প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব

বিজ্ঞানীরা কি বোকা ছিলেন?
আচ্ছা, আলোর মাপকাঠি যদি এতই অকেজো, তাহলে ওই বিজ্ঞানীরা অত কাঠখড় পুড়িয়ে পৃথিবীর গতি মাপার চেষ্টা করছিলেন কেন? তাঁরা কি বোকা ছিলেন? সব পরীক্ষায় ফেল করার পর বোধোদয় হয়েছে?
বিজ্ঞানীরা মোটেই বোকা ছিলেন না। তাঁরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। মাপজোপের আসল কারণটা ব্যাখ্যা করছি। আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব এক অতি সূক্ষ্ম বস্তু দিয়ে ভরা। সেই কাল্পনিক বস্তুটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইথার’। তাঁদের মতে, ইথার সর্বব্যাপী।
তাঁরা ভাবতেন, ইথার স্থির। এই ইথারের ভেতর দিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রেরা চলাফেরা করে, কিন্তু কোনও বাধাই পায় না। ইথারের এইসব ধর্ম আসলে মানুষের কল্পনা। কোনও প্রমাণ ছিল না, শুধু অনুমান ছিল।
তাঁরা ভাবতেন, ‘আলো’ ওই ইথারের ঢেউ। ইথার বস্তু, তাই আলো বস্তুর ঢেউ। যেহেতু বস্তুর ঢেউ, তাই বস্তুদের ‘তুলনামূলক গতি’ আইনকে মানতে বাধ্য। আলোর মাপকাঠি দিয়ে, স্থির ইথারের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর গতিবেগ মাপায় বাধা কোথায়?
মাইকেলসন আর মোরলের ওই যুগান্তকারী পরীক্ষার দুটি কারণ ছিল। ইথারের কল্পনার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সব তথ্যই ভুল। পরীক্ষার ফাউ হিসাবে আলোর এক আজব গতির কথা মানুষ শিখে গেল। আলোর গতির এই অকল্পনীয় চরিত্র আগে জানা ছিল না।
দুইটি ছুটন্ত রেলগাড়ি
আলোর ‘আজব গতি’ অথবা আলোর গতির ‘অকল্পনীয় চরিত্র’ এই জাতীয় কথাবার্তায় মানুষ চমকে যায়, কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না। বোঝার জন্য অল্প একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাই একটা উদাহরণ দিচ্ছি।
মনে করি, পাশাপাশি ‘আপ’ আর ‘ডাউন’ রেল-লাইন রয়েছে। ওই দুটি লাইনের উপর দুই ছুটন্ত ট্রেনের মুখোমুখি দেখা। দুই রেল-লাইনের মাঝে, আপ ট্রেনের দিকে মুখ করে একটা ফ্লাড লাইট জ্বালানো আছে। আলোর গতিবেগ মাপার যন্ত্র নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুই ট্রেনের ভেতরেই বসে আছেন।
আপ ট্রেন আলোর উৎসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আলো ট্রেনকে ছোঁয়ার আগেও ট্রেন নিজে এগিয়ে এসে আলোকে ধরে ফেলবে। আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলবে, আলোর গতি সামান্য বেশি মনে হবে।
আবার ডাউন ট্রেনটা আলোর উৎসের উলটোদিকে ছুটে পালাচ্ছে। আলো বেশি তাড়াতাড়ি ছোটে, ওই ধীরে ছোটা ডাউন ট্রেনকে ধরে ফেলছে। আলোকে বেশি রাস্তা ছুটতে হচ্ছে। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এই ডাউন ট্রেনের থেকে আলোর গতি কম মনে হবে। (ঝড়ের দিকে ছুটলে হাওয়ার বেগ বেশি। ঝড়ের উলটোদিকে ছুটলে হাওয়ার বেগ কম মনে হয়।)
দুই ট্রেনের বিজ্ঞানীদের মাপজোপ দেখলে বোঝা যাবে, আমাদের সাধারণ বুদ্ধি একেবারে ডাহা ফেল। বিজ্ঞানীদের মাপজোপ দেখলে বোঝা যাবে যে, কোনও ট্রেনেই আলোর গতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। (ঝড়ের দিকেই ছোটো অথবা ঝড়ের উলটোদিকে ছোটো, ঝড়ের গতি সমান।)
অসম্ভব ঘটনা, ঘটা সম্ভব নয়। অথচ এই ঘটনাগুলো দেখলে অসম্ভব মনে হচ্ছে। তাহলে আসল ব্যাপারটা কী? একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক।

হায় হায়, ‘হিসাবের কড়ি’ বাঘে নয়, আলোতে খেয়েছে। জানালা দিয়ে ঢোকা হাওয়ার গতিবেগ, ট্রেনের গতির হিসাবকে রক্ষা করে। তবে জানালা দিয়ে ঢোকা আলোর গতিবেগ ট্রেনের গতির হিসাব রক্ষা করে না কেন? হিসাবকে বেমালুম গিলে ফেলা তো প্রকৃতির নিয়মে অচল।
আলোকে গালি দেওয়া উচিত নয়। আলো নিয়ম ভাঙেনি, হিসাবের কড়িও খায়নি। ট্রেনের গতির হিসাবটা অন্য ভাষায় লেখা আছে। ওই অন্য ভাষার লেখা হিসাবটা পড়ার চেষ্টা করা যাক।
আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে হিসাবটা এইরকম হওয়া উচিত। আলোর গতি বাড়লে প্রতি সেকেন্ডে বেশি সংখ্যায় আলোর ঢেউ পাওয়া যাবে। যদি আলোর গতিবেগ কমে যায়, তখন প্রতি সেকেন্ডে আসা আলোর ঢেউয়ের সংখ্যা গুনতিতে কম হবে। এই হিসাবটা বাঘের পেটে যেতে দেব না।
ছুটন্ত আপ ট্রেনে আলোর গতি বাড়ে না। কিন্তু আলোর ঢেউ গুনতিতে বেড়ে যায়। ঢেউয়ের সংখ্যা বেশি, অথচ গতিবেগ বাড়েনি। ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে ঠেকছে। আসলে ওই ঢেউগুলো বেঁটে হয়ে যায়। একই গতিতে আলো আসছে। কিন্তু ঢেউগুলো বেঁটে বেঁটে, তাই গুনতিতে বেশি হয়ে যায়। গতিও বেশি হয়নি, আবার ঢেউ আসার সংখ্যাও বেড়েছে। (আলোর গতির গোঁ বজায় আছে, অথচ হিসাবের কড়ি বাঘে খায়নি।)
ঠিক একই নিয়মে, ডাউন ট্রেনেও আলোর গতি কমে যায় না। শুধু আলোর ঢেউগুলো লম্বা হয়ে যায়। এর ফলে গুনতির হিসাবটা বজায় থাকে। এখানেও হিসাবের কড়ি বাঘে খায়নি। (আলোও খায়নি।)
একটা হিসাব তো বোঝা গেল। কিন্তু ট্রেনের জানালার হাওয়ার গতি তো দিব্যি ট্রেনের গতির হিসাব রাখে। আলোর বেলা ওই হিসাব কোথায়?
আলোর ঢেউ বেঁটে হয়ে গেলে আলোর রঙ নীলের দিকে সরে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ব্লু শিফট’ (Blue Shift)। এই ব্লু শিফটটা বুঝিয়ে দেয়, আলোর দিকে ছুটছি। আর ওই শিফটের পরিমাণ বলে দেয়, কত জোরে ছুটছি। ট্রেনের গতির দিক আর ট্রেনের গতির হিসাব হারিয়ে যায় না।
আলোর ঢেউ লম্বা হয়ে গেলে আলোর রঙ লালের দিকে সরে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রেড শিফট’ (Red Shift) বলে। ওই রেড শিফটটা বুঝিয়ে দিচ্ছে, আলোর দিক থেকে সরে যাচ্ছি। আর রেড শিফটের পরিমাণ বলে দেবে, ট্রেনটা কত জোরে ছুটছে।
চলন্ত ট্রেনের তুলনায় আলোর গতি কত? এই প্রশ্ন মূল্যহীন। আলো তুলনা-ফুলনার ধার ধারে না। আলোর গতি বদলায় না। স্থির আর অস্থির এই অজুহাতে আলোর গতির হিসাব হয় না। যিনি আলোর গতি মাপছেন তিনি সবসময় আলোর কাছে স্থির। অন্যের চোখে তাঁকে অস্থির দেখালেও আলোর চোখে তিনি স্থির। (আলো অন্যের কথায় কান দেয় না।)
একটি ছুটন্ত রেলগাড়ি
স্থির আর অস্থিরকে নিয়ে আলোর বিচিত্র ব্যবহার বড়োই জটিল। তাই একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝাবার চেষ্টা করছি।
রেল-স্টেশনের পাশ দিয়ে একটা ট্রেন জোরে ছুটছে। ওই ট্রেনের কামরার ভেতরে যন্ত্রপাতি নিয়ে বিজ্ঞানী বসে আছেন। সেই কামরার ঠিক মাঝখানে একটা বাতি জ্বালানো আছে। আলো বাতি থেকে বার হবার পর কোন দেওয়ালে আগে পড়বে সেইটা মাপতে হবে।
রেল-স্টেশনের উপরে অন্য এক বিজ্ঞানী যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে আছেন। ওই ছুটন্ত কামরার কোন দেওয়ালে আগে আলো পড়ছে, তা মাপতে হবে।
ট্রেন যেদিকে ছুটছে সেই দিকে সামনের দেওয়াল। আর তার উলটোদিকে পেছনের দেওয়াল। এই দুই দেওয়ালকে নিয়েই যত মাপজোপ।
ট্রেনের কামরায় বসা বিজ্ঞানীর হিসাব। বাতির থেকে দুই দেওয়ালের দূরত্ব সমান। ট্রেন যতই ছুটুক না কেন, দেওয়ালের দূরত্ব বদলে যাবে না। তাই দুই দেওয়ালেই একসঙ্গে আলো পড়বে। কামরায় বসে, যন্ত্রপাতি দিয়ে মাপজোপ করে এই সত্যকে প্রমাণ করেছি।
রেল-লাইনের পাশে থাকা বিজ্ঞানীর হিসাব। আলো বাতি থেকে বার হয়ে দেওয়ালের দিকে ছুটে চলেছে। দেওয়ালের কাছাকাছি আসতে অল্প একটু সময় নেবে। ওই অল্প সময়ের মধ্যে রেলগাড়িও অল্প এগিয়ে যাবে। তাই কামরার পেছনের দেওয়ালটা আলোর দিকে সামান্য এগিয়ে আসবে। আর সামনের দেওয়ালটা আলোর কাছ থেকে সামান্য দূরে সরে যাবে।
পেছনের দেওয়াল এগিয়ে এসেছে। তাই আলোর দৌড়ের রাস্তা অল্প ছোটো হয়ে গেছে। তাই আলো অল্প আগেই পেছনের দেওয়ালকে ছোঁবে।
সামনের দেওয়াল দূরে সরে গেছে। তাই আলোর দৌড়ের রাস্তা সামান্য বড়ো হয়ে গেছে। তাই সামনের দেওয়াল ছুঁতে অল্প বেশি সময় লাগবে।
এক কথায় বলা যায় যে, চলন্ত ট্রেনে পেছনের দেওয়ালে আগে আলো পড়বে। ওই ট্রেন যত জোরে ছুটবে, আলো তত বেশি আগেভাগে পেছনের দেওয়ালকে ছোঁবে। যন্ত্র দিয়ে মেপে এই সত্যকে প্রমাণ করেছি।
একই ঘটনায় দু-রকমের প্রমাণিত সত্য। এক প্রমাণিত সত্য আবার অন্য সত্যের একদম উলটো। লাইনের ধারে থাকা বিজ্ঞানী হয়তো বলবেন যে ট্রেনের বিজ্ঞানী নিজেকে স্থির ভাবছেন, তাই এত ঝামেলা।

তিনি হয়তো বলবেন, ওই ট্রেনের বিজ্ঞানীর উচিত জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখা। তাকালেই বুঝবেন ট্রেনটা কত জোরে ছুটছে। আরও বুঝবেন যে, কামরার দেওয়াল দুটো মোটেই স্থির নয়। উনিও স্থির নন।
জবাবে ট্রেনের বিজ্ঞানী হয়তো বলবেন যে, ওই ট্রেনের গতি বড়োজোর একশো কি দেড়শো কিলোমিটার। আর লাইনের পাশে থাকা বিজ্ঞানী তো পৃথিবীর সঙ্গে ঘণ্টায় এক লক্ষ কিলোমিটার বেগে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছেন। তার বেলা? ওঁর উচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখা। চাঁদ-তারাদের সরে যাওয়া দেখলেই বুঝবেন উনি কত জোরে ছুটছেন। উনিও স্থির নন।
