুলি গুছি, ভীষণ স্থিতিস্থাপক বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের ঢাকনায় ঢাকা থাকে। সেতুর ভার, তার ওপরে ছুটে চলা অজস্র গাড়ির ভার এই কেব্ল্গুলো ধরে রেখেছে। সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় এই স্টিলের তার যাতে ক্ষয়ে না যায় তাই ওই ঢাকনার ব্যবস্থা। রোদ, জল ঝড় সব কিছুর থেকে বাঁচিয়ে রাখা ঢাকনার প্লাস্টিক সাধারণ প্লাস্টিক নয় বুঝতেই পারছো।
মহাত্মা গান্ধী সেতু

গঙ্গার দুই পাড়ের দুই শহর পাটনা আর হাজিপুরের সংযোগকারি এই সেতুর দৈর্ঘ ৫.৫৭৫ কিলোমিটার। ৪ লেনের এই ব্রিজটি চওড়ায় ২৫ মিটার। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ দশবছর ধরে এই সেতুটি নির্মাণ করেছিল ভারতের বিখ্যাত নির্মাণ সংস্থা গ্যামন ইন্ডিয়া লিমিটেড।
বিশাল এই সেতু পাটনা ও হাজিপুর শহরের বর্তমান যান পরিবহনের পক্ষে আর যথেষ্ট না হওয়ায়, এর পাশাপাশি আরো একটি সেতু বানানোর পরিকল্পনা চলছে।
বিদ্যাসাগর সেতু

এই সেতুটি আমাদের কলকাতা শহরের সঙ্গে হাওড়ার নতুন যোগসূত্র। দৈর্ঘে মাত্র ৮২২.৯৬ মিটার হলেও এই সেতুর বিশেষত্ব এর প্রযুক্তির জন্যে। গঙ্গার জলতল থেকে এর উচ্চতা ২৬ মিটার, বড়ো বড়ো জাহাজ অনায়াসে এই সেতুর নীচে দিয়ে পার হয়ে যেতে পারে। তেসরা জুলাই ১৯৭৯ এর নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ১০ই অক্টোবর ১৯৯২। এত ছোট দৈর্ঘ্যর সেতু নির্মাণে প্রায় তের বছর সময় লাগাও এক অনন্য উদাহরণ। এই বিলম্বের কারণ কিছুটা প্রযুক্তিগত জটিলতা হলেও, সেতু নির্মাণের জন্য যথেষ্ট জায়গা ও জমি পাওয়ার ব্যাপারে আইনী জটিলতাই ছিল প্রধান কারণ। এই সেতুটি পুরোটাই মাত্র দুটি উঁচু টাওয়ারের মাথা থেকে কেব্লে ঝুলে আছে। কেব্ল্ ব্যাপারটা কী সেটা তো তোমরা আগেই মোটামুটি জেনে গেছ বান্দ্রা –ওরলি সি লিংক থেকে। ভারতে বিদ্যাসাগর সেতুই দীর্ঘতম কেব্ল্ সেতু এবং এশিয়ার মধ্যেও অন্যতম।
দেশের প্রধান তিনটে সেতুর কথা তো শুনলে এবার চলো একটু বিদেশে যাই। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ দুটি সেতুই আছে চিন দেশে।
দাংয়িয়াং-কিউনশান মহা সেতু

চিনের ইয়াংসি নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলের নদী, নালা, নীচু জলা জমি আর অনেক সরোবরের ওপর দিয়ে বানানো এই সেতুর দৈর্ঘ ১৬৪.৮ কিলোমিটার। ২০০৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে, ২০১০ সালে এটির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। ৩০শে জুন ২০১১ পরিবহনের জন্যে এই সেতু খুলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত এই সেতুটিই বিশ্বের দীর্ঘতম।
চিনের সাংহাই শহর থেকে পূর্ব চিনের জিয়াংসু প্রদেশের নানজিং পর্যন্ত এই সেতুর ব্যাপ্তি। পশ্চিম থেকে ইয়াংসি নদীর ৫ থেকে ৫০ মাইল দূরত্ব বরাবর দাংয়িয়াং, চাংঝাউ, উক্সি, সুঝাউ শহর হয়ে একদম পূর্বের শহর কিউনশানকে জুড়ে দিয়েছে এই দ্রুতগামী রেল সেতু। ওপরের ছবিটি প্রায় ৯.০০ কিলোমিটার লম্বা ইয়াংশেং লেকের ওপরে সেতুর একটি অংশের ছবি।
তিয়াংজিং মহা সেতু

চিনের ১১৩.৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুটি বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু। বেজিং থেকে সাংহাই দ্রুতগামী রেলপথের একটা অংশ এই রেলসেতু। চিনের লাংফাং শহরের সঙ্গে কিংজিয়ান শহরকে যুক্ত করেছে এই সেতু। এই সেতুটিরও নির্মাণ মোটামুটি ২০০৬ সালে শুরু হয়ে ২০১০ সালে সম্পূর্ণ হয়ে যায় এবং ৩০শে জুন ২০১১ থেকে চালু হয়ে যায় রেল পরিষেবা।
দৈর্ঘে আর প্রযুক্তিতে বড়োসড়ো দেশ বিদেশের অনেক সেতুর কথা তোমরা শুনলে এবার বলি আমার পছন্দের সুন্দর দুটি সেতুর কথা, যারা দৈর্ঘে হয়তো তেমন কিছু নয়, কিন্তু ট্রেনে বা বাসে সেই সেতুগুলি পার হতে খুব ভাল লাগে।
পম্বন সেতু

মূল ভারত ভূখন্ডের সঙ্গে রামেশ্বরমের পম্বন দ্বীপের যোগসূত্র এই সেতু লম্বায় ২.৩৪ কিলোমিটার। পাশাপাশি দুটি সেতু একটি রাস্তা আর অন্যটি রেলপথ, বরাবর পার করে দিয়েছে পক প্রণালী। রেলসেতুর নির্মাণ ১৯১৩ সালে শুরু হয়ে ১৯১৪ সালে শেষ হয়ে জনগণের জন্যে খুলে দেওয়া হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই সেতুই ছিল ভারতের দীর্ঘতম সাগরসেতু। দুপাশে নীল সমুদ্রের উপর দিয়ে এই ট্রেনযাত্রায় যারা গিয়েছ, তারা নিশ্চয়ই কোনদিন ভুলতে পারবে না সেই যাত্রা।
করোনেশন সেতু:

সিকিম বা কালিম্পং যাবার পথে এই সেতুটি অনেকেই দেখে থাকবে। তিস্তা নদীর উপর খুব সুন্দর ছোট্ট সেতুটি প্রযুক্তিগতভাবে একটু পুরানো হলেও খুব কাজের। তিস্তা পার করে এই সেতু দা্র্জিলিং জেলার সঙ্গে জলপাইগুড়িকে জুড়ে দিয়েছে। ১৯৩৭ সালে শুরু হয়ে এই সেতু সম্পূর্ণ হয়েছিল ১৯৪১ সালে। ইংরিজি করোনেশন মানে রাজা বা রানির অভিষেক, ইংল্যাণ্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও রানি এলিজাবেথের অভিষেকের স্মৃতিতে নির্মিত এই সেতুর অন্য নাম সেবক ব্রিজ। দুপাশে পাহাড়ের সবুজ জঙ্গল, নিচে প্রবল স্রোতে বয়ে চলা তিস্তা, পায়ে হেঁটে এই সেতু পার হওয়ার সময়, এর স্থাপত্যকে প্রকৃতির থেকে খুব আলাদা মনে হয় না, এতই সহজ আর সুন্দর।