FUNবিজ্ঞান-মারিয়ার ছেলে দিমিত্রি(তৃতীয় পর্ব) -অমিতাভ প্রামাণিক-বসন্ত২০২৩

প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্বতৃতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

bigganmendeleev

রসায়নশাস্ত্রের মেরুদণ্ড যে পিরিওডিক টেবিল বা পর্যায় সারণি, তার জন্ম হয়েছিল তাঁর মস্তিষ্কে। অথচ ছেলেবেলাটা তাঁর মোটেই ফুল বিছানো পথে এগোনো হয়নি। তবে অমন মা যাঁর সহায় তাঁকে কে রুখবে? রইল  বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিভ-এর ছেলেবেলার  গল্প। 

xxxxxxxxxxxxxxxxxx

চার

১৮৬৫ সাল। অধ্যাপক দিমিত্রি মেন্ডেলীভ সহকর্মী অধ্যাপক ইলিয়িনের সঙ্গে একত্রে আট হাজার রুবল খরচ করে মস্কোর কাছে বোবলোভো গ্রামে তিনশো ষাট একর জমিরও ওপর এক খামারবাড়ি কিনে ফেললেন। জায়গাটা বোবলোভো পাহাড়ের ওপর, মস্কো থেকে ট্রেনে সাত ঘন্টার পথ, স্টেশন থেকে বারো মাইল দূরে। জমির মাঝখানে একতলা বাড়িটা বেশ উঁচু, কাঠের তৈরি, পেল্লাই কাচের জানালা দেওয়া। কিন্তু বাড়ির চারদিকে পাইন, বার্চ, ওকের ঘন গাছপালায় দূর থেকে তাকে দেখাই যায় না। এখানে বাতাসে জঙ্গলের গন্ধ, তাজা ঘাসের ঘ্রাণ। তার সঙ্গে মিশে থাকে বাড়ির ঠিক সামনে ফুটে থাকা গোলাপ বাগানের সুবাস।

কিন্তু শুধু গরমের ছুটি কাটাতে এখানে আসার জন্য এই খামারবাড়ি কেনেননি দিমিত্রি। তাঁর উদ্দেশ্য একেবারেই আলাদা। এই তিনশো ষাট একরের জমির এক বড়সড় অংশ হচ্ছে পরীক্ষামূলক চাষের জমি। মেন্ডেলীভ এখানে চাষ করতে চান বিভিন্ন ধরনের ফসল, দেখতে চান কেমনভাবে তাদের ফলন বাড়ানো যায় বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তু জমিতে মিশিয়ে। ঠিক যেমনভাবে ফসফোরাইট গুঁড়ো ব্যবহার করে ইয়াস্টাস ফন লিবিগ বদলে দিতে চেয়েছেন চাষের প্রকরণ। এ কাজে সাহায্য করার জন্য খামারবাড়িতে স্থান পেয়েছে বেশ কয়েকটি গাই-বলদ, ঘোড়া, অনেকগুলো স্থানীয় দিনমজুর এবং ঝাড়াই-মাড়াই করবার যন্ত্রপাতি।

মেন্ডেলীভের অনুসন্ধিৎসু মন দেখতে চায় আরও অনেক কিছু জিনিস মেপেজুপে দেখতে। তাই বাড়ির সামনেই তিনি ফানেলওয়ালা একটা পরিমাপক সিলিন্ডার রেখেছেন এক এক দিনে কতটা বৃষ্টি হয়, তা মাপার জন্য। পাশেই রাখা আছে একটা ব্যারোমিটার, একটা থার্মোমিটার, একটা হাইগ্রোমিটার। তারা মেপে চলে বাতাসের চাপ, তাপমাত্রা, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ। এগুলো রোজই মাপা হবে। দিমিত্রি দেখতে চান এদের পরিবর্তন জমির ফসলের উৎপাদনে কেমন প্রভাব বিস্তার করে। ঢোলা জামা আর খড়ের টুপি পরে তিনি যখন তাঁর খামারে ক্ষেতের মধ্যে ঘুরে বেড়ান, তখন কে বলবে তিনি একজন চাষি নন! তাঁর কপালে জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তার সাদা দাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ায় শস্যক্ষেতের শ্যামল হাওয়া।

দিমিত্রির শস্যক্ষেতে ফলে আশেপাশের জমির চেয়ে অনেক বেশি ফসল। কিন্তু এই গুপ্তবিদ্যা নিজের কাছে লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা নেই তাঁর। যে-কেউ তাঁর কাছে এসে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেই দিমিত্রি উদারভাবে বলেন, এ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা জারি আছে। তবে তিনি যেটা ব্যবহার করে এখনও অবধি সবচেয়ে ভালো ফল পাচ্ছেন, সেটা যদি প্রতিবেশী ব্যবহার করতে চান, তবে তিনি তাঁকে শিখিয়ে দিতে প্রস্তুত। বিভিন্ন সাইজের কাঠের ড্রামে তাঁর কাছে ভরা থাকে ফসফেট, ম্যাগনেসিয়া, পটাশ, সালফার। তিনি সেগুলো থেকে কিছুটা করে ঢেলে দেন তাঁদের সঙ্গে নিয়ে আসা পাত্রে। কখনও দু-তিনটে একসঙ্গে মিশিয়ে ধরিয়ে দেন তাঁদের হাতে। প্রতিবেশীরা জানে, দিমিত্রির এই ম্যাজিক গুঁড়ো হচ্ছে সূর্যের আলোর চূর্ণ!

যখন ক্ষেতে কাজকর্ম করেন না, তখন ঘোড়ায় চড়ে দিমিত্রি বেরিয়ে যান দূরের গ্রামগুলো ঘুরে আসতে অথবা ঘন জঙ্গলের মধ্যে বিচরণ করতে।

কখনও তাঁর দিদিদের কেউ বেড়াতে আসে দিমিত্রির বাড়িতে। শুরু হয়ে যায় ছোটবেলার গল্পগাছা। বাবার গল্প। মায়ের গল্প। দিমিত্রি বলে, জানিস দিদি, ওডেসা থেকে আমি যখন ফিরলাম সেন্ট পিটার্সবার্গে, ফিরেই তো ম্যাজিস্টারের জন্য থিসিস জমা দিলাম। সেই পরীক্ষা তো ভালোয় ভালোয় চুকে গেল। পরের ম্যাজিস্টারের থিসিস জমা দেওয়ার জন্য আমার হাতে একেবারেই সময় ছিল না। মাত্র একটি মাস। অত তাড়াতাড়ি পড়াশোনাই বা কী করব, লিখবই বা কী! হঠাৎ মায়ের মুখ মনে পড়ে গেল। মা যে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত আমাদের কাচের কারখানায়, সেখানে আমি দেখতাম কেমনভাবে কাচ গলিয়ে তৈরি হয় হরেক রকম কাচের বাসনপত্র। কাচ মানেই তো সিলিকেট। বিভিন্ন ধাতুর সিলিকেট। আমি ঠিক করলাম, ওইটা নিয়েই লিখে দেব আমার থিসিস। ছোটবেলার শেখা বিদ্যা কি মানুষ সহজে ভোলে? আমিও ভুলিনি। তড়িঘড়ি বইপত্তর জোগাড় করে ওর ওপরেই পড়াশোনা করে লিখে ফেললাম আমার থিসিস। অধ্যাপকরা সেটা পড়েই মহা খুশি।

দিদি তাঁর প্রিয় ভাইয়ের এই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে আত্মহারা। বলল, মা ঠিকই জানত, তুই-ই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। তোর জন্যই মা জমিয়ে রেখেছিল তাঁর শেষ সামর্থ্যটুকু। 

গ্রীষ্মের ছুটি খামারবাড়িতে কাটালেও দিমিত্রি প্রায় প্রতিদিনই বেশ কয়েকটা করে চিঠি লেখেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের। গবেষণাপত্রাদি থেকে যেই তিনি জানতে পারেন কেউ কোনো বিশেষ পদার্থ নিয়ে গবেষণা করছেন, বিশেষ করে অজৈব যৌগ, দিমিত্রি তাঁকে চিঠি লেখেন জানতে চেয়ে সেই পদার্থের গলনাঙ্ক কত, স্ফুটনাঙ্ক কত, মৌলিক পদার্থ হলে কত তার পারমাণবিক ভর। এই সমস্ত তথ্যাদি তিনি লিখে রাখেন তাঁর নোটবইতে। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে তিনি ফিরে যাবেন সেখানকার ক্যাম্পাসে। সেখানেও তাঁর এক বসতবাড়ি আছে আর সেই বসতবাড়িতেই তিনি তৈরি করে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব গবেষণাগার। সেই গবেষণাগারে তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন, চিঠি থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি সব ঠিক কিনা।

জৈব যৌগের ওপর লেখা বইটার খুব কদর হয়েছে। কিন্তু শুধু জৈব যৌগ মানে তো সমগ্র রসায়ন নয়। রাশিয়ান ভাষায় অজৈব রসায়নেরও বই নেই। কে লিখবে, তিনি ছাড়া?

* * *

টাকা পয়সার এই যে সাচ্ছন্দ্য দিমিত্রির, এর পেছনে চাকরিটার ভূমিকা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি কোকোরেভের। আরও ভালো হ’তে পারত ফিওজভার আপত্তি না থাকলে। দিমিত্রির চেয়ে আট বছরের বড় ফিওজভা, তাকে দিমিত্রি কিছুতেই বুঝতে পারে না। বিয়ের এগারো মাস পরে ১৮৬৩ সালের মার্চে তাদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। মায়ের স্মৃতিতে কন্যার নাম রাখা হয়েছে মারিয়া। কন্যার ভাগ্যেই বলা যেতে পারে, দিমিত্রির জুটে গেছে টেকনলজি ইনস্টিট্যুটের চাকরিটা। এতদিন যে সে বিভিন্ন জায়গায় পড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, তার অনেকগুলো থেকে অব্যাহতি পাওয়া গেছে।

সে বছরেরই অগাস্টের মাঝামাঝি। শনিবার। দিমিত্রি বাড়িতে বসে স্ত্রীর সঙ্গে চা খাচ্ছে। পাঁচ মাসের বাচ্চা মারিয়া কিছুটা অসুস্থ খবর পেয়ে দিমিত্রি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছে। এমন সময় কোকোরেভের ভৃত্য তার বাড়িতে এসে খবর দিল তার প্রভু দিমিত্রিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্য। কোকোরেভ সেন্ট পিটার্সবার্গেই থাকেন, বাকু অঞ্চলে তার বিশাল ব্যবসা, তিনি তেলের কারবারী।

সে দিনই কোকোরেভের সঙ্গে দেখা করল দিমিত্রি। ফিরে এসে জানাল, কোকোরেভ তাকে অনুরোধ করেছেন ককেশাস অঞ্চলে বাকুর কাছে তার যে তেল পরিশোধনের কারখানাটা আছে, সেটা একবার দেখে আসতে। এখানে যে তেল তৈরি হয়, তাতে খরচা পড়ে অনেক। এর চেয়ে কম খরচে আমেরিকা থেকে কেরোসিন আমদানি করা যায়, তাই তার বিক্রিবাটাও কম, লাভও তথৈবচ।

দিমিত্রি মাস গেলে মাইনে পায় আটান্ন রুবল। কোকোরেভ তাকে বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ এই কাজটার জন্য তিনি তাকে দেবেন এক হাজার রুবল। এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার প্রশ্নই নেই। এর সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন দিমিত্রি যদি এমন কোনো ফন্দি বের করতে পারে যাতে তাঁর লাভের পরিমাণ বেড়ে যায়, তবে তিনি তাঁকে একটা তেলের পরিশোধনাগারের ডাইরেক্টরের চাকরি দেবেন। মানে মাসে মাসে হাজার রুবল করে আয় করার সুযোগ। কোথায় আটান্ন ডলার, কোথায় হাজার!

কিন্তু দিমিত্রি তেলের কারখানার ডাইরেক্টর হবে এবং ককেশাসে গিয়ে চাকরি করবে শুনেই ফিওজভা উচ্চ স্বরে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। এই এক মুশকিল! কীসে যে তার আপত্তি, দিমিত্রি বুঝতে পারে না। এটা কি এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে সে একটা তেলের কারখানায় চাকরি করবে, সেটা? নাকি তাদের গিয়ে থাকতে হবে ককেশাসের মতো পাণ্ডববর্জিত জায়গায়, সেটা? নাকি দুটোই?

প্রায় তিরিশ বছর বয়স দিমিত্রির, পরিবারে নতুন আগন্তুক এসেছে, টাকা পয়সা রোজগারের এই তো সময়! এখন এ সবে বাগড়া দিলে চলে! বৌকে বোঝাল, ঠিক আছে, ডাইরেক্টরের ব্যাপারটা পরে ভাবা যাবে, আপাতত সে প্রাথমিক কাজটা করে আসুক। এই এক হাজার রুবলের কাজটা ছাড়া একেবারেই উচিত হবে না।

তিন দিন পরে দিমিত্রি যাত্রা শুরু করল মস্কো, নিঝনাই নোভগরোদ হয়ে বাকুর উদ্দেশে, ভল্গা নদী বেয়ে। জাহাজে এই যাত্রা আঠাশ দিনের। যখনই হাতে কোনো কাজ থাকে না, ফিওজভাকে সে চিঠি লেখে। কোকোরেভের সঙ্গে যতই কথা বলে সে, ততই তার চিন্তাভাবনার দিগন্ত খুলে যায়। মানুষের বুদ্ধি যদি ব্যবসার কাজে সাহায্যই না করল, তবে সেই বুদ্ধির আর গুরুত্ব কী! ব্যবসার সমৃদ্ধি মানেই দেশের সমৃদ্ধি। কত লোকের রুজি-রুটির সম্ভাবনা তৈরি হয় ব্যবসায়। রাশিয়া বিশাল দেশ, মাটির নীচে তার ধনসম্পদ তো কম নয়। অথচ এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে রাশিয়ায় শিল্প গড়ে ওঠে কই? লোকজন তো ইওরোপ আর আমেরিকা থেকে গাদা গাদা জিনিস আমদানি করে আনতেই আগ্রহী। এইভাবে দেশের উন্নতি হবে কী করে!

সমস্ত জাগতিক ব্যাপারে মেন্ডেলীভের অনন্ত কৌতূহল, পড়াশোনা করতে তার আগ্রহ ব্যাপক। ভল্গার যে ঘাটেই দাঁড়ায় তার জাহাজ, সেখান থেকেই সে বই কেনে। রাশিয়ান ভাষার বই, জার্মান ভাষার বই, ফরাসী ভাষার বই। দুটো শহরের মধ্যে কত দূরত্ব, সে টুকে রাখে নোটবইতে। যেখানেই নতুন জিনিস চোখে পড়ে, তার বিবরণ লিখে রাখে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে সেটা কী করে তৈরি করা হয়, তাতে কী কী লাগে, তার কেমন খরচাপাতি – সব।

রাশিয়ার দক্ষিণে যাচ্ছে সে। জায়গাটা কেমন হবে, কে জানে। কী মনে করে এক জায়গা থেকে সে একটা রিভলবার কিনে নিল।

নিঝনাই নোভগোরোদ থেকে ফিওজফাকে চিঠিতে জানাল যে মস্কোতে তারা গিয়ে উঠেছিল কোকোরেভের প্রাসাদে। সে এক বিশাল প্রাসাদ! বিশ লক্ষ রুবল খরচা করে তৈরি, তাও এখনও পুরোটা তৈরি হয়নি। মস্কো নদীর যে দিকে ক্রেমলিন, তার ঠিক উলটো দিকে কোকোরেভের এই অট্টালিকা। তাতে শ’ চারেক ঘর শুধু অতিথিদের থাকবার জন্য। আর জিনিসপত্র রাখার জন্য কত যে আলাদা জায়গা!

সেখান থেকে জাহাজ বদলিয়ে আবার তারা এগিয়ে চলল ভল্গা নদী বেয়ে। দিমিত্রি চিঠি লিখল বৌকে – জানো, এবার কোকোরেভ আরও বিলাসবহুল ব্যবস্থা করেছে আমার জন্য। এখন আমি যাচ্ছি ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রী হয়ে। আমার ডিভানটা ভীষণ সুন্দর, আমার ঘরটা বিরাট বড়, সবকিছুই খুব আরামপ্রদ। ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রীদের জন্য ওপরে একটা বিশাল হলঘরও আছে। তবে আমার এই আরাম কিন্তু সবই কোকোরেভ দিচ্ছে, আমি আমার নিজের পয়সা একেবারেই খরচা করছি না। তবে তুমি কিন্তু নিজের জন্যে যা যা দরকার, সব কিনে নিতে কার্পণ্য কোরো না। কয়েকটা কুপন ভাঙিয়ে নাও, যা আছে তাতে তুমি পঁয়তাল্লিশ রুবল মতো পেয়ে যাবে। মারিয়ার দেখভাল কোরো ঠিকমতো। বাকু জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। তুমি আর মারিয়া সঙ্গে থাকলে আমরা খুবই আনন্দে থাকতে পারব। বাকুরে তাতারদের ভিড় থাকলেও শুনেছি সেখানে শান্তিশৃঙ্খলার অভাব নেই, আর সমুদ্রটা তো অনিন্দ্যসুন্দর।

ফিওজভার মন ভালো নেই। তার কোনো বিলাসিতারও প্রয়োজন নেই। সে তার জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট নয়। কিন্তু একটা বাচ্চা নিয়ে সে যথেষ্ট হিমশিম খাচ্ছে।

যে কাজের জন্য কোকোরেভ তাকে বহাল করেছিলেন, তার কোনো লিখিত রিপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি দিমিত্রির। যা বলার সে মুখেই বলে দিয়েছিল, লিখে নিয়েছিল কোকোরেভ। এ সংক্রান্ত একটা ছোট্ট প্রবন্ধ সে ছাপিয়েছিল প্রায় সতেরো বছর পরে। সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে কোকোরেভকে দিমিত্রির পরামর্শ চারখানা।

এক, যেখান থেকে তেল তোলা হচ্ছে, সমুদ্রের কাছের সেই জায়গা থেকে পরিশোধনাগার অবধি একটা বিশাল পাইপলাইন তৈরি করতে হবে। তেল আসবে সেই পাইপলাইন দিয়ে। চামড়ার থলেতে বা কাঠের ড্রামের ভরে তেলের মতো বস্তু পরিবহণ একেবারে চলবে না।

দুই, পরিশোধিত তেল এবং কেরোসিন পরিবহণের জন্য ব্যবহার করতে হবে তেল পরিবহণের উপযুক্ত জাহাজ। এরা কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ভল্গা দিয়ে বিভিন্ন শহরে যাবে।

তিন, তৈল পরিশোধনাগার এক শিফটে চলবে না, চলবে দিবারাত্র অষ্ট প্রহর, বন্ধ হবে না কখনও।

চার, পরিশোধনাগারটা নিঝনাই নোভগোরোদে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কোকোরেভ যাত্রাপথেই তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এই ব্যবসায় একেবারেই লাভ করতে পারছেন না এবং এইভাবে চলতে থাকলে কারখানা ও ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া গতি নেই। দিমিত্রির এই চার পরামর্শ পেয়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। এবং অনতিবিলম্বেই তাঁর ব্যবসা লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছিল।

এ ছাড়াও এই যাত্রার মধ্যেই তিনি দিমিত্রিকে তারই পরামর্শমতো নিঝনাই নোভগোরোদে কোকোরেভের পয়সায় যে তৈল পরিশোধনাগারটা নির্মিত হবে, তার টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর পদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এর যাবতীয় শর্তাবলিও তুলে দেওয়া হয় দিমিত্রির হাতে। সে শর্তগুলো এতটাই লোভনীয় যে ছাড়া খুবই মুশকিল। দিমিত্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি রেখেই এই পদে যোগ দিতে পারবে। গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অবসরের সময়টা এই কাজের পেছনে দিলেই চলবে। এইটুকু সময় দিতে পারলেই সে বছরের অক্টোবর থেকে পরের বছরের এপ্রিল অবধি সে মাসে মাসে পাবে আড়াইশো রুবল করে, মে মাস থেকে যতদিন কারখানা লাভজনক না হচ্ছে (যার সীমা পরবর্তী তিন বছর) ততদিন মাসে মাসে পাঁচশো রুবল করে। আর কারখানা লাভজনক হয়ে গেলে, আরও কিছু শর্তসাপেক্ষে সে এককালীন পাবে তিরিশ হাজার রুবল!

এই প্রস্তাব কি ছাড়া যায়! এমনকি যে কাজের জন্য তাকে বহাল করা হয়েছিল, তার জন্যও আয় মন্দ হয়নি। কোকোরেভ অগাস্টে তার হাতে দিয়েছে ছশো রুবল, অক্টোবরে আরও সওয়া সাতশো রুবল। কোকোরেভের পরিচিত আর একজন তেলের ব্যবসায়ী, তার নাম বেকম্যান, তার হয়েও কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছে এর মধ্যে দিমিত্রি এখানে। সেও তাকে দিয়েছে দুশো রুবল। আর এখানে এসে সে পরিচিত হয়েছে আরও একজনের সঙ্গে, তার নাম স্নওয়ার। সে তার কিছু যন্ত্রপাতি – সম্ভবত কোনো অস্ত্র – দিমিত্রিকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে তাকে দিয়েছে এক অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ – পাঁচ হাজার রুবল!

এই সব কাজ করতে গিয়ে দিমিত্রির বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে দেরি হয়ে গেল। এই দেরির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে সে রেক্টরকে চিঠি দিল। তার জন্য সেখানে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল কিনা, সে কথা জানা যায় না।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য দিমিত্রি কোকোরেভের প্রস্তাবে রাজি হতে পারল না। দিমিত্রি বৌকে চিঠি লেখে, আশা করে যে ফিওজভা তার চিঠির উত্তর দেবে। কিন্তু সেই চিঠি আসা এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। সেপ্টেম্বরের কুড়ি তারিখে দিমিত্রি বেশ অনুযোগ করে চিঠি লিখল, তোমার ব্যাপারটা কী? একটা চিঠি লেখার সময় নেই? সেই অগাস্টের শেষ সপ্তাহে লেখা তোমার চিঠি পেয়েছি। তারপর আর চিঠি লেখার নামগন্ধ নেই। ছোট্ট মারিয়া নিশ্চয় ঠিকঠাক আছে। সে নিশ্চয় তোমাকে বেশি জ্বালাচ্ছে না। আমি আর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরব। তোমাদের সকলের জন্যই তো আমার এই পরিশ্রম, সে তো তুমি নিশ্চয় বোঝো।

ফিওজভা এই চিঠির কী উত্তর দেবে! তার প্রাণাধিক মারিয়া এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে সেপ্টেম্বরের এক তারিখে!

ক্রমশ

 জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

 

Leave a Reply